নব ফাল্গুনের দিনে

পর্ব - ৯

🟢

"নীরু রে, আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না আমাদের কিছুক্ষণ আগে বিয়ে হয়ে গেল। মনে হচ্ছে স্বপ্ন।"

নৈঋতা কালবিলম্ব না করে রিহানের হাতে একটা চিমটি কাটল৷ রিহান চেঁচিয়ে বলে উঠল,

"একটা রাক্ষুসী ছিল আমার কপালে, আল্লাহ রক্ষা করো।"

নৈঋতা দুষ্টু হেসে বলল, "আমি আগে থেকেই এমন। তাছাড়া আমার কী দোষ, তুই স্বপ্ন দেখছিলি, তাই জাগিয়ে দিলাম।"

"এটাই বোধহয় জেনেশুনে বিষপান করা। আমি একেবারে উৎকৃষ্ট মানের বিষ গলায় ঢেলেছি। আচ্ছা, হেমলকের চাইতে উৎকৃষ্ট কোনো বিষ আছে? নাকি ওইটাই বেস্ট?"

নৈঋতা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, "আজ আমাদের বিয়ে হলো। পৃথিবীর কোন নব দম্পতি আছে যারা বাসর রাতে বিষ নিয়ে গবেষণা করে?"

"আমরা ইউনিক।"

"এত ইউনিক পোষাচ্ছে না। তাছাড়া কবুল বলতে না বলতেই বিষ হয়ে গেলাম? বাকি জীবন তো পড়েই আছে।"

রিহানও কম যায় না, সে-ও বলল, "তুই যে আমাকে এত মারিস তাতে দোষ নেই, বললেই দোষ!"

নৈঋতা ঘুরে বসে বলল, "যা আর মারব না। খুশি?"

রিহান বুঝল নৈঋতার অভিমান হয়েছে। সে এগিয়ে গিয়ে কাঁধের পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরল নৈঋতাকে। প্রথম আলিঙ্গন এত স্পেশাল হয়!

"না, মোটেও খুশি না। তুই যেমন আছিস, তার সবটা নিয়েই তোকে জীবনে চেয়েছি নীরু। আমার উপরে তোর প্রবল অধিকারবোধকেও খুব করে চাই, সবসময়। বদলাস না কখনো।"

নৈঋতার চোখ থেকে দুই ফোঁটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে রিহানের হাতে পড়ল।

"আজ কাঁদছিস কেন?"

"এটা আনন্দের কান্না গাধা। বুঝিস না?"

"এদিকে তাকা, তোকে ভালো করে দেখি। আজকের মতো করে আর কখনো সাজবি না তো।"

নৈঋতা তাকাল না, বলল, "ছবি আছে, ভিডিও আছে, দেখে নিবি।"

"সে তো স্মৃতি রোমন্থন করার জন্য। তোকে সামনা-সামনি এভাবে দেখতে কেমন লাগে সেই অনুভূতিটুকুও রেখে দিতে চাই।"

"আনরোমান্টিক রিহানের মুখে এমন রোমান্টিক কথাবার্তা!"

"কী জানি! আমার এসব কথা খুব ক্লিশে মনে হতো, কখনো মন থেকে আসেনি। আজ এলো। বলতে ভালো লাগছে, তোর জন্য আমার কী কী যে করতে হবে! তবুও কেন যেন ভালো লাগছে ভীষণ।"

নৈঋতা রিহানের দিকে তাকাল, প্রেমময় দৃষ্টি বিনিময় হলো, কত প্রতীক্ষার পর সে তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের মানুষকে জীবনে পেল। সেও তো হৃদয়ে চিরতরে বেঁধে রাখতে চায় আজকের বহু আকাঙ্ক্ষিত রাতটাকে, মানুষটাকে, আজীবন।

কী একটা অপার্থিব লজ্জা, আনন্দ, প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসা সমস্তকিছুই একাকার হয়ে গেল ফাল্গুনের এই প্রথম রাতটায়। ফাল্গুনের প্রথম দিনেই ওদের নতুন পথ চলা শুরু হলো।

***

এমএসের ক্লাস শুরু হয়ে গেছে মাসখানেক হলো। রিহানের জন্য নৈঋতাও এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশনে ভর্তি হয়েছে। এই ছেলের পড়াশোনায় মন নেই, তাই সে ভরসা পায়নি।

দুজন যার যার হলে থাকে। নৈঋতা এটা-সেটা রান্না করে নিয়ে আসে প্রায়ই। যদিও সে রান্নায় পরিপক্ক নয়। তবুও এই কিছুদিনে সে কাজ চালানোর মতো রান্না শিখে নিয়েছে রিহানের মায়ের কাছ থেকে।

তিনি ওকে পরম স্নেহে শিখিয়ে দিয়েছেন। যদিও রিহানকে বলেছেন,

"ও রান্না করবে আর তুই বসে বসে খাবি, তা কিন্তু হবে না। ওকে সাহায্য করবি।"

রিহান অবশ্য সাহায্য করার অবকাশ পায়নি। কারণ আলাদা থাকতে হচ্ছে। তবে বাজার করে এনে দেয়।

বিয়ের পর যখন ওরা প্রথমবার ইউনিভার্সিটিতে এলো, তখন সব বন্ধুবান্ধবরা ভীষণ খুশি হয়েছে। তবে সবার একটা কমন কথা ছিল,

"আমরা আগে থেকেই জানতাম যে তোরা দুইটা ডুবে ডুবে জল খাচ্ছিলি। কিন্তু স্বীকার করিস না।"

এখন আর ওরা ভুলটা ভাঙায় না, যা ভাবার ভাবুক, কিছুই এখন আর এসে যায় না, বরং মজাই লাগে। তবে ফাজিলের দলগুলো ট্রিট আদায় করতে ভোলেনি। আবার ফোঁড়ন কেটে বলেছে,

"ডাবল ট্রিট পাওনা। একটা ট্রিট দিলে হবে?"

এভাবে বিয়ের পরেও আলাদা আলাদাভাবে থাকতে ওদের ভালো লাগে না। নৈঋতা বাবার কাছ থেকে টাকা নেয়া বন্ধ করেছে। তিনি শাফায়াতের সাথে বিয়ে ভাঙার পরে নৈঋতাকে বলেছিলেন,

"ও তো এখনো স্টুডেন্ট। তোমার দায়িত্ব নিতে পারবে?"

কথাটা নৈঋতার গায়ে লেগেছিল। সে তখনই ঠিক করেছে বিয়ের পরেও বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে রিহানকে তার কাছে ছোট করবে না।

রিহানের বাবা বলেছিলেন, "আমার দুই সন্তান। একজন তো চাকরি করছে। আরেকজন সন্তানের দায়িত্ব নিতে পারব না?"

রিহানের মা-ও তাতে সম্মতি দিয়েছেন। তবুও নৈঋতা তাদের উপরে বাড়তি বোঝা হতে রাজি নয়। রিহানের বাবা রিটায়ারমেন্টে গেছেন। ওর বোধ ওকে বাঁধা দেয়। অনেকদিন থেকেই ভাবছিল টিউশনের কথা। কিন্তু আজ একটা ইউনিভার্সিটি এডমিশন কোচিং থেকে মোটামুটি ভালো একটা অফার আসায় সে লুফে নিল।

শেষ মোড়ের দিকে বাসা ভাড়াও তুলনামূলক কম। ক্যাম্পাসের প্রায় সাথেই। রিহানকে বলল কথাটা,

"রিহান, চল বাসা খুঁজি।"

"সে তো আমিও চাই। কিন্তু..."

"আমি ভাবছি কোচিংয়ের অফারটা নেব।"

"কিন্তু তোর পড়া যদি হ্যাম্পার হয়?"

"হবে না। খুব বেশি না, দুইটা শিফটে চারটা ব্যাচ করায় ওরা। আমি দুটো ব্যাচের ক্লাস করাব। যাতায়াত মিলে সাড়ে তিন ঘণ্টায় হয়ে যাবে।"

রিহান খোঁজ নিয়ে জানল সেখানে ওর এক ফ্রেন্ডের বড় ভাইয়ের পার্টনারশিপ আছে। সে-ও ক্লাস করাবে। দুইজন করলে টাকাটাও বেশি আসবে। নৈঋতার উপরেই পুরো ভারটা পড়বে না।

"কথাটা মা বাবাকে জানাস না। উনারা মন খারাপ করবেন।"

ওরা ভীষণ স্বপ্ন নিয়ে বাসা খুঁজতে শুরু করল। একটা বাসা পছন্দ হলো। একটা বেডরুম, রান্নাঘর, আর ওয়াশরুম। একটা ছোট্ট বারান্দাও আছে। যা আয় হবে থাকা খাওয়া হয়ে যাবে।

প্রথম মাসের স্যালারি পেয়ে একটা বড় কাঠের চৌকি কিনল, দুটো টেবিল, দুটো চেয়ার। তোশক, চাদর। বালিশ কাঁথা যা ছিল, তাতে কিছুদিন চলবে। নৈঋতার জমানো টাকা থেকে এডভান্স দিল বাড়ি ভাড়ার। এরপর একটা দিন দেখে বাসায় উঠে পড়ল, ওদের টোনাটুনির সংসার শুরু হলো।

এসাইনমেন্ট করছিল নৈঋতা, রিহান নিজের ল্যাপটপে নেটফ্লিক্সে সিরিজ দেখার তাল করছিল। নৈঋতা তেড়েফুঁড়ে বলল,

"এখন যদি তুই খালি সিরিজ দেখা শুরু করিস, তোর একদিন কী আমার একদিন।"

"সেটা তো তুই করছিসই।"

"আমি খেটে মরব, আর তুই ফুর্তি করবি, সেটা হবে না চাঁদু।" তুই আমার পাশে এসে বসে থাকবি।"

"এরজন্যই বিয়ে করেছিলাম আমি! শান্তি শেষ।"

বলল বটে কিন্তু উঠে নিজের চেয়ারটা নৈঋতার টেবিলের পাশে এনে বসল। এরপর একদৃষ্টে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকল। নৈঋতা ততক্ষণে বুঁদ হয়ে গেছে অসহ্য বিরক্তিকর এসাইনমেন্টে। এত বোরিং জিনিস এত একাগ্রতা নিয়ে কেউ করে!

কতক্ষণ পরে নৈঋতা রিহানের দৃষ্টি উপলব্ধি করে চোখ তুলে বলল, "এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?"

"তোকে মোটিভেট করছি!"

"এভাবে তাকিয়ে?"

"তো, এখানে তুই ছাড়া দেখার আর কী আছে! ওই এসাইনমেন্টের দিকে তাকিয়ে থাকব? তাছাড়া তুই তো আমাকে দেখিস না। যত প্রেম নিয়ে ওই এসাইনমেন্টের প্রতি। আমাকে দেখার সময় আছে?"

নৈঋতা রিহানের বলার ভঙ্গিতে হেসে ফেলল, "শেষমেশ এসাইনমেন্টকে জেলাস করছিস?"

"তোর আর আমার মধ্যে যেই আসবে সেটার প্রতিই জেলাস ফিল হয় আমার। কী করব?"

নৈঋতা জানে রিহান ওকে ডিস্টার্ব করার জন্য বলছে, বাবুকে এনে বসিয়ে রাখার প্রতিশোধ হিসেবে। তবে কথাগুলোয় কোনো ভণিতা নেই। মন থেকে বলছে। তাই ভালো লাগে ভীষণ।

সকালে এখন ফোন করে ডাকতে হয় না। রিহানের সাধের ঘুম দফারফা করে নৈঋতা বড্ড সকালে। সে ঘুম জড়ানো গলায় বলে,

"নীরু, সকাল সকাল বিরক্ত করিস কেন প্রতিদিন?"

"ক্লাস মিস হয়ে যাবে।"

"হোক। মাঝেমধ্যে ক্লাস মিস করা স্বাস্থ্যের পক্ষে উপাদেয়।"

"এটা কোন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের বাণী?"

"এটা রিহান স্পেশাল।"

"উঠ রিহান। না উঠলে গায়ে পানি ঢেলে দেব।"

"ধূর। আরেকটু ঘুমাব আমি।"

"আমি ক্লাসে গেলাম। সৌম্যর সাথে এসাইনমেন্টের প্রেজেন্টেশন নিয়ে ডিসকাস করিগে।"

রিহান ঝট করে উঠে বসল। নৈঋতা হেসে ফেলল। সৌম্য নৈঋতার সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়। শুধুই বন্ধুত্ব, নৈঋতা তবুও নিষেধ করেছে। কিন্তু রিহান ওকে সহ্য করতে পারে না। কার মনে কী আছে কে জানে! যদি বিরক্ত করে নৈঋতাকে! এটা মেয়েটা মাঝেমধ্যে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

***

কোচিংয়ের ক্লাস শেষ করে নৈঋতা বেরুচ্ছিল, শুনল বাইরে দুটো মেয়ে কিছু যেন বলছিল। রিহান নামটা শুনে ওর কৌতূহল হলো।

"রিহান ভাইয়াকে আমার জোস লাগে। আমি ক্রাশ খাইছি।"

"আমিও দোস্ত। সেদিন গান শুনাইসে, তুই মিস করছিস।"

নৈঋতার কী হলো সে জানে না, রিহানকে কল দিয়ে বলল, "একটু গেটের এদিকে আয় তো।"

"কেন?"

"আয় না।"

মেয়ে দুটো তখনো রিহান বন্দনায় মশুগুল। নৈঋতাকে খেয়াল করে থেমে গেল। এসে জিজ্ঞেস করল,

"আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন আপু?"

নৈঋতা হাসিমুখে বলল, "ভালো, তোমরা কেমন আছ?"

"ভালো।"

"ক্লাস নেই তোমাদের?"

"করলাম তো। রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছি আপু।"

এরমধ্যে রিহান এগিয়ে এলো।

"নীরু, জরুরি তলব কেন?"

"কিছু না। আজ তো ঘরে রান্না করার কিছু নেই। বাজার করতে হবে। এরপর আমাকে রান্নায় হেল্প করবি। মা কী বলেছে মনে নেই? ওয়াইফকে হেল্প করতে?"

মেয়ে দুটো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ওরা কোনোমতে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।

নৈঋতাও গটগট করে হেঁটে রাস্তায় নামল। রিহান পেছনে যেতে যেতে বলল,

"আরে, বাজারে যাবি ভালো কথা। কিন্তু তোর হয়েছেটা কী? এমন করছিস কেন?"

"তোর গিটার সাথে করে নিয়ে আসিস। আরও বেশি ক্রাশ খাবে তোর উপরে।"

রিহানের এতক্ষণে বোধগম্য হলো বিষয়টা। সে হেসে ফেলল, "আরে এতে আমার কী দোষ?"

নিজের ছেলেমানুষীতে নৈঋতা নিজেও হতভম্ব হয়ে গেল। এসব কী করল এতক্ষণ! কিশোরী মেয়েদের মতো! এখন এসব মানায়!

"তুই যেভাবে বললি, দেখবি কালকের মধ্যেই সবাই কথাটা জেনে যাবে। তখন ক্রাশ টাশ হাওয়া হয়ে যাবে।"

"মন খারাপ হলো বুঝি?"

"তা তো একটু হয়েছেই।" স্বভাবসুলভ দুষ্টুমি করে রাগিয়ে দিতে কথাটা বলল রিহান।

সত্যি বলতে এখন নৈঋতা ছাড়া অন্য কারোর এটেনশন সে চায় না। ওই সমুদ্র সমান এটেনশনে ডুবে সে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারে।

রিহানের ভাবি ওদের বলেছেন, "ভালোবাসায় এসব হয়। ধীরে ধীরে যখন অনেক পরিপক্কতা আসবে, তখন এসব কমে আসে অনেক।"

কিন্তু ওরা কেউই চায় না এই অনুভূতির উদ্দামতা কমুক।

***

দেখতে দেখতে পরীক্ষা চলে এলো প্রথম সেমিস্টারের। দুই টেবিল একসাথে করে নিয়ে পড়তে বসেছে। রিহানের সাথে পড়তে গিয়ে বেচারা ঘুমে টলে পড়ে যাচ্ছে। নৈঋতা ঠেলেঠুলে জাগিয়ে দিচ্ছে।

মূলত এরজন্যই নৈঋতা আরও তাড়াহুড়া করে বাসা নিয়েছে। পরীক্ষায় এই ছেলের মাথায় পড়ার ভূত ইনপুট করা যায় যদি!

"ঘুমাচ্ছিস কেন?"

"কই ঘুমাইচ্ছি। পড়ছি তো।"

নৈঋতা ফ্লাস্কে চা বানিয়ে রেখেছিল। সেটা কাপে ঢেলে এগিয়ে দিল।

"এটা কিন্তু টর্চার।"

"ফুটবল ম্যাচ দেখার জন্য সারারাত জাগিস, মুভি সিরিজ দেখিস রাত জেগে। পড়তে বসলেই যত ঘুম?"

"আরে, ঘুম এলে আমি কী করব? ঘুম কি আমার পারমিশন নিয়ে আসে নাকি?"

"রিহান? তোর ভুজুংভাজুং বন্ধ কর!"

"আজ ঘুমাই, প্লিজ।"

এবার নৈঋতার মায়া লাগল ভীষণ। কঠিন গলায় কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। রিহান ততক্ষণে টেবিলে মাথা চাপিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। নৈঋতা এক পৃথিবী মায়া নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। এরপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আদুরে গলায় বলল,

"বিছানায় গিয়ে ঠিক করে ঘুমা পড়া চোর।"

নব ফাল্গুনের দিনে গল্পটি নুসরাত জাহান লিজা-এর লেখা একটি জনপ্রিয় অসাধারণ একটি সাংসারিক গল্প