'পূর্বর সেই তাচ্ছিল্যভরা কথা শুনে তুশির ইচ্ছে হলো লোকটার চশমাটা টেনে নিয়ে এক আছাড়ে ভেঙে দিতে। কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে সে এখন তার শক্ত দুই বাহুবন্দী। মুহূর্তেই নিজেকে ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল তুশি। রাগে ওর কান-মুখ লাল হয়ে গেছে।শাড়ির আঁচলটা কাঁটা থেকে কোনোমতে ছাড়িয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—"অসভ্য লোক!পড়াশোনা করে শিক্ষা অর্জন করলেও ভদ্রতা শেখেননি আপনি।"
পূর্ব জবাব দিল না।কেবল নিজের হাতে থাকা ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে শান্ত পায়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল। তুশিও গটগট করে তার পিছু পিছু ড্রয়িংরুমে এলো।ওর ইচ্ছে ছিল নিচে গিয়েই বড়দের সামনে চিৎকার করে বলবে যে এই বিয়ে সে করবে না।ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তুশির মা আর পূর্বর বোন উৎসুক চোখে তাকালেন।তুশির মা এগিয়ে এসে মেয়ের হাত ধরে আদুরে গলায় বললেন,
—"কী রে মা? কথা বললি তো দুজনে?সব ঠিকঠাক?ভালো লেগেছে পূর্বকে?"
তুশি মুখ খুলতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে পূর্ব তুশির চোখের দিকে একপলক তাকিয়ে তূর্যর দিকে ফিরে বেশ সাবলীল গলায় বলল,
—"তুশি তো আমাকে বলল ওর এই বিয়েতে কোনো আপত্তি নেই। আমাকে নাকি ওর বেশ পছন্দ হয়েছে।যদিও আমার বিয়ে টিয়ের প্রতি খুব একটা আগ্রহ নেই।তবুও তূর্য আর আপনারা সবাই যখন চাইছেন এ বিয়েটা হবে!তুমিও তো একই কথা বললে...তাই না তুশি?"
তুশি যেন আকাশ থেকে পড়ল! ওর মুখটা হাঁ হয়ে গেল বিস্ময়ে। লোকটা এত বড় মিথ্যে কথা বড়দের সামনে এত অবলীলায় বলে দিল? তুশি আমতা আমতা করে বলল,
—"আম্মু আসলে... আমি তো..."
—"থাক মা, আর লজ্জা পেতে হবে না।"
পূর্বর বোন তুশির মাথায় হাত রেখে হাসি মুখে বললেন,
—"পূর্বও আমাকে ইশারায় বুঝিয়ে দিয়েছে ওর কোনো আপত্তি নেই।ছোটবেলার সেই দুষ্টু মেয়েটা আমার ঘরের বউ হয়ে আসবে, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে!খালাম্মা আপনারা বিয়ের বন্দবস্ত করুন।আমি আজই গিয়ে বাড়িতে সবাইকে সবটা জানাচ্ছি।"
পুরো বাড়িতে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল।মিষ্টিমুখ করানোর তোড়জোড় শুরু হলো। তুশি সোফায় বসে পূর্বর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। পূর্ব তখন বেশ আয়েশ করে একটা মিষ্টি মুখে দিয়ে তুশির দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসল। যেন বোঝাতে চাইল,—'টিচারের সাথে পাঙ্গা নিতে নেই!'
-
মেহমানরা বিদায় নিতেই তুশি নিজের ঘরে ঢুকে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। রাগে ওর মাথায় আগুন জ্বলছে। তিতকরলা মেজাজের স্যারের হাত থেকে বাঁচার জন্য সে তার বেস্ট ফ্রেন্ড প্রেমা-কে কল দিল।প্রেমা আর তুশি একসাথে পড়ে, সেও জানে পূর্ব স্যার কতটা ভয়ংকর।আর ওমন মেজাজী লোকের সাথে সংসার করা যাবে নাকি?
একবার, দুবার... তিনবার রিংটোন বেজে কেটে এলো।প্রেমা কল রিসিভ করছে না।তুশি বিরক্ত হয়ে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে।ঠিক সেই সময়েই ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। প্রেমা ব্যাক করেছে। তুশি তখন ওয়াশরুমে কলকল শব্দে পানি ছাড়ছে। ফোনের রিংটোন শুনে পাশ দিয়ে যাওয়া তূর্য ঘরে ঢুকল। বোনের ফোন বাজছে দেখে সে ভাবল হয়তো জরুরি কোনো কল।স্ক্রিনে প্রেমা নামটা দেখে কেমন যেন অনুভূতি হলো।ভালো লাগায় চেয়ে গেলো পুরো শরীর,মন,মস্তিষ্ক।ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে সে কলটা রিসিভ করল,
—"হ্যালো,প্রেমা?"
'তূর্যর গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে ওপাশ থেকে প্রেমা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।তারপর ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
—"হ্যাঁ... তুশি কোথায়?ও আমাকে অনেকবার কল করেছিল।"
তূর্য ফোনের লাউডস্পিকার অন করে বিছানায় বসল। হালকা হেসে বলল,
—"তুশি তো ওয়াশরুমে।ও বের হোক আমি বলে দিব তুমি কল দিয়েছিলে।"
বিষ্ময়ে প্রেমার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়।লোকটা হুট করে ওকে তুমি সম্মোধন করছে কেন?প্রেমা নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
—"বলছি... তূর্য ভাইয়া..."
পুরো কথাটা বলতে পারল না প্রেমা রাগে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো তূর্য,
—"ভাইয়া? এই.. এই.. এই... পেত্নী, আমি তোর কোন জন্মের ভাই লাগি রে?"
প্রেমার কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম।সে ফোনটা কান থেকে সরায়।খানিকক্ষণ পর আবারও ফোনটা কানে ধরে বলে,
—"আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? তুশি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আর আপনি ওর একমাত্র ভাই তাহলে আমারও তো ভাই-ই হলেন তাই না?"
রাগে ফোনটা কেটে দেয় তূর্য।বিছানায় ফোনটা ফেলে ধপাধপ পা পেলে বেরিয়ে যায় সে।আবারও রিংটোন বাজে তুশির ফোনে।ততোসময়ে সে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে।ফোনটা হাতে তুলে সেভ করা নামটা দেখেই মিষ্টি করে হাসে সে।কলটা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলে,
—"বল।"
—"কি রে তুশি... তোর ভাইকে ভাইয়া ডাকায় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো কেন?ধমকা ধমকি করে কলটা কেটে দিলো!তূর্য ভাইয়া তো এতোটাও রাগী নয় তাহলে?"
তুশি হাসলো।সে বেশ বুঝতে পারছে ভাইয়ের মনে কি চলছে!প্রেমা এ বাড়িতে এলে তূর্যের ভাবভঙ্গিই পালটে যায়।কেমন একটা আলাভোলা টাইপ ব্যাবহার করে।অথচ তুশি আর বাড়ির সকলের সামনে লোকটা কতো রাগী!আবারও প্রেমার কন্ঠস্বর ভেসে এলো তুশির কানে।সে বলল,
—"কি জানি!ওসব রাখ।আজকের ব্রেকিং নিউজটা শুন!"
—"কি নিউজ?কি হয়েছে?কেউ তোকে প্রপোজ করেছে নিশ্চয়ই? নাকি বিয়ের আলাপ চলছে?"
—"আরে... আরে... শান্ত হো।হুম বিয়ের আলাপই বলা চলে!পাত্রটা কে জানিস?"
—"না বললে জানব কি করে?"
—"শুন তাহলে... পাত্র হলো ভাইয়ার বেস্টফ্রেন্ড আর আমাদের কলেজের রাগী এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পূর্ব আহসান।"
চা খাচ্ছিলো প্রেমা।তুশির কথা শুনে কাঁশতে শুরু করল মেয়েটা।চা পরে ভিজে গেলো পুরো জামাটা।সে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
—"কী বলছিস তুই!ওই হিটলার পূর্ব স্যার?যে তোকে সারাক্ষণ বকাঝকা করে?তুই তো বললি উনি একটা আস্ত রাক্ষস!আচ্ছা একটা কথা বল তো—তুই কি সত্যিই এই বিয়েতে রাজি?"
তুশি কিছু বলতে যাবে তখনই খেয়াল করল ওর ভাই ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে।পেছন দিকটায় দাঁড়িয়ে প্রেমার বলা কথা শুনছিল সে।তুশি তার ভাইকে দেখে আঁতকে ওঠে।এদিকে তূর্যর মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে সে তাকিয়ে রইলো বোনের দিকে।তূর্যকে দেখেই কলটা কেটে দিলো তুশি।ফোনটা রেখে দিলো বিছানায়।তূর্য সেই ফোনের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল,
—"হিটলার? রাক্ষস? তুশি...তুই তো নিচে বললি পূর্বকে খুব পছন্দ করেছিস।তাহলে এসব কি শুনছি?"
আমতা আমতা করছে তুশি। ঠিক বলে ভাইকে বুঝাবে বুঝতে পারছে না সে।এখন যদি আবার বলে তখন ভেবেচিন্তে বলেনি এসব তাহলে তূর্য আরও বেশি রেগে যাবে।তার থেকে ভালো অন্য কিছু বলেই সে কথা কা'টাবে।