ভ-এর গল্প

লেখিকাঃ আফিয়া আফরিন

প্রকাশকালঃ জুন ২১, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

সেঁজুতির সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে। আমি পেশায় ব্যাংকার। সামনে পেশাগত পরীক্ষা ছিল বলে অনলাইনে কয়েকটা বই অর্ডার করেছিলাম। সেগুলো আনতেই কুরিয়ার অফিসে যাওয়া। জরুরি কাজের কারণে সেদিন বের হতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। শীতের রাত, ঘড়িতে তখন ৮:৪০। অফিস প্রায় ফাঁকা, লোকজন তেমন নেই। কাউন্টারে বয়স্ক একজন লোক বসা। কাগজপত্র গুছানোর ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছে আজকের মতো অফিস বন্ধ করার চিন্তা করছেন।

আমি দ্রুত এগিয়ে বললাম, “একটা পার্সেল আছে।”

লোকটা চোখ তুলে আমাকে একবার দেখেই পাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আর আপনার?”

আফিয়া আফরিন এর লেখা অনুগল্প ভ-এর গল্প এর ইমেজ

আমার পাশে কখন যে একটা মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে তা বুঝতেই পারিনি। মেয়েটি মুখ তুলে বলল, “আমারও তাই।”

লোকটা মুচকি হেসে বলল, “আজ তো আর হবে না।” তারপর কাগজপত্র আর রেজিস্টার খাতাটা ধপাস করে ডেস্কের এক কোণায় ফেলে টেনে টেনে বলল, “আজকের মতো ক্লোজ।”

এই কথা শুনে মেয়েটা ভীষণ মন খারাপ করে বলল, “কিন্তু গল্পের বইগুলো ঠিকঠাক এলো কিনা, তা না দেখা পর্যন্ত আমার রাতে ঘুমই হবে না!”

কাউন্টারে দাঁড়ানো লোকটা ‘না’ সূচক মাথা নেড়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মেয়েটার একজোড়া নির্মল চোখের আকুতি দেখে আমি হঠাৎ বলে ফেললাম, “আমার পার্সেল লাগবে না। আপনি অন্তত উনারটা দিয়ে দিন, প্লিজ!”

কথাটা বলেই আমি ভীষণ হকচকিয়ে গেলাম। পাশ ফিরে দেখলাম মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভীষণ লজ্জায় নিজের গালে দু’খানা কাল্পনিক চড় কষে মাটির সাথে মিশে গেলাম। লোকটা একবার আমার দিকে আরেকবার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাহা করে হেসে উঠে বলল, “অপেক্ষা করুন, দুজনেরটাই আনছি। আপনাদের মেসেজ দেখান দেখি।”

বই নিয়ে খানিকটা এগিয়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে রিকশা ডাকব ভাবছি, ঠিক সেই সময় পেছন থেকে মেয়েটা বলল, “শোনেন, আমি এখন নান-গ্রীল খাব। আপনাকে নিমন্ত্রণ করা হলো, খেতে চাইলে আসতে পারেন।”

আমি অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, বেটাইমে কুরিয়ার অফিস খোলা রেখে আপনার বইগুলো দেবার সুপারিশের কারনেই কী এই খাতিরদারি? সে বলল, “বুঝেছি, আপনার খিদে নেই। টাটা।”

“আরে, আমি তাই বললাম নাকি? আজব মানুষ তো আপনি!” এই বলে আমি পিছু নিলাম। কিছুটা এগিয়ে নিউমার্কেটের স্টার রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। একজোড়া অর্ধসেদ্ধ পোড়া মুরগীর ঠ্যাং আর কাশ্মীরি নান আমাদের প্রথম পরিচয়ের স্মৃতিস্বরূপ দু’জনের পেটে চালান হয়ে গেলো। সেঁজুতি তার হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটুকরো কাগজ বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। আমি অবাক হলেও নিলাম। মনে মনে ভাবছি, এই রাতে মলম পার্টির খপ্পরে পড়লাম না তো?

কাগজটা ভাঁজ করা খুলতেই দেখি কালো কলমে লেখা কয়েকটা লাইন লেখা,

“ভবের ভিড়ে ভেসে যাওয়া মানুষ আমরা, ভিজে থাকা ভাব ভুলে যাই বারবার। ভালোলাগা কখন কীভাবে বদলে যায়, বুঝিনা। ভোরের মত শিশিরে ভেজা এই বিষন্ন রাতটায় যদি বলি, ভরসা রাখবো কারে? ভাগ্যের ভাঁজে হয়তো আপনারই নাম ভেসে উঠে।”

আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সে তখন চুপচাপ আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখে চোখ পড়তেই বললাম, “এইটা… আপনি লিখেছেন?”

সে হেসে বলল, “হ্যাঁ, মাঝেমাঝে আমি শব্দ নিয়ে খেলি। আজ মনে হলো আপনাকে একটা ‘ভ’-এর গল্প দিই।”

আমিও পাল্টা হাসলাম, “সব ‘ভ’-এর মধ্যে একটা শব্দ মিসিং রইল।”

ও কৌতূহলী চোখে জিজ্ঞেস করল, “কোনটা?”

আমি উত্তর দিলাম, “ভালোবাসি।”

সেঁজুতি একমুহূর্ত থেমে স্পষ্টভাবে বলল, “ওটা পরের চিরকুটে থাকবে।”

আমি অবাক! পরের চিরকুট মানে? ওর সাথে কি আমার আবার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা আছে? কীভাবে? কোথায়? আমার মুখের সেই অপ্রস্তুত দ্বিধা বুঝে সেঁজুতি মৃদু হেসে বলল,

“পৃথিবীটা গোল। তাই হয়তো পথ হারিয়েও পথ খুঁজে পাওয়া যায়। আবার দেখা হলে, সেটা কাকতালীয় নয় ভাগ্যের নিবিড় আয়োজন।” ওর কণ্ঠে আশ্বাস ছিল, যা কথার চেয়ে বেশি সত্যি লাগছিল। পরক্ষনেই ও ব্যাগটা কাঁধে তুলে দাঁড়াতে দাঁড়াতে পুনরায় বলল, “আসছি… ভালো থাকবেন, মিস্টার আহনাফ-আল-সিদ্দিকী।”

আমি অবাক হয়ে কুরিয়ারের প্যাকেটটার দিকে তাকালাম। নাহ, এখানে আমার পুরো নাম লেখা নেই, শুধু ‘আ. সিদ্দিকী’। তাহলে ও জানল কীভাবে? আমি কৌতূহলী হলাম, “আপনি… আমায় চেনেন?”

সেঁজুতি মিষ্টি হেসে বলল, “খুব ভালো করেই।”

“কীভাবে?”

বিজ্ঞাপন

ও চুপ করে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল, “পরেরবার দেখা হলে বলব।”

এই বলেই হাঁটা দিল সেঁজুতি। শীতের বাতাসে ওর চুলগুলো উড়ছে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম কুরিয়ারের প্যাকেট হাতে। এই রহস্যময়ী মেয়েটার সাথে আবার দেখা হবে?

আমি অনেক চেষ্টা করেও সেঁজুতির চিন্তা মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না। কে মেয়েটা? আমাকে কীভাবে চেনে? বারবার ভাবছি, কিন্তু কোনো উত্তর পাচ্ছি না। ভাবতে ভাবতে মাস পেরিয়ে গেল। মনটা সেই নিউমার্কেটের মোড়ে, শীতের বাতাসে, সেঁজুতির উড়তে থাকা চুলের ভেতর পড়ে আছে। কয়েকদিন পরে আমি ব্যাংকের কাজে নতুন শাখায় গেলাম, একটা স্কুলের ফান্ড ট্রান্সফারের জন্য। স্কুলের অফিসে কাগজপত্র জমা দিতে গিয়েই দেখি, ডেস্কের ওপাশে বসে আছে সেঁজুতি। আমি অবাক! ও তাকিয়ে বলল,

“বলেছিলাম না, পৃথিবীটা গোল?”

আমি ঝাঁকুনি খেলাম, “আপনি এখানে?”

“ভাগ্যের আয়োজন।”

“আপনি শিক্ষক?” প্রশ্নটা বেরিয়ে এলো মুখ থেকে।

সেঁজুতি মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ, ইংরেজি পড়াই।”

আমি কপালে ভাঁজ ফেললাম, “আপনাকে খুঁজছিলাম...”

“আমি জানতাম আপনি আমাকে খুঁজবেন। খোঁজার কারণটাও জানি।”

“বলবেন, কীভাবে আমাকে চেনেন?”

সেঁজুতি রহস্যময় হাসল। বলল, “বলতে পারি, একটা শর্তে।”

“শর্ত?” আমি থ!

“আমাকে বিয়ে করুন, আহনাফ। উত্তরটা আপনি খুঁজবেন না। উত্তরটা আপনাকেই খুঁজছে।”

এই বলে সেঁজুতি দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। আমি স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম, ফাইল হাতে। এটা কী ধরনের কথা? আমি কি কোনো স্বপ্ন দেখছি? ওই মুহূর্তে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, বিয়ে আমি সেঁজুতিকেই করব। পরিচয় জানতে বিয়েই করব... ওকে তা জানালাম। ও শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,

“না জেনেশুনে একটা মেয়েকে বিয়ে করে সারাজীবন আফসোস করবেন?”

“রহস্য ডুবে থাকা থেকে আফসোস করা ভালো।”

সেঁজুতি মাথা নাড়ল। নিজের মনে ভাবছিল। তারপর ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল, “আফসোস করতে হবে না, রহস্যেও ডুবে থাকতে হবে না। এটা নিন, এখানে সব লেখা আছে। পড়ে আগামীকাল বিকেল নাগাদ এখানে দেখা করবেন।”

ফাইলটা আমি নিলাম। সেঁজুতি চলে গেলে তা খুললাম। এসব কি? এখানে তো সব আমার ছবি... অনেক আগের, বছর দশেক হবেই। সেঁজুতি এত আগে থেকে আমাকে চেনে? আমাকে উদ্দেশ্য করে অনেককিছুই লিখেছে। উল্টাতে উল্টাতে একটা লেখা পেলাম, সেঁজুতির লেখা:

“দশ বছর আগে, আমাদের পরিচয়। আমরা আপনাদের বাসার উপরতলায় ভাড়া ছিলাম। আমার বাবার ট্রান্সফারের কারণে আমাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। সেই বছরই আপনি দুর্ঘটনায় স্মৃতির একটা অংশ হারালেন। কিচ্ছু মনে নেই আপনার। কিন্তু আমি… আপনাকে ভালোবেসেছি। আপনার সব আমি নিজের মনে সংরক্ষণ করেছি। অতঃপর দশবছর পর, আপনি-আমি মুখোমুখি। এই দশবছর আপনাকে আগলে রেখেছি। আপনি জানেন না, প্রতিদিন আপনার জন্য কতটা অপেক্ষা করেছি, কতটা ভালোবাসা জমিয়েছি। ভালোবাসা একা বহন করতে কষ্ট হচ্ছে। আহনাফ, আমাকে বিয়ে করবেন?”

আমার চোখেমুখে হাসির উচ্ছ্বলতা। আগামীকাল কখন হবে? কখন পাবো সেঁজুতির দেখা? এই দশবছরের অপেক্ষার শেষ মুহূর্তটা আসবে কখন? আমি ফিসফিস করলাম নিজের সাথে,

“সেঁজুতি… আপনার ভালোবাসা আমি গ্রহণ করতে চাই। ভালোবাসাটুকু আমাকে দিয়ে সারাজীবন আপনার প্রতি বাধিত করুন।”

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প