ছাদে এক অন্ধকারছন্ন মায়াবী আলো বিরাজ করছে, থেকে থেকে চাঁদ মেঘের আড়ালে লুকোচ্ছে।সেই নাটকীয় কালো আকাশ দেখে নিকোটিনের ধোঁয়া উড়াতে ব্যস্ত রুবাদ, এমন সময় মেয়েলি কন্ঠে কেউ গুনগুন করে উঠলো ।ছাদে অনেক গাছ-পালা লাগানো, পেয়ারা গাছের ডাল সড়িয়ে আরেকটু কাছে যেতেই গুনগুনিয়ে ওঠা ধ্বনি গুলো শব্দে রূপান্তরিত হলো "আল্লাহ কে যে পাইতে চায়, হযরত কে ভালোবেসে"
টেনে টেনে আনমনে গাওয়া নাশিদ টুকু যেন হৃদয় কেড়ে নিলো রুবাদ এর।
হঠাৎ কেশে উঠায় চমকে গেল মেয়েটি। রুবাদ ভেবে নিয়েছে এই বাড়িতে দুটো মেয়ে আছে কেবল কিন্তু আজ তো অনেক মেহমান ও এসেছে, তাহলে কে এই মেয়ে? হঠাৎ যেন জানার তীব্র কৌতুহল হলো। এই জন্যই বুঝি বলে পুরুষ চিত্ত বড়োই দূর্বল এই নারী নামক প্রলয়ে।
:
:
:
পেখমের হয়েছে আরেক জালা রুবাদ ভাই দেখে ফেলেছে তাকে। তারপরও কিছু না বলে চলে যেত কিন্তু ঐ বেঈমান ওড়না টা যদি মেহেদী গাছের প্রেমে না মজতো।
রুবাদ ফের প্রশ্ন করল"কে? "
হাসফাঁস গলায় পেখম উত্তর দিতে বাধ্য হলো "রুবাদ ভাই আমি"
"আমি কে?"
"পেখম "
"ওহ আচ্ছা, তা গান টান তো বেশ ভালো শিখেছিস। "
"আস্তাগফিরুল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ, না না না আমি গান টান গায় না " ওটা নাশিদ ছিল। পেখমের ভড়কে যাওয়া দেখে রুবাদের হাসি পেল কিন্তু সে যথেষ্ট গাম্ভীর্য্যের ঠাট বজিয়ে চলে বলে চেহরায় প্রকাশ করল না।
পেখম আবার মিনমিনিয়ে বলল"আমি যাই?"
"না থেকে যা। " রুবাদের এমন বেফাঁস মশকরায় পেখম হকচকিয়ে তাকাল।
রুবাদ অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল, ওতোটুকুতেই বলল "একে তো ডিস্টার্ব করেছিস, তার ওপর যেতে ও চাচ্ছিস না, কি একটাবস্থা!"
পেখম দ্রুত পায়ে নিচে নেমে গেল "আমি নামতে চাইছিলাম না?হাহ, কী ফুঁকেছে কে জানে আজ।"
হাতের কাপড় গুলো বিছানায় রেখে ভাজ করতে করতে ভাবলো "হৃদিশাহ ম্যাডাম বলেছিল তিনি আমাকে সাহায্য করবে, আমার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতেই হবে।উপরওয়ালা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে, না করতে নেই।
:
:
:
অভিজ্ঞ ডাক্তারদের সাথে মিটিং শেষ করে বাসার পথে রওনা দিলো হৃদিশাহ। সেক্রেটারি মোবাইল এগিয়ে দিয়ে বলল আপনার জন্য কিছু ম্যাসেজ ছিল।
হৃদিশাহ সব চেক করতে করতে পেখমের ম্যাসেজ দেখতে পেল।
মেয়েটি বলেছিল তার টাকা গুলো ঘরে খুঁজে পায়নি বলে ফি জোগাড় করতে এতো কষ্ট হয়েছে।পেখম বের হয়ে যাওয়ার পর জয়নুল স্যার বলেছিলেন " পেখম কে আমি অনেক আগে থেকেই চিনি ওদের পাশের বাড়িতেই আমার বাসা তাছাড়া আমার মেয়ে ও একই স্কুলে পড়তো । মেয়েটি এতিম, আপন ভাই-বোন ও নেই। প্রথম প্রথম সবাই ওকে খুব অহংকারী মনে করতো, কথা কম বলতো বলে কিন্তু আসলে সে একা বলেই এমন করে। আমার স্ত্রী থেকে বহুবার শুনেছি তার চাচী রুমানা বেগম বাইরে বেশ মিষ্টিমুখ হলেও
অন্তর খাটি নয়।আমার একটায় আফসোস পড়ালেখায় খুব দুর্দান্ত হওয়ার পরও সে হেরে যাচ্ছে একজন ভালো অভিভাবকের অভাবে। টাকার জন্য হারছে বলবনা কারণ আজ যদি মেয়েটার আপন কেউ থাকতো, তার মলিন চেহরাটায় হাসি ফোটাতে সব বাজি রাখতো।
হৃদিশাহ ভাবলো জীবন কতো কী শেখায়, এই অল্প বয়সী মেয়েটার ও বিশ্বাস ভঙ্গের গল্প আছে!
:
:
:
যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের অধিকারী ; তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেন নাই ; সার্বভৌমত্বে তাঁহার কোনো শরীক নাই। তিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করিয়াছেন এবং প্রত্যেককে পরিমিত করিয়াছেন যথাযথ অনুপাতে।(সূরা আল-ফুরকান: ২)
এমন একটা সুন্দর কথা ভাবতে ভাবতে হাড়ি পাতিল ধুয়ে পানি ঝরাচ্ছিল পেখম।রুমানা বেগমের খুশির শেষ নেই পুরো বাড়ি মিষ্টি বিতরণ করে এসেছে। তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে পাকা হয়েছে বলে কথা।
তবে পেখমের মনের ভয় বাস্তবে পরিণত হলো, সে বেশ কিছুদিন ধরে চাচীকে ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চায়ছিল। সামনের মাস টা তার পরীক্ষা তখন যেন বিয়েটা না ফেলে কিন্তু কে শুনে কার কথা?
চমক অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী, সে আর মিশা একই বয়সী। যদিও পড়ালেখা নিয়ে চমকের কখনো মাথা ব্যাথা ছিল না।
পরীক্ষার ফাঁকে বিয়ের আয়োজন পড়লে, পেখম নিশ্চিত চাচী তাকে বিভিন্ন কাজের ছুতই আর পড়তে বসতে দিবেন না। যা ভেবেছিল এখন তা ই নিশ্চিত।
পেখমের একটা পরিকল্পনা আছে। আর সেই পরিকল্পনার কথা ঘরে কেউ জানেনা, একদিন তার প্রিয় বান্ধবী নূরাশা এসে বলেছিল "দোস্ত শোন, আমি বিদেশ পড়তে যেতে চাই।"
"বিদেশ যাবি?"
"হুম, আমার শখ বাকি পড়াটা ওখানেই পড়ব।বাবা কে ও বলেছি।
" স্যার কি বললেন?"
পেখমের চোখে সীমাহীন কৌতুহল।এর আগে কখনো এসব নিয়ে না ভাবলেও, নতুন একটা বিষয় যেন তার ভিত নাড়া দিয়েছে। বিদেশ গিয়ে পড়া যায়! যতদিন খুশি ততদিন পড়া যায়? নূরাশা বলেছে এমনকি চাকরি পেয়ে, সেখানে স্থায়ী বসবাস ও করা যায় । পেখমের চোখে এক ব্যতিক্রমধর্মী স্বপ্ন ধরা দিতে লাগলো তার মন যেন খাঁচা থেকে বেরিয়ে রংবেরঙের দুনিয়া দেখছে। সে ও এইখানের চক্ষুশুল সমাজিকতা মানতে নারাজ। তার জীবনের সিদ্ধান্ত সে নিজেই নিতে চায়।মা-বাবা থাকলে ব্যতিক্রম ভাবতো কিন্তু এখন তার ভালো কে ভাববে? নিজেকে ভালোবাসলে কেউ স্বার্থপর হয় না বরং দিনশেষে নিজে ভাল না থাকলে কাউকে সুখে রাখা যায় না।
পরেরদিন নূরাশা এমন একটা খবর জানালো, যা শুনে পেখমের জান পাখি যেন ফরফর করে উঠলো অতিমাত্রার উত্তেজনায়।
"বাবা জানতে চেয়েছে তুই ও কি বিদেশ গিয়ে পড়তে চাস?"
"আ,,আমি? " মুখ দিয়ে কোনোভাবেই কথা বের হচ্ছিলনা যেন পেখমের।
নূরাশা বলল, "আমি যতুটুকু জানি,তুই আমার চাইতেও বেশি চাস কিন্তু ভয় পাচ্ছিস। "
"এটাও কি সম্ভব? " চোখ টলমল করে উঠলো মেয়েটির।
পরেরদিন জয়নুল স্যারের কাছে গিয়ে বিস্তারিত জানতে পারলো।হ্যাঁ সম্ভব , সে যা ভাবছে তা সত্যি হবে যদি সে কঠোর পরিশ্রম, ভালো রেজাল্ট আর অধ্যাবসায় এর সাথে সব মোকাবেলা করতে পারে।
পেখমের ছলকে পড়া নোনাজল জানান দিচ্ছিলো, জীবন টা কে একটু ব্যাতিক্রম করতে সে সব পারবে।কষ্ট তো রোজ ই হয়।
:
:
:
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু হয়ে গেল বিয়ের আয়োজন। রোজ রোজ চাচী ঘরের দ্বায়িত্ব পেখমের উপর ছেড়ে দিয়ে শপিং করতে চলে যায় নিজ মেয়ের সাথে।তার চাচা জালাল সাহেব ভালো মনের মানুষ কিন্তু বউয়ের সাথে পেরে উঠেনা।তিনি পেখমের জন্য টাকা ও দিয়েছিল কিন্তু রুমানা বেগম যে সেই টাকা পেখম কে দেয়নি, তা এখনো তার অজানা।মহিলা মিষ্টি কথা বলে স্বামীর কাছে দিব্যি আদর্শ বউ সেজে আছেন শুরু থেকেই।
পেখমের নানুবাড়িও মামাদের দখলে, নানী বয়সের ভারে এক প্রকার বোঝা হয়ে পড়ে রয়েছে এককোনায়। মায়ের ভাগে একখানা দোকান আছে আর ঘর ভিটে এখনও ভাগ হয়নি। সেই সুবাদে পেখম সেখান হতে কিছু টাকা প্রতিমাসে পেয়ে থাকে।
বাবা বিশেষ কিছু রেখে যেতে পারেনি ঘর ভিটে ছাড়া আজীবন বিদেশ কাটিয়েছেন ঠিকই কিন্তু স্ট্রক করে দেশ ফেরত আসায় সমস্ত জমাজাতি চিকিৎসায় খরচ হয়ে গেছে। তাও বেঁচে থাকলে অন্তত পেখমের মাথায় বাবার ছায়া থাকতো। এতিম ভেবে যার যা ইচ্ছে বলতে পারতো না।
পড়ালেখার ব্যস্ততায় কাজ টাজ ভালো লাগে না আর। মাঝেমধ্যে মন চায় ফুফির বাড়ি চলে যেতে কিন্তু সেখানেও যে ল্যাঠা চুকেনি।
:
:
:
শুরু হয়ে গেছে গায়ে হলুদ দিনভর মানুষের আনাগোনা চলছে, এ বাড়ি ও বাড়ি ছুটছে ছোট ছোট বাচ্চারা। দিনে হলুদ আর রাতে মেহেদি পড়াবে চমককে
পেখম সবে ঢুকলো ঘরে পরীক্ষা দিয়ে এসে।ঘেমে থাকা তনু নিয়ে গোসলে ঢুকতে যাচ্ছিল। তখনই চাচী বলল "এসে গেছ? যাক বাবা এবার মেহমান দের একটু শরবত বানিয়ে দাও। যা গরম পড়ছে না।"
"কিন্তু চাচী আমি তো গোসলে যাব। "
"এখনই কেন যেতে হবে, দিন তো পড়েই আছে।" যাও যাও পাক ঘরে যাও আগামী দুই দিন বন্ধ আছে। কোনো সমস্যা নেই।"
চমকের মামী বলল"মেয়েটার যখন পরীক্ষা, বিয়েটা না হয় আরো কিছুদিন পরে ফেলতে? "
রুমানা বেগমের বিশেষ পছন্দ হলোনা নিজ ভাই বউয়ের কথা তাই টিপ্পনি কেটে বলল "ওমা ওর তো অন্য পরীক্ষা টা আরো দুদিন পর। তাছাড়া পাশ করলেই হয়, মেয়েদের আবার কিসের পড়া? ওই একই চুলো গুতনো।
পেখম সেখানে আর দাঁড়ালো না মুখ গোমড়া করে শরবত বানাতে চলে গেল। পুরো ২০ জনের শরবতকে চাচী একটু শরবত কিভাবে বলল তার মাথায় আসছে না। পেছন থেকে বেনুনি টান দিয়ে হঠাৎ কেউ বলল " আমাকে এক গ্লাস দিবে?
পেখম ফিরে তাকাতেই রাদিফ চোখ টিপে বলল"হাই জানেজিগার কেমন আছ?"
এই গল্পের পরবর্তী অংশ নিয়ে বানানো হয়েছে একটি ১১ পর্বের গল্প। পড়ে আসুন এখান থেকে ▶ আই হেইট রেড ফ্ল্যাগস