তোমার মনেরও মন্দিরে

পর্ব - ৩

তোমার মনেরও মন্দিরে বাংলা গল্প - লেখিকা আফিয়া আফরিন

কাজলের আকুতি মিনতি কোনোটাই কানে তুলল না প্রতীক। ঠিক সেই মুহূর্তে আবির্ভাব ঘটল জিসানের। বোনকে ছাড়িয়ে এলোপাথারি কয়েকটা কিল ঘুসি মারল প্রতীককে। সপাট সপাট করে কয়েকটা থাপ্পরও পড়ল তার গালে। প্রতীক কোনোমতে দৌঁড়ে পালিয়ে এলো। জিসান কাজলের দিকে এগিয়ে এলো। হাউমাউ করে কাঁদছে মেয়েটা। ভাগ্যিস শিমু ঠিক সময় খবর দিয়ে নিয়ে এসেছিল, না হয় কী হতো কে জানে?

জিসান রাস্তার আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোক গুলোর দিকে একবার তাকাল। ধিক্কার জানাল তাদেরকে। একটা মেয়ে তাদের সামনে বিপদে পড়েছে, মেয়েটাকে না আগলে তারা মজা লুটছে!

মফস্বল শহরে এই জাতীয় ঘটনা রটতে খুব একটা সময় লাগে না। যেটুকু ঘটেছে সেটুকুর সাথে আরো ময়মসলা লাগিয়ে একজন আরেকজনের কাছে বলে বেড়ায়। কাজলের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটা হয়েছে। আংটি বদলের অনুষ্ঠানে আজ যখন অনয়দের বাড়ি থেকে সবাই এসেছে তখনই রাস্তাঘাট থেকে বহু কু'কথা শুনে এসেছে। সবাই জিজ্ঞেস করছে, শুনে আসা ঘটনাটা সত্যি কিনা! অনয় তো কাজলের সাথে দেখাও করতে চেয়েছিল কিন্তু কাজল মানা করে দিছে। এতো অপবাদ নিয়ে সে তার হবু শ্বশুরবাড়ির মানুষদের সামনে গিয়ে মুখ তুলে দাঁড়াতে পারবেনা।

একদিকে অনুষ্ঠান শুরুর আমেজ, আর একদিকে খন্দকার বাড়ির মানুষদের হাহাকার, মুহূর্তেই যেন পরিবেশটাকে ভারী করে তুলল।

এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে জীবনটাকে বেশ কঠিন মনে হচ্ছে কাজলের। সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। এরপর কি তাকে 'কলঙ্কিনী' উপাধি নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে? কিন্তু এমন কিছু তো আদৌ হয় নাই।

এসব ভাবতেই নিঃশ্বাস আটকে আসছে কাজলের। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দুটো পরখ করে নিল। ওই নোংরা ছেলেটার নখের দাগ হাতে দেবে গেছে। আজকের মুহূর্তটা সে যতবার ভুলে যেতে চাইবে ততবারই এই দাগটা তাকে মনে করিয়ে দেবে নির্মম সত্যটা।

এই মুখ নিয়ে বাবার সামনে কী করে দাঁড়াবে সে? কী করে দাঁড়াবে সে অনয়ের সামনে? সে যে অনয়কে একটু একটু করে ভালবাসতে শুরু করেছে! এতকিছুর পর কী তারা আর কখনো তাকে মেনে নিবে?

অনয় যদি তাকে ছেড়ে চলে যায়? ছেড়ে চলে গেলেই বা দোষ কী দেবে? এটাতো অস্বাভাবিক না।

যে মেয়ের কিছু দিন পর তার বউ হওয়ার কথা ছিল, তার চরিত্রে তো কলঙ্কের দাগ লেগে গেছে। অনয় ছেড়ে চলে গেলে সত্যিই প্রতীকের উদ্দেশ্যে সফল হবে।

অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগমুহূর্তে অনয়সহ, তার মা এবং আত্মীয় স্বজনরা কাজলের সাথে দেখা করতে এলেন। উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন প্রতিবেশীও।

তাদের সামনে অনয়ের এক আত্মীয় হুট করে বলে বসল, "এত কিছুর পরও এই বাড়ির মেয়ের সাথে তো আর সম্বন্ধ রাখা যায় না? কে জানে এর চরিত্রের মধ্যেও ঘাপলা আছে কিনা?"

অবাক হলো উপস্থিত সবাই। এমনটা কেউ আশা করেনি। কথাটা শ্রবণ করা মাত্রই জয়ীতার চোখ পানিতে টলমল করে উঠল।

ভদ্রমহিলা ফের বললেন, "দুই জোড়া বিয়েই ভেঙ্গে দেওয়া হবে।"

প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ একজন এগিয়ে এসে বলল, "ঠিকই তো। এরপর আর এই দুই মেয়ের বিয়ে কেমনে হবে আল্লাহ ভালো জানে? বড়টার তো তাও সম্ভাবনা আছে। ছোটটার তো বাহিরে মুখ দেখানোই মুশকিল। এই মেয়েটার জন্য জয়ীতার কপালটা পুড়ল।"

কাজলের মা এগিয়ে এসে বললেন, "আপনারা এসব কথা কেন বলতেছেন? আমার কাজলের কি দোষ এখানে?"

"হুহ। দোষ নাকি আবার ব্যাখ্যা করে দিতে হবে? একহাতে কখনো তালি বাজে? এই বাড়িতে এত এত মেয়ে থাকতে আপনার মেয়ের দিকে কেন চোখ তুলল? আসলে চরিত্রে যে দোষ আছে।"

কাজলকে কেন্দ্র করে এত কথা হয়ে যাচ্ছে, অথচ অনয় একদম নিশ্চুপ। ভালো মন্দ কিছুই বলছে না। কাজল আড়চোখে একবার ওর দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়েছে। ওই চোখে চোখ রাখার সাহস তার নেই।

আজ যেটাই হোক না কেন সে তার জন্য প্রস্তুত আছে। কিন্তু সাদাব আর জয়ীতার বিয়েটা সে কিছুতেই ভাঙতে দেবে না।

সবাই যখন তর্ক বিতর্ক করছিল, তখন সে করুণ কন্ঠে বলল, "আমার জন্য প্লিজ সাদাব ভাইয়া আর জয়ীতা আপুর বিয়েটা ভাঙবেন না। এখানে ওদের তো কোন দোষ নেই।"

সবাই চোখ তুলে তাকাল কাজলের দিকে। সাদাব স্পষ্ট কণ্ঠে বলল, "বিয়ে জিনিসটা ছেলে খেলা নয়। বিয়ে হবে না কিসের জন্য? বিয়ে অবশ্যই হবে।"

আক্ষেপের মধ্যেও আত্মতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল উপস্থিত কয়েকজনের মধ্যে।

প্রতিবেশীরা সবাই আরো কয়েকজন নানান কথা বলে গেলেন। তারা সমস্ত দোষ কাজলের উপর চাপিয়ে দিল।

তারপর বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা।

রাবেয়া কাজলের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, "তুমি চিন্তা করো না মা, সব ঠিক হয়ে যাবে। সাদাব আর জয়ীতার বিয়েটা যেমন হবে তোমার আর অনয়ের বিয়েও হবে এবং খুব শীঘ্রই। আজকে যা কিছু হলো এখানে তো তোমার কোন দোষ নাই। ভুক্তভোগী তুমি। মানুষজনের কাজই হচ্ছে কথা শোনানো। তারা কথা বলবেই। তুমি ভেঙ্গে পড়ো না। আমার ছেলের সাথেই তোমার বিয়ে হবে। আমি আছি তো।"

রাবেয়া বেগমের কথায় কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠল জয়ার বাবা-মায়ের চোখে মুখে।

কিন্তু অনয়? অনয় কী রাজি হবে আদৌ?

এত কথার মধ্যেও সে কোন কথা বলে নাই। শুধুমাত্র সবাইকে অবাক করে দিয়েছে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

তারপর গোটা দুইটা দিন পার হয়ে গেলেও তার আর কোন খোঁজ পাওয়া গেল না।

গেল দুইটা দিন কেটেছে প্রচুর অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে। অনয় তার বাড়ির কারো সাথেও কোনোরূপ যোগাযোগ করেনি।

কাজল সব ভাবনা-চিন্তা বাদ দিয়েছে। যে মানুষটা ভালোবাসে শেখাল, সে মানুষটা শেষ পর্যন্ত থাকল কই?

সে নিজেও স্বাভাবিক হতে পারছে না। খুব বড় একটা ঝড় বয়ে গেছে তার ওপর দিয়ে, এমন সময় অল্পতেই স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব নয়। তার মধ্যে অনয়ের খোঁজ নেই, তার নিখোঁজ হওয়ার পিছনে বারবার নিজের অপরাধবোধ কাজ করছে। অনয়ের একটা খোঁজ পাওয়া গেলে অন্তত মনকে বুঝ তো দিতে পারত।

তিন দিনের মাথায়, বিকেলের দিকে ছাদে এলো কাজল হাওয়া খেতে। ওই ঘটনার পর বাইরে বের হয় না। গতকাল একটু বের হতেই মানুষজন কেমন জানি করে দেখছিল তাকে! শেষমেষ অস্বস্তিতে পড়ে বাড়ি ফিরে এসেছিল।

গায়ে হাওয়া মাখতে মাখতে অতীতের স্মৃতিচারণ করছিল সে। ডুব দিয়েছিল অনয়ের ভাবনায়। মনে পড়ে গেল আগের কাটানো সেই মুহূর্তগুলো। এই দুঃখের সময় সুখের স্মৃতি গুলো মনে পড়ে যাওয়ার মতো কষ্ট বোধহয় পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই!

এমন সময় কেউ পেছন থেকে মৌন কণ্ঠে ডেকে উঠল, "কাজল!"

চিরচেনা কন্ঠে বুক কেঁপে উঠল কাজলের। সে পেছন ফিরে তাকাল। অনয় দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি।

সূর্য তখন প্রায় ডুবতে বসেছে, সূর্যের মৃদু আবছা আলো অনয়ের সারা শরীরে ঠিকরে পড়ছে।

অনয়কে দেখে মোটেও অবাক হলো না কাজল। ভেবে নিল, এটা হয়তো কোন স্বপ্ন। নির্মম, মিথ্যা, ভিত্তিহীন একটা স্বপ্ন!

কাজলকে চুপ থাকতে দেখে অনয় ফের প্রশ্ন করল, "কি হলো, কথা বলবে না আমার সাথে?"

এইবার ভীষণ রকমের অবাক হলো সে। স্বপ্ন তো কখনো এত স্পষ্ট হয় না। আর এমন ভর সন্ধ্যায় সে কী করে স্বপ্ন দেখবে?

বেশ অবাক হয়ে উত্তর দিলো কাজল, "তুমি?"

অনয় এগিয়ে এসে হাসিমুখে বলল, "হ্যাঁ আমি। চিনতে পারছ না? দুই দিনের মধ্যে আবার ভুলে গেলে নাকি?"

"তুমি? কিভাবে সম্ভব? এই দুইদিন কোথায় ছিলে?" বেশ অস্থির ভঙ্গিতে বলল কাজল।

অনয় ছাদের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে বলল, "ছিলাম কোথাও একটা!"

"কোথায়?"

"যে তোমার এমন অবস্থা করে কাপুরুষের মতো পালিয়ে গিয়েছে, তাকে কী এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া যায় বলো? কিছু বোনাস তো দিতেই হয়। সেখানেই ব্যস্ত ছিলাম দুই দিন। কিন্তু তোমার একি হাল করেছ? চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। আরো শুকিয়ে গেছো। ব্যাপার কি, হুমমম? আমার চিন্তায় চিন্তায় নাকি?"

কাজল অনয়ের কথায় বেশ অবাক হল। সে এমনভাবে কথা বলছে মনে হয় কিছুই যেন হয় নাই। সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক!

কাজল সরাসরি অনয়কে প্রশ্ন করল, "প্রতীক কোথায়?"

ভাবলেশহীন মুখে অনয় উত্তর দিল, "যেখানে থাকার কথা সেখানেই আছে।"

"সেটাই জিজ্ঞাসা করছি আমি, কোথায় আছে সে?"

"সে এখন কারাবাস করছে।"

অবাকের শেষ সীমানায় পৌঁছে জয়া বলল, "কীহ?"

তারপর সে অনয়ের দিকে তাকিয়ে শাসনের ভঙ্গিতে বলল, "তুমি জানো বাসায় আপনার মা কতটা চিন্তায় ছিল আপনাকে নিয়ে? যাও, এখন বাড়ি যাও। বাড়ি গিয়ে তোমার মাকে শান্ত করো।"

"মা, বাবা, সবার সাথে দেখা করেই এখানে আসছি আমি।" হেসে বলল অনয়।

তারপর কাজলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, "আচ্ছা তুমি আমায় মিস করনি একটুও?"

কাজল 'হ্যাঁ' বলতে গিয়েও থেমে গেল। এখন সমস্ত দুর্বলতা কাটাতেই হবে। কোন দুর্বলতা প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

সে চোখ মুখ শক্ত করে বলল, "না, মিস কেন করব?"

অনয় কিঞ্চিত হেসে বলল, "তুমি কি জানো আর মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে আমরা স্বামী-স্ত্রী হবো!"

ব্যাপক বিস্মিত হলো কজল। কী বলছে এই ছেলে?

কণ্ঠে বিস্ময়ের রেশ টেনে বলল, "মানে কি? দুই দিনের মধ্যে আমরা স্বামী-স্ত্রী হবো মানে?"

"দুইদিন পর আমাদের বিয়ে। সাদাব ভাইয়ার বিয়ের আগেই।"

কাজলের উদ্বেগ মিশ্রিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে?"

"দুই পরিবার মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।"

"দয়া করে বিয়েটা ভেঙে দেবে। আমি রাজি না এই বিয়েতে।"

"এই কথা কেন বলছ? রাজি হবে না কেন?"

"এত কথা জিজ্ঞাসা করো না। তুমি বিয়েটা ভেঙে দাও। আমি তোমার যোগ্য নই।"

"কেন যোগ্য না? ওই প্রতীকের জন্য? ভুলে যাও কাজল এসব। যে অতীত এত কষ্ট দেয় সেই অতীত মনে রেখে লাভ কি?"

"যেই অতীত আমাকে কলঙ্কিত করেছে সেই অতীত ভুলে যাব কী করে, বলতে পারো? উত্তর আছে কোন তোমার? সমাজ আমাকে কলঙ্কিত হিসেবেই কিন্তু আখ্যায়িত করে দিয়েছে।"

"সমাজের কথা কেন ভাবছ? বিয়েটা তোমার আর আমার। এখানে আর দশজন/পাঁচজন মানুষ কোথা থেকে আসবে?"

"ভাবতে হয় এসব। সব সময় কী নিজের দিকটা দেখলেই চলে? সমাজে থাকি, সেই হিসেবেও তো একটা দায়িত্ব কর্তব্য আছে?"

"এখানে দায়িত্ব কর্তব্যের কথা কোথা থেকে আসছে? তোমাকে সেদিন যে কথাগুলো বলছে, তুমি আজও ধরে রাখছ?"

কাজল নিষ্প্রাণ গলায় বলল, "কাজলের সারা গায়ে যে কালো কালি লেপ্টে গেছে। মেনে নিতে পারবে না তুমি।"

অনয় এগিয়ে এসে কাজলের দুহাত ধরে বলল, "আমি কাজলকে ভালোবেসেছি। আর কাজলের রং তো কালোই হয় তাই না? তবে বলো কেন মানতে পারব না?"

"আমাকে বিয়ে করলে তোমার মান সম্মান অবশিষ্ট থাকবে কিছু? এমনিতেই লোকে আমায় দু-চার কথা শুনিয়ে দেয়। তারপর তোমাকে বিয়ে করলে তোমাকেও শোনাবে।"

"আমি কি তাদের খাই না পড়ি, যে তাদের কথা শুনব?"

কাজলের আর অনয়ের কথার জবাব দিতে ইচ্ছে করল না। তার যুক্তির কাছে কাজলের প্রতিটা যুক্তিই ক্ষয়ে যাচ্ছে।

এতকিছুর পরেও মানুষের মুখ তো আর থেমে থাকছে না। সেদিন অনয় যখন কাজলদের বাসা থেকে চলে যাবে, তার সাথে মেইনগেট পর্যন্ত কাজলও আসছিল। দুজনকে একসাথে দেখে পাশের বাড়ির এক ভদ্র মহিলা বললেন, "অবশেষে তোমাদের বিয়ের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত হল?"

কাজল কিছু বলার আগে অনয় উত্তর দিল, "আমাদের বিয়েটা হচ্ছে আন্টি।"

সামনে থাকা মহিলাটি অবাক হয়ে বললেন, "এমন দুশ্চরিত্রা মেয়েকে কেন বিয়ে করছ বাবা? তোমার জন্য কি পাত্রীর অভাব পড়বে নাকি? চাল চরিত্রের ঠিক নাই এই মেয়ের?"

"সেটা তো আপনার দেখার বিষয় নয় আন্টি। আমি আপনার ছেলে বা কোন নিকটাত্মীয় নই, যে আপনি আমায় আদেশ করবেন বা এই ধরনের কোনো উপদেশ দেবেন।"

"হ্যাঁ। আজকালকার ছেলেমেয়েদের ওই ঢং। তোমার ভালোর জন্যই বলেছি বুঝেছ। নিজের ভালো তো পাগলেও বোঝে।"

মুচকি হেসে অনয় বলল, "আমি তো পাগল না, তাই নিজের ভালো বুঝিনা।"

ভদ্রমহিলা মুখ বাঁকালেন।

অনয় ফের বলল, "সেদিন আপনারাই বলেছিলেন না, ছোটটার জন্য বড়টার কপাল পুড়ল। অথচ দুইজনের বিয়েই কিন্তু ঠিকঠাক আছে। যাদের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তাদের সাথেই। দয়া করে আপনারা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলান। সেদিন যা হয়েছিল সেটা সম্পূর্ণ একটা দুর্ঘটনা। এখানে কাজলের কি দোষ? প্রতীক যদি আপনার মেয়ের সাথে এই একই ঘটনাটা ঘটাত, তখন কী করতেন আপনি? নিজের মেয়েকে দুশ্চরিত্রা বলে সরিয়ে দিতেন, নাকি কেটেকুটে নদীর জলে ভাসিয়ে দিতেন? কোনটাই করতে পারতেন না। কারণ, সে তো আপনার নিজের মেয়ে। আর পরের মেয়ের সম্বন্ধে সামান্য কিছু শুনলেই শুরু হয়ে যায় আপনাদের ছুখছুখানি স্বভাব। নিজের বেলায় ভালো বিচারক হতে পারেন আপনারা।"

মহিলা অবাক হয়ে বেশ কিছুক্ষণ অনয়ের দিকে বললেন, "তুমি হয়তো ঠিক কথাই বলেছ। তবে এটাও ঠিক যে এক হাতে তালি বাজে না। নিশ্চয়ই কাজলেরও কোন দোষ ছিল, যে কারণে প্রতীক এত সাহস পেয়েছে।"

"হ্যাঁ, অবশ্যই কাজলের দোষ ছিল। এটা তো আর অস্বীকার করা যাবে না। সে প্রতীকের কথাটা কাউকে বলে নাই, এটাই তার প্রধান এবং একমাত্র দোষ। এরপর আর কোন দোষ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।"

ভদ্রমহিলা অনয়ের কথায় অনুতাপের সুরে বললেন, "যাই হোক, আমিও সেদিন অনেক কথা বলেছিলাম। আমাকে তোমরা মাফ করে দিও।"

তারপর কাজলের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, "আমার ঘরেও তোমার বয়সি একটা মেয়ে আছে, ভুলটা মাত্র ভেঙেছে। যদি পারো তাহলে মাফ করে দিও। আর তোমাদের দুজনের জন্য শুভকামনা রইল। তুমি অনেক ভাগ্যবতী, অনয়ের মতো এমন একজন মানুষ জীবনে পেতে চলেছ!"

কাজল উত্তরে হাসল। ওই মহিলাটি চলে যাওয়ার পর অনয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "বিয়েটা আপাতত স্থগিত করার ব্যবস্থা কর।"

অনয় অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, "আবার কেন?"

"কারণ আছে। আমি বাবার সাথে কথা বলব।"

"আচ্ছা ঠিক আছে। যা ভালো বোঝো। বিয়েটা স্থগিত থাকবে, কিন্তু ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা করোনা। তাহলে কিন্তু বাসা থেকে তুলে নিয়ে বিয়ে করব।" কিছুটা হুমকি দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল অনয়।

কাজল হাসতে হাসতে বলল, "আচ্ছা করব না।"

কাজল তার বাবার কাছে বলে বিয়ের ডেট পেছানোর ব্যবস্থা করল। কাজলের কারণেই তারা তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সে জানাল তার কিছুদিন সময় দরকার।

অনয় সেদিন কজলকে জিজ্ঞাসা করল, "হঠাৎ করে বিয়েতে না বললে কেন? বিয়েটা হয়ে গেলে কত ভালো হতো। সারাদিন তোমাকে আমার চোখের সামনে বসিয়ে রাখতাম।"

"আগে এই অগোছালো ছেলেটাকে গোছালো করব। ছাগলটাকে মানুষে পরিণত করব। তারপর বিয়ে। এর আগে যদি একবারও বিয়ের না মুখে নিয়েছ মেরে ঠ্যাং ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিব বলে দিলাম!"

অনয় অসহায় চোখ মুখ করে বলল, "বাবারে বাবা, এখনই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে বউ হলে কি হবে?"

"সেটা বউ হলেই দেখতে পাবে!"

অনয় মুচকি হাসল। কাজল অনয়ের হাসি দেখে বলল, "আমি তোমার বউ হলে বুঝি তুমি খুব খুশি হবে?"

"একবার হয়েই দেখ না!"

"তোমার কাছে বোধহয় সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকলেও এই ঋণ শোধ হবেনা।"

"কিসের ঋণ?"

"এইতো এত কিছুর পরেও তুমি আমায় ভালোবাসো!"

"আমি জানিনা, বারবার তুমি এই কথাগুলো কী জন্য বলো? আমি কিন্তু এই বেলায় মিথ্যা প্রেমের অভিনয় করতে আসিনি, তোমার মাঝে যাই থাকুক না কেন আমার তো কোন আপত্তি নেই। আমি তো তোমাকে ভালোবাসি! নিজের মতো করে ঠিকই গুছিয়ে নিতে পারব। তোমার খুঁত বা ভুল থাকতেই পারে। খুঁত ছাড়া কি মানুষ হয় বলো? পরবর্তিতে যদি তুমি এসব কথা আবার তোলো, আই প্রমিস তোমারে আমি সোজা তুলে নিয়ে বিয়ে করে ফেলব।"

কাজল হেসে ফেলল। অনেকদিন পর সে এরকম প্রাণ খোলা হাসি হাসল।

সময় কেটে যায় সময়ের নিয়মে। সেই নিয়ম অনুসারে আজ তাদের বিয়ে। সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছাড়িয়ে কাজল এবং অনয়ের বিয়ে। শুধু কাজল এবং অনয় নয়, সাদাব এবং জয়ীতারও বিয়ে আজকে। দুই জোড়া দিয়ে একসাথে দেওয়ার খুব শখ ছিল দুই পরিবারেরই।

সকাল থেকেই অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। বিয়ে পড়ানোর পর অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত বারোটা পার হয়ে গেছে।

বিয়ে শেষ হতেই স্নিগ্ধ হাসি হেসে অনয় কাজলকে উদ্দেশ্য করে বলল, "আমার মনের মন্দিরে আপনাকে স্বাগতম ম্যাডাম!"

হাসিটুকু ফেরত দিয়ে কাজল স্বাগতিক্ত করল, "আর আমাকে ভালোবাসার চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমি তোমার মনেরও মন্দিরে আজীবন ভালোবাসার বীজ বপন করে যাব।"

অনয় আর কাজল সরাসরি বাসর ঘরে ঢুকল না। দুই কাপ কফি নিয়ে ছাদে চলে এলো। আজকে যে জ্যোৎস্না রাত! গল্প করা যাবে জম্পেশ!

রাফি জয়ার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, "তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি নয়'শ নিরানব্বই বার মরে যেতে পারি সেটা কি জানো?"

"তাই?"

"হ্যাঁ। এরপর রাতে তুমিই শুধু প্রতিদিন ঘুমাবে। আমি কখনোই ঘুমাব না। জেগে জেগে তোমার ঘুমন্ত তুমিকে দেখব।"

"ইশশশ, ঢং!" লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল কাজল।

"আমি কই ঢং করলাম? ঢং এর আস্ত একটা ডিব্বা তো আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে!" কাজলের চোখে চোখ রেখে বলল অনয়।

"আমি ঢং এর ডিব্বা?" ভুরু কুঁচকে বলল কাজল!

এরপর বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা। একটা সময় পর নীরবতা ভেঙ্গে অনয় ভীষণ অনুরোধের সুরে কাজলকে বলল, "একটাবার জড়িয়ে ধরার অনুমতি দিবে কাজল?"

হুহু করে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। কাঁচা ফুলের মিষ্টি ঘ্রান ভেসে আসছে কোথাও থেকে। অনয়ের কথা শুনে কাজলের ভিতরটা জড়িয়ে গেল। কেমন আকুলিবিকুলি অনুভূতি হচ্ছে সমস্ত শরীর জুড়ে! সে নতমস্তকে বলে, "অনুমতি নিতে হবে না।"

অনয় খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরল কাজলকে।

সাক্ষী থাক আকাশ, সাক্ষী থাক বাতাস, সাক্ষী থাকুক আজকের এই নিস্তব্ধ রাত! সাক্ষী থাক চাঁদ, সাক্ষী থাক সবাই এই মিষ্টি প্রেমের বাঁধনের রাতের। কত কিছু বদলে গেছে তাই না? যে কাজল একটা সময় অনয়কে পছন্দই করত না, সে এখন নিজে এসে ধরা দিয়েছে। আজ দুজনের মধ্যে কোন দূরত্ব নেই, কমতি নেই ভালোবাসার। আজ দুটি প্রাণ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। সূচনা হয়েছে আরেকটি পবিত্র প্রেম কাহিনীর!

কথায় আছে না, সময় এবং স্রোত কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সময় সময়ের মতো বহমান।

অনয় আর কাজলের জীবনে অনেকটা সময় প্রবাহিত হয়ে গেছে ওদের বিবাহিত জীবনের। তারা সুখে আছে।

অনয় প্রতিদিন একটা চিরকুট খুব সযত্নে কাজলের জন্য রেখে যায়।

"আমি না থাকার সময় টুকুর মধ্যে যা খুশি করে নাও প্রিয়, আমি সামনে থাকলে কিন্তু আর কিছুই করতে পারবে না। জ্বালাব, বলে দিলাম।"

সে বাসায় ফেরার সময় প্রতিদিন নিয়ম করে দুটি লাল টুকটুকে গোলাপ নিয়ে আসে তার লাল টুকটুকে বউয়ের জন্য। বউ তো সেই গোলাপ পেয়ে মহা আনন্দে নাচে। প্রতিদিন গোলাপ গুলোকে ডায়েরির ভাঁজে ভাঁজে রেখে দেয়, একদিন সবগুলো একসাথে করে অনয়কে চমকে দেবে বলে!

জীবনটা তার কাছে এখন অদ্ভুত রকমের সুন্দর! এইতো, কয়েকদিন আগে পর্যন্ত বিষাক্ত লাগত এই জীবনটাকে। কে জানত, অনয় আসায় জীবনের এরকম পরিবর্তন ঘটবে? তাহলে তো বোধহয় বেশ আয়োজন করে অনয়কে অনেক আগেই আগমন জানাতো!

কাজল সেদিন অনয়কে বলল, "ভাগ্যিস তুমি সেদিন এসেছিলে, না হলে তো তোমার ভালোবাসাটা আমার পাওয়া হতো না। সেদিন এসেছিলে বিধায় আজ আমার জীবনটা এত সুন্দর!"

অনয় খুব সন্তপর্নে কাজলের কপালে ভালোবাসার পরশ এঁকে দেয়।

সত্যিকারের ভালোবাসা হলো এটা। যেটা কোন কিছুকেই পরোয়া করে না। যে ভালবাসায় কোন স্বার্থ থাকে না, নিঃস্বার্থভাবে একে অপরকে ভালবাসতে পারে, বুঝতে পারে। যে ভালোবাসা বারবার, হাজারবার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দিতে পারে! সেই ভালোবাসাটাই অসম্ভব সুন্দর!

বেঁচে থাকুক এমন ভালোবাসা, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।

বিজ্ঞাপন