অপ্রত্যাশিত অনুরাগ

পর্ব - ৩

অপ্রত্যাশিত অনুরাগ বাংলা গল্প - লেখিকা আফরোজা আঁখি

—"ইয়ে...মানে ভাইয়া।তেমন কিছুই নয়।"

কথাটা বলেই মা ডাকছেন এই বাহানায় রুম থেকে বেরিয়ে যায় তুশি।তূর্য হাঁ করে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার যাওয়ার পানে।কি হচ্ছে কিছুই তার ঢুকছেনা এমন অবস্থা!

কলেজ আপাতত অফ আছে।তাই তুশির পুরো দিন কাটছে বাড়িতেই।বিকেলে সে বসে বসে পায়ের নখে নেইল পালিশ লাগাচ্ছিলো তখনই আগমন ঘটে পূর্বের।লোকটার অপ্রত্যাশিত আগমনে তুশি চমকায়।সে কোনোমতে নিজেকে সামলে দৌড়ে পালায় ওখান থেকে।উড়নচণ্ডী মেয়েটার যাওয়ার পানে তাকিয়ে হাসে পূর্ব।খানিকক্ষণ পর তুশি রুম থেকে বেরিয়ে আসে।তূর্য আর পূর্ব গল্প করছিলো।তুশিকে দেখে ওদের আলাদা করে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে তূর্য ওখান থেকে চলে যায়।তুশি পূর্বের সামনে গিয়ে বসে।শান্ত গলায় বলে,

—"এই বিয়েটা হচ্ছেনা!"

পূর্ব প্রতুত্তরে কিছুই বলেনা।বলা চলে তুশিকে সে গুরুত্বই দিচ্ছেনা।তুশির ভিষণ রাগ হয়।আবারও বলে,

—"আপনি তখন মিথ্যা বললেন কেন?আমি কখন বলেছি এ বিয়ে করব?আমি এ বিয়ে করতে চাইছিনা।আমি পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই!"

—"তুমি কি অন্যের পায়ে দাঁড়িয়ে আছো?"

তুশি প্রতুত্তরে কিছু বলতে চাইলেই দেখল ওর আম্মু এসে উপস্থিত হয়েছেন।ভদ্রমহিলাকে দেখানোর জন্য প্রসঙ্গ বদলে অন্য কথা তুলল সে।অতঃপর একরাশ বিরক্তি নিয়ে চলে গেলো।লোকটাকে বোঝানোই হলো না এই দাঁড়ানো সেই দাঁড়ানো নয়।নিজের পায়ে দাঁড়ানো বলতে সে পড়াশোনা করে চাকরি করাকে বুঝিয়েছে।

-

এক সাপ্তাহ পর —-

মানুষের জীবন বড়ই অদ্ভুত। কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে অপছন্দের মানুষটাই সবথেকে কঠিন সময়ে বড় অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। তুশি কখনো ভাবেনি তার জীবনেও এমন কিছু ঘটবে। বিয়ের কথা চূড়ান্ত হওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পর কালবৈশাখী ঝড়ের রাতে তুশির আম্মু হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পুরো বাড়ি তখন নিস্তব্ধ।সকলেই বেশ চিন্তিত বিষয়টা নিয়ে।তূর্য বাড়িতে ছিল না,সে তখন কাজের জন্য বাইরে।তুশির আব্বু নেই।আশেপাশের কারোর সাথেও তেমন বনিবনা নেই।কাছের মানুষগুলো কেউ-ই তখন তাদের আশেপাশে ছিলেন না যে সাহায্য চাইবে।অসুস্থ মাকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে যখন কাঁদছিল মেয়েটা।তখন দেবদূতের মতো এসে হাজির হলো পূর্ব।উপায় না পেয়ে তুশিই তাকে জানিয়েছিলো সবটা।

পূর্ব খবর পেয়ে দ্রুত গাড়ি নিয়ে ছুটে আসে।আম্মুকে পাঁজাকোলা করে গাড়িতে তুলে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বড় বড় ডাক্তারদের সাথে কথা বলা সবটাই সে করেছে একা হাতে।তুশি হাসপাতালের করিডোরে বসে অবাক হয়ে দেখছিল সেই কঠোর হৃদয়ের প্রফেসর মানুষটিকে। যে লোকটা সামান্য ভুলের জন্য ক্লাসে তুশিকে দাঁড় করিয়ে রাখত, সেই লোকটাই আজ তুশির আম্মুর জন্য নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।তুশিকে মেন্টালি সাপোর্ট দিচ্ছে!হাসপাতালে প্রায় ১০ দিন কেটে গেছে।এই ১০ দিনে তুশির পৃথিবীটা আমূল বদলে গেছে।সে লক্ষ্য করেছে পূর্বর দায়িত্ববোধ।রাতের পর রাত পূর্ব হাসপাতালের সোফায় বসে কাটিয়েছে।তুশির সব রকমের খেয়াল রেখেছে।তূর্য কল দিয়ে দুশ্চিন্তা করলে তাকে স্বান্তনা দিয়েছে।একদিন খুব ভোরে তুশি যখন আম্মুর জন্য খাবার নিয়ে হাসপাতালে এলো, দেখল পূর্ব কেবিনের বাইরে বেঞ্চে বসে ল্যাপটপে কী যেন কাজ করছে।চোখ দুটো লাল হয়ে আছে তার। তুশি অপরাধবোধে দগ্ধ হয়ে পাশে গিয়ে দাঁড়াল।নিচু স্বরে বলল,

—"আপনি কি এখনো আমার উপর রেগে আছেন?।"

পূর্ব ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই শান্ত গলায় বলল,

—"রাগবো কেন?"

—"আমি যে সেদিন আপনাকে কতো কি বলে অপমান করলাম।বিয়েটা ভেঙে দিতে চাইলাম।আপনি নিশ্চয়ই রেগে আছেন সেসব শুনে!"

—"তুমি বিয়ে ভেঙে দিতে চাইলেই কি আমি বিয়ে ভাঙতাম?"

ভ্রু নাচিয়ে কথাটি বলে তুশির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে পূর্ব।তুশি কিছু বলছে না দেখে পূর্ব আবারও বলে,

—"তূর্যের সাথে আমার বন্ধুত্ব ভার্সিটি লাইফের শুরু থেকেই।সে হিসেবে ওর প্রাণপ্রিয় বোন অর্থাৎ তুমি সম্পর্কে আমি সবটাই জানতাম।আমি তোমাকে দূর হতে দেখেছি বহুবার।নজরে নজরে রেখেছি যেন কোনো খারাপ ছায়া তোমায় স্পর্শ করতে না পারে।এগুলো কেন করেছি জানো?"

—"কেন?"

—"ভালোবাসি তাই!"

পূর্বের সহজসরল কথা!তুশি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে।মানবের মোহনীয় মুখের হাসিতে বিভোর সে।মনে মনে সেও পূর্বকে পছন্দ করে তবে মুখে তা বলল না।

-

তুশির আম্মু হসপিটাল থেকে বাড়িতে এলেন।বিয়ের তোরজোর শুরু হলো বাড়িতে।একমাত্র বোনের বিয়ে তাই অনুষ্ঠানে কোনোকিছুর কমতি রাখেনি তূর্য।তাদের বাড়ির বিশাল বাগানে বিয়ের আয়োজন করা হলো।বর কনের সাজলো তুশি আর পূর্ব।আজ সব মান,অভিমানের অবশান ঘটলো।নাজিফা মেহরিন তুশি সারাজীবনের মতো প্রফেসর পূর্ব আহনাসের হলো।

স্টেইজে দাঁড়িয়ে আছে তুশি আর তূর্য।দুজনকেই বেশ সুন্দর লাগছে।অতিথিদের নজর ওদের দিয়েই।দূরে দাঁড়িয়ে বান্ধবী আর তার বরকে দেখছে প্রেমা।পাশেই তূর্য।প্রেমা তূর্যকে বলল,

—"তূর্য ভাইয়া,আপনি খেয়াল করেছেন? তুশি আর পূর্ব স্যারকে পাশাপাশি খুব মানিয়েছে!"

তূর্য হুট করেই প্রেমার হাত ধরে বসল।তাও রাগে!প্রেমার চোখের দিকে তাকাল সে।চমকে তাকালো প্রেমাও।কিন্ত তূর্যের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে প্রেমা দমে গেল। তূর্য বলল,

—"আবার ভাইয়া?তোকে কতবার বলেছি আমাকে ভাইয়া ডাকবি না?তুই কি ইচ্ছা করে করিস এটা?"

প্রেমা আমতা আমতা করে বলল,

—"না... আসলে... তুশি ভাইয়া ভাইয়া করে আপনার নামে গল্প শুনাতো তো... তাই অভ্যেস হয়ে গেছে।"

তূর্য এবার প্রেমার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে গম্ভীর গলায় বলল,

—"এই অভ্যেসটা বদলে ফেলো প্রেমা।"

মুচকি হাসে প্রেমা।সে নিচু স্বরে হেসে বলে,

—"এতোটা রেগে যান কেন?"

—"তুমি আমার রাগ সামলাবে বলে!"

—"ভালোবাসেন বুঝি?"

—"অনেক বেশি!"

প্রেমা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।লোকটার ওমন সহজ স্বীকারক্তি সে আশা করেনি বোধহয়।প্রেমা আবারও বলল,

—"ঠিক আছে... কথা দিলাম আমি আপনাকে আর আপনার রাগকে কন্ট্রোল করার দায়িত্ব নিব!তবে তূর্য ভাইয়া... সরি, তূর্য! আপনার এই রাগী চেহারাটা আমার বড্ড প্রিয়।"

তূর্য চমকালো ভিষণ! সে কি ঠিক শুনছে?তার প্রিয়তমা ভালোবাসা গ্রহণ করেছে?তূর্যের ঠোঁটের হাসি প্রশস্ত হলো।প্রেমাকে সে জড়িয়ে ধরল সকলের সামনেই।প্রেমাও মিশটি হেসে হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল যুবকে।অবশেষে সব মেঘ কেটে সুদিন এলো।তুশি আর পূর্ব এক হলো।তুশির আম্মুর অসুস্থতা কমলো। আর তূর্য প্রেমার মধ্যে ভালোবাসার সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হলো।

-

'তুশি অবস্থান করছে পূর্বের বাড়িতে।সকল মেহমানরা আর বাড়ির লোকেরা এক এক করে দেখে যাচ্ছেন নরুন বউকে।সবাই চলে গেলে। লাল টকটকে বেনারসিতে তুশি গিয়ে আয়নার সামনে বসলো।তার মনে পড়ছিল প্রথম দিনের সেই ছাদের কথা।সেদিন সে পূর্বর চশমা ভেঙে দিতে চেয়েছিল,লোকটাকে মনে মনে কতো গালমন্দ করেছে অথচ আজ সে অপেক্ষা করছে পূর্ব কখন রুমে আসবে এইজন্য!

অবশেষে পূর্ব এলো।তুশি উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকালেই দেখলো এক সুদর্শন যুবককে।যে অতি সুদর্শন যুবকটি তুশির বর!তুশি ঘোমটা টানে।চুপচাপ গিয়ে বিছানায় বসে সে।পূর্ব আলতো হেসে এগিয়ে যায় প্রিয় রমণীর দিকে।তুশি ঘোমটার আড়ালে মিটিমিটি হাসছিল।পূর্ব বিছানায় বসে বরাবরের মতো গম্ভীর গলায় বলল,

—"তুমি তো এতোটাও লাজুক নয় তুশি।তাহলে আজ কি হলো?আমায় দেখে লজ্জা পাচ্ছো বুঝি?"

তুশি ঘোমটা সরালো না।বসে রইলো ওভাবেই।পূর্ব এগিয়ে গেলো প্রিয়তমার মুখের উপর থেকে ঘোমটা সরিয়ে অপলক তাকিয়ে রইলো ওর দিকে।তুশির লজ্জা যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেলো।দুইহাত দিয়ে মুখ ঢাকলো সে।ফের হাসলো পূর্ব।চোখের চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে তুশির হাত ধরে কাছে টেনে নিল।কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলল,

—"আচ্ছা...আমার ব্যাপারে তোমার ধারণা কি কিঞ্চিৎ হলেও পালটেছে?হুম... আমি জানি পাল্টেছে।আমি জানতাম পালটাবে।তুমি আমাকে আমার মতোই ভালোবাসবে।আমার ধারণা কতোটুকু সত্য তুশি?তুমি ভালোবাসো আমায়?"

তুশি লজ্জায় পূর্বর বুকে মুখ লুকালো।দুইহাত দিয়ে লোকটাকে জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করে বলল,

—"হ্যাঁ পালটেছে।আমি স্বীকার করছি আমি আপনাকে ভালোবাসি।আপনি আমার জীবনের প্রথমও শেষ ভালোবাসা।আমার শ্রেষ্ঠ পাওয়া।"

পূর্বের ঠোঁটের কোবে প্রশান্তির হাসি।সে তার প্রিয়তমাকে আজ নিজের করে পেয়েছে।পূর্বের মনে হচ্ছে সে পৃথিবী সবথেকে সুখী মানুষটা।আর তুশি ভাবছে পূর্বের অপ্রত্যাশিত আগমন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া।

বিজ্ঞাপন