রিহানের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল অসীম ক্ষোভ, কোনোকিছুতেই আগ্রহ পাচ্ছিল না। সেটা স্প্যানিশ লীগের এল ক্লাসিকো হোক, নেটফ্লিক্সের নেইল বাইটিং যত নতুন থ্রিলার সিরিজই হোক, কিংবা হৃদি.. কোনোকিছুর প্রতিই ওর আগ্রহ আসছিল না। যাবতীয় প্রিয় জিনিসে যেন হঠাৎই রাজ্যের অরুচি এসে জমা হয়েছে।
এলার্ম দিয়ে ঘুমায়, কিন্তু এলার্মের কর্কশ শব্দে ঘুম ভাঙার পরেও কোনো একটা ক্ষীণ আশা নিয়ে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে! আজ যদি কাঙ্ক্ষিত কলটা আসে!
ক্লাসে কখনো দু'জন মুখোমুখি হয়ে গেলে ইউটার্ন নিয়ে চলে যায়। তবে পুরো ক্লাসে ঠিকই আড়চোখে নৈঋতা কী করছে তীক্ষ্ণ খেয়াল রাখে।
দুই সপ্তাহ পরে রিহান কেআরে দাঁড়িয়ে ছিল, নৈঋতা এসে বলল, “নে, তোর এসাইনমেন্ট।”
রিহানের ক্ষোভের আগুনে যেন ঘি পড়ল, “তুই কেন করেছিস? করুণা করতে? তুই দায়িত্ব নিতে বলেছিস। আমি নিজেই করে নেব। সিমপ্যাথি দেখিয়ে এসাইনমেন্ট দিতে হবে না।”
“জেনে ভালো লাগল যে তুই নিজে সিরিয়াস হচ্ছিস। এবার তো কষ্ট করেই ফেলেছি, অভ্যাস হয়ে গেছে। এরপর থেকে নাহয় তুই করে নিস। রেখে গেলাম।”
কথাটা বলে ওর হাতে এসাইনমেন্টটা ধরিয়ে দিয়ে হলে চলে গেল নৈঋতা। রিহানের ইচ্ছে হলো এটা পুড়িয়ে ফেলতে। কিন্তু পারল না! ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল। নৈঋতার দেয়া কিছু সে নষ্ট করতে পারবে না।
সায়নের রুমে বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছিল। ওই রুমে মাস্টার্সের বড় ভাই আজ নেই। সবাই সেখানে আড্ডা জমিয়েছে। রিহান আর মৃদুল গিটার বাজায়। ওদের সাথে গিটার আছে।
আড্ডা চলছিল উদ্দেশ্যেহীন, লতাপাতা, শাখা-প্রশাখায় বিস্তার হয়ে বিষয়বস্তুর শিকড় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না৷ কোন প্রসঙ্গ থেকে কোন প্রসঙ্গে যাচ্ছে তারাও কোনো তাল মিল নেই।
আড্ডা তখন তুমুলে, এরমধ্যে সহসা মৃদুল রিহানকে প্রশ্ন করল, “দোস্ত, তোদের কী হয়েছে রে?”
“কাদের?”
“তোর আর নীরুর?”
“কী হবে? কিছুই না।”
এবার রেদোয়ান বলল, “কিছু না বললেই হলো? আমাদের চোখ সওয়া হয়ে গেছে তোদের দুইটাকে একসাথে দেখতে দেখতে। মামা, এইভাবে এড়ায়ে গেলে হবে? সবারই চোখে লাগছে এটা!”
“তো এর জন্য আমি কী করব?”
“কী হয়েছে বললেই তো হয়।”
“অন্য কথা থাকলে বল, নইলে চুপ থাক৷ আজাইরা কথা অসহ্য লাগছে।”
“আচ্ছা। থাক।”
কিন্তু থাক বললেই সব থামে না, একজন বলল, “নীরু মেয়েটার কিন্তু খুব ধৈর্য। আমরা নিজেরটাই করে কূল পাই না, বেচারি এসাইনমেন্ট, কিছু কিছু প্র্যাকটিক্যাল খাতা পর্যন্তও তো করে দেয়।”
রিহান হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “থামবি তুই? বললাম না এই টপিক বাদ। তাও খোঁচাচ্ছিস কেন?”
“তুই রেগে যাচ্ছিস কেন? এটা খোঁচা কীভাবে হলো?”
রিহানের সামনে এসট্রে ছিল, সেটাকে ছুঁড়ে ফেলল প্রবল রাগে, এরপর বেরিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। সে সিগারেট সবসময় খায় না৷ কখনো সখনো এমন আড্ডায় দুই টান দেয়।
বন্ধুরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল কেবল, কিছুই বুঝতে পারছে না।
রিহান নিজের ঘরে এসে পড়ার টেবিলে বসল, রাগ কমানোর জন্য সামনে খাতা কলম পেয়ে, খাতায় প্রবল রাগে কলম দিয়ে ঘষাঘষি করতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে টেবিলে দুই হাত রেখে খাতার মধ্যে মাথা গুঁজল। অস্ফুটস্বরে বলল,
“এমন করলি কেন নীরু? আমি কি খুব বেশি খারাপ? আমার সাথে বন্ধুত্ব রাখা যায় না!”
***
মাসখানেকের মধ্যে রিহানের ক্ষোভ, রাগ সমস্তই থিতিয়ে এলো, এই অনুভূতি প্রতিস্থাপিত হলো হাহাকারে!
নৈঋতা ওর কাছে ভীষণ স্পেশাল মানুষ। তবে ওর সামান্য একটু দূরত্ব যে এতটা অসহনীয় হবে, সে কোনোদিন ভাবতে পারেনি।
এত দূরে যাবার এই যে চেষ্টা, তবুও ওর জন্য ভাবছে মেয়েটা। কখন কোন শিটপত্র লাগবে, কখন কোন এসাইনমেন্ট সাবমিট করতে হবে সব মনে করিয়ে দিয়েছে।
ইউনিভার্সিটি লাইফের এই সেমিস্টারটা এত বিশ্রী কাটল! শুধু ইউনিভার্সিটি লাইফের কেন, রিহানের পুরো জীবনে এমন অসময় কী কখনো এসেছিল!
দেখতে দেখতে শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষার ডেট দিয়ে দিল। ফরম ফিলআপের আগেরদিন নৈঋতা নিজের এগিয়ে এলো। হাতে একগাদা ফটোকপি করা শিট।
“কেমন আছিস রিহান?”
“ভালো।” অভিমানে ইচ্ছে থাকলেও জিজ্ঞেস করা হলো না নীরু কেমন আছে।
“এগুলো নে।”
“কী হবে এগুলো দিয়ে?”
“পড়বি। পরীক্ষা চলে এসেছে না?”
“তোর এত চিন্তা করতে হবে না।”
“ঢং করিস না, রিহান। লাস্ট সেমিস্টারে ক্যারি খেলে চল্লিশ দিনে পড়ে যাবি৷ এমএসে জে-জে সেমিস্টার ধরতে পারবি না।”
“না পারলে নাই।”
“কেন জেদ করছিস এভাবে? নিজের ভালো বুঝবি তো!”
“তুই বুঝেছিস? তুই যে এমএসই করবি না বললি।”
“করব।”
এতদিনের সকল তিক্ততা ভুলে রিহান ভীষণ আনন্দিত হয়ে বলল, “সত্যি?”
“হ্যাঁ। শেরে বাংলায় ভর্তি হবো।”
হাসিমুখ আবার ম্লান হয়ে গেল, “এখানে কী সমস্যা?”
“শাফায়াতের ফ্যামেলি ঢাকাতেই থাকে।”
“শাফায়াত? মানে ওই ছোটলোকটা? ওকেই বিয়ে করবি?”
“এভাবে বলবি না রিহান। হ্যাঁ। উনি আমার কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন কয়েকবার। আমার পরীক্ষাটা শেষ হলেই বিয়ে হবে।”
“ভালোই।”
বলে রিহান চলে যাচ্ছিল, নৈঋতা পেছন থেকে ডাকল ওকে,
“রিহান, একটু দাঁড়া!”
এই ডাকে কী যেন ছিল সে উপেক্ষা করতে পারল না।
“রিহান, আমাদের কত চমৎকার সময় কেটেছে ক্যাম্পাসে। আমার লাইফের বেস্ট মোমেন্টগুলো আমি তোর সাথে কাটিয়েছে। আমাদের একসাথে সময়টা আর অল্প কিছুদিন। তারপর যে যায় পথে চলে যাব। তুই তোর লাইফে, আমি আমার লাইফ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাব। মাঝেমধ্যে হয়তো খোঁজখবর নেয়া হবে! কিন্তু এভাবে এই মুহূর্তগুলো আর কোনোদিন ফিরবে না। শেষটা এভাবে তিক্ততায় শেষ করবি? বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে একটা জিনিস তোর কাছে চাইছি রিহান, এই কয়টা দিন আমাদের মতো করে, আগের মতো করে কাটাই আমরা?”
বলতে বলতে কখন যে নৈঋতার চোখে পানি চলে এসেছে সে বুঝতেও পারেনি, রিহানের চোখও ঝাপসা। চোখ ভরা জল নিয়ে রিহান বলল,
“তুই খুব খারাপ নীরু! কষ্ট যখন হচ্ছে, তাহলে কেন চলে যাচ্ছিস? তুই এত নিষ্ঠুর কেন?”
নৈঋতা চোখ মুছে হাসার চেষ্টা করে বলল, “বন্ধুত্ব এমনই রিহান। স্টুডেন্ট লাইফ শেষ হলে কোনোদিন আর আগের মতো হয় না কিছু। এটাই রিয়্যালিটি।”
“কেন হয় না?”
“জানি না। এবার নে এগুলো।”
রিহান ঘুরে সন্তর্পণে চোখ মুছল।
“হৃদির কী খবর?”
“জানি না।”
“জানিস না মানে?”
“ওর সাথে কন্টিনিউ করছি না।”
“কেন?”
“ম্যাচ করছে না৷ ওর মধ্যে সন্দেহ বাতিক আছে। জিনিসটা আমার ভালো লাগে না। ভালো হয়েছে প্রপোজ করিনি আগে।”
প্রায় তিন মাস পরে ওরা স্বাভাবিক ভাবে কথা বলল। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। রিহানের মনে হলো নৈঋতা পরীক্ষার জন্য ওর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। যা চলছিল, সেভাবে চললে রিহান কিছুতেই নৈঋতার খাতা দেখে লিখত না জেদ করে। সেজন্যই এটা করেছে। নইলে ওকে তো মুছেই দিয়েছিল। পরীক্ষা শেষ করে ওর সাথে বেশিক্ষণ কথা না বলেই নইলে হুট করে চলে গেল কেন!
রিহান মায়ের সাথে নৈঋতার বিয়ের কথাটা সে শেয়ার করেছে৷ মা জিজ্ঞেস করলেন,
“তুই এত কষ্ট পাচ্ছিস কেন?”
“পাওয়ার কথা না?”
“তোর রাগ ছিল নীরু পড়াশোনা বাদ দেবে বলে। কিন্তু ওর তো সেটা করছে না। তাহলে তোর রাগের জায়গাটা কোথায়?”
রিহান মায়ের কথায় হঠাৎ থমকে গেল। ওর সহসা মনে হলো, সে নীরুকে হারাতে পারবে না।
“তোর সমস্যাটা মনে হয় আমি বুঝতে পেরেছি।”
“কী?”
“ছোট বাচ্চারা কী করে জানিস? খুব প্রিয় কোনো জিনিস নিয়ে খেলে, এরপর একসময় সেটা স্বাভাবিক মনে হয়। এরপর হয়তো জিনিসটা কোনো সুরক্ষিত জায়গায় রেখে দেয়। অনেকদিন পরে হয়তো জিনিসটার কথা ভুলেই যায়! বাবা অথবা মা হয়তো সন্তানের আগ্রহ হারিয়ে গেছে বলে কাউকে দিয়ে দিল। তখন হঠাৎ তার মনে পড়ল জিনিসটা ওর কত প্রিয় ছিল! সেই হারিয়ে ফেলা প্রিয় জিনিসের জন্য সে অস্থির হয়ে উঠে। তোর সাথে এটা পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক নয়। তবুও নীরু তোর মনে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে এটা তুই আগে বুঝিসনি৷ যখন ও সরে গেছে, তখন অনুভব করেছিস। দূরত্ব মানতে পারছিস না।”
“মা, আমি…”
“নীরুকে আমার ভীষণ পছন্দ ছিল। ভেবেছিলাম আমার এলোমেলো ছেলেটার জন্য ওই মেয়েটা পারফেক্ট। কিন্তু আমার ছেলেটা শুধু এলোমেলো না, বোকাও। নিজেকে চিনতেই বড্ড দেরি করে ফেলল!”
রিহান বিস্মিত হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ, বলল, “আমি নীরুর বাড়িতে যেতে চাই মা। একবার শেষ চেষ্টা করতে। অন্তত নিজের কথা জানাতে চাই৷ এরপর ওর সিদ্ধান্ত।”
রিহান সেদিন রাতেই রওনা দিল নৈঋতাদের বাড়িতে। শুধু মনে মনে দোয়া করল, যেন খুব বেশি দেরি না হয়ে যায়! ফাজিল মেয়ে কল ধরছে না কেন!
নৈঋতার ঘুম ভাঙল মুঠোফোনের রিংটোনে, কলারের নাম দেখে উঠে বসল ঝটপট। সময় দেখল, ছয়টা বত্রিশ, এত ভোরে রিহান কেন কল করেছে! রাতেও অনেকবার কল দিয়েছে, সে ইচ্ছে করে ধরেনি। নিজের মনের নাজুক অবস্থা ওকে জানতে দিতে চায় না বলে, সেজন্য ভালোমতো বিদায়ও নিতে পারেনি।
কোনো সমস্যা হলো কি-না ভেবে কলটা রিসিভ করল, কিন্তু সহসা মুখে কথা ফুটল না।
“নীরু!”
“রিহান? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
“হুম, জীবন মরণ সমস্যা।”
নৈঋতার চিন্তা প্রগাঢ় হলো, অস্থির চিত্তে প্রশ্ন করল, “কী হয়েছে?”
“একবার বাইরে আসবি নীরু?”
“মানে?”
“আমি তোদের বাড়ির পাশে একটা পার্কের মতো জায়গা আছে না? তুই গল্প করতি, তোর মন খারাপ হলে এখানে বসে থাকিস। আমি এখানে আছি।”
“এত সকাল সকাল কল দিয়ে ফাজলামো করছিস কেন? তাছাড়া সকালে আমি তোকে না ডেকে দিলে উঠিস না৷ আজ…”
“তুই আমার এলার্ম ঘড়ির কাজ করতিস, আজ ভাবলাম একদিনের জন্য আমি তোর এলার্ম ঘড়ি হয়ে যাই৷ তাছাড়া আমি, সত্যি বলছি। দাঁড়া, প্রমাণ দেই।”
বলে একটা সেলফি তুলে পাঠালো রিহান।
“বিশ্বাস হলো? এই ডিসেম্বরের কনকনে ঠাণ্ডায় তিন ঘণ্টা ধরে এখানে বসে আছি। একবার আয় প্লিজ, ভীষণ জরুরি কথা আছে৷ না বলতে পারলে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে!”
“এখন কয়টা বাজে তুই জানিস?”
“না জানার কী আছে! আমি এসে পৌঁছেছি, তখন সাড়ে তিনটা বাজে। অত রাতে তোকে ডাকলে খারাপ দেখাবে, সেজন্য এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। এখন তো ভোর হয়েছে। আয় প্লিজ!”
নৈঋতা চোখেমুখে পানি দিয়ে একটা শাল গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে এলো। চুলটাও আঁচড়ানো হয়নি। রিহান কী বলতে চায় ওকে! যার জন্য এভাবে ছুটে এসেছে!
বেরুবার সময় বসার ঘরে ওর বাবা বসেছিলেন, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাচ্ছ এত সকাল সকাল?”
“পার্কে।”
“কেন?”
“আমার একজন ফ্রেন্ড এসেছে তাই।”
“যেই ফ্রেন্ডকে নিয়ে শাফায়াতের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে সে?”
“হ্যাঁ।”
“এটা বেয়াদবি নয়?”
“আমি এসে তোমার সাথে কথা বলি বাবা?”
কথাটা বলে শোনার জন্য আর দেরি করল না, তার নতুন পরিবার নিয়ে তিনি তো শান্তিতেই আছেন। ওকে কোনটা আদব কোনটা বেয়াদবি সেটার শিক্ষা দেবার মতো সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই তার হয়নি কখনো। আজ কেন! অভিভাবকত্ব কি কেবল শাসনের বেলায়! ওর নিয়ম ভাঙতে ইচ্ছে করল।
বাইরে বেরুতেই হিম শীতল বাতাস গায়ে এসে ধাক্কা দিল, পাতলা শালে এই শীত মানবে না! তবুও সে এগিয়ে গেল গন্তব্যের পথে।
ওকে দেখে রিহান উঠে দাঁড়াল, ছেলেটার চোখের নিচে সূক্ষ্ম কালি পড়েছে, সুদর্শন রিহানের চেহারায় আজ মালিন্য। জীবন নিয়ে সিরিয়াস না হলেও পোশাকের ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে ছেলেটার পোশাকও যেন এলোমেলো।
“নীরু, এসেছিস তুই?”
নৈঋতা নিজেকে শক্ত করে নিয়ে বলল, “যা বলার তাড়াতাড়ি বল রিহান।”
রিহান ম্লান হাসল এরপর নৈঋতার দিকে দুই কদম এগিয়ে এসে ওকে পর্যবেক্ষণ করল। ওদের মধ্যে হাত তিনেকের ব্যবধান।
“হুট করে আমার সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে নীরু। আমি সুস্থির হয়ে কিছু ভাবতে পারছি না। কী বলতে এসেছিলাম, তাও গোছানো নেই। শুধু জানি, যা বলতে চাই তা আমাকে বলতেই হবে। তুই তো আমাকে বুঝিস নীরু? তাই না? আমার এলোমেলো কথাগুলো বুঝে নিবি, কেমন?”
নৈঋতা ধৈর্য হারাল, তবে কিছু বলল না। রিহান বলতে শুরু করল,
“তুই আমাকে প্রতিদিন ঘুম থেকে সকালবেলা তুলে দিতি, আমার শান্তির ঘুম নষ্ট হতো বলে কত ঝগড়া করেছি তোর সাথে। আমি জানতাম না, তোর ওই সকালবেলার ঘুম ভাঙানি কলটা আমার কত প্রিয়! গত কিছুদিন আমি ঘুমাতে পারিনি, মনে হতো কেবল ওই কলটাই মিস করছি, কিন্তু গতকাল মনে হলে আসল সমস্যা আসলে অন্য। তুই সকালে আমার ঘুম না ভাঙিয়ে অন্য পুরুষের ঘুম ভাঙাবি, এটা আমি সহ্য করতে পারব না। তুই আমার সমস্ত খেয়াল রাখিস, তোর বিয়ে হয়ে গেলে ওই লোকের খেয়াল রাখবি, তোর সমস্তটা দিয়ে, এই চিন্তাটা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে নীরু। তুই আমার এসাইনমেন্ট করে দিস, ভবিষ্যতে অন্য মানুষের জন্য তুই রান্না করে দিবি হাত পুড়িয়ে, তোর কোথাও আর আমি থাকব না, এটা আমি কি করে সহ্য করব নীরু? বল? আমাকে একটা উপায় বলে দিতে পারবি?”
রিহানের কথা শুনতে শুনতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল নৈঋতা, মৌনতা কাটিয়ে প্রশ্ন করল, “তুই কি আমাকে ভালোবাসিস রিহান?”
“ভালোবাসা কী, আমি জানি না নীরু। ওইসব কেতাবি কথাবার্তা আমি বুঝতেও চাই না। শুধু এটুকু বুঝি, তোকে আমি হারাতে চাই না। তোর সমস্তটা জুড়ে আমি থাকতে চাই। আমাকে বন্ধুত্ব ভরা শাসন করিস, আমি তোকে সারাজীবনের জন্য সেই অধিকার দিতে চাই। তুই একদিন বললি না নীরু, ভার্সিটি লাইফ শেষ হলে আর কিছুই আগের মতো থাকে না! আমার সাথে তুই তোর বেস্ট মোমেন্ট কাটিয়েছিস? আমিও আজ সত্যিটা বলতে চাই, আমার লাইফেরও বেস্ট পার্ট ওইটা৷ ওই সময়টুকুকে আমরা লম্বা করতে পারি না? শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত?”
এমন আবেগী রিহানকে নৈঋতা চেনে না, এমন আকুল হয়ে এই ছেলে ওকে চাইবে, এটা ওর কোনো সুখ স্বপ্নকেও হার মানায়! কিন্তু এত আরাধ্য কথাগুলো শুনল বড্ড অসময়ে!
“এত দেরি করলি কেন কথাটা বলতে? এখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে রিহান!”
কম্পিত গলায় অস্ফুটস্বরে বলল নৈঋতা, রিহান অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কত দেরি?”
“সামনের সপ্তাহেই বিয়ে হবে আমার। আজ কার্ড ছাপাতে দেবে। সব কথাবার্তা ফাইনাল। এখন কিচ্ছু করার নেই রিহান।”
“সবগুলোতেই তো হবে বললি, তাহলে দেরি কী করে হয়ে গেল? তুই কি ওই ছোটলোকটাকে ভালোবাসিস?”
এতদিনের এত শঙ্কা সবটা সরে গিয়ে রিহান যেন সহসা নির্ভার হলো। অদ্ভুত একরোখা শোনায় গলাটা।
“না।”
“তুই শুধু তোর ইচ্ছেটা আমাকে বল। বাকিটা আমি ম্যানেজ করে নেব। বল প্লিজ। আজ জানিয়ে দে। একটা অনুরোধ, প্লিজ, মিথ্যা কথা বলবি না। তোর একটা কথার উপরে আমাদের ভবিষ্যত নির্ভর করছে।”
নৈঋতার হৃদয়ের খুব গহীন প্রকোষ্ঠে আজ যেন প্রবল ঢেউ আন্দোলিত হচ্ছে, যাবতীয় জাগতিক সমস্যা, দ্বিধা সব যেন প্রবল স্রোতে কোথাও ভেসে গেল,
“তোকে কখনো বলা হয়নি রিহান, আজ বলে ফেলি। জানি না ভবিষ্যতে কী হবে, তবে এই কথাটা আমি শেয়ার করতে চাই। আজ না বলতে পারলে হয়েতো আর কোনোদিনই বলা হবে না৷ এই জঞ্জালে ভরা ধুলোমাখা পৃথিবীতে তুই আমার একমাত্র শান্তি রিহান।”
বলতে বলতে পার্কের বেঞ্চিতে বসে পড়ল নৈঋতা, দু'হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল, আর রিহান! ওর মনে তখন অপার্থিব আনন্দ, বিস্ময়, কষ্ট সমস্তটা একসাথে হয়ে যেন সুখী সুখী একটা সুর খেলে গেল।
“কবে থেকে?” গলায় আবেগে কম্পমান।
নৈঋতা মুখ তুলে তাকালো, “কী কবে থেকে?”
“এই, যেটা বললি মাত্র!”
নৈঋতা এবার পুরোপুরি নিজেকে ফিরে পেয়েছে, স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল, “সেটা তোকে কেন বলব?”
“আমি যে বললাম?”
“আমি বলব না এটা।”
“তারমানে আগে থেকেই? তাইতো?” কিছুক্ষণ ভেবে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে নিয়ে রিহান হঠাৎ রেগে গিয়ে বলল,
“এরজন্যই আমার সাথে ডিসট্যান্স তৈরি করেছিলি? আমার জন্যই ওকে বিয়ে করার মতো একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলি? নীরু, তুই আমাকে একবার বলতে পারতি না?”
সমস্ত আড়াল সরে যাবার পড়ে এখন আর লুকানোর মতো কিছু নেই, তাই নৈঋতাও আজ নির্ভার,
“তখন বললে তুই বুঝতে পারতি না রিহান৷ তোকে আমি চিনি। তখন আমি তোর চোখে অন্য দশজনের মতো সাধারণ হয়ে যেতাম৷ আমি সবসময় বড্ড সাধারণ রিহান, অন্তত পৃথিবীতে একজন কেউ তো আছে, যার কাছে আমি অসাধারণ। এটুকু ভালো লাগা নিয়েই সরে এসেছিলাম। সারাজীবন ওইটুকু সুখ একান্ত আমার হতো! এটা কি অন্যায়?”
রিহানের দৃষ্টি হঠাৎ ঝাপসা হয়ে এলো, এই মেয়েটা ওকে এত কাছে থেকে এতটা ভালোবেসে গেছে! সে বুঝতেই পারেনি!
“শাফায়াতের সাথে দেখা করব। বিয়েটা ভাঙতে হবে তো!”
“কী করে?”
“আমার অনেক টেকনিক জানা আছে।”
“শুনি?”
“বলব ওর ধারণা সঠিক ছিল। সে যদি তৃতীয় পক্ষ হয়ে আমাদের মাঝে আসতে চায়, তবে তার ইচ্ছে। অন্য পদ্ধতি এপ্লাই করব। এসব ম্যানেজ করা আমার জন্য সমস্যা না। ওই ব্যাটার ঘটে বুদ্ধি থাকলে অবশ্যই নিজে নিজে সরে যাবে।”
নৈঋতা প্রশ্ন করল, “নাহিদ ভাইকে তুই কী বলেছিলি?”
“সেটা তোর শুনতে হবে না!”
“বল, রিহান, না বললে আমি ছোটলো.. আই মিন শাফায়াতকে বিয়ে করে ফেলব।”
রিহান হেসে ফেলল সশব্দে, “দেখ, আমার কাছ থেকে শুনতে শুনতে তুই ছোটলোক বললি। এভাবে ব্ল্যাকমেইল করছিস কেন?”
“আমার ইচ্ছা।”
“কিন্তু ওইটা টপ সিক্রেট।”
“মাইর খাবি রিহান।”
“তোর হাতে ভীষণ জোর। থাক বলি, বলেছিলাম, তোর মাথায় গণ্ডগোল আছে।”
নৈঋতা উঠে রিহানের সামনে গিয়ে ওর পিঠে দুমদাম কিল বসিয়ে দিল কয়েকটা।
হঠাৎ রিহান অন্যরকম স্বরে বলল, “তুই নিজের মধ্যে ছিলি না। আজ অঅনেকদিন পরে আবার আমার চেনা নীরুকে দেখতে পেলাম। মিস করছিলাম এটা।”
নৈঋতা থমকে গেল, “ওকে বলেছিলাম, তোর সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। পড়াশোনা শেষ করে স্যাটেল হলেই বিয়ে করে ফেলব। সেই মিথ্যেটা আজ কেমন সত্যি হয়ে যাচ্ছে দেখ।”
নৈঋতা বলল, “বিয়ে করতে যাচ্ছি, বললেই বিয়ে হয়ে গেল? তুই যা ফিরিস্তি দিলি, সবটাতে তো আমি তোর জন্য কী করব সেটা বলে গেলি। তুই আমার জন্য কী করবি?”
“তোকে সহ্য করব সারাজীবন, এটা কম?”
নৈঋতা রাগি চোখে তাকাতে রিহান সিরিয়াস গলায় বলল, “আমি তোকে তোর হাসিমুখ দিতে চাই।”
“আমার হাসিমুখ আমাকে কী করে দিবি?”
নৈঋতার চোখের দিকে তাকিয়ে রিহান প্রগাঢ় স্বরে বলল, “তোর অমূল্য হাসিটা তোর মুখে যেন সবসময় থাকে, এটা খেয়াল রাখব সবসময়।”
নৈঋতার মনে হলো, জীবন এত সুন্দর কেন!
“আমাকে তুই প্রেমের প্রস্তাব তো দূরের বিষয় বিয়ের জন্যও প্রপোজ করিসনি এখনো।”
রিহান শঙ্কিত গলায় বলল, “এতক্ষণ কী বললাম তাহলে?”
“সুন্দর করে বল।”
“এ্যাহ্! এটায় ছাড় পাওয়া যায় না? আমার অতি মেলোড্রামা পোষায় না!”
“অনেককিছু ছাড় দেব, কিন্তু এটা মাস্ট।”
“চল আমরা বিয়ে করে ফেলি।”
“এত বেরসিক প্রস্তাব আমি জীবনে শুনিনি।”
“না শুনলে নাই। তোর বাবাকে প্রস্তাব দেব সুন্দর করে।”
নৈঋতা রেগে যাচ্ছিল, রিহান হঠাৎ বলল, “শুনেছি বসন্ত নাকি প্রেমের ঋতু। সামনের ফাল্গুনেই চল বিয়ে করে ফেলি।”
“এত তাড়াহুড়ার কী আছে? আমাদের পড়া শেষ হোক আগে!”
“এখন কেন মনে পড়ল? তুই তো এখনি বিয়ে করতে যাচ্ছিলি! তাছাড়া আমি রিস্ক নিতে চাই না।”
“কীসের রিস্ক?”
“বিয়ে হবার আগ পর্যন্ত তুই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে কাজ আদায় করে নিবি। হয়ে গেলে এটা দিয়ে আর ব্ল্যাকমেইল করতে পারবি না।”
হেসে বলল রিহান।
শীতের সকালে সূর্য উঠে গেছে ততক্ষণে, কুয়াশায় মোড়ানো প্রকৃতি। এরমধ্যে ওরা যাচ্ছে নৈঋতার বাড়িতে, ওর বাবার সাথে কথা বলতে।
যেতে যেতে রিহান বলল, “শোন না, বিয়ের পরে কিন্তু তোকে তুমি বলতে পারব না!”
“আমিও না, তোকে তুই বলার মধ্যে একটা আপন আপন ব্যাপার আছে, তুমি বললে মনে হবে দূরের মানুষ।”
“নাতিপুতিরা টিজ করলেও কিন্তু বলবি না!”
“ধূর, রিহান।”
নৈঋতার বাবার আপত্তি কেটেছে রিহানের মায়ের মধ্যস্থতায়। তিনি ভীষণ খুশি। বড় ছেলের বউয়ের সাথেও তিনি টিপিক্যাল শাশুড়ি হতে পারেননি, পারবেনও না। নৈঋতার মা হয়ে উঠার জন্য তিনিও অপেক্ষা করছেন৷
সামনের ফাল্গুনের প্রথম দিনেই ওদের বিয়ে হবে! নতুন একটা ফাল্গুনে নতুন শুরুর অপেক্ষায় আছে রিহান আর নৈঋতা! খুঁনসুটিতে, বন্ধুত্বে মোড়ানো একটা সংসারের স্বপ্নে আপাতত দিন গুণছে ওরা। অপেক্ষার সময় এত দীর্ঘ কেন! ফাল্গুন আসার নামই নিচ্ছে না!