দেনা পাওনা

লেখিকাঃ আফিয়া আফরিন

প্রকাশকালঃ জুন ২২, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

আকাশ নামক নিখুঁত ক্যানভাসে তখন মেঘবালিকাদের আনাগোনা চলছিল। বিকেলের মিষ্টি রোদ, লালচে আভায় পরিণত হয়ে অস্তাচলে মিলিয়ে যাচ্ছিল।

দ্বিপ এর আসার অপেক্ষায় চিলেকোঠার ঘরে দাঁড়িয়ে, রাস্তায় চোখ রেখে প্রহর গুনছিল অনু। বছর পাঁচেক পর আজ তার দেশে ফেরা, সেই যে কাউকে কিছু না বলে অনু কে জগত সংসারে একলা করে ফেলে গিয়েছিল; এরপর আর দেখা মিলে নাই তার।

দুইদিন আগে জানিয়েছে সে আসছে। তারপর থেকেই অনুর অস্থিরতা বাড়ছে ক্রমশ। দ্বীপ কি আদৌ তাকে মনে রেখেছে? নতুন জায়গা, নতুন মানুষজনের ভিড়ে পুরাতন মানুষ কে ভুলে যাওয়া তো অস্বাভাবিক নয়। অনু এত কিছু মানতে পারছে না, চক্ষু তৃষ্ণা বেড়েই চলছে। খামখেয়ালী সব ভাবনা ছেড়ে সন্ধ্যা নামার অপেক্ষায় রইলো। দ্বীপকে চোখের সামনে দেখলে নিজেকে সামলাবে কি করে সে?

আফিয়া আফরিন এর লেখা অনুগল্প দেনা পাওনা এর ইমেজ
বিজ্ঞাপন

অপেক্ষার অবসান ঘটলো। বড়ো রাস্তার মোড়ে সাদাত ভাইয়ের সাথে দ্বীপকে হেঁটে আসতে দেখা গেল। অনু জানালা থেকে সরে পাশ ফিরে দাঁড়ালো। সেই মানুষটার সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু তার থেকে বহুত প্রশ্নের উত্তর জানার ভীষণ ইচ্ছা। কেন সে ভালোবাসার মানুষটাকে অবহেলায় ফেলে চলে গেল?

মুহূর্তেই চোখ ভেঙ্গা বন্যা দুঃখের অনুভূতি প্রকাশ করল।

বেশ কিছুক্ষণ পর, সূর্য তখন একেবারেই ডুবে গিয়েছে। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসছে, চিলেকোঠার ঘরে হঠাৎ করেই কোন এক মানবের ছায়া স্পষ্ট হলো।

সাথে সাথে অনুর বুকের ভেতর দ্রিম দ্রিম শব্দ ও স্পষ্ট হতে লাগলো। হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখের কোনা মুছে নিল, অপেক্ষা করতে লাগল আগত মানুষটির কণ্ঠস্বরের।

'নিভে যাওয়া প্রদীপ জ্বালাতে আসলাম, আমাকে কি পুনরায় সেই সুযোগটা দেওয়া হবে?'

ফের চোখের কোনে জল জমতে লাগলো। কণ্ঠস্বরে কথোপকথন আটকে যাচ্ছে বারবার।

'ভেঙে গেছে সব সুখের স্বপ্ন কালবৈশাখী ঝরে।'

স্তব্ধ এই ঘরে চাপা দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ শোনা গেল।

'আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার পাশে কি এসে খানিকক্ষণের জন্য দাঁড়ানো যাবে?'

নিঃসঙ্কোচ আবদার। অনুর সাহস হলো না মানা করতে। দুপাশে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল সে।

অন্ধকারে ও সেটা বুঝে নিল দ্বীপ। ধীর পায়ে অনুর পাশে এসে দাঁড়াল। দু পকেটে দুহাত রেখে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তোমাকে ভেজা চোখে মানায় না অনু।'

'যখন সব ছেড়ে চলে গিয়েছিলি তখন এটা মনে ছিল না? আজকে সামান্য চোখের পানি দেখে বলছো আমাকে ভেজা চোখে মানায় না। তোমায় ছাড়া প্রতিটি দিন কিভাবে কাটিয়েছি, সেটা দেখলে তাহলে তুমি কি বলতে?'

'মানুষের জীবনে কতোই উথান পতন থাকে, সবকিছু কি বাহির থেকে বোঝা যায়? সেই রকম আমার অবস্থাটাও তুমি জানো না। আচ্ছা সবকিছু বাদ দাও, আমাকে কি মাফ করা যায় না?'

অনু মুখ ঘুরিয়ে নিল। দ্বীপ হেসে বলল, 'অভিমান করেছো অভিমানিনী? আচ্ছা ঠিক আছে, আমার ভুল স্বীকার করে এই যাত্রায় সব মেনে নিচ্ছি। তুমি অভিমান করেছো, আমি বৃষ্টি ঝরিয়ে দিব। সেই বৃষ্টির প্রতিটা ফোটায় ফোটায় অনুভব করবে, আমার ভালোবাসা!'

দ্বীপের কথার উত্তর না দিয়ে অনু বলল, 'কেন ফিরে এসেছ তুমি?'

'ফিরে এসে খুব কি অন্যায় করে ফেলেছি? সত্যি করে বলতো, আমায় দেখার ইচ্ছে কি তোমার জাগেনি? একবারও মনে পড়েনি আমার কথা?'

'পরান পুড়েছে আমার। প্রতিমুহূর্তে ক্ষ'তবি'ক্ষ'ত হয়েছি আমি। আর কতটুকু র'ক্ত'ক্ষ'রণ হলে তুমি বুঝবে আমার মনের কথা, সেটাই ভেবে এসেছি।'

'তাহলে অভিমানে দূরে সরিয়ে দিচ্ছ কেন? আমি কি বুঝি না তোমাকে? তোমার প্রতিটা অভ্যাস, আমার শিরায় শিরায় গাঁথা রয়েছে। আর একবার অভিমান করে চলে গেলে কিন্তু কখনো ফিরে আসবো না।'

অনু শুকনো ঢোক গিলল। বলল, 'যোগাযোগ করো নাই কেন? তুমি আমি যোজন যোজন দূরে, সবাই আমাকে বলেছে দ্বীপ তোকে ভালোবাসে না। আমিও হয়তো মেনেও নিয়েছিলাম। কিন্তু ভীষণ অশান্তিতে ছিলাম, তুমি যে আমায় ভালোবাসো না এই কথাটা যে মন মানতে চায় না কিছুতেই।'

'দেনা পাওনা সমস্তই এইবার মিটিয়ে ফেলবো। আজকের এই মিটিমিটি তারাদের সন্ধিতে, অভিমানের গন্ডি পাড়ি দেবে কি?' দ্বীপ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইল অনুর দিকে।

অনু কিছু না বলে এইবার ও মুখ ঘুরিয়ে নিল। দ্বীপ এগিয়ে এসে হাত ধরে ঘুরিয়ে নিল।

চোখে চোখ রেখে বলল, 'শোনো মেয়ে, পৃথিবীতে তোমার জন্য এখনো কত ভালোবাসা বরাদ্দ বাকি সেটা কি জানো?'

'জানার প্রয়োজন মনে করি না।'

'হ্যাঁ তোমার নিজ থেকে জানার প্রয়োজন নেই, জানানোর জন্য বান্দা তো হাজির হয়েই গেছে।'

'উদ্ধার করেছ আমায়!'

দ্বীপ হেসে ফেলল। বহুদিনের চিরাচরিত সেই হাসি।

'তারমানে তুমি আমায় ক্ষমা করে দিয়েছো তাই না অনু? আমি জানতাম, এক বুক আশা নিয়ে এসেছিলাম।'

'আমিও এক বুক আশা নিয়েই এতদিন বেঁচে ছিলাম।'

'তাহলে ধরেই নিলাম অভিমানী ঢেউ ভেঙেছে। আমার উপর রাগ করো, অভিমান করো, কিন্তু কখনো দূরে সরিয়ে দিও না। আমার বিশ্বাস ছিল তুমি আমার ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখবে, বিন্দু পরিমান ও ছেদ পরতে দেবে না তাতে।'

অনু চোখ তুলে তাকিয়ে বলল, 'আমি কি সফল হয়েছে তাতে?'

'নিঃসন্দেহে তুমি সফল!'

বাংলা অনুগল্প দেনাপাওনা লিখেছেন আফিয়া আফরিন

'তাহলে বলো আর ফেলে চলে যাবে না। খুব বেশি কাছে তো তোমাকে কখনো চাই নাই, সব সময় পাশে চেয়েছি। সে তোমাকে যদি পাশ ফিরে না দেখতে পাই, বুকটা একদম ফেটে যায়।'

'আচ্ছা আকাশের সাধারণ রং নীল, কিন্তু সর্বক্ষণ কি আকাশ নীল হয়ে থাকে? রঙের পরিবর্তন কি ঘটে না। সূর্য কি সব সময় ই জ্বলে থাকে? তারাও হয়তো কোন কারনে তারাও ভেঙে পড়ে। কিন্তু দিনশেষে বা সবকিছু শেষে, নিজেদের অবস্থানে নিজেদের ঠিকানায় তো ফিরে আসে। আমিও ঠিক তেমনি, এই ভবঘুরে দ্বীপের একমাত্র ঠিকানা যে তুমি! বড্ড বেশি ভালোবাসি যে তোমায়!'

'হ্যাঁ পেয়েছে তো ঐ এক কথা। ভালবাসি ভালবাসি করে, তোমার রাগ দুঃখ অভিমান এর সাথে তোমাকেও কবুল করে নিতে হয়।'

দ্বিপ খিল খিল করে হেসে দিল, সাথে অনুও।

রাগ অভিমান শেষে, দুটো মানুষ পাশাপাশি হেসে নিজেদের স্বপ্ন বোনার মত একটা মুহূর্ত বোধ হয় পৃথিবীতে আর দুইটা হয় না।

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প