এক প্যাকেট বিরিয়ানি

লেখিকাঃ মাহরিণ তৃণ

প্রকাশকালঃ জুন ২১, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

সব ছেলে পক্ষের এক চাওয়া মেয়ে লম্বা চওড়া, সুন্দরী হতে হবে। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে আমি তেমন লম্বা ছিলাম না। কাঁটায় কাঁটায় ৫ ফুট। সুন্দরী বলতে চেহারা আল্লাহর দানে বেশ ভালোই ছিল,লোকেমুখে শুনেছি আর কি। তবে গায়ের রং ছিল শ্যামলার মধ্যে। সব মিলিয়ে চিকন, পাতলা পুতলা এক সাদামাটা মেয়ে আমি। বিয়ের বাজারে আমার মতো মেয়েদের চোখে পড়াটা একটু কঠিনই ছিল। ভালো ঘর থেকে সম্বন্ধ এলে এসবের মধ্যে যে কোনো একটা খুঁত ধরতোই। যার কারণে বিয়ে হওয়াটাও দিনকে দিন কঠিন হয়ে উঠছিল আমার জন্য। অনার্স শেষ হতে না হতেই পরিবারে আমাকে নিয়ে সেই যে শুরু হয় যুদ্ধ বিগ্রহ। এখনও তা চলমান।

আব্বা নেই আমার,আম্মা,ভাই-বউ, ছোট্ট ভাগ্নে এই নিয়েই সংসার। বড় ভাই আমার সরকারি ইঞ্জিনিয়ার,পানি উন্নয়ন বোর্ডের। বেশ ভালো পদ মর্যাদা, অর্থকড়ি৷ পরের মেয়ে হিসেবে ভাবি মোটামুটি ভালো হলেও অধিকাংশ সময়ই আমাকে ভৎর্সনা করত। অবিয়াত্তা হয়ে এভাবে তার সংসারে পড়ে আছি,বিষয়টা মেনে নেওয়া কঠিনই। এদিকে ভাই আমার একটু রাগী, গম্ভীর স্বভাবের। অনার্স শেষ করে দু একটা চাকরি পরীক্ষা দিয়েও কোনো কাজ হয়নি দেখে নানা কথা বলে অপমান করতো৷ বিয়ে হয় না এই নিয়েও খোঁটা দিত। সারাজীবন কি তার ঘাড়ে বসেই খাওয়ার চিন্তা ভাবনা করছি নাকি এমন প্রশ্ন সরাসরি জিজ্ঞেস করতো। আমি নিরুত্তর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। বুকের ভিতর আমার ঠিকই ফাটতো কিন্তু প্রকাশ করতে পারতাম না। কি করবো আমি,আমার বিয়ে না হওয়ার পিছনে দায়টা কি আমার? আমি নিজেও তো চাই আমার একটা ভালো বিয়ে হোক,সংসার হোক অথবা একটা চাকরি হোক নিজের পায়ে দাঁড়াই। কিন্তু ভাগ্য তো সহায় হয় না।

ভরা বর্ষাকাল তখন। কোনো এক বিকেলে ভাই ভাবিদের চা নাস্তার আড্ডায় ফের আমাকে নিয়ে কথা উঠলো। এভাবে ঘরে বসে অন্ন ধ্বংস করে যাচ্ছি, কাজের কাজ কিচ্ছু হচ্ছে না দেখে তাদের আক্রোশের শেষ নেই। আম্মা শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে আমার রুমে এসে বললেন,

মাহরিণ তৃণ এর লেখা অনুগল্প এক প্যাকেট বিরিয়ানি এর ইমেজ

"আর কত জ্বালাবি আমাকে?? আর কত অশান্তি করবি? মুরোদ নেই তো কিছু করার। ভাইয়ের সংসারে বসে বসে ভাত গিলছিস,শুয়ে বসে আছিস। খুব আরাম তাই না? পাটখড়ির মতো অবস্থা,চোখে ধরে না৷ মাইনসের মেয়েরা কি সুন্দর, ফর্সা মোটাকাটা। দেখলেই চোখ জুড়ায়। আর তুই? তোরে দেইখাই মানুষ চোখ ঘুরায়। বের হইয়া যা বাসা থেকে..তোরে আমার আর দেখতে মন চায় না।"

বলা বাহুল্য, মা জননী আমার ভীষণ ছেলে ভক্ত। ছেলের জন্য জান কুরবান তার। ছোটবেলা হতে এই নিয়ে কত বঞ্চনার শিকার হয়েছি। যাকগে সেসব কথা।

আম্মার কথা শুনে সেদিন প্রথম আমার ভীষণ রাগ হয়েছিল। কোনোদিন মুখ না খোলা আমি সেদিন কি করে যে ওতো কথা বললাম ভেবে পাই না। রাগে চিল্লিয়ে উঠে বললাম,

"সবসময় আমাকে নিন্দাও। আমি কি আমাকে বানিয়েছি? শুকনা,পাটখড়ি আমি নিজ ইচ্ছায় হয়েছি? ভালো মন্দ কিছু কি খেতে দাও আমাকে? শুধু তিনবেলা ভাত খেলেই মোটা হওয়া যায়? মা হয়ে তো কখনো আমাকে একটু যত্ন করোনি,মায়ের ছোঁয়ায় মেয়েরা সুন্দর হয় এ কথা কি জানো? শুধু আমার দোষ, আমার দোষ, আমার দোষ। এ সংসারে কাজ কি আমি কম করি? বুয়ার মতো খাটাও৷ তবুও তোমাদের মন ভরে না।"

ড্রয়িংরুম থেকে ভাই ছুটে আসে আমার গলা শুনে। মায়ের সাথে চিল্লিয়ে কথা বলার দরুণ ডান গালে সপাটে একটা চড় এসে বসে আমার। দ্বিতীয় বার গায়ে হাত তোলার আগে ভাবি এসে কোনমতে ঠেকায়।

"এক্ষুণি আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাবি তুই। তোর মতো বেয়াদবের এ বাসায় কোনো জায়গা নেই। বের হ.."

ভাইয়ের বিকট ধমকে আমি কেঁপে উঠি। চোখ দিয়ে আমার অবাধ নোনাজল। ভাই যে বাসা নিজের বলে উল্লেখ করছে,সে বাসা আসলে আমার বাবার। যেখানে আমারও পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কিন্তু সমাজ ব্যবস্থায় আমার অধিকার খাটানোর ইখতিয়ার নেই।

সেদিন প্রথমবারের মতো আমার আত্মসম্মান ঘা লাগলো। নিজেকে ভীষণ ছোট,তুচ্ছ মনে হলো এদের কাছে। সবাই চলে যেতেই চোখ মুছে তড়িঘড়ি করে আমার কাপড় চোপড় ব্যাগে পুরতে লাগলাম। আমি সাহসী মেয়ে নয় মোটেও। ঘরকুণো, ভীতু,চাপা স্বভাবের মেয়ে আমি। কিন্তু সেদিন কি হলো,যে সিদ্ধান্ত আমি অনেক আগে নিব নিব করে নেওয়া হয়নি সেটাই হুট করে নিয়ে নিলাম। আব্বার কিনে দেওয়া মাটির ব্যাংক ভেঙে সাত হাজার টাকা হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম।

সন্ধ্যা নেমে গেছে ততক্ষণে। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনে এসে বসে রইলাম। অপেক্ষা রাজশাহীগামী সিল্কসিটি ট্রেনের। যদিও মনে শংকা ছিল ট্রেন পাব কি না, তবে ট্রেনে চলাচলের সুবাদে একটু ভরসা ছিল সঠিক সময় ট্রেন কখনোই আসবে না।

ঠিক সাতটার সময় ট্রেন আসে। একটা অনিশ্চিত জীবনকে সঙ্গী করে,মাথার উপর ছায়া হারিয়ে, পরিবারকে মুক্তি দিতে উঠি পড়ি ট্রেনে। চোখ দিয়ে আমার টুপ করে ঝরে পড়ে তখন একফোঁটা জল। নিতান্তই অবান্তর সেটা।

রাজশাহী শহর আমার চেনাজানা, পরিচিত। চারটা বছর এখানকার সরকারি এক কলেজে অনার্স করেছি আমি।

যে ছাত্রীনিবাসে পুরোটা বছর কাটিয়েছি সেখানকার মালিক,ম্যানেজার আমার ভীষণ পরিচিত। তাই রাত দশটার সময়ও স্টেশনে নেমে সরাসরি চলে যাই আমার সেই অস্থায়ী ঠিকানায়।

"একটা সিটই খালি ছিল। ভাগ্য ভালো তোমার নিপা।"

ছাত্রীনিবাসের মালকিন ফারজানা আন্টির চোখে মুখে একরাশ প্রশ্ন। এতোরাতে, এভাবে হুট করে সিটের জন্য তার কাছে আবদার করে বসাটা চোখে লাগার মতোই। সে হয়তো কোনো একটা কারণ ঠিক মনে মনে ভেবে নিয়েছে। কিন্তু চেনাজানার কারণে পারছে না সরাসরি জিজ্ঞেস করতে। তবে,কাল ম্যানেজার আন্টিকে আমার রুমে পাঠিয়ে ঠিক কারণ শুনে নিবেন এ আমি জানি।

আমি আন্টিকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রুমের চাবি নিয়ে দোতলার ২০৫ নম্বর রুমে উঠলাম। যদিও পুরো অনার্স পার করেছি আমি তিনতলাতে। ওখানটা আমার বেশ আপন মনে হয়। দোতলায় এসে কেমন অপরিচিত লাগছে।

আমার এই দুষ্সময়ে ভাগ্য ভালো রুমমেট ছিল না৷ ছুটিতে বাড়ি গিয়েছে সে। যাক দুঃখবিলাসটা অন্তত ভালোভাবে করতে পারবো। কারো সামনে নিজের অসহায়ত্ব দেখাতে ইচ্ছে করে না আমার।

সেদিন সারারাত আমার নির্ঘুমে পার হলো। শোয়ার ব্যবস্থা বলতে একখানা পাতলা চাদর ছাড়া কিছু ছিল না। কাঁথা, বালিশ এগুলো তো আর আনিনি। ক্ষুধা পেটে চিন্তায় অসাড় হয়ে আসছিল আমার মাথা। বাড়ি তো ছাড়লাম৷ কি করব এখন আমি? সাত হাজার টাকার মধ্যে সতেরশো টাকা মেস ভাড়া দিলাম। হাতে আছে চার হাজার তিনশো টাকা। এই টাকা নিয়ে কি বেঁচে থাকা সম্ভব? চলা সম্ভব?

দুনিয়া ভেঙে আসা দেখে আমার মন চাইল অঝোরে কাঁদতে, কিন্তু আমি কাঁদলাম না। আমার কাঁদার মতো শক্তি নেই।

সকাল বেলায় কিছু পেটে দেওয়ার জন্য রুম হতে বের হতেই ম্যানেজার আন্টির দেখা পেলাম। ঠিক হাজির সে। রুমে বসে ইনিয়েবিনিয়ে অনেক কথা বললো। আমার কেন জানি মিথ্যে বলে কাটিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে হলো না। খুব স্বাভাবিকভাবে নিজের জীবন পরিস্থিতি তার সাথে শেয়ার করলাম। সে সব শুনে বেশ দুঃখ প্রকাশ করলেও আমি কিছু বললাম না। কারণ আমি এতোটাই চাপা, মানুষজনের সামনে আমি মোটেও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি না।

আন্টিকে অনেক বলে একটা টিউশনির ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ করলাম। আন্টি রাজি হলেন। বললেন,দেখবে সে।

চোখের পলকে দুটো দিন কেটে গেল। এদিকে তিনবেলা বাইরে থেকে ভাত, ডাল আর ভর্তা কিনতে গিয়ে আমার মাথায় হাত। টাকা তো ফুরিয়ে যাচ্ছে,এদিকে আমি কিছুই করতে পারছি না। উপায় না পেয়ে তিনবেলার জায়গায় একবেলা খাবার কেনা শুরু করলাম। ওটা ভাগ করে দু'বেলা খেতাম। মেসের ৮০ টাকা মিল চালানোর সাধ্য আমার নেই। ২২ টাকার ভাত,১০ টাকার ডাল আর ১০ টাকার ভর্তা এতটুকুই যথেষ্ট।

আল্লাহকে ডেকে ডেকে, কাঠফাটা রোদে সপ্তাহখানিক ঘুরে, ম্যানেজার আন্টির ধর্না ধরে অবশেষে একটা টিউশন আমার কপালে জুটলো। বেতন তিন হাজার। আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া জানালাম। এই সময়ে আমার এই টিউশনটা যে কত দরকার ছিল তা একমাত্র আমার আল্লাহ আর আমি জানি। বাড়ি থেকে তখনও কিন্তু কেউ ভুলেও আমার খোঁজ নেয়নি। আমি কোথায় গেলাম,কেমন আছি,মরে গেছি নাকি বেঁচে আছি। কিচ্ছু না। আমার এগারো হাজার টাকা দামের ফোনে কারো ফোন আসতো না। এমনকি কোনো আত্মীয় স্বজনেরও না।

যাই হোক,ক্লাস ফাইভের একটা ছেলে বাবুর টিউশন আমার। নাম আলিফ। বেশ বড়লোক পরিবার। শুরুর দিনে আমার একটু ভয় হলো৷ চকচকে পোশাক আশাক আমার নেই। কালো বোরকা আর একটা তুলে রাখা স্কার্ফ পরেই গেলাম টিউশনি করাতে। শুরুর দুটো দিন তারা আমার ডেমো ক্লাস নিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, আমি অনেক কষ্টে বুকের মধ্যে সাহস সঞ্চার করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের সাথে মিশেছি,কথা বলেছি। যার কারণে তারা আমাকে সিলেক্ট করেন তাদের ছেলেকে পড়ানোর জন্য।

আলিফ খুব একটা মনোযোগী ছাত্র ছিল না। বেশ ভালোই দুষ্টু ছিল। হাতের লেখা ভীষণ অগোছালো। তাই ওর জন্য আমাকে অতিরিক্ত ইফোর্ট দিতে হতো। আমি চেষ্টা করতাম ওকে একটু ভালো স্থানে আনার জন্য। একঘন্টার জায়গায় দেড়ঘন্টা,কখনো কখনো দু'ঘন্টাও পড়াতাম।

টিউশনে মাঝে মধ্যে আন্টি নাস্তা দিতো। আমি কেন জানি, নাস্তা দেখলেই ভীষণ খুশি হতাম। আমার অসহায়ত্ব আমাকে ভিতরে ভিতরে ছোঁচা করে তুলছিল। পেটের মধ্যে এতো ক্ষুধা। পানি খেয়েও কাজ হতো না।

এভাবে কেটে যায় আমার একমাস আঠারোদিন। প্রথম উপার্জন আর আগের সঞ্চয়ের পাঁচশ টাকা মিলে আমার হাতে তখন ৩৫০০ টাকা। এর মাঝে একশো টাকা মসজিদে দান করলাম। আমাকে বেঁচে থাকার জন্য এই অর্থটুকু দেওয়ার মালিক তো আল্লাহ। তাঁর পথে দান করার সৌভাগ্যটুকু যে হয়েছে এই অনেক।

সেদিন শুক্রবার ছিল। আলিফের রবিবারে পরীক্ষা থাকায় আন্টি আমাকে ফোন করে বললেন, বাংলাটা দেখিয়ে দিতে। আমি এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। মনে মনে একটু হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক, দুপুরে তাহলে আমার আর খাবার কিনতে হবে না। আন্টি তো নাস্তা দেনই। আর আজকে দুপুরের সময় যেহেতু, খেতে তো দিবেনই৷ এই এক ভাত ভর্তা খেতে খেতে এখন একটু ভালো খাবারের আশা আমাকে লোভী করে তুলেছে।

আলিফদের বাসায় পা রাখতেই বিরিয়ানির গন্ধে আমার শরীর মোহে ডুবে যায়। কতদিন পর এই অমৃত খাবারের সুঘ্রাণ নাকে এলো। আমার ভিতরে তখন ঈদের খুশি। বিরিয়ানির প্রতি আমার ভালোবাসা অনবদ্য। আমাকে যদি টানা এক সপ্তাহ বিরিয়ানি দেওয়া হয় আমি বোধহয় সোনামুখ করে খেতে পারবো। ছোট বেলায় প্রায়ই বাড়ি ফেরার পথে আব্বা এক প্যাকেট বিরিয়ানি কিনে আনতো আমার জন্য। আম্মা ভাগ করে দিতো আমাদের দু ভাইবোনকে। যদিও ভাইয়ের প্লেটে পরিমাণটা বেশি যেত তবুও আমি বিরিয়ানি পেয়েই খুশি থাকতাম। কিন্তু আব্বার নজরে তা ঠেকেছিল। সে পরেরদিনই আমাকে বাজারে নিয়ে এক প্যাকেট বিরিয়ানি কিনে দিয়েছিল। বুধো চাচার দোকানে কি আয়েশ করেই না খেয়েছিলাম। সে কথা কোনদিনও ভুলবো না।

দেড় ঘন্টা আলিফকে পড়ানো শেষে আমার বিদায়ের ঘন্টা বাজে। কিন্তু তখনও চাতক পাখির মতো দরজার দিকে একটু পর পর করে তাকাই আমি। ভিতরটা আমার ভেঙে আসার উপক্রম। বিরিয়ানি তো দূরে থাক সামান্য জল খাবারেরও দেখা নেই।

“ম্যাডাম আজকে এটুকুই থাক।”

“আচ্ছা।”

বিষন্ন মন নিয়ে আমি উঠে দাঁড়াই। ঠিক তখনি রুমে প্রবেশ করেন আলিফের আম্মু। তাকে দেখা মাত্র চোখদুটো আমার উৎফুল্লে চিকচিক করে উঠে। যাক অবশেষে..

“পড়ানো শেষ?”

“জ্বি।”

“তোমার জন্য একটা সুসংবাদ আছে।”

আমি খুশিমনে জিজ্ঞেস করি,“সুসংবাদ?”

“নিচতলার ভাবির মেয়েটাকে তোমাকে পড়াতে হবে। তুমি আলিফকে এতো সুন্দরভাবে পড়াও দেখে সেও আবদার জানিয়েছে। বলেছে তোমাকে বলতে। তোমার কোনো অসুবিধা আছে কি?”

আমি জোরবেগে মাথা নাড়িয়ে বলি,“না,না কোনো সমস্যা নেই। পড়াবো।”

“আচ্ছা, একটা কথা বলতে চাই তোমাকে। প্লিজ কিছু মনে করো না হ্যাঁ?”

“জ্বি, আন্টি বলুন।”

“দেড়মাস যাবত দেখছি তোমার এক বোরকা এক স্কার্ফ।

বাইরে দেখলাম তোমার চটিজুতার একপাশে ছেঁড়া। আসলে বুঝোই তো..আমরা কেমন এনভায়রনমেন্টে থাকি। মানানসই নয় আসলে। তুমি একটু নিজের খেয়াল নিও কেমন। আসলে এটা আমার বলা ঠিক না। কিন্তু বাসায় গেস্ট আসা যাওয়া করে তো।”

আন্টির কথাশুনে লজ্জায় আমি মুষড়ে যাই। মাথানিচু করে ঠোঁট কামড়ে কোনমতে সায় জানাই। আমার বুকের ভিতরটা পাথার চাপায় পিষ্ট হতে থাকে। নিজেকে অপমান লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে,পারি না ছুটে বের হয়ে আসতে।

কিন্তু আমি নিরুপায়। আমার নিজের দিকে খেয়াল রাখার মতো অর্থকড়ি নেই। সব কষ্ট গলাধঃকরণ করে নতুন টিউশনের সুখটুকু আঁকড়ে ধরি। বাজারে গিয়ে একটা বালতি,মগ টুকিটাকি কিছু জিনিস কিনি। জুতাটাকে সেলাই করে নিই শক্তপোক্তভাবে। দুটো টিউশনির বেতন পেলে কমজোর হলে একটা স্কার্ফ কিনবো বলে মনস্থির করি। এর বেশি কিছু খরচ করার উপায় নেই আমার। এতে অপমান হলে হবো। কেননা বালিশ, কাঁথা কিনতে হবে,পানির দুটো বোতল কিনতে হবে আরও কত কি..অন্যের জিনিস নিয়ে কতদিন।

সেদিন দুপুরে আবারও ভাত ডালের শরণাপন্ন হই আমি। বাজারের মধ্যে আসার সময় লাল কাপড়ে মোড়ানো ডেকচির দিকে চোখ পড়তেই চোখ ফিরিয়ে আনি। কিন্তু বিরিয়ানির সুগন্ধ আমার নাকে এসে ঠেকে। প্যাকেটে প্যাকেটে সব বিরিয়ানি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। হয়তো কোনো অনুষ্ঠানের জন্য।

মন চায়, এক প্যাকেট বিরিয়ানি কিনি। একটু নিজেকে পরিতৃপ্তি দেই। কিন্তু ১২০ টাকার কথা মনে পড়ে আর এগোনোর সাহস পাই না। এই টাকা দিয়ে একটা চাকরির আবেদন করা যাবে অথবা দু'দিনের খাওয়া উঠে যাবে। কি দরকার বিলাসিতার!!

দিন পার হতে থাকে আমার কঠিন যুদ্ধ করতে করতে। সারারাত চাকরির জন্য পড়াশোনা করা আর দিনে টিউশনি করানো। এইতো।

একদিন রাতে পড়তে পড়তে হুট করে আমার মাথায় এক ভাবনা আসে। আমি অযথা এই মেসে এতো টাকা দিয়ে থাকছি। এর চেয়ে কাজলার দিকে টিনশেড কোনো একটা মেসে থাকলে এর চেয়ে কম ভাড়ায় থাকা যাবে। কেননা সামনের মাসে এই মেসে একশো টাকা বাড়ানো হবে। কি দরকার এতো টাকা ব্যয় করে বিল্ডিং ঘরে থাকার।

যেই ভাবনা সেই কাজ। পরদিন দুপুরে ঘুরে ঘুরে কাজলার মোড় হতে আরো ভিতরের দিকে মেসের খোঁজ করলাম। দুটো মেসের খোঁজ পেলেও অতিরিক্ত নোংরা থাকার কারণে পছন্দ হলো না। অবশেষে কলেজে এক পরিচিত মেয়ের সুবাদে তার মেসে গেলাম। সেখানে পরিবেশ ভাড়া দুটোই মোটামুটি আমার জন্য একটু সহজ মনে হলো। তেরোশ টাকা। আমি সেটাই কনফার্ম করলাম।

জুলাই মাস চলছে তখন। আমার একাকিত্ব সংগ্রামের তখন পাঁচ মাস পার হচ্ছে। এর মাঝে আমার পরিবারের কারো সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। আমি সিম পরিবর্তন করে আগেরটা ভেঙে ফেলে নিজেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি অনিশ্চিত যাপনে।

পরপর তিন চারটা চাকরির পরীক্ষা দিলাম। প্রিলিতে টিকলে রিটেনে টিকি না আবার রিটেনে টিকলে ভাইভাতে আউট। এদিকে বই কেনার টাকা ম্যানেজ করতে আমার হিমশিম অবস্থা। তবুও লাইব্রেরি ঘুরে ঘুরে পুরতান বই সংগ্রহ করতাম। টিউশনিতে গিয়ে সংবাদপত্র সংগ্রহ করে চোখ বুলাতাম। আর গাধার মতো পড়তাম। আমার যে এছাড়া কোনো বিকল্প নেই। টিউশন করি ভয়ে ভয়ে। ভালো পড়ালেও ভালো চলন বলন নেই আমার। তাদের পরিবেশে মানানসই নয়। কখন যে না করে দেয় কে জানে। এক ভরসা আমার চাকরি। যেকোনো গ্রেডের একটা সরকারি চাকরি যদি পাই তাহলে আমার আর কোনো ভয় থাকবে না। আমার আর পিছুটান থাকবে না।

কিন্তু পড়তে গিয়ে ক্ষুধার জ্বালায়,দূর্বল শরীর আমাকে নিঃসাড় করে দিতো। চোখের নিচে কালি, মাথার চুল উসকোখুসকো,ক্লান্ত মন। এতো এতো প্রতিবন্ধকতা…শক্তি পেতাম না। চোখ ভরা ঘুম আমাকে বিছানায় টানতো কিন্তু কিছু একটার জেদে নিজেকে প্রশ্রয় দিতাম। এক মুঠো মুড়ি আর পানি খেয়ে আবার পড়া শুরু করতাম।

যে মেয়ে বাবুটাকে আমি পড়াতাম ওর নাম ছিল তানিশা। ওর মা বেশ ভালো ছিলেন। নিয়মিতই নাস্তা দিতেন। আমার পোশাক আশাক নিয়ে তার তেমন মাথা ব্যথা ছিল না। একদিন হুট করেই পড়াতে গিয়ে দেখি বিস্তর আয়োজন ওদের বাসায়। তানিশা কোথা থেকে ছুটে এসে বলল,“ম্যাম আজকে আমার ছুটি মামণি বলেছে। আজকে আমি পড়বো না।”

আমি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আন্টিকে বললাম। আন্টি হাসি মুখে বললেন,“ওর দাদির আজ কুলখানি। আজকের দিনটা ছুটিতে কাটাক। তুমি কাল এসো।”

আমি সায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়ি। একটু খারাপ লাগে আমার। যদি ফোন করে জানিয়ে দিত তাহলে আমার অটোভাড়া আর সময়টুকু নষ্ট হতো না। এইটুকু সময় পড়তে পারতাম। কেননা আলিফেরও ছুটি চলছে। আমি দরজা পার হওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে পিছনে থেকে আন্টির ডাক ভেসে আসে। আমি থেমে যাই, পিছন থেকে আন্টি একটা প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,“এটা খেয়ো।”

আমার নাকে সুঘ্রাণ এসে ঠেকে। আমি বুঝতে পারি হাতে থাকা প্যাকেটটা বিরিয়ানির। খুশিতে আমি মনে মনে আত্মহারা হয়ে যাই। অতঃপর বাজারে এসে আজকের দিনে কেনা খাবারের টাকার সাথে কিছু টাকা যোগ করে একটা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স কিনে মেসে ফিরি।

অর্থকষ্টে,অন্নকষ্টে ভোগা আমি সেদিন চোখের পানি ঝরিয়ে আমার প্রিয় বিরিয়ানি গিলেছি। কতকাল পর জিহ্বায় স্বাদের পরিবর্তন অনুভব করেছি। নাক চোখ মুছে আমার ছোট্ট টেবিলে স্তূপ করে থাকা বইয়ের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বলেছি,“ইনশাআল্লাহ। আমি একদিন নিজেকে এমন জায়গায় নিয়ে যাবো। যেখানে একপ্যাকেট বিরিয়ানি হবে আমার জন্য ডালভাত।”

আমি জায়নামাজে সেদিন আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানিয়ে ওই আন্টির জন্য অনেক দোয়া করেছি। আন্টি আমাকে নিজের অজান্তে যে পরিতৃপ্তিটুকু দিয়েছে এতে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।

পরপর তিনটে মাস কেটে যায়। আমার হাড় ভাঙা পরিশ্রম তখনও চলমান। কিন্তু জায়গা করে উঠতে পারি না চাকরির মাঠে। একেতে তো সিট কম, প্রতিযোগী বেশি৷ তার উপরে সরকারি কলেজ হতে গ্রাজুয়েট দেখে ভাইভা বোর্ড কর্মকর্তারা নাক সিঁটকায়। মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং এর দাম সবচেয়ে বেশি ৷ তার পরে পাবলিক বিশ্ব বিদ্যালয়। সরকারি কলেজে তো ধরা ছোঁয়ার বাহিরে।

মাঝে মাঝে পড়তে ভীষণ হতাশায় ডুবে যেতাম। ছয়মাস চলছে। একটা কোথাও কিছু করতে পারছি না। আর কতো পড়া যায়। আদৌও চাকরি হবে কি আমার? নাকি শুধু গাধার খাটুনি খেটে চলেছি।

শীতের এক রাতে, বন অধিদপ্তরের একটা ভাইভার ফলাফল প্রকাশিত হয়। আমি ভীষন আশাবাদী ছিলাম এই চাকরিটা নিয়ে। আমি সত্যি অনেক ভালো পরীক্ষা দিয়েছিলাম । কিন্তু ফলাফল শিটে নিজের রোল খুঁজে না পেয়ে একদম বির্মষ হয়ে পড়ি। রুমমেট থাকায় কাঁদতেও পারি না। উপায় না পেয়ে বাথরুমে গিয়ে পানিকল ছেড়ে হাউমাউ করে কাঁদি। আমাকে দ্বারা সত্যি কিছু হবে না। আমি কিছুই করতে পারবো না। এই চাকরির বাজারে আমার মতো খড়কুটোর কোনো জায়গা নেই। হবে না কিছু আমাকে দিয়ে। আমি মনে মনে পাগলের ন্যায় প্রলাপ বকতে থাকি।

আব্বার কথা ভীষণ মনে পড়ে। আজ যদি আব্বা বেঁচে থাকতো তাহলে হয়তো এই দিন আমার দেখতে হতো না। এতো সংগ্রামের জীবন পার করতে হতো না।

এরপর কত পরীক্ষা দিয়েছি, কত ফলাফল হাতে পেয়েছি কোনোটাতেই কিছু করে উঠতে পারিনি। আমার দৈনন্দিন জীবনে নিত্যকার সঙ্গী হয়ে উঠেছিল কান্না। ব্যর্থতার ফলাফল নিয়ে বাথরুমে গিয়ে কান্না করে চোখে মুখ মুছে আবার টেবিলে বসতাম। সারারাত পড়তাম। কারণ এ ছাড়া আমার বিকল্প কিছু নেই।

একটা বছর নির্মম কষ্টে পার করেছি আমি। আমার রুমমেট আমাকে দেখে বলতো,আপু আপনার কষ্ট চোখে সহ্য হয় না। আমি হলে কবেই নিজেকে শেষ করে দিতাম।

আমি মলিন হেসে বইয়ের পাতায় বুঁদ হতাম। নিজেকে শেষ করে দেওয়ার চিন্তা আমার মাথাতেও এসেছে অনেকবার। কিন্তু মন সায় জানায়নি খুব একটা। এই সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখানোর জন্য, পরিবারের মানুষদের সামনে নিজেকে বড় করার জন্য এক অদম্য জেদ আমার ভিতরে কাজ করতো। জানি না সফল হবো কি না কিন্তু এর শেষ দেখে আমি ছাড়বো।

শ্রাবণের এক দিন। রাত এগারোটা। প্রচন্ড জ্বরে আমি কুপোকাত। দুটো চোখ লাল টকটকে হয়ে অশ্রু ঝরছে অনবরত। কাঁথা মুড়ি দিয়ে জ্বরে আমি গোঙাচ্ছি শুয়ে থেকে। নিজের কষ্ট নিজে আর চোখে দেখতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল সব ছেড়ে ছুঁড়ে দূরদেশে কোথাও চলে যাই।

“নিপা আপু ঘুমিয়েছ?”

রুমমেটের ডাক আমি চোখদুটো মুছে ধীর গলায় বলি,“কিছু বলবে?”

“বিসিএস এর রেজাল্ট আউট হয়েছে। আফসানা আপুর হয়ে গেছে।”

“ওহ আচ্ছা।”

বিজ্ঞাপন

আমি ছোট করে উত্তর দিয়ে কাঁথা মুড়ে মুখ ঢেকে নিলাম। রেজাল্ট দেখার প্রবৃত্তি হলো না। একটার পর একটা ব্যর্থতা আমার ভিতরের আশাটাকে নাজুক করে তুলেছে। যেটা নিয়েই একটু আশাবাদী হই সেটাতে আমার দূর্ভোগ পোহাতে হয়।

রাত তখন তিনটা। গলা শুকিয়ে কাঠ। জ্বর মাথা নিয়ে একটুখানি পানির তৃষ্ণা মেটাতে বিছানা ছেড়ে উঠেছি। পানি খেয়ে শোয়া মুহুর্তে কি মনে করে রেজাল্ট দেখার ইচ্ছে হলো। বালিশের নিচ হতে ফোন বের করে ওয়েবসাইটে ডুকে রোল সার্চ দিলাম।

এক অবিশ্বাস্যকর ঘটনা ঘটলো আমার সাথে। আমার মতো খড়কুটো, অবাঞ্ছিত মেয়ের রোল শো করছে লিস্টে। কি আশ্চর্য!!

আমি পারি না চিৎকার করে উঠতে। হাত পা আমার থরথর করে কাঁপছে। বুকের ভিতরে ডান অলিন্দ,বাম অলিন্দের ছটফটানি শুরু হয়েছে। আমার ভ্রম মনে হচ্ছে সবকিছু। আমি বারে বারে আমার রোল মেলাতে থাকি। কিন্তু আমার রোল আমাকে নিশ্চিত করে তুমি সত্যি দেখছো। আমি ধরা দিয়েছি তোমার হাতের মুঠোয়।

আমি ডুকরে কেঁদে মেঝেতে বসে পড়ি। এক পর্যায়ে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদে ফেলি। আমার কান্নায় আশেপাশে সবাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। সবাই অস্থির হয়ে উঠে কি হয়েছে জানতে চেয়ে। আমার রুমমেট আমাকে জড়িয়ে ধরে সবাইকে বলে,আমি বিসিএস কাস্টমস ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছি।

আমার এই সফলতার দিনে সবচেয়ে বেশি খুশি হয় আমার রুমমেট। কেননা ও সাক্ষী আমার আমার দূর্বিষহ জীবনের। মেসের বুয়ার চোখে পানি আমার হৃদয় নিংড়ে তোলে। সে জানে আমার কষ্টের সমাহার। ঈদে পার্বণের ছুটিতে কত বলে কয়ে তার কাছে একটু ঠাঁই নিতাম।

চোখের সামনে আমার ভেসে উঠে পার করা দিনগুলি। অবশেষে! অবশেষে! সৃষ্টিকর্তা তাঁর সেরা উপহারটা আমাকে দিয়ে দিলেন। আমি সফল, আমি সফল। আমার কোনো ভয় নেই, কোনো পিছুটান নেই। আমার পরিবারের সামনে দাঁড়াতে আর কখনো মাথা নিচু করতে হবে না।

এই বিকৃত সমাজকে আমি আমার রূপের চেয়ে গুণ দিয়ে হারিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। আমি জয়ী। আজ থেকে আমার নতুন পরিচয়—

সাদিয়া তাসনিম নিপা

সহকারী কমিশনার, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট (৩৫তম বিসিএস)।

আমি ভোররাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুকতারা দেখি। ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে বলি,

“ আব্বা,আপনার মেয়ে এখন এক প্যাকেট বিরিয়ানি ডালভাতের মতো খাবে ঠিকই কিন্তু আপনার কিনে দেওয়া বিরিয়ানির মতো স্বাদ কখনোই পাবে না।”

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প