তোমার মনেরও মন্দিরে

পর্ব - ২

তোমার মনেরও মন্দিরে বাংলা গল্প - লেখিকা আফিয়া আফরিন

অবশেষে শত দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও দুই পরিবারের ইচ্ছায় অনয় আর কাজলের বিয়ে ঠিক করা হলো। যদিও কাজল প্রচুর গাইগুঁই করছিল, তাই দুজনকে জন্য সময় দেওয়া হলো একে অপরকে বোঝার জন্য।

কোনো এক বিকেলের দিকে কাজল আর তার বান্ধবী ফারিহা হাঁটতে বের হলো চৌরাস্তার মোড়ে। দু'জনে ফুচকা খেতে খেতে গল্প করছিল। অধিকাংশ গল্পই ছিল অনয়কে কেন্দ্র করে।

ফারিহা এক পর্যায়ে বলে উঠল, "তুই দেখেই অনয়ের মতো ছেলেকে বিয়ে করতে কেমন দোনোমনো করছিস। ইশ, আমি হলে তো প্রথম দেখায় এক পায়ে রাজি হয়ে যেতাম। কী মিষ্টি দেখতে ছেলেটা, গায়ের রংটাও ঠিকঠাক। আগাগোড়া পুরোটাই জোস।"

"তাহলে তুই বিয়ে করে নে। আমি বেঁচে যাই।"

"থাক বোন, তোর জিনিস আমি নিব না। তোর অনয় তোরই থাক।"

"হুহ।" মুখ ঝামটা দিয়ে বলল কাজল।

এমন সময় পেছন থেকে একটা পুরুষালী কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "কার জিনিস নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এখানে?"

কাজল আর ফারিহা দুজনেই ঘুরে তাকাল। দেখল প্রতীক দাঁড়িয়ে আছে পেছনে। প্রতীককে দেখামাত্রই বিরক্ত হলো কাজল। এই ছেলেটা রাস্তায় বের হতে না হতেই হুট করে উদয় হয় সামনে। প্রতীক পুনরায় কাজলের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল, "বললে না?"

কাজল বলল, "সেটা তোমায় বলতে বাধ্য নই।"

প্রতীক এগিয়ে এসে অনুরোধের সুরে বলল, "কাজল, প্লিজ একসেপ্ট মাই প্রপোজাল।"

"তোমাকে বলেছি না, তোমার মতো ফালতু লম্পট ছেলের প্রপোজাল আমি কখনোই একসেপ্ট করব না। বারবার বলি তোমায়, বাংলা কথা বোঝনা।"

অপ্রতিরোধ্য মেজাজে চেঁচিয়ে বলল কাজল। ফারিহা এগিয়ে এসে তাকে থামাল।

প্রতীক ঠোঁটের কোণে ক্রুদ্ধ হাসি ঝুলিয়ে বলল, "তুমি নাই মানতে পারো। কিন্তু তোমাকে যে কোনো মূল্যে আমার যে লাগবেই। যে কোন মূল্য মানে, যে কোন মূল্যেই! তুমি ভাবতেও পারবেনা কতটা রেয়ার হতে পারি তোমার জন্য।"

এটুকু বলেই প্রতীক চলে গেল।

কাজল ফারিহার দিকে তাকিয়ে বলল, "দেখলি সাহস দেখলি। অসভ্য ছেলে কোথাকার। বেয়াদব একটা। ওর জন্য শান্তিমত ঘরের বাইরে পা রাখতে পারি না। অসহ্য।"

রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ির পথে চলল কাজল। বাসায় এসেও রাগ পড়েনি। চুপচাপ রুমে দরজা আটকিয়ে শুয়েছিল।

.

.

অনয় মাঝে মাঝে ফোন দেয় কাজলকে। কাজল তার সাথে খাপছাড়া ব্যবহার করে, কথাও বলে খুব অল্প। অনয়কেও মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে তার। ছেলেটার প্রধান এবং একমাত্র সমস্যা হলো সে খুব বেশি কথা বলে। এতটাই কথা বলে যে, মানুষের একদম পাগল হয়ে যাওয়ার জোগাড়। কাজল সামান্য একটু রাগ বা মন খারাপ করলে উতলা হয়ে যায় কিভাবে রাগ ভাঙ্গানো যায় সেটা নিয়ে!

মাঝে মাঝে কাজল নিজের মনেই হাসে, এই ছেলেটা এমন পাগল কী জন্য? একটুতেই কেমন যেন খুব অস্থির হয়ে পড়ে।

কাজল খুব করে খেয়াল করে দেখেছে, অনয় কখনো রাগ করে না। যেকোনো অবস্থাতেই সে নির্বিকার, শান্তশিষ্ট ধাঁচের। এমন প্রাণবন্ত ছেলে খুব কম দেখা যায়। অথচ কাজল তার পুরোটাই উল্টো। সে অল্পতেই রেগে যায়, কিছু হতে না হতেই মন খারাপ।

একদিন তো অনয়ের সাথে দেখা করার কথা ছিল কাজলের। সে আসতে আসতে পাক্কা তিরিশ মিনিট দেরি করেছিল। কাজল রেগে মেগে আগুন হয়ে গিয়েছে।

অনয়কে দেখা মাত্রই প্রশ্ন ছুড়ে মারল, "কোন গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে গিয়ে এত দেরি হল?"

অনয় মোটেও রাগ করল না। কাজল নিজের মত করে আরো অনেক কথা বলে গেল। অনয় চুপচাপ শুনে গেল এবং কাজলকে আশ্বস্ত করল, পরবর্তীতে আর

কখনোই এমন হবে না। দরকার হলে কাজল আসার এক ঘণ্টা আগে থেকে সে এসে বসে থাকবে।

তবুও কাজল মানে না। মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে। কেন যেন অনয়ের সাথে এই অকারণ অভিমানগুলো তার খুব ভালো লাগে। এতে সে ভীষণ রকমের স্বস্তি পায়!

অনয় সেইবার অনেক অনুনয়-বিনয় করে, কান ধরে কাজলকে মানিয়ে ছিল।

সেইদিন অনয়ের রাগ ভাঙ্গানোর ব্যাপারটা বেশ লেগেছে কাজলের। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যতবার অনয়ের সাথে দেখা হবে ততবার সে অকারণ অভিমান করবে আর অনয় কায়দা করে তার রাগ ভাঙ্গাবে।

অনয়ের প্রতি ধীরে ধীরে ভালোলাগাটা কাজ করতে শুরু করেছে। কিন্তু অনয়ের কাজকর্মগুলো তাকে বেশ ভাবায়। সে যেমন চঞ্চল, সেইরকমই আবার প্রয়োজনের তুলনায় বেশ শান্তশিষ্ট, চুপচাপ। মনের মধ্যে কখন যে কী চলে তা সহজে ধরা যায় না।

ছেলেটা যেমন নিজেকে প্রকাশ করে, আবার সেরকম কিছু কিছু সময় নিজেকে আড়ালে অন্ধকারে গুটিয়ে রাখে। তখন হাজার চেষ্টা করলেও তার মনের খবর জানতে পারা যায় না।

আর কাজল যেটাই করবে, প্রকাশ্যে। একটুতেই বাড়াবাড়ি পর্যায়ের রাগারাগি, অকারণে যেটা পায় সেটাই ছুড়াছুড়ি। আবার সামান্য আদরেই মান অভিমান ভেঙে যায়!

ইদানিং প্রতীকের অত্যাচারটা খুব করে বেড়েছে। যেখানেই কাজল, সেখানেই বান্দা এসে হাজির। আপাতত সে প্রতীকের ব্যাপারটা কাউকে জানান দিতে চায় না।

কাজল ভেবেছে, প্রতীকের এই ব্যাপারটা সাময়িক। দুদিন পরে ঠিক হয়ে যাবে।

তাই মা-বাবা বা অনয় কাউকেই জানায়নি। তার এই না জানানোটাই বোধহয় পরবর্তীতে কাল হয়ে দাঁড়ায়। আগেভাগেই সবাইকে জানিয়ে রাখলে পরবর্তীতে সেই বীভৎস পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না কাজলকে।

রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে অনয়কে ফোন করল কাজল। ইদানিং তার সাথে কথা না হলে দিনটা বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সময়টাও কেমন জানি কাটতে চায় না। দীর্ঘদিন যাবৎ একটা মানুষের সাথে চলাফেরা, কথাবার্তার দ্বারা ভালোলাগাটা বোধহয় আপনাআপনি এসে যায়।

কাজলেরও হয়েছে এমন দশা। অনয়ের প্রতি ভালোলাগা উদয় হচ্ছে দিনকে দিন। আর অনয় তো সহজে ভালোলাগার মতনই একজন মানুষ, এক কথায় সে অসাধারণ!

মাঝে মাঝে দুজনে দেখা করে। রিকশা চড়ে শহরতলী ঘুরে বেড়ায়। এমনি করেই চলছে অনয় আর কাজলের সম্পর্ক। এতদিনে দুজন দুজনের কাছ থেকে তুমি সম্বোধনের অধিকারও আয়ত্ত করে নিয়েছে। ভালোলাগা পর্যন্ত তো পৌঁছেই গেছে, কিন্তু

ভালোবাসা পর্যন্ত এখনো হয়তো পৌঁছাতে পারেনি। সেটা তো অনয়ের দায়িত্ব। অনয় তাকে সযত্নে ভীষণ সন্তর্পনে ভালোবাসার চৌকাঠ পযন্ত পৌঁছে দিবে।

.

.

আগামীকাল সাদাব আর জয়ীতার আংটি বদল অনুষ্ঠান। তাই আজ বাড়ির সবাই টুকটাক শপিং করতে বেড়িয়েছে। সন্ধ্যার মধ্যে বাড়ির বাকি সদস্যরা বাড়ি ফিরে এসেছিল। সর্বশেষে বাকি ছিল কাজল আর তার বড় ভাইয়ের বউ শিমু। তাদের শপিং মল থেকে বের হতে হতেই আটটা বেজে গেল।

চৌরাস্তার মোড়ে আসতেই কাজলের হঠাৎ মনে হল কেউ তাদের অনুসরণ করছে। একবার পিছন ফিরে চেয়ে দেখল। নাহ, কেউ নাই।

শিমুর উদ্দেশ্য বলল, "ভাবী তাড়াতাড়ি চলো তো। কেমন মনে হচ্ছে কেউ আমাদের ফলো করছে।"

শিমু আশেপাশে তাকিয়ে বলল, "কই? কাউকে তো দেখতে পাচ্ছি না।"

শিমুর দিকে তাকাতেই আচমকা সামনে পাথরের সাথে বেজে পড়ে যেতে নিলেই কেউ কাজলের হাত ধরে টেনে দেওয়ালের সাথে ঠেসে দিয়ে দাঁড় করাল।

কাজল প্রথমে ঘাবড়ে গেল, চোখ মেলে তাকিয়ে প্রতীককে আবিষ্কার করল সামনে।

তবুও নিজেকে সামলে প্রতীককে দু'হাতে ধাক্কা দিয়ে বলল, "তুমি এখানে? সরো সামনে থেকে আর ছাড়ো আমার হাত।"

প্রতীক কাজলের দুহাত আরো জোরে চেপে ধরে বলল, "ছাড়লাম না। কী করবা?"

কাজল নিজের দুহাত ছাড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। প্রতীকের সাথে এক প্রকার ধস্তাধস্তি বেঁধে গেছে। শিমু এসে সামাল দেবার চেষ্টা করতেই প্রতীক তাকে এক হাত দিয়ে ঠেলে ফেলে দেয়।

প্রতীক ক্রোধমিশ্রিত স্বরে কাজলকে বলে, "তোকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আজ আসি নাই। তুই নাকি আমায় ভালোবাসিস না, এটার শেষ দেখে ছাড়ব আজকে!"

"জোর করে কখনো ভালোবাসা হয় না। ভালোয় ভালোয় বলছি ছেড়ে দাও আমাকে। এর ফল কতটা ভয়ংকর হতে পারে তুমি ভাবতেও পারছ না।"

প্রতীক কাজলের হাত ছেড়ে দিল। লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "অন্য কাউকে বিয়ে করবি তাইনা? বলেছি না তোকে আমি ভালোবাসি। আমার কথা কানে যায় না তোর?'

কাজল একদলা থুতু পাশে ফেলে বলে, "তোমাকে আমি কখনোই ভালোবাসি নাই এবং ভবিষ্যতেও কখনো বাসব না। কথাটা কান খুলে শুনে নাও।"

প্রতীক পুনরায় ক্রুদ্ধ স্বরে বলে, "আমাকে ভালোবাসিস না তাইনা? তোর কোন ধারণা আছে আমি কী করতে পারি তোর সাথে?"

খানিক চেঁচিয়ে উত্তর দেয় কাজল, "নাহ। ভালোবাসি না, ভালোবাসি না, মানে ভালোবাসি না‌। হাজারবার আমায় জিজ্ঞাসা করলেও সেম অ্যানসার আসবে।

তোমার মত জানোয়ারকে আমি ভয় পাই না। যা মন চায় করো। কাপুরুষ কোথাকার!"

"হ্যাঁ। কাপুরুষ আমি। কাপুরুষের কাজটা করলে কেমন হবে বলতো?"

জয়া একবার আশেপাশে তাকাল। এবার তার সত্যি সত্যি ভয় করছে। হৈচৈয়ের শব্দে রাস্তাঘাটে কয়েকজন মানুষজন জমেছে। কিন্তু কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছে না। প্রতীকের মতিগতিও ভালো ঠেকছে না। কেমন যেন চাহনি নিয়ে তাকিয়ে আছে কাজলের দিকে। ওই চাহনিতে কেমন যেন লালসা, কামনা স্পষ্ট!

কাজল মনে মনে সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করছে। এই প্রতীকের মাথা বেশ গরম। কথা বলতে হবে ওর সাথে ঠান্ডা মাথায়।

কাজল নিজেকে বেশ দমিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে বলল, "এখন কোন ঝামেলা করো না প্রতীক। রাস্তা ভর্তি মানুষজন।"

প্রতীক ক্রুদ্ধ হাসি হাসল। ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে বলল, "সো হোয়াট?"

কাজল কিছু বলল না। এই নোংরা ছেলেটার সাথে কথা বলতেই তার রুচিতে বাঁধা পড়ছে।

প্রতীক পুনরায় বক্র হাসি ফুটিয়ে বলল, "আজ যদি তোকে কলঙ্কিত করে দেই, তবুও কি তোর হবু শ্বশুরবাড়ির মানুষজন তোকে হবু বউ হিসেবে আর মানবে?"

কাজল অবাক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে সামনে থাকা একটা হিংস্র জানোয়ারের দিকে।

প্রতীক কাজলের কোন উত্তর না পেয়ে বলল, "বলেছিলাম না, যেকোনো মানে যেকোনো মূল্যেই তোকে আমার চাই।"

কাজল আর কিছু ভাববার আগেই প্রতীক এক হাতে তার ওড়নাটা টেনে ধরল।

.

বিজ্ঞাপন