অপ্রত্যাশিত অনুরাগ

পর্ব - ১

অপ্রত্যাশিত অনুরাগ বাংলা গল্প - লেখিকা আফরোজা আঁখি

'পাত্র হিসেবে নিজের বড় ভাই তূর্যর ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড পূর্ব আহসান-কে দেখে রীতিমতো ভড়কে গেল তুশি।ড্রয়িংরুমের সোফায় আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকতে থাকতে তুশির মনে হলো, পায়ের তলার মাটি যদি এখন দু-ভাগ হয়ে যেতো,তবে সে নির্দ্বিধায় পাতালের কোনো এক কোণে আশ্রয় নিত।

সামনে বসে আছেন তার কলেজের অত্যন্ত কড়া মেজাজের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পূর্ব আহসান।তুশি জানত ভাইয়ার বন্ধু পূর্ব কোনো একটা নামি-দামি কলেজের প্রফেসর।কিন্তু সে যে মাসখানেক আগে তাদেরই কলেজে জয়েন করেছে এবং স্বয়ং তুশিরই টিচার সেটা তুশির কাছে ছিল এক বিরাট বজ্রপাত।গত সপ্তাহেই প্র্যাকটিক্যাল খাতা ঠিকমতো জমা না দেওয়ায় পুরো ক্লাসের সবার সামনে পূর্ব তাকে এমনভাবে অপমান করেছে যে,তুশি রাগে-অপমানে তিনদিন ঠিকমতো ভাত খেতে পারেনি।সেই মানুষটাই আজ তার বিয়ের পাত্র!পূর্ব তাকালো তার বন্ধুর পানে।ওকে বলল,

—"কিরে,তোর বোন এমন রাক্ষুসির মতো লুক নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে কেন?"

তুশি মনে মনে ভাবল—খচ্চর লোকটার কথা শুনো!সবাই আমার চোখের প্রশংসা করে আর উনি কিনা বলছেন রাক্ষুসির মতো তাকিয়ে আছি!' তুশি কোনোমতে হাসি দিয়ে তূর্যর দিকে তাকাল। তূর্য বেশ আয়েশ করে চা খেতে খেতে বলল,

—"আরে তুশির হঠাৎ খুব লজ্জা লেগেছে।ও আসলে কল্পনাই করতে পারেনি যে আজ ওকে দেখতে তুই আসবি।ও তোকে যমের মতো ভয় পেতো।তাই কিঞ্চিৎ বিব্রত হয়েছে!"

পূর্বর মুখে কোনো ভাবান্তর নেই।সে অত্যন্ত বিচক্ষণ মানুষ। তুশির চঞ্চলতা এবং তার ছটফটে স্বভাব পূর্বর বেশ পরিচিত।কলেজের সেই অবাধ্য মেয়েটিকে ঘরের ঘরণী হিসেবে কল্পনা করতে গিয়ে পূর্ব নিজেও কিঞ্চিৎ বিব্রত। তবে বড়দের সামনে সেটা প্রকাশ হতে দেয়না।

এক পর্যায়ে তুশির মা এবং পূর্বর বড় বোন গল্পে মজে গেলে, তূর্যই সুযোগ করে দিল দুজনকে আলাদা কথা বলার।এ যুগের ছেলেমেয়ে বলা কথা।আলাদাভাবে কথাবার্তা বলে নিলেই ভালো হয়!ছাদে গিয়ে তুশি আর পূর্ব মুখোমুখি দাঁড়াল।আকাশে হালকা মেঘ জমেছে।প্রকৃতি কেমন অশান্ত হয়ে আছে।বাতাস বইছে,সেই বাতাসে নাজেহাল অবস্থা তুশির।শাড়ি সামলাতে বেশ হিমশিম খাচ্ছে সে।তুশি আর সহ্য করতে না পেরে ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।মাথার কাপড় সরিয়ে দিয়ে সোজা পূর্বর চোখের দিকে তাকালো।নিজের চঞ্চল রূপে ফিরে এসে বলল,

—"স্যার,আপনি কি ড্রয়িংরুমে নাটক করছিলেন? আপনি তো আমাকে সহ্যই করতে পারেন না।এ কথা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ না জানলেও কলেজের অর্ধেক স্টুডেন্ট ঠিকই জানে।কলেজে তো পারলে আমাকে একবেঞ্চ থেকে অন্যবেঞ্চে ছুড়ে মারেন আপনি।চোখের চাহনি দিয়েই গিলে খান এমন অবস্থা!তবে আজ কেন আমাকে দেখতে আসলেন?শুনুন... এ বিয়ে আমি করতে পারব না।আর যাইহোক নাজিফা মেহরিন তুশি কোনো তিতকরলা মেজাজের লোকের সাথে সংসার করবে না।আপনি এখন নিচে গিয়ে সোজা বলে দেবেন,তুশি মেয়ে হিসেবে সুবিধার না,ওকে আমার পছন্দ হয়নি।ঠিক আছে?"

চোখে পরে থাকা সাদা ফ্রেমের চশমাটা ঠিক করে নিল পূর্ব।তুশির দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আনমনেই হাসল সে।ছাদের রেলিঙে পিঠ ঠেকিয়ে দুই হাত বুকে ভাঁজ করে বলল,

—"তুমি ঠিকই ধরেছো।আমার পছন্দের সাথে তুমি ঠিক যাও না।তবে...."

—"তবে?"

—"তবে আমার বাড়ির প্রত্যেকের বিশেষ করে আম্মার তোমাকে বেশ পছন্দ।উনারা চান বিয়েটা আমি তোমাকেই করি।তাই এ বিয়ে হচ্ছে!তুমি ভেবোনা আমি তোমাকে পছন্দ করি।আর আমি বিয়ে করে নিলে তুমি বেঁচে গেলে বুঝেছ?এ যাত্রায় বিয়েটা হয়ে গেলো।নইলে বিয়ে টিয়ে হচ্ছেনা।তুমি যা উড়নচণ্ডী!কথাবার্তার ঠিক নেই।হাত পায়ের ব্যালেন্স নেই।কে বিয়ে করবে তোমাকে?"

তুশির মেজাজ খারাপ হচ্ছে ক্রমেই।লোকটা চলাকি করে ওর মধ্যে থাকা খুত গুলো ধরিয়ে দিলো।বুঝালো উনি বিয়ে না করলে তুশির এ জন্মে বিয়ে হবেনা!সত্যিই কি তাই?দেখতে সে এতোটাও খারাপ নয়!তাহলে লোকটা এভাবে কথা বলছে কেন?তুশি এক কদম এগোয়।লোকটার চোখের সামনে আঙুল উঁচিয়ে বলে,

—"আপনি কি বুঝালেন আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি।আর শুনুন কি বললেন আপনি?আপনি বিয়ে না করলে আমাকে অন্য কেউ বিয়ে করবেনা?কে বলল এটা?আপনি জানেন সকাল হলেই আমার ফোনে কতো গুলো আইলাভইউ মেসেজ আসে।বাড়ির গেটের সামনে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে সুন্দর সুন্দর ছেলে গুলো।নেহাৎই আমি তাদের পাত্তা দেইনা।নইলে কবেই বিয়ে হয়ে যেতো।তবে এবার আমি পাত্তা দিব।বিয়ে করব সংসার করব আর সবটা সামলেও নিব।আমি দেখে নিবেন!"

কথাটা বলেই চলে যেতে চায় তুশি।পূর্বর নজর গেল তুশির কাঁধের ওপর থেকে ঝুলে পড়া আঁচলটার দিকে। তুশি দ্রুত আঁচল টেনে ঠিক করতে গিয়ে আরও বেশি তালগোল পাকিয়ে ফেলল। ঠিক তখনই বাতাসের ঝাপটায় তুশির চোখের ওপর কিছু চুল এসে পড়ল। বিরক্ত হয়ে তুশি যখন চুল সরাতে যাবে, তখনই তার শাড়ির আঁচলটা পাশের একটি টবের কাঁটায় আটকে গেল।সামলে নেওয়ার আগেই তুশি ব্যালেন্স হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল পূর্বর ওপর। পূর্ব শক্ত করে তুশির কোমর জড়িয়ে ধরল যাতে সে পড়ে না যায়।পূর্বর গায়ের কড়া পারফিউমের ঘ্রাণে তুশি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে রইল।পূর্বর তপ্ত নিঃশ্বাস তুশির কানের কাছে আছড়ে পড়ছে।সে মৃদু স্বরে বলল, !

—"শাড়ির আঁচল সামলাতে পারেনা যে মেয়ে সে সামলাবে সংসার!নাইস জোকস!"

বিজ্ঞাপন