দিনের বেলা একবার এহতেশাম আহমেদের ঘরটা পর্যবেক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে ময়ূখ। গতকাল রাতে নতুন নিশানা আবিষ্কারের পর থেকে তার প্রতি সাইদ আর সাজিদসহ বাড়ির অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষণীয়। সকালের নাশতার টেবিলে বেশ ভালো মতো উপলব্ধি করেছে সে।
আজ এই পরিবারের নতুন আরেকজন সদস্যর সাথে সে পরিচিত হয়েছে। সদস্য নয় ঠিক, তবে এই বাড়ির বাসিন্দা বলা যায়। তার নাম মুনিম। এহতেশাম সাহেবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর বলে জেনেছে সাজিদের কাছ থেকে। একমাত্র এই লোককেই তাচ্ছিল্য ভরে দেখেননি তিনি। বয়স পঁয়ত্রিশও হতে পারে আবার চল্লিশও হতে পারে। সঠিক বয়স ঠাহর করা মুশকিল। তবে মুনিমের প্রতি বাড়ির অন্যদের মনোভাব এখন অস্পষ্ট দুর্বোধ্য। তবে সেটা প্রীতিকর নয় অবশ্যই। বোধকরি উল্টো প্রান্তেও একই মনোভাব!
একমাত্র মৃদুলাই হাস্যোজ্জ্বল মুখে এই লোকের সাথে কথোপকথন চালিয়ে গেল। সাজিদের মুখাবয়বের সূক্ষ্ম ঈর্ষার কাঁটা ময়ূখের নজর এড়ায় না। মুনিম বেশ কৌতূহলের উদ্রেক করেছে ময়ূখের মনে। এহতেশাম সাহেব লোকটাও পৃথিবীতে না থেকেও যে লোক এতগুলো মানুষের উপরে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, সেই লোক সম্পর্কে কৌতূহল না জাগলেই বরং অবিবেচকের কাজ!
এই লাভ ট্রায়েঙ্গেলের হোতা মৃদুলাই বা কম কীসে! ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন’ প্রবাদবাক্যটা ময়ূখ অক্ষরে অক্ষরে লালন করে সর্বান্তকরণে।
‘Tenebrae cedunt luci’ এর অর্থ রাতেই উদ্ধার করে ফেলেছে সে। ‘লুসি’ শব্দটা জানা ছিল বলেই সহজ হয়ে গেছে। ‘আলো’! ল্যাটিন শব্দের ভান্ডার ঘেঁটে বাকি শব্দের অর্থোদ্ধার সম্ভব হয়েছে।
“ডার্কনেস গিভ ওয়ে টু লাইট”
“অন্ধকার যা আলোর পথে নিয়ে যায়।”
“অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসে।”
“আলোর দিক নির্দেশক অন্ধকার ...
......”
আরও নানাভাবে এটাকে ভাবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ফলাফল শূন্য। এই গুপ্তধনের রহস্য লুকিয়ে আছে সেই অন্ধকারেই। যে অন্ধকারে আছে আলোর পথ। কী সেটা! আপাতত ভাবা বন্ধ করে দিয়েছে। এটা যেটুকু বিলম্বিত হয়, যত এদের আস্থাভাজন হয়ে যায় তত সুবিধা। এহতেশাম আহমেদ নামের অদ্ভুত লোকটার মৃত্যুরহস্য কিনারা না করে সে ফিরবে না। যদিও প্রায় মাস দেড়েক চলে গেছে। আলামত সবই হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু নিজের নাছোড়বান্দা মনোভাবের সাথে সে ভীষণ পরিচিত!
আজ এসেছে বাড়ির সামনের বিশাল বাগানে। গাছপালার একটা ছোটখাটো অরণ্য বললে ভুল হবে না জায়গাটাকে। ময়ূখের লম্বাটে অবয়ব পাঁচিলের নাগাল পায় না, এতটা উঁচু করে দেওয়া। প্রাসাদোপম বাড়িটিতে আভিজাত্যের কোনো কমতি নেই। এটা নিশ্চয়ই এদের পূর্বপুরুষের তৈরি। সবগুলো ঘর জুড়ে চাকচিক্যের ছড়াছড়ি। পুরোনো হলেও সময়োপযোগী প্রায় সকল সুবিধা বিদ্যমান।
এহতেশাম সাহেব নিচতলায় যে ঘরে থাকতেন তার জানালা ঘেঁষে এসে দাঁড়ায় ময়ূখ। ভারী কাঠের পাল্লা দেওয়া। এখন বন্ধ থাকলেও কাল ভেতর থেকে দেখেছে, গ্রিল নেই এটার। জানালা খোলা থাকলে অনায়াসে কেউ এদিক দিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করতে পারবে। এটা কী তার ইচ্ছাকৃত! প্রশ্নটা চকিতে মাথায় ঘুরছে, কেন? যে লোক এত সাবধানতা অবলম্বন করেছেন, তিনি কী শুধু শখের বশে এটা করেছেন? নাকি কাউকে ভেতরে আসার প্রবেশপথ তৈরি করে দিয়েছেন, যাকে তিনি প্রবলভাবে বিশ্বাস করতেন!
বাড়ির সামনের দিকটা দেখে পেছনের দিকে যাচ্ছিল, তখনই সেদিক থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছিল মৃদুলা। ময়ূখকে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখে থমকে গিয়েছিল, মুহূর্তেই নিজের জবুথবু ভাব কাটিয়ে স্বাভাবিক হলো।
কঠিন গলায় প্রশ্ন করল, “আপনি এখানে কী করছেন?”
ময়ূখ আশেপাশে একবার জরিপ করে নিয়ে উত্তর দিল, “যে জন্য এসেছি, তাই করছি। লুকোনো উইলের সন্ধান।”
হেয়ালি ভরা হাসি খেলে গেল মেয়েটার সুন্দর মুখাবয়বে, “আপনার ধারণা চাচা এই জঙ্গলে সেটা লুকিয়ে রেখেছেন?”
“রাখতেও পারেন!”
“তাহলে বলতেই হচ্ছে আপনার মাথা মোটা। সাইদ ভাই যে কেন আপনাকে এনেছেন? আপনার জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, এই জঙ্গলে অনেক আগেই চিরুনী অভিযান চালানো শেষ!”
এই মেয়ের কথা বলার ধরনে ময়ূখের নিজের মেজাজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানো সময়ের ব্যাপার।
সে নিজেকে যতটা সম্ভব সংযত করার চেষ্টা করলেও পুরোপুরি পারল না, শীতল গলায় বলল,
“সেটা না খুঁজে পেলে আপনি খুশি হন মনে হচ্ছে?”
“সেটা আপনাকে কেন বলব?”
“তাহলে আমাকে আমার মতো কাজ করতে দিন, ম্যাডাম। আমার কাজে অযাচিত নাক গুঁজানো আমি একদম পছন্দ করি না!”
“সেটা আমিও করি না!” বলেই বাড়ির ভেতরের রাস্তা ধরল মেয়েটা। ময়ূখ মাটিতে পা ঠুকে রাগটা নিয়ন্ত্রণ করে বাড়ির পেছনের দিকটায় এগিয়ে গেল। কাউকে দেখল না। কিন্তু দুই জোড়া সদ্য তৈরি হওয়া পায়ের ছাপ নজরে এলো। একটা তো মৃদুলার, আরেকটা সাজিদের নয়, সে এত লম্বা না। মুনিম নাকি তৃতীয় কেউ আছে! ভাবল ময়ূখ।
নাহ্! যতটা সহজ মনে হচ্ছিল, ততটা সহজ হবে না!
“আপনার নামটা কী?” একজন মধ্যবয়স্ক লোককে জিজ্ঞেস করল ময়ূখ।
“আলাউদ্দিন।”
“এখানে কতদিন ধরে আছেন?”
“আমার তিন পুরুষ এইখানে থাকছে।”
“আপনি এখানে কী কাজ করেন?”
“আমি সবাই সব ঠিকঠাক করতাসে কিনা দেখভাল করি।”
“তা বেশ। এহতেশাম সাহেবের উইল সম্পর্কে কিছু জানেন?”
“হ, তা জানি।”
“আপনার জন্য তাতে কিছু আছে বলে শুনেছেন?”
“শুনছিলাম।”
ময়ূখ বিরক্ত হচ্ছিল কথা বলে। এক-দুই শব্দের উত্তর দিচ্ছে লোকটা। মুখে গোবেচারা ভাব থাকলেও অত্যন্ত সাবধানী বলেই মনে হচ্ছে। বাগান ঘুরতে ঘুরতে লোকটাকে একলা পেয়ে গিয়েছিল। এভাবে প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়া যাবে না উপলব্ধি করে অন্যপথ ধরল সে। সন্দেহের উদ্রেক না করে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় গল্পছলে প্রশ্ন করল,
“এহতেশাম সাহেব যেদিন মারা গেলেন, সেদিন আপনি এখানেই ছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“কীভাবে মারা গেলেন?”
“বয়স হইসিল। তাছাড়া শেষের দিক দিয়ে কেমন যেন অস্থির অস্থির থাকত। হার্টের অসুখ ছিল তো!”
“তিনি কি ঘুমের মধ্যে গেছেন? নাকি কখন?”
“নিজের ঘরেই। তয়, নিচে পইরা আছিলো। মাথার পিছে ফাইটা গেছিল। কিছু নিতে উঠছিল মনে হয়। কিন্তু পইরা গেছিল। আহারে!” শেষদিকে তার গলায় আফসোসের সুর।
“প্রথমে লা’শ কে দেখেছে?”
“স্যার তো উঠত ফজর ওয়াক্তে। সেদিন সাতটা পার হইলেও উঠে নাই। একটা নার্স তার দেখভাল করতা। প্রথমে সবাই ভাবছিল হয়তো আজ একটু বেশি ঘুমাইতাসেন। কিন্তু পরে আটটা বাজলেও দরজা যখন খুলল না, তখন ধাক্কাধাক্কি করেও লাভ হইল না। পরে জানালা দিয়ে ঢুকসে মুনিম।”
“জানালা খোলা ছিল?”
“হ্যাঁ।”
“সবসময় খোলা থাকত?”
“না, তয় মাঝেমইদ্যা জানালা খুলা থাকতো। তার চাঁদ দেখনের শখ আছিল। বাইনোকুলার নিয়ে বইসে থাকত।”
“যেই নার্স তার দেখভাল করছিলেন তিনি...?”
আর কথা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। সাইদ তাকে ডেকে ভেতরে পাঠিয়ে দিল।
“তোমার অগ্রগতি কতদূর?”
“গন্তব্যে পৌছলেই দেখতে পাবে।”
“দেখো, তোমার কথায় ওরা বিভ্রান্ত হবে। খামাখা ওদের এসবে জড়ানো ঠিক নয়।”
“তাহলে তুমিই বলো যা বলার।”
“উইলের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় ছাড়া অন্যদিকে সময় নষ্ট করছো বলেই মনে হচ্ছে!”
“তাহলে ইনভেস্টিগেশনটা তুমিই করো। আমি বিদায় নেই। টাকা পুরোটা তোলাই আছে!” এবার আর নিজের বিগড়ে যাওয়া মেজাজের পারদকে চেপে রাখতে পারল না ময়ূখ। সেটা নিমিষেই সর্বোচ্চ মাত্রাটা স্পর্শ করল। মনে মনে বলল,
“মাথা মোটার দল একেকটা। এদের বাবা খুবই সঠিক পরিমাপ করেছিলেন গাধাগুলোর বুদ্ধির বহর নিয়ে।”
“তুমি রেগে যাচ্ছ কেন? তোমার মতোই করো। কিন্তু অন্যদিকে ভেবো না এটুকুই বললাম কেবল” স্বর নমনীয় হলেও প্রচ্ছন্ন হুমকি ছিল স্পষ্টতই।
সাইদ চলে গেলেও ময়ূখের খিঁচড়ে যাওয়া মেজাজের পারদ চড়েই রইল, সহজে সেটা নিয়ন্ত্রণে এলো না! বাইরের পলকা হাওয়ার সাধ্য হলো না সেটাকে বশে আনার।
রাতে ময়ূখ একটা কাগজে আনমনে কাটাকুটি করছিল আর নিজের ভাবনায় শান দিচ্ছিল। সন্তানরা কেন এটা নিয়ে উদাসীন! শুধু রাগ আর অভিমানে না, সেটা অসম্ভব!
ঘটনার পেছনেও নিশ্চয়ই আরও ঘটনা আছে! হয় কাউকে বাঁচাতে চাইছে সবাই মিলে। আর নয়তো নিজেদের কোনো অপকর্ম ধামাচাপা দিতে চাইছে। দ্বিতীয়টাই এক্ষেত্রে বেশি মানানসই। এদের আর যাই হোক কাউকে বাঁচাতে এতটা লুকোছাপা করার কথা নয়। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হওয়ার ভয়!
এই পথেই এগিয়ে যেতে হবে। তবেই কিনারা পাওয়া সম্ভব বলে মনে হচ্ছে।
ময়ূখের সিক্সথ সেন্স প্রখর। কেউ আশেপাশে আছে। আচমকা ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালো সে, কিন্তু একটা ছায়া যেন সরে গেল ততক্ষণে। উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় ছুটে সেদিকে গেল, কিন্তু কেউ নেই। সব জানালা বন্ধ, ওপাশ থেকেও বাতাস আসা সম্ভব নয়। কিন্তু সে খেয়াল করেছে পর্দা দুলছিল অনবরত।
কেউ ওর পরিচিতি সম্পর্কে অবগত। নয়তো সন্দেহ করেছে ওর কার্যবিধি নিয়ে। অথবা...
পর্দা দুলছিল অনবরত।
কপালের রেখা গভীর হলো গাঢ় চিন্তায়। লাইট বন্ধ করে আলতো পায়ে এগিয়ে গেল নিজের ঘরের জানালার দিকে। কপাট খুলে দিতেই একরাশ হিম শীতল বাতাস ঢুকে পড়ল হস করে। ঘোলা ব্যাপসা জোৎস্নালোক যেন ভাসিয়ে দিল সকল চিন্তা আর রাগকে। সহসাই কেমন ফুরফুরে হয়ে গেল মন।
বড় করে বেশ কয়েকবার শ্বাস টানল, এরপর মাথাটা বাঁকাল বারকয়েক। নাহ্! একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। অন্ধকার আর আলো শব্দ দুটো মাথায় ভর করল।
আগামীকাল থেকে দৃষ্টি প্রসারিত করতে হবে। ঘরে বসে কাজ হবে না। কিছু মানুষের গতিবিধির উপরে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। এরা কোথায় কী করে তারও হিসেব-নিকেশ করাটা জরুরি। তবে কৌশলে!
ঘোর তমসা ঘেরা রাতের আঁধারে কী লুকিয়ে আছে খুঁজতে হলে এই পাঁচিলের গণ্ডি ভেদ করতেই হবে! মানুষগুলোর স্বরূপ জানতে হবে। এরা প্রত্যেকেই লাভবান হয়েছে এহতেশাম সাহেবের মৃত্যুতে। কার স্বার্থ সবচাইতে বেশি!
সবচাইতে বড় কথা, ‘Tenebrae cedunt luci’ দিয়ে তিনি ঠিক কীসের নির্দেশনা রেখে গেছেন! অন্ধকার, আলো, আলো অন্ধকার....