"রিহান, উঠে বাজারে যা।"
"ছুটির দিন তো একটু ঘুমাতে দিবি।"
"আচ্ছা, ঘুমা। যেতে হবে না। ভেবেছিলাম খিচুড়ি রান্না করব, সাথে গরুর মাংস ভুনা। তুই না গেলে কী আর করার। বাড়িওয়ালা আন্টির ফ্রিজে ছোট মাছ রেখেছিলাম সেদিন। ওটাই রান্না করব। করল্লা আছে বাসায়। আর কোনো সবজিও নেই। করল্লা দিয়ে ছোট মাছ রান্না করি।"
এই ওষুধে কাজ হলো। রিহান একরাশ বিরক্তি নিয়ে চোখ মেলে ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
"আমাকে এত প্যারা কেন দিস নীরু?"
বলে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। ছোট মাছ রিহানের দুই চোখের বিষ।
"আমি যে আগুনে পুড়ে রান্না করি তার বেলা?"
রিহান হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে বিরস গলায় বলল, "বাজারের ব্যাগ দে।"
নৈঋতা ব্যাগ দিল, সাথে বাজারের লিস্ট ধরিয়ে দিল।
রিহান বেরিয়ে এলো বাইরে। সে জানে ও পছন্দ করে না বলে ছোট মাছ কেনা হয় না, করল্লাও নেই বাসায়। নৈঋতা ওকে বাজারে পাঠাবার জন্য বানিয়ে বলেছে। তবুও সে এলো। খিচুড়ির সাথে গরুর মাংস ভুনা ওর খুব প্রিয় খাবার। তাছাড়া নৈঋতা যখন রান্নায় নিমগ্ন থাকে, ওর প্রিয় খাবার রান্না করে, তখন দেখতে ভীষণ ভালো লাগে।
রিহানের পছন্দ হবে কি-না সেটা নিয়ে চিন্তা করে। লবন ঠিকঠাক হলো কি-না, ঝাল বেশি হয়ে গেল কি-না, খিচুড়ি ঝরঝরে হবে কি-না, এসব বলতে থাকে। মাঝেমধ্যেই মাকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করে নেয় কোনটা কতটুকু পরিমাণ দেবে।
যে মেয়ে ওর জন্য এত ভাবে, তার কথা রিহান কিছুতেই ফেলতে পারে না।
নৈঋতা রান্না শুরু করেছে। সে পেঁয়াজ কাটতে পারে না। চোখ থেকে অনবরত পানি ঝরে, রিহান পেঁয়াজ কেটে দেয় সবসময়। একসাথে সবজি কাটে বেশিরভাগ সময়। আজও পেঁয়াজের সাথে সাথে আরও কিছু উপকরণ কেটে দিয়েছে রিহান।
রান্না করার সময় চুল উঁচু করে বাঁধে। ওড়না গায়ে প্যাঁচিয়ে রাখে। কেমন বউ বউ লাগে তখন মেয়েটাকে। রিহান মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে।
নৈঋতা মুগ্ধ দৃষ্টি অনুভব করে বলল, "আমি দেখতে বড্ড সাধারণ রিহান৷ তবুও এভাবে কী দেখিস আমার মধ্যে?"
"আমার জন্য তোর ভালোবাসার প্রগাঢ়তা দেখি। যে এত গভীরভাবে ভালোবাসতে জানে, সে সাধারণ কী করে হয়? তাছাড়া গোটা পৃথিবীর কাছে তুই কেমন সেটা দিয়ে আমার কী কাজ! আমার কাছে তুই অনন্য, অদ্বিতীয়। তোর মতো কেউ নেই আমার কাছে। আমার চোখে তুই পৃথিবীর সবচাইতে ভালো মেয়ে৷ সবচাইতে সুন্দরীও।"
নৈঋতার মুখে লালচে আভা ফুঁটছিল, রিহান এবার বলল, "এত প্রশংসা করার জন্য আমাকে ট্রিট দিবি কিন্তু।"
নৈঋতার হাতে খুন্তি ছিল, সে সেটা উঁচিয়ে ধরে সতর্ক করে বলল, "খুন্তির ছ্যাঁকা খাবি কিন্তু।"
রিহান নৈঋতার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, "দে না। শাফায়তকে বিয়ে করতে গিয়ে যে ছ্যাঁকা দিয়েছিলি, ওমন ছ্যাঁকা আমি জীবনে খাইনি।"
নৈঋতা হাল ছেড়ে দিল, এই ছেলে শোধরাবার নয়। সে বোঝে রিহান একটু আগে যে কথাগুলো বলল, সেটা মন থেকে বলেছে। এরপর ওকে রাগিয়ে দিতে উল্টোপাল্টা বকবক করল।
রিহান হাসছিল, সে জিজ্ঞেস করল, "হাসছিস কেন ওইভাবে, পাগলের মতো?"
"তোকে বিয়ে না করতে পেরে তোর ওই পাত্রের মুখটা দেখার মতো হয়েছিল৷"
আসলেই যা একখানা কাণ্ড হয়েছিল তখন! শাফায়াত ভীষণ ইগোইস্টিক লোক। মহা হম্বিতম্বি করেছে কিছুদিন। শেষমেশ অবশ্য পিছু হটা ছাড়া উপায় ছিল না।
"অন্যের দুঃখে হাসছিস কেন?"
"খুব দরদ না ছোটলোকটার জন্য?"
এবার নৈঋতা হেসে ফেলল। ওর কপালে গলায় ঘাম জমে আছে। মুখে দুষ্টু মিষ্টি হাসি। রিহান আবারও মুগ্ধ হলো।
***
নৈঋতার জন্মদিন ঘড়িতে রাত বারোটার কাটা ছুঁলেই। রিহান এই দিনের জন্য কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছিল গত তিন মাসের স্যালারি থেকে।
নৈঋতা কাচের চুড়ি আর নূপুর ভীষণ পছন্দ করে। তবে খুব একটা পরে না। রিহান রূপার একজোড়া নূপুর কিনেছে, সাথে কাচের চুড়ি। অনেক ভেবে ভেবে সে এই উপহার কিনেছে।
নৈঋতা রিহানের টেবিল গোছাচ্ছিল আর বিড়বিড় করছিল,
"নিজের টেবিলটা গুছিয়ে রাখতে পারিস না নিজে? সব এলোমেলো করে রেখেছিস।"
"টেবিলের দিকে তাকালে বই, শিট পত্র দেখলেই আমার বিরক্ত লাগে। তাই টেবিলে বসিই না।"
"সে তো লাগবেই। পড়া চোর যে তুই।"
"পড়াই তো চুরি করি। এরজন্য জেল জরিমানার দন্ড আছে বলে তো শুনিনি?"
স্বভাবসুলভ স্বর রিহানের।
"তুই জীবনে মানুষ হবি না।"
হাল ছাড়া গলায় বলল নৈঋতা। রিহানের তাৎক্ষণিক উত্তর,
"মানুষ না হলে কী আমি?"
"এলিয়েন গোছের কিছু একটা।"
"দেখ, তুই কত লাকি। এলিয়েনের বউ হয়েছিস।"
নৈঋতা কঠিন চোখে তাকাল ওর দিকে। রিহানের ফোনের রিমাইন্ডার টোন বেজে উঠল। সে সবার আগে উইশ করতে চায় বলে টাইম সেট করে রেখেছিল।
রিহান উঠে স্ত্রীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "শুভ জন্মদিন নীরু। আরও বহুবছর বেঁচে থাক এভাবে আমার সাথে। তোর সাথে বুড়ো হলেও এভাবে থাকতে চাই। একসাথে বুড়ো হবার জার্নিটা উপভোগ করতে চাই।"
মনে মনে একই দোয়া চাইল মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে।
নৈঋতা বিস্মিত গলায় বলল, "তোর মনে আছে?"
"তোর সবকিছু আমি ছাড়া আর কে মনে রাখবে?"
নৈঋতা এই বিশাল পৃথিবীর বুকে বড্ড একা ছিল, নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো একা। রিহান সেই একাকিত্ব ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দিয়েছে। একটা পরিবার দিয়েছে, নিজের মানুষ দিয়েছে। দৃষ্টি ভারি হয়ে আসছিল ওর।
রিহান বলল, "নীরু একটু বস না এখানে।"
নৈঋতা প্রশ্ন করল, "বসব কেন?"
"এত প্রশ্ন করিস কেন সবসময়?" কিঞ্চিৎ বিরক্তি ঝরল ওর গলায়।
নৈঋতা বিছানায় বসতেই রিহান হাঁটু গেঁড়ে ওর সামনের মেঝেতে বসল। সে তাকিয়ে দেখছে ছেলেটা কাণ্ড। কিন্তু কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না।
রিহান ওর পায়ে হাত দিতেই সে হন্তদন্ত হয়ে বলল, "কী করছিস?"
রিহান ওর পকেট থেকে নূপুর জোড়া বের করে আনল, এরপর পরম ভালোবাসায় যত্ন করে সেটা নৈঋতার পায়ে পরিয়ে দিল। মেয়েটা ক্ষণকালের জন্য কোনো কথা খুঁজে পেল না।
রিহান এবার বালিশের নিচ থেকে একটা গিফট পেপার মোড়ানো বক্স বের করে খুলল। তাতে কয়েক রঙের কাচের চুড়ি। কিছু চুড়ি নিয়ে ওর হাতেও পরিয়ে দিল।
নৈঋতার চোখ বেয়ে তখন বর্ষা নেমেছে। ওর মনে পড়ল রিহান কারো জন্য ভেবে উপহার কেনা পছন্দ করে না জাজমেন্টাল মন্তব্য আসবে সেটা ভেবে। হৃদির জন্মদিনেও বলেছিল কথাটা।
"তুই এত ভেবে আমার জন্য উপহার এনেছিস!" প্রশ্ন নয়, ওর গলায় বিস্ময়।
"এত অবাক হবার কী আছে?"
"তুই তো কারো জন্য উপহার কিনতে পছন্দ করিস না।"
"কারো জন্য আর তুই এক? তুই একদিন বলেছিলি না, এই জঞ্জালে ভরা ধূলোর পৃথিবীতে আমি তোর একমাত্র শান্তি? তোর জন্য এই সামান্য উপহার এমন কী? আমি তো নিজেকেই তোকে দিয়ে দিয়েছি। তাছাড়া আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তোকে তোর হাসিমুখ উপহার দিতে চাই। সেই প্রতিশ্রুতি পালন করতে চাই সারাজীবন।"
নৈঋতা নিজের সমস্তটা দিয়ে জড়িয়ে ধরল রিহানকে। ওর চোখের জলে রিহানের কাঁধ ভিজে যাচ্ছিল। সে বাঁধা দিল না। নিজের কাঁধ বাড়িয়ে বসে রইল কেবল।
***
দেখতে দেখতে এক বছর চলে গেল। ওদের থিসিস সেমিস্টার চলছিল। এখানেও সারাক্ষণ ফাঁকিবাজির তালে থাকে রিহান। নৈঋতা অনবরত ধাক্কা দিয়ে দিয়ে ওকে থিসিসের কাজ করায়।
নিজেরটা করে, পাশাপাশি রিহানকে বলে বলে করায়। মহাব্যস্ততার সেমিস্টার এটা। নৈঋতা আর রিহানের ডাটা কালেকশনের এরিয়া আলাদা হলেও ওরা পরস্পরের সাথে যায়। ইউনিভার্সিটিতে যখন থাকে লাইব্রেরিতে বসে বসে সেখান থেকে থিসিসের কপি, জার্নাল ঘাটাঘাটি করে।
রিহান যখন বেশি বিরক্ত হয়ে উঠে তখন ওরা ক্যাম্পাসে আগের মতো হাঁটাহাঁটি করে। নদীর পার, জব্বারের মোড়ের রেললাইন, লেক সাইড ভিউ, লন্ডন ব্রিজ, লিচু বাগান, গোলাপ বাগান ইউনিভার্সিটির অলিগলিতে চক্কর দেয়। চুটিয়ে আড্ডা জমে। এরপর আবারও বাসায় ফিরে ওদের টোনাটুনির সংসার চলে।
ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসেছে ওরা। রিহানের বড় ভাইয়ের একটা ছোট্ট পুতুল সোনা আছে। তাকে ভীষণ ভালোবাসে সকলে। নৈঋতা মিষ্টি পুঁচকেটাকে কোলে নিয়ে বসে ছিল।
রিহান ভাইঝির সাথে খুঁনসুটি করছিল পাশে বসে।
নৈঋতা বলল, "আমাদের ঘর আলো করতে এরকম একটা পুতুল কবে আসবে?"
রিহান নিঃশঙ্কোচে বলল, "তুই আগে তোর প্রিয় পড়াশোনা শেষ কর। ওই প্রেম শেষ হলে তবেই আসবে।"
দু'জনেই হাসল, হাসিতে মিশে থাকল একরাশ স্বপ্ন, ভবিতব্যের, ওদের টোনাটুনির সংসারের কোনো এক সময়ের অনাগত অতিথির।
"তোর তো এ জীবনে আর পড়াশোনার সাথে প্রেম হলো না।"
"একটা প্রেম নিয়েই কূল কিনারা পাই না। তাছাড়া আমার সাথে তুই ছিলি, আছিস। তোর মতো বন্ধু থাকলে আর শুধু শুধু খেটে কী করব?"
নৈঋতা মুখে কাঠিন্য ফুটিয়ে রিহানের পিঠে কয়েকটা দিল কষিয়ে। পুঁচকেটা মজা পেয়ে হাসছিল।
"দজ্জাল বউ।"
"পাঁজি বর।"
বলে এবার নৈঋতাও হেসে ফেলল। এই ছেলের সাথে থাকলে জীবনে বিরক্তিকর কোনো মুহূর্ত আসার চান্সই নেই। রিহানও হাসছে। শিশুসুলভ ট্রেডমার্ক দুষ্টু হাসি। কী যে সুন্দর লাগছে ছেলেটাকে! এই হাসিতে আর কতবার ডুববে নৈঋতা! জানা নেই। তবে আকাঙ্ক্ষা শেষ নিঃশ্বাস অব্দি এই পড়ায় ফাঁকি দেয়া অসম্ভব সুন্দর হৃদয়ের ছেলেটায় আকণ্ঠ ডুবে থাকতে পারবে ক্লান্তিহীন। এরকম হাজার ফাল্গুন তার নিজস্ব রঙে ওদের রাঙিয়ে দিয়ে যাক।