অপূর্ণ ভালোবাসার পূর্ণ শিক্ষা

লেখকঃ আব্দুল্লাহ বিন মালিক

প্রকাশকালঃ জুলাই ১২, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

আমার জীবনের এই গল্প শুরু হয়েছিল এমন একজন মানুষকে দিয়ে, যাকে আমি প্রথমে কখনোই নিজের জীবনের অংশ হিসেবে কল্পনা করিনি।

তখন আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রবাসে থাকত। মজা করে আমি তাকে প্রায়ই বলতাম,

— "আমার জন্য একটা ভালো মেয়ে দেখে দে।"

সে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন মেয়ের ছবি পাঠাত। আমি দেখতাম, কিন্তু তেমন গুরুত্ব দিতাম না। কারও সঙ্গেই আর কথা এগোত না।

একদিন রাতে সে আবার একটি মেয়ের কথা বলল। পরদিন জানাল, মেয়েটি নাকি তার প্রেমিকার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। সেখান থেকেই প্রথমবারের মতো আমার পরিচয় হয় ফারদিয়ার সঙ্গে।

তখনও আমাদের সম্পর্ক বলতে কিছুই ছিল না। শুধু পরিচয়।

পরদিন বিকেলে হঠাৎ একটি ফোন আসে। নম্বরটি ছিল সেই মেয়ের ফোন, কিন্তু ফোন ধরতেই শুনি আমার বন্ধুর প্রেমিকা কথা বলছে।

সে বলল,

"ভাইয়া, কাল তো আপনার বন্ধুর জন্মদিন। আমরা আজ গোপনে সারপ্রাইজ দিতে চাই। কিন্তু দুজন মিলে সব সামলাতে পারছি না। আপনি একটু সাহায্য করবেন?"

আমি না করিনি। সঙ্গে সঙ্গে চলে গেলাম।

সেদিনই প্রথমবার ফারদিয়াকে সামনে থেকে দেখি।

বন্ধুর প্রেমিকার ছবি আগে অনেকবার দেখানো হলেও আমি কখনো খেয়াল করে দেখিনি। তাই সামনাসামনি দেখার সময়ও আমি ইচ্ছা করেই চোখ নিচু করে রেখেছিলাম। পুরো সময়টাতে তার দিকে প্রায় তাকাইইনি। আমার সঙ্গে আমার এক খালাতো ভাইও ছিল।

সবকিছু শেষ করে যখন ফিরছিলাম, তখন অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা ঘটে।

ফারদিয়ার এক বান্ধবী আমার হাতে একটি ফুল দিয়ে আমাকে প্রপোজ করে।

আমি কিছুই বলিনি।

ফুলটাও গ্রহণ করিনি, আবার সরাসরি না-ও বলিনি।

চুপচাপ সেখান থেকে চলে এসেছিলাম।

আমি তখন প্রেম করতে চাইতাম না। কিন্তু কাউকে কষ্ট দিয়ে না বলতে আমারও খারাপ লাগত।

তাই পরে ফারদিয়াকে এসএমএস করে বলেছিলাম,

"এভাবে আমাকে ডাকার মানেটা কী ছিল? তোমার বান্ধবীকে না করে দিও।"

সেখান থেকেই আমাদের মাঝেমধ্যে কথা হওয়া শুরু হয়।

যখন কোনো প্রয়োজন হতো, সে আমাকে মেসেজ দিত।

আমিও সাধ্য অনুযায়ী সাহায্য করতাম।

সে আমাকে "ভাই" বলত।

আমিও তাকে "বোন" হিসেবেই দেখতাম।

এর বেশি কিছু ছিল না।

তার সঙ্গে আমার কথাও খুব বেশি হতো না। আমি নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। মাঝে মাঝে শুধু টুকটাক কথা হতো।

এদিকে আমি দেখতাম, আমার বন্ধু আর ফারদিয়ার মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো।

কখনো ব্রেকআপ।

আবার কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যেত।

ফারদিয়ার স্ট্যাটাসে তার কষ্টের কথা দেখতাম।

মনে মনে ভাবতাম,

"এমন একটা মেয়ে যদি আমার জীবনে আসত, আমি কখনো তাকে এভাবে কাঁদাতাম না।"

তখনও সেটা শুধুই একটা অনুভূতি ছিল।

ভালোবাসা নয়।

শুধু তার ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করত।

একদিন হঠাৎ খবর পেলাম, তারা আবার বিয়ে করতে চায়।

ফারদিয়া আমাকে মেসেজ দিয়ে জানাল, সাহায্য লাগবে।

পরিকল্পনা ছিল, সে আমার বন্ধুর এক চাচাতো ভাইয়ের বাসায় থাকবে, আর পরে বিয়ে করবে।

কিন্তু আমার বন্ধু তখনও বিদেশে।

আমি বিষয়টি স্বাভাবিক মনে করিনি।

আমার পরিচিত এক কাজীর সঙ্গে কথা বললাম।

তিনি জানালেন, আইনগতভাবে বিয়ের জন্য মেয়ের বয়স ১৮ বছরের বেশি এবং ছেলের বয়স ২১/২২ বছরের বেশি হতে হবে।

ফারদিয়ার বয়স তখনও সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

আমি তাকে স্পষ্ট বলেছিলাম,

"কাজী রাজি হননি। আর অন্যের বাসায় গিয়ে থাকা ঠিক হবে না।"

আমি তখনও তাকে ছোট বোন ভেবেই উপদেশ দিয়েছিলাম।

এরপরও মাঝেমধ্যে আমাদের যোগাযোগ চলতে থাকে।

কয়েকদিন পর আমার বন্ধু জানাল, ফারদিয়ার এলার্জি হয়েছে।

সে আমাকে ওষুধ এনে দিতে বলল।

আমি প্রথমে অজুহাত দেখিয়ে না করেছিলাম।

কিন্তু পরে দুই দিন ধরে একই কথা বলায় আমি নিজেই ফারদিয়াকে মেসেজ করলাম।

সে জানাল, সত্যিই এলার্জির সমস্যা হয়েছে।

আমি বললাম,

"তোমাদের বাসার কাছের হাসপাতালে আমার পরিচিত ডাক্তার আছেন। কাল সকালে সেখানে চলে যাও। আমি আগে থেকেই বলে রাখছি।"

পরদিন আমি হাসপাতালের নিকটে থাকায় তার অনুরুধে নিজেও হাসপাতালে চলে গেলাম।

ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম।

ওষুধ এনে দিলাম।

ডাক্তারের সব পরামর্শ বুঝিয়ে দিলাম।

রাতে হঠাৎ সে জানাল, তার মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে।

আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

সঙ্গে সঙ্গে আমার পরিচিত একজন হার্ট বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম।

তিনি তখন দেশের বাইরে ছিলেন।

সব শুনে বললেন,

"অবিলম্বে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাও।"

আমি ফারদিয়াকে হাসপাতালে যেতে বললাম।

সে শুধু বলছিল,

"রক্ত আরও বাড়ছে।"

আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম।

জিজ্ঞেস করলাম,

"পাশে কে আছে?"

সে বলল,

"ফুফু।"

আমি বললাম,

"ফুফুকে নিয়ে এখনই হাসপাতালে যাও।"

তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন জানতে পারলাম, সে হাসপাতালে যায়নি।

কারণ, তার মা নাকি যেতে দেননি।

আমি কারণ জানতে চাইলে সে জানাল, তার মায়ের বিরুদ্ধে অন্য এক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ সে প্রকাশ করেছিল।

সেই কারণেই তার মা তার প্রতি কঠোর হয়ে গেছেন।

আমি বিষয়টি শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।

সেদিন রাতে আবার তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়।

আমি তাকে বললাম,

"তোমার ফুফুর সঙ্গে একটু কথা বলাও।"

ফোনে ফুফুকে বললাম,

"এখন হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব না হলে অন্তত ডাক্তারের দেওয়া পরামর্শগুলো মেনে চলুন।"

ডাক্তারের একটি বিশেষ নির্দেশ ছিল—

অসুস্থ অবস্থায় রোগীকে একা অনুভব করতে দেওয়া যাবে না।

সেই কারণে সেদিন রাত আমি নিজেও ঘুমাইনি।

পুরো রাত তার সঙ্গে ফোনে ছিলাম।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দূরত্ব কমতে শুরু করল।

প্রথমবারের মতো সে নিজের জীবনের অনেক গোপন কথা খুলে বলতে শুরু করল।

নিজের মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের কথা...

পরিবারের অশান্তির কথা...

আমার বন্ধুর সম্পর্কে নানা অভিযোগ...

এমনকি আমার সম্পর্কে আমার বন্ধু কী কী বলত, সেগুলোও।

সে দাবি করেছিল, আমার বন্ধু নাকি আমাকে সত্যিকারের বন্ধু মনে করত না, শুধু নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করত।

আরও অনেক ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয় সে সেদিন আমাকে বলেছিল।

আমি হতবাক হয়ে শুধু শুনেছিলাম।

গল্প করতে করতে কখন যে ফজরের আজান হয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি।

আজানের পর আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন দুপুরে সে জানাল, এখন একটু ভালো লাগছে।

কথা বলতে বলতে আবার তার মায়ের প্রসঙ্গ উঠল।

সে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

বলল,

সে নাকি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবে।

তার এক দূর সম্পর্কের খালা ও খালাতো ভাইয়ের কাছে ঢাকায় চলে যাবে।

আমার সন্দেহ হলো।

আমি তাকে নিষেধ করলাম।

বললাম,

"যত সমস্যাই থাকুক, এভাবে কোথাও যেও না।"

কিছুক্ষণপর হঠাৎ আমার সামনে "Enaya" নামে একটি TikTok আইডির ভিডিও আসে।

ভিডিওটি দেখেই আমার চিনতে পারি ছেলেটার সঙ্গে এটা সে হবে।

আমি ফারদিয়াকে জিজ্ঞেস করি।

সে অস্বীকার করে।

আমি নিজের জানা কিছু কৌশল ব্যবহার করে TikTok আইডিটি পরীক্ষা করি।

তারপর নিশ্চিত হই—

ওটা সত্যিই তার আইডি।

সেদিন আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।

কারণ, যার জন্য আগের রাতটা না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি, তার কাছ থেকে অন্তত মিথ্যা আশা করিনি।

রাগ করে তাকে বলেছিলাম,

"যাও, যার সঙ্গে পালাতে চাও, তার সঙ্গেই যাও। পরে আফসোস করো।"

তারপর তাকে ব্লক করে দিই।

কিন্তু মাত্র দশ-পনেরো মিনিট পরই আবার আনব্লক করি।

মনে হলো—

মেয়েটা তো অসুস্থ।

রাগের মাথায় যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে?

আবার কথা শুরু হলো।

সে ক্ষমা চাইল।

আমিও ক্ষমা করে দিলাম।

ডাক্তারের নতুন পরামর্শগুলো জানালাম।

এর মাঝেই একদিন সে বলল,

সে নাকি অনেকদিন ধরে একজনকে ভালোবাসে।

কিন্তু কখনো বলতে পারেনি।

আমি জানতে চাইলাম,

"সে কে?"

সে নাম বলল না।

আমি বললাম,

"এতদিনে তো আমাকে চিনেছ। বলতে পারো।"

সে বিষয়টা এড়িয়ে গেল।

রাতে আবার সেই প্রসঙ্গ উঠল।

আমি মজা করে বললাম,

"যাকে ভালোবাসো, তাকে বলে দাও।"

সে বলল,

"সাহস পাই না।"

আমি বললাম,

"নাম বা নম্বর দাও। আমি বলে দিচ্ছি।"

সে কিছুই দিল না।

আমি বললাম,

"আচ্ছা, অন্তত মেসেজটা পাঠাও। দেখি কী উত্তর আসে।"

সে বলল,

"ঠিক আছে।"

কিছুক্ষণ পর বলল,

"তুমি কল রাখো। আমি মেসেজ দিয়ে আসি।"

আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম।

হঠাৎ দেখি, আমার নিজের টেলিগ্রামে একটি মেসেজ এসেছে।

লেখা—

"Ami Tumare cai."

আমি হতবাক।

বললাম,

"এটা কাকে পাঠানোর কথা ছিল?"

সে উত্তর দিল,

"সঠিক জায়গাতেই গেছে।"

আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

তখন সে ধীরে ধীরে স্বীকার করল—

যাকে সে এতদিন ধরে ভালোবাসে...

সে মানুষটা আমি।

সে আরও বলল,

আমার বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কে থাকা অবস্থাতেও নাকি সে আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিল।

আমি প্রথমে তাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম।

বলেছিলাম,

"আমার কোনো চাকরি নেই। আমি বেকার। আমার নিজের বাড়ি নেই, ঘর নেই। ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। তুমি আমার সঙ্গে সুখে থাকতে পারবে না।"

কিন্তু সে প্রতিবারই একই উত্তর দিত।

"আমি এক কাপড়ে থাকব।"

"পানি-ভাত খেয়েও তোমার সঙ্গে থাকব।"

"তোমার যদি কিছুই না থাকে, তবুও আমি তোমাকেই চাই।"

আমি যতই নিজেকে ছোট করে দেখাতাম, সে ততই আমাকে আঁকড়ে ধরত।

জীবনে প্রথমবার মনে হয়েছিল—

হয়তো এমন একজন মানুষকে পেয়েছি, যে আমাকে কোনো স্বার্থ ছাড়াই ভালোবেসেছে।

হয়তো এই মানুষটাই আমার জীবনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো একজন সঙ্গী।

আমারও তাকে ভালো লাগত।

তবে সেটা শুরু হয়েছিল তার ব্যবহার দেখে, তার চরিত্র দেখে, তার কষ্ট দেখে।

শেষ পর্যন্ত আর না বলতে পারিনি।

আমিও তাকে গ্রহণ করলাম।

সেই দিন থেকেই আমাদের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হলো।

এদিকে আমার বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল।

একজনের মাধ্যমে ভিসার কাজ করাচ্ছিলাম।

অগ্রিম টাকা দিতে হবে।

পরদিন সকালেই মাকে নিয়ে ব্যাংকে গেলাম।

ব্যাংকের কাজ শেষ করে হঠাৎ মনে হলো—

ফারদিয়ার ফুফুর বাসা তো কাছেই।

মাকে ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে কেমন হয়?

এর আগের দিন মাকে আমি ফারদিয়ার কথা বলেছিলাম।

বলেছিলাম—

"একটা মেয়েকে চিনি। অসুস্থ হলেও তার মা চিকিৎসা করাতে চায়নি।"

মা মজা করে বলেছিলেন,

"তাহলে বউ করে নিয়ে আয়।"

আমি হেসে উত্তর দিয়েছিলাম,

"না আম্মু, ও তো আমার বোনের মতো।"

সেই কথার পরদিনই মাকে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করাতে গেলাম।

আমি ফোন করে তাকে নিচে আসতে বললাম।

সে এল।

আমি মাকে দেখিয়ে বললাম,

"এই হচ্ছে ফারদিয়া।"

মা শুধু দেখলেন।

খুব বেশি কিছু বললেন না।

পরে আমরা একসঙ্গে হালকা নাস্তা করলাম।

তারপর সবাই নিজ নিজ পথে চলে গেলাম।

সেদিন রাতে গল্প করতে করতে জানতে পারলাম—

যার কাছে আমি ভিসার টাকা দিয়েছি, তিনি নাকি ফারদিয়ার মামা।

পৃথিবীটা যেন ছোট হয়ে গেল।

পরদিন তার আবার ডাক্তার দেখানোর কথা ছিল।

সে একা যেতে ভয় পাচ্ছিল।

ফোন করে বলল,

"পারলে চলে এসো।"

আমি আবারও তার পাশে দাঁড়ালাম।

হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখালাম।

পরীক্ষা করালাম।

চেকআপের সময় হঠাৎ সে আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরল।

ডাক্তার কিংবা আশেপাশের কেউ বুঝতেই পারেনি—

আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা, নাকি স্বামী-স্ত্রী।

রিপোর্ট আসতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগবে।

আমরা হাসপাতালের পাশের ছোট্ট পার্কে গিয়ে বসে থাকলাম।

একসঙ্গে নাস্তা করলাম।

অনেক গল্প করলাম।

ছবি তুললাম।

সেই ফাঁকে তার মোবাইলে থাকা আমার বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কের সব স্ক্রিনশট ও ছবিগুলোও মুছে দিলাম।

রিপোর্ট হাতে পেয়ে আবার ডাক্তারের কাছে গেলাম।

সব বুঝে নিয়ে তাকে বাসায় পৌঁছে দিলাম।

আমি নিজের বাড়িতে ফিরে এলাম।

এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই আমাদের দেখা হতো।

আমরা ঘুরতে যেতাম।

একসঙ্গে সময় কাটাতাম।

জীবনে এত কাছের সম্পর্ক আগে কখনো হয়নি।

একটা বিষয় আজও মনে আছে—

প্রায় সব খরচই সে করত।

আমি খুব কম খরচ করতাম।

অনেক সময় কিছুই করতাম না।

তবুও কখনো মুখ ফুটে কিছু বলেনি।

আমার মা ধীরে ধীরে সব বুঝে গিয়েছিলেন।

আমি তাকে খুলে বললাম—

ফারদিয়ার কথা।

মা আপত্তি করলেন না।

বরং তাকে পছন্দই করলেন।

এরপর থেকে ফারদিয়া নিয়মিত আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।

আমার মনে হতে লাগল—

হয়তো সবকিছু ঠিক দিকেই এগোচ্ছে।

অন্যদিকে যার কাছে আমি ভিসার টাকা দিয়েছিলাম, সেই মামা আমার কাছেও বন্ধুর মতো ছিলেন।

একদিন মজা করে বললাম,

"আপনার ভাগ্নিকে আমার সঙ্গে বিয়ে দেবেন?"

তিনি কয়েকজনের নাম বলতে লাগলেন।

আমি শেষে বললাম,

"ফারদিয়ার কথা বলছি।"

তিনি সিলেটি ভাষায় হেসে বললেন,

"তাইরে দেখলেউ বুঝা যায় পানি বান্দিলাইছে।"

ওই কথা শুনে আমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে পড়েছিলাম।

আমি পরে ফারদিয়াকে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম—

"এদের থেকে একটু দূরে থাকো।"

এদিকে তার মামা বলেছিলেন,

১২ তারিখের মধ্যেই আমার ভিসা হয়ে যাবে।

আমরা ধরে নিয়েছিলাম—

আমার হাতে সময় খুব কম।

তাই ফারদিয়া বলল,

"চলো একটা লং ট্যুরে যাই।"

আমি প্রথমে একটু ভেবেছিলাম।

তারপর রাজি হয়ে গেলাম।

আমরা বিভিন্ন রিসোর্ট খুঁজতে লাগলাম।

কোথায় পরিবেশ ভালো, নিরাপদ, খরচ কম—সব হিসাব করে শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম,

শ্রীমঙ্গলের লেমন গার্ডেন রিসোর্টে যাব।

সেই দিনটার কথা আজও ভুলতে পারি না।

প্রায় ২০ কিংবা ২২ তারিখ।

আমরা সেখানে পৌঁছালাম।

আমাদের আচরণ দেখে কেউ সন্দেহই করেনি।

যে-ই দেখেছে, মনে করেছে—

নতুন বিয়ে করা স্বামী-স্ত্রী।

সারাদিন গল্প...

হাসি...

ছবি...

একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য মুহূর্ত।

সেই সফর আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে আছে।

সুইমিং পুলে নামার সময় সে খুব চাইছিল আমি পানিতে নামি।

কিন্তু আমি রাজি হলাম না।

সে এতটাই মন খারাপ করল যে কেঁদেই ফেলল।

তার চোখের জল দেখে তখনও বুঝিনি—

এই সম্পর্কের সামনে আরও কত বড় ঝড় অপেক্ষা করছে।

রাতে ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গেল।

প্রায় ধরা পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।

তখনও তার পরিবার আমার সম্পর্কে কিছুই জানত না।

পরদিন আমরা কোথাও বের হইনি।

শুধু বিশ্রাম নিয়েছিলাম।

কিন্তু সেদিনই আমাদের জীবনে আরেকটি বড় আঘাত নেমে এল।

খবর এল—

আমার বিদেশের ভিসা হয়নি।

যার জন্য এত টাকা দিয়েছিলাম...

যার জন্য এত স্বপ্ন দেখেছিলাম...

সবই নাকি ভুয়া।

এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল আমার সব আশা।

আমি নীরব হয়ে গেলাম।

আর ঠিক সেই দিনই ফারদিয়া আমাকে আরেকটি কথা জানাল।

তার একজন প্রাইভেট শিক্ষক তাকে নিয়মিত এসএমএস করে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছেন।

আমি তাকে বললাম,

"ব্লক করে দাও।"

সে কোনো প্রশ্ন না করেই তাকে ব্লক করে দিল।

এরপর দিনও সে জেদ করল ঘুরতে যাবে,তাই আমরা ঘুরতে গেলাম।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ফারদিয়া আমাদের একসঙ্গে তোলা একটি ছবি নিজের স্ট্যাটাসে দেয়।

সেই একটি ছবিই সবকিছু বদলে দেয়।

তার এক কাজিন ছবিটির স্ক্রিনশট রেখে দেয়।

পরে সেই স্ক্রিনশট তার মায়ের বোনের কাছে পৌঁছে যায়।

আব্দুল্লাহ বিন মালিক এর লেখা অনুগল্প অপূর্ণ ভালোবাসার পূর্ণ শিক্ষা এর ইমেজ

প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়।

সে বলেছিল, ছবিটি বাস্তব কোনো ছেলে না টা Ai দিয়ে বানানো।

কিন্তু পরদিন সবাই নিশ্চিত হয়ে যায়, এটি সত্যিকারের ছবি।

এরপর ফারদিয়ার ফুফু বিষয়টি তার মাকে জানিয়ে দেন।

সেদিনই প্রথমবার আমার পরিচয় হয় তার ফুফুর সঙ্গে।

আমি অনেক অনুরোধ করলাম।

অনেক বুঝালাম।

শেষ পর্যন্ত তার ফুফুর সহযোগিতায় সেদিনের পরিস্থিতি কিছুটা সামলে নেওয়া সম্ভব হয়।

তবে এর পর থেকেই ফারদিয়ার পরিবার আমার অস্তিত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে যায়।

এরপর থেকে আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ অনেক কমে যায়।

আগের মতো আর ইচ্ছামতো কোথাও যাওয়া হতো না।

প্রয়োজন হলে বাজারে দেখা হতো।

কখনো বাজারে নিয়ে যেতাম, কখনো কোনো দরকারি কাজ থাকলে সাহায্য করতাম।

কয়েকদিন পর তার মা, তার দাদুকে পাঠিয়ে তাকে ফুফুর বাসা থেকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান।

ফারদিয়া আমাকে জানায়—

বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর তার সঙ্গে কেউ ঠিকমতো কথা বলে না।

খাবারও দেয় না।

সে নিজেকে একা অনুভব করছিল।

তার কথা শুনে আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না।

আমি তার মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বললাম।

অনেক অনুরোধ করলাম।

অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম।

পরে তিনি আমার মায়ের সঙ্গেও কথা বললেন।

অনেক কথাবার্তার পর কিছু শর্তের ভিত্তিতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলো।

এরপরও আমাদের যোগাযোগ চলতে লাগল।

একদিন রাতে সামাজিক মাধ্যমে মহরানা নিয়ে একটি ভিডিও দেখছিলাম।

হঠাৎ তাকে জিজ্ঞেস করলাম,

"তুমি কত টাকা মহর চাও?"

সে একটু চুপ থেকে বলল,

"তুমি যতটা পারবে।"

আমি আবারও জিজ্ঞেস করলাম।

শেষ পর্যন্ত সে বলল,

"১০১ টাকা।"

আমি অবাক হয়ে বললাম,

"এত কম কেন? আমি তো চাইলে আরও বেশি দিতে পারি।"

সে রাজি হলো না।

বরং বলল,

"আমি আমার পরিবারকে রাজি করিয়ে ফেলব।"

তার সেই কথাগুলো শুনে আমার মনে হয়েছিল—

সে আমাকে সত্যিই ভালোবাসে।

কারণ তখন তার কাছে টাকার চেয়ে মানুষটাই বড় মনে হচ্ছিল।

আমাদের সম্পর্কে ঝগড়াও হতো।

ছোটখাটো অভিমান হতো।

তবুও প্রতিদিনই আবার মিল হয়ে যেত।

আমি শুধু একটা বিষয় নিয়ে সবসময় সতর্ক ছিলাম।

আমি চাইতাম না, সে অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয়ভাবে যোগাযোগ রাখুক।

চাচাতো ভাই...

ফুফাতো ভাই...

বা অন্য যে-ই হোক।

আমার মনে হতো, অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝির কারণ হতে পারে।

এরপর ঈদ এলো।

ঈদের পর তার ফুফু বিদেশ থেকে দেশে এলেন।

পরিবার মিলে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করল।

ফারদিয়া আমার কাছে এসে কাঁদতে লাগল।

সে বলল,

"আমি যেতে চাই না। তোমাকে ছাড়া কোথাও ভালো লাগবে না।"

আমি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারিবারিক প্রয়োজনে সে তাদের সঙ্গে বেড়াতে গেল।

ফিরে এসে সে বলল,

ভ্রমণে তার একটুও ভালো লাগেনি।

প্রায় প্রতিদিনই সে কেঁদেছে।

আমি বিশ্বাস করেছিলাম।

কারণ তখন পর্যন্ত আমার কাছে তার প্রতিটি কান্নাই সত্যি মনে হতো।

এরপর এলো আমার এক আত্মীয়ের বিয়ে।

সেদিন সকালে আমাদের অল্প কিছু কথা হয়েছিল।

আমি তাকে আগেই বলেছিলাম,

"আমাকে না জানিয়ে কোথাও যেও না।"

দুপুরের পর থেকে সে অফলাইনে।

আমি ভেবেছিলাম—

হয়তো নেটওয়ার্ক নেই।

বিয়ে শেষে আমি আর আমার এক খালাতো ভাই একটু ঘুরতে বের হলাম।

মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল।

চার্জে দিয়ে আমরা সেলুনের দিকে যাচ্ছিলাম।

হঠাৎ দেখি—

আমার সামনে ফারদিয়া।

আর তার পাশে একজন চাচাতো ভাই।

তার কাঁধে ফারদিয়ার হাত।

সেই দৃশ্য দেখে আমার মনে হলো—

আমার চারপাশের সবকিছু যেন থেমে গেছে।

বিজ্ঞাপন

ভালোবাসা মুহূর্তেই রাগে পরিণত হলো।

আমি এক মুহূর্ত দেরি না করে তাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করে দিলাম।

সে অন্য নম্বর থেকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও সেটাও ব্লক করে দিলাম।

রাতে তার মা আমাকে ফোন করলেন।

তিনি বললেন—

তারা হঠাৎ এক আত্মীয়কে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন।

পরে চাচির সঙ্গে তাকে বাজারে পাঠানো হয়েছিল।

এরপর ফারদিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,

"আমার ফোনে ব্যালেন্স ছিল না। তাই তোমাকে বলতে পারিনি।"

"এখন থেকে তোমাকে না বলে কোথাও যাব না।"

তার কান্না দেখে আমি আবারও তাকে ক্ষমা করে দিলাম।

এরপর সে আরও বলতে লাগল—

তার মা নাকি আমার বিষয় নিয়ে তাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করেন।

বাড়িতে অন্য ছেলের সঙ্গে বিয়ের কথাও বলেন।

সে প্রতিদিনই আমাকে কিছু একটা করার জন্য চাপ দিতে লাগল।

আমি তাকে বলতাম,

"সবকিছুর মালিক আল্লাহ।"

আমি তাকে একটি আমলের কথা শিখিয়ে দিয়েছিলাম।

বলেছিলাম—

প্রতিদিন নির্দিষ্ট নিয়মে দরুদ শরিফ ১০০বার, "লা হাওলা ওয়ালা" ৪৯৯ বার "লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ..." ১বার এবং শেষে আবার দরুদ ১০০বার পড়ে আল্লাহর কাছে হালাল নিয়তে দোয়া করলে, আল্লাহ উত্তম ফয়সালা করবেন।

এরপর আমার মা ও তার মায়ের মধ্যে আবার কথা হলো।

আমার মা স্পষ্ট জানালেন—

তিনি এক বছর সময় চান।

কারণ আমার বাবা তখনও প্রবাসে ছিলেন।

হার্টে সাতটি রিং বসানো।

অসুস্থ।

তিনি দেশে ফিরলে বসে সব আলোচনা করা যাবে।

আমি বিষয়টি মেনে নিয়েছিলাম।

কিন্তু ফারদিয়া আমাকে জানাত—

তার মা মাঝেমধ্যে তার কাছে ২০ হাজার, ৫০ হাজার টাকা চাইতেন।

গালিগালাজও করতেন।

আমি তখনও ভাবতাম—

সময়ই হয়তো সব ঠিক করে দেবে।

কিন্তু সামনে যে আরও বড় ঝড় অপেক্ষা করছিল...

তা তখনও আমি বুঝতে পারিনি।

একদিন দুপুরে সে হঠাৎ ফোন করে বলল,

সে আর পড়াশোনা করবে না।

সামনেই এসএসসি পরীক্ষা।

আমি কারণ জানতে চাইলে সে বলল—

তার মা তাকে স্কুলে যেতে দিচ্ছেন না।

কারণ, স্কুলে গেলে আমার সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে।

আমি সঙ্গে সঙ্গে তার মাকে ফোন করলাম।

অনুরোধ করলাম—

"ওকে স্কুলে যেতে দিন।"

তিনি বললেন,

"তোমার জন্যই যদি এত দরকার হয়, তাহলে স্কুল থেকে যা লাগে তুমি সব কিছু এনে দিও।"

আমি রাজি হয়ে গেলাম।

পরদিন সকালে বের হওয়ার আগে ফারদিয়া ফোন করল।

খুশি হয়ে বলল,

"মা মত বদলেছেন। ছোট বোনকে সঙ্গে দিয়ে আমাকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন এক সঙ্গে স্কুলে গেলে সমস্যা হবে না।

আমরা একসঙ্গে স্কুলে গেলাম।

স্কুলের কাজ শেষ করে বাজারে নাস্তা করতে বসলাম।

সেই সময় তার জন্য আমি যে অনলাইন বই অর্ডার করেছিলাম, সেটিও এসে পৌঁছাল।

ভাবছিলাম, আজই বইটা দিয়ে দিই। কিছুক্ষণ একসঙ্গে নাস্তা করে সে আর তার ছোট বোন বাসায় চলে যাবে।

সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল।

কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব বদলে গেল।

হঠাৎ ফারদিয়ার মা আমাকে ফোন করলেন।

প্রথমে আমার অবস্থান জানতে চাইলেন।

আমি সত্য কথাই বললাম,

"আমি বাজারে আছি।"

এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

"ফারদিয়া কোথায়?"

আমি লুকালাম না।

বললাম,

"আমার সঙ্গেই আছে।"

এই একটি উত্তর যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল।

তিনি রাগে জানালেন, কেউ নাকি আমাদের একসঙ্গে দেখে তাকে ফোন করেছে। এরপর ফোনে আমাকে নানা কথা বলতে লাগলেন। আমি আর কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দিলাম।

এদিকে বইয়ের ডেলিভারি এসে গেছে। আমি বইটা ফারদিয়ার হাতে দিলাম এবং তাকে ও তার ছোট বোনকে বাড়ির দিকে যেতে বললাম।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার তার মায়ের ফোন।

তিনি বললেন,

"ওকে যেখানে আছে, সেখানেই থাকতে বলো। আমি আসছি।"

আমি আবার ফারদিয়াকে ফোন করে থামতে বললাম।

ঠিক তখনই সে কান্না করে বলল,

"আম্মু একা আসবে না। আব্বুর ওই বন্ধু চাচাও আসবে। ও আমাকে মারবে।"

সে বারবার কাঁদছিল।

আমি বুঝলাম, পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে।

আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার এক বন্ধুকে ফোন দিলাম।

সে বলল, সে কাছেই আছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তার খালাতো ভাইকে নিয়ে চলে এলো।

এর অল্প পরেই ফারদিয়ার মা এবং সেই চাচাও এসে পৌঁছালেন।

পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়াল যে, যেকোনো সময় বড় ঝামেলা হতে পারে।

আমার মা'কেও ফোন করে নানা রকম ভয় দেখানো হলো।

এমনকি বলা হলো,

"আমরা মেয়েকে আর নিয়ে যাব না।"

আমি তখন রাগের মাথায় বলেছিলাম,

"সমস্যা নেই, আমি নিয়ে যাব।"

আমার পাশে থাকা বন্ধু তখন নিজের পরিচয় দিয়ে মাঝখানে কথা বলল।

তার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া থেকে রক্ষা পেল।

সেদিনের একটি দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে।

ফারদিয়া আমার হাত ধরে কাঁদছিল।

সে বলছিল,

"আমাকে নিয়ে পালিয়ে যাও।"

আমি পারিনি।

আমি তাকে বলেছিলাম,

"না।"

আমি চাইনি কোনো ভুল পথে সিদ্ধান্ত নিতে।

শেষ পর্যন্ত সে তার মায়ের সঙ্গে চলে গেল।

যাওয়ার আগে আমি আর আমার বন্ধু তার মা এবং সঙ্গে আসা লোকটির কাছে অনুরোধ করেছিলাম,

"ওর গায়ে হাত তুলবেন না।"

তারা আশ্বাস দিয়েছিলেন।

সবার সামনে তার চাচা তার মোবাইল নিয়ে নিলেন।

বিদায় নেওয়ার আগে সে আমার হাতে দুটি পারফিউম তুলে দিয়েছিল।

বলেছিল,

"এগুলো তোমার জন্য।"

আমি সেই পারফিউম নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে একটু নাস্তা করে অনেক রাতে বাড়ি ফিরলাম।

রাতে আবার তার মা ফোন করলেন।

তিনি কিছুটা আবেগ নিয়ে কথা বললেন।

কিছুটা কাঁদলেনও।

বললেন,

"ফারদিয়াকে আপাতত মোবাইল দেব না। তবে আমার ফোন দিয়ে প্রতিদিন ১০–২০ মিনিট কথা বলতে দেব।"

এরপর কয়েকদিন আমরা তার মায়ের ফোনেই কথা বলতাম।

প্রতিবারই ফারদিয়া কাঁদত।

আমাকে বলত,

"কিছু একটা করো।"

দুই–তিন দিন পর সে নিজের মোবাইল আবার ফিরে পেল।

তবে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলতে হতো।

আগের মতো আর দীর্ঘ সময় কথা বলা সম্ভব হতো না।

এর মধ্যেই চলে এলো তার জন্মদিন।

সারাদিন তেমন কথা হয়নি।

বিকেলে সে একবার ফোন করে বলল,

"আজ আমার জন্মদিন। মামা আমার জন্য কেক আর ফুল পাঠিয়েছে।"

আমি তখন অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলাম।

অনেক দূরে ছিলাম।

চাইলেও কিছু উপহার দিতে পারতাম না।

রাতে কথা হলো।

সে জানাল, পরদিন তাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতে হবে।

তার মা-ও আমাকে বললেন,

"তুমি ওকে যেতে বলো।"

আমি ফারদিয়াকে বললাম,

"সিদ্ধান্ত তোমার। যদি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তি লাগে, তাহলে কোনো অজুহাতে বাসায় থেকো।"

পরদিন আমি নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলাম।

আমাদের কথাও খুব কম হয়েছিল।

রাতে সে জানাল,

"আজ আমরা বিয়ের বাড়িতে চলে যাচ্ছি।"

তারপর...

সে আর আমি—দুজনের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

বিয়ের দিন পর্যন্ত আর কোনো কথা হলো না।

বিয়ের দিন আমার কাছে তার একটি অ্যাকাউন্টের অ্যাক্সেস ছিল।

সেখানে হঠাৎ একটি ছবি দেখলাম।

সে পার্লারে।

তার পাশে এক অচেনা ছেলে।

আমি তাকে চিনতাম না।

আমার মনে হলো, সে আত্মীয়ও নয়।

সেই একটি ছবি আমার মাথা গরম করে দিল।

রাগে আমি তার ফোন রিসেট করে দিলাম।

রাতে সে পাসওয়ার্ড চাইলে আমি দিয়ে দিলাম।

কিন্তু সেদিন আর কেউ কারও সঙ্গে কথা বললাম না।

পরদিন তাকে অফলাইনে দেখে আমি তার মায়ের ফোনে কল করলাম।

তিনি বললেন,

"সে চাচির সঙ্গে ওয়ালিমায় গেছে।"

আমি ছবির কথা তুলতেই তিনি প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে আমাকে বোঝালেন,

"ও ছেলে তাদের আত্মীয়।"

আমি শান্ত হওয়ার চেষ্টা করলাম।

কিন্তু মন মানতে চাইছিল না।

ফারদিয়ার সঙ্গে কথা না বলে থাকতে না পেরে আমি একা পাহাড়ে চলে গেলাম।

ভাবছিলাম—

হয়তো কিছুটা শান্তি পাব।

হঠাৎ তার ফোন।

আমি পাহাড় থেকে নেমে এলাম।

নিজেই সব ঠিক করার চেষ্টা করলাম।

কথা বলতে বলতে আমি তার নম্বরের দিকে থাকালাম

নাম দেওয়া ছিল—

N.F

আমি শুধু জানতে চাইলাম,

"N মানে কে?"

সে স্পষ্ট উত্তর দিল না।

এদিক-ওদিকের কথা বলতে লাগল।

বরং আবার বিয়ের জন্য চাপ দিতে লাগল।

ঠিক তখনই শুনলাম—

আমার মা কাঁদছেন।

আমি দৌড়ে গেলাম।

জিজ্ঞেস করলাম,

"কী হয়েছে?"

তিনি কিছুই বললেন না।

আমার মনে হলো,

হয়তো সারাদিন ধরে আমার অস্বাভাবিক আচরণই তাকে কাঁদিয়েছে।

আমি আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না।

রাগে...

হতাশায়...

অসহায়তায়...

ফারদিয়া তখনও ফোনে ছিল।

আমি নিজের মোবাইল ভেঙে ফেললাম।

কম্পিউটার ভেঙে ফেললাম।

হাতের কাছে যা পেলাম, সব ভাঙতে শুরু করলাম।

মা আমাকে থামাতে এলেন।

আমি ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলাম।

তারপর...

আটটি ঘুমের ওষুধ একসঙ্গে খেয়ে ফেললাম।

ঘরের কাপড়ে আগুন লাগালাম।

নিজের শরীরের সঙ্গে বৈদ্যুতিক তার জড়িয়ে দিলাম।

এরপরের কিছুই আমার মনে নেই।

যখন জ্ঞান ফিরল...

পরদিন বিকেল।

আমি নানাবাড়ির একটি বিছানায় শুয়ে।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

"আমি এখানে কেন?"

তখন জানতে পারলাম—

প্রবাসে থাকা আমার বাবা খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমার মামাকে বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন।

মামা এসে আমাকে উদ্ধার করেন।

পরে আমি বাবার সঙ্গে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় কথা বলি।

জীবনের সব কথা খুলে বলি।

একটাও কথা লুকাইনি।

আমি কেঁদেছিলাম।

আমার বাবাও কেঁদেছিলেন।

পরে শুনলাম, আমি নাকি মায়ের ফোনও ভেঙে ফেলেছিলাম।

বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম।

মামা আমাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান।

এই সময়ের অনেক ঘটনাই আমার নিজের মনে নেই।

পরে অন্যদের কাছ থেকে জেনেছি।

পরদিন আমাকে একজন হুজুরের কাছে নেওয়া হয়।

তিনি তাবিজের কথা বলতেই আমি রেগে যাই।

আপত্তি জানিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসি।

সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে ধীরে ধীরে আমি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করি।

কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় তখনও শেষ হয়নি।

কারণ...

আমার বাবা তখনও আমার সামনে বসে ছিলেন না।

আর আমি তখনও জানতাম না—

তিনি সব ছেড়ে দেশে ফিরে এসেছেন, শুধু আমাকে বাঁচানোর জন্য।

পরদিন সকালে বাবার ফোনে আমার ঘুম ভাঙল।

আমি তখনও নানাবাড়িতে।

ফোন ধরতেই বাবা জিজ্ঞেস করলেন,

"তুই কোথায়?"

আমি বললাম,

"নানাবাড়িতে।"

তিনি শুধু বললেন,

"বাড়িতে চলে আয়।"

পরে মামার কাছ থেকে জানতে পারলাম—

খবর পাওয়ার পর বাবা জরুরি ফ্লাইটে দেশে চলে এসেছেন।

হার্টে সাতটি রিং বসানো একজন মানুষ, যার বিশ্রামে থাকার কথা, তিনি আমার জন্য সবকিছু ফেলে দেশে ফিরেছেন।

এর চেয়েও কষ্টের বিষয় ছিল—

আমার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা, ভিসার পেছনের খরচ এবং অন্যান্য কারণে সংসারের প্রায় সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গিয়েছিল।

বাবা প্রায় খালি হাতেই দেশে ফিরেছিলেন।

বিকেলে মামা আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিলেন।

বাবা তখন ঘুমিয়ে ছিলেন।

ঘুম থেকে ওঠার পর আমি তাঁর সামনে গিয়ে সালাম করলাম।

নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না।

তাঁকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম।

চোখের পানি যেন থামতেই চাইছিল না।

সেই রাতে বাবা আমাকে অনেক বুঝিয়েছিলেন।

তিনি বললেন,

"ওই মেয়ের চিন্তা বাদ দে।"

আমি তখনও রাজি হইনি।

পরদিন বাবা আরেকবার বললেন,

"আমি চেষ্টা করব, ওকে তোর কাছে এনে দিতে।"

কিন্তু সঙ্গে এটাও জানিয়ে দিলেন—

"এরপর যদি কিছু না হয়, তাহলে নিজের জীবন নিজেকেই গড়তে হবে। আমি আর কোনো দায়িত্ব নিতে পারব না।"

আমি চুপ করে ছিলাম।

কোনো উত্তর দিতে পারিনি।

কয়েকদিন পর আমি এক ছোট ভাইয়ের ফোনে নিজের সিম লাগিয়ে ফারদিয়ার মায়ের নম্বরে ফোন দিলাম।

আমি শুধু জানতে চাইলাম,

"ফারদিয়া কেমন আছে?"

তিনি বললেন,

ফারদিয়াকে নানাবাড়ি পাঠানো হয়েছে।

সেখানে নাকি তাকেও মারধর করা হচ্ছে, শুধু আমাকে বিয়ে করতে চাওয়ার কারণে।

এই কথা শুনে আমি আরও ভেঙে পড়লাম।

প্রতিদিন তার মায়ের কাছে অনুরোধ করতাম,

"একবার শুধু ওর সঙ্গে কথা বলতে দিন।"

অনেক অনুরোধের পর আমার মা এবং মামার কথায় বাবা বিষয়টি মেনে নিলেন।

আমার মা আবারও ফারদিয়ার মায়ের সঙ্গে কথা বললেন।

কিন্তু এবার তিনি আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন,

"আমার মেয়েকে তোমাদের কাছে বিয়ে দেব না আর ফারদিয়া তা মেনে নিয়েছে"।

আমি প্রতিদিন বলতাম ফারদিয়া এই কথাটা বলুক,এই সিদ্ধান্ত আপনার।

এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেল।

এক শুক্রবার, জুমার নামাজ শেষে আমি আমার বাটন ফোন থেকে আবার ফোন করলাম।

সেদিন তার মা রাগের মাথায় বললেন,

"তোমার কাছে যদি কোনো ছবি থাকে, ইচ্ছা হলে ভাইরাল করে দাও। তারপরও আমার মেয়েকে তোমার কাছে দেব না।"

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

কথার এক পর্যায়ে তিনি কান্না করে বললেন,

"তোমরা সবাই মিলে আমাকে মেরে ফেলো।"

আমি তখন নিজের রাগ আর কষ্ট নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।

কঠিন কণ্ঠে বলেছিলাম,

"আপনি মরে গেলে প্রয়োজন হলে আপনার জানাজায় আসব।"

আজও স্বীকার করি—

এই কথাটি বলা আমার উচিত হয়নি।

তিনি ফোন কেটে দেন।

পরে আমার মাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন,

"আমি তো ওকে ছেলের মতো ভাবতাম। আজ সে আমাকে এত কঠিন কথা বলল।"

এরপর তিনি বললেন,

"ফারদিয়া বাড়িতে এসেছে। ওর সঙ্গে কথা বলিয়ে দিচ্ছি।"

আমি অনেক দিন ধরে একটি কথাই বলে আসছিলাম—

"আপনারা যদি বলেন, আমি বিশ্বাস করব না। কিন্তু ফারদিয়া যদি নিজে বলে, তাহলে আমি মেনে নেব।"

অবশেষে ফারদিয়া ফোনে এলো।

সে শান্ত গলায় বলল,

"তুমি আমার আম্মুর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছ। তাই আমি তোমাকে বিয়ে করব না।"

আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম।

বললাম,

"আমি তো তোমার জন্যই সব করেছি। তোমার জন্যই এমন পরিস্থিতিতে পড়েছি।"

"আমি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।"

"আমার বাবা-মাকে রাজি করিয়েছি।"

"সবকিছু সামলেছি।"

"এখন আমি মানুষের সামনে কীভাবে দাঁড়াব?"

কিন্তু সে তার সিদ্ধান্ত বদলায়নি।

বরং বলল,

"একটা শর্ত আছে।"

আমি জানতে চাইলাম,

"কী শর্ত?"

সে বলল,

"৩৫ লক্ষ টাকা মহরানা দিতে হবে।"

"আর ১০ তোলা স্বর্ণ দিতে হবে।"

"সব স্ট্যাম্প করে রাখতে হবে।"

"তারপর দুই বছর পরে বিয়ে করব।"

আমি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে ছিলাম।

আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই মেয়েটি—

যে একদিন বলেছিল,

"১০১ টাকা মহর হলেই হবে।"

যে বলেছিল,

"এক কাপড়ে থাকব।"

"পানি-ভাত খেয়েও থাকব।"

আজ সেই মানুষই ৩৫ লক্ষ টাকা আর ১০ তোলা স্বর্ণের শর্ত দিচ্ছে।

সেদিনই প্রথম আমার সন্দেহ দৃঢ় হলো।

এর আগে এলাকার কিছু মানুষ বাবাকে বলেছিলেন,

এই পরিবার নাকি আরও অনেক ছেলের সঙ্গে এমন করেছে।

আমি বিশ্বাস করিনি।

কিন্তু ফারদিয়ার নিজের মুখে এই দাবি শোনার পর আর অবিশ্বাস করার কোনো কারণ রইল না।

আমি তাকে বললাম,

"আগেই শুনেছিলাম তোমরা এসব নিয়ে ব্যবসা করো। বিশ্বাস করিনি। আজ বিশ্বাস হলো।"

এরপর আমাদের মধ্যে তর্ক শুরু হলো।

এক পর্যায়ে তার মা ফোন নিয়ে ক্ষমা চাইলেন।

বললেন,

"তোমার যত ক্ষতি হয়েছে, আমরা সব ক্ষতিপূরণ দেব।"

তারপর ফোন কেটে দিলেন।

আমি আর কিছু বললাম না।

সবকিছু আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিলাম।

এরই মধ্যে বাবা আমাকে একজন ভালো আলেমের কাছে নিয়ে গেলেন।

তিনি কোনো তাবিজ দেননি।

কোনো হাদিয়াও নেননি।

শুধু কুরআনের আয়াত পড়ে ঝাড়ফুঁক করলেন।

সেদিনের পর থেকেই আমার মন ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করল।

আমি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শুরু করলাম।

প্রতিদিন এশার নামাজের পর "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আযীম" এর আমল করতাম।

আল্লাহর কাছে শুধু একটি দোয়াই করতাম—

"হে আল্লাহ, আমার জন্য যেটা উত্তম, সেটাই নির্ধারণ করে দিন।"

দুই দিন পর হঠাৎ আমার এক বন্ধু আমাকে একটি ভয়েস মেসেজ ও কিছু ছবি পাঠাল।

ছবিগুলো ছিল—

আমার সেই পুরোনো বন্ধু, আবিদের।

যে একসময় ফারদিয়ার প্রেমিক ছিল।

ভয়েস মেসেজে সে আমাকে হুমকি দিচ্ছিল।

আমার মা বিষয়টি শুনে আবিদকে ফোন করতে বললেন।

পরদিন আবিদ ফোন করলে মা আমাদের পুরো ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খুলে বললেন।

সব শুনে আবিদ অবাক হয়ে গেল।

সে জানাল,

ফারদিয়া তার কাছেও গিয়ে বলেছে—

আমি নাকি ৩৫ লক্ষ টাকা মহর আর ১০ তোলা স্বর্ণ দিয়ে জোর করে বিয়ে করতে চাই।

এমনকি আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগও করেছে—

আমি নাকি তার ফোন হ্যাক করেছি এবং ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছি।

পরদিন আবিদের মা আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন।

দুই মা দীর্ঘ সময় কথা বললেন।

সেই কথোপকথনে এমন এক সত্য বেরিয়ে এলো, যা আমাদের সবাইকে হতবাক করে দেয়।

দেখা গেল—

ফারদিয়া এবং তার মা আমার পরিবারের সঙ্গে যেমন আচরণ করেছেন,

ঠিক একইভাবে আবিদের পরিবারকেও বিশ্বাস করিয়েছেন।

আমার সঙ্গে সম্পর্ক চলাকালেও ফারদিয়া প্রতিদিন আবিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত।

আমার কথা বললে বলত—

সে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত।

আবার আমার কাছে এসে বলত—

আবিদ অতীত।

শুধু তাই নয়,

আবিদ জানাল,

যখন সে শুনেছিল আমি নাকি জোর করে বিয়ে করতে চাই,

তখন সেও প্রবাসে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল।

সেদিন আমি আল্লাহর কাছে সিজদায় পড়ে শুকরিয়া আদায় করেছিলাম।

কারণ বুঝতে পেরেছিলাম—

আল্লাহ শুধু আমাকেই নয়,

আরেকজন মানুষকেও একই পরিণতি থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।

এরপর আরও তথ্য সামনে আসতে থাকে।

শুধু আমরা নই,

আরও কয়েকটি পরিবারের সঙ্গেও একই ধরনের প্রতারণার অভিযোগ ছিল।

কিন্তু পর্যাপ্ত আইনি প্রমাণ না থাকায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।

ফারদিয়া নিজেই একদিন আমাকে বলেছিল,

তাদের পরিচিত একজন স্থানীয় পুলিশ সদস্য আছেন।

তার মা তাকে ভাই বলে ডাকেন।

কোনো বিপদ হলে তিনিই নাকি তাদের সাহায্য করেন।

আমি সেই কথাগুলো তখন গুরুত্ব দিইনি।

আজ সবকিছু মিলিয়ে বুঝতে পারি—

জীবনের কিছু শিক্ষা খুব কঠিন হয়।

কিন্তু সেই শিক্ষাই মানুষকে বদলে দেয়।

আজ আর আমার মনে কোনো প্রতিশোধ নেই।

কোনো ঘৃণাও নেই।

শুধু একটি বিশ্বাস আছে—

আল্লাহ যা করেন, বান্দার শেষ পর্যন্ত কল্যাণের জন্যই করেন।

হয়তো যাকে হারিয়ে আমি ভেবেছিলাম আমার জীবন শেষ,

আসলে তাকে হারিয়েই আল্লাহ আমাকে আরও বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করেছিলেন।

সমাপ্ত।

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প