হাতের কাজ শেষ করার সুযোগ টুকুও পাচ্ছে না পেখম। আজানের ধ্বনি বলে দিচ্ছে মাগরিবের সময় হয়ে গেছে।সে অধীর আগ্রহে কারো অপেক্ষায় আছে।যেন এক জীবন-মরণের ব্যাপার জড়িয়ে আছে তার সাথে। উত্তেজনায় বুকের ধুকধুকি বেড়ে গেছে যখন চাচী বলল"চলে এসেছে বোধহয় পাত্রপক্ষ,। "বেশ কয়েকটি গাড়ি উঠোনে এসে থেমেছে তখন।
"তিনিই আল্লাহ্, সৃজনকর্তা, উদ্ভাবনকর্তা, রূপদাতা, তাঁহারই সকল উত্তম নাম। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে, সমস্তই তাঁহার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।(সূরা : আল হাশর : ২৪)
মেয়েটি মোনাজাতে খুব আকুতি ভরে চায়লো কিছু।চোখের পানি মুছেই তাড়াতাড়ি জায়নামাজ টা গুটিয়ে নিয়ে পুনরায় পাকঘরের দিকে ছুটে গেল।
আজ দুটো কাজের খালা রাখা হয়েছে, তারা ভালোই বেতন আর খাবার পাবে, শুধু কোনো প্রকার লাভ হবে না পেখমের।
রুমানা বেগম বলে উঠলো, অতিথিদের নাস্তা দিতে হচ্ছে আর তুমি কি না রুমে গিয়ে বসে আছ?
" আমি, আমিতো নামাজ এ,," কথা শেষ করতে না দিয়েই রুমানা বেগম বলল "আমিও তো পড়ে আসলাম তাই তো বলছি জলদি যাও।
কি যেন একটা মনে করে আবার ডাকল পেখম কে "
শোনো তুমি ওঁদের সামনে যেও না। কাজ না থাকলে রুমে গিয়ে যা ইচ্ছে করো।"
পলক তুললো পেখম, চাচী মানা করেছেন অর্থাৎ তাকে তা ই পালন করতে হবে।অতিথিদের সামনে আর যাওয়া হলো না।
অনেকখানি কাজ সেড়ে এসে রুমে ঢুকলো সে কিন্তু সত্যি বলতে ভালো লাগছে না কিছু।কিচ্ছুক্ষণ বইয়ের পাতায় চোখ বুলিয়ে,নোট করতে শুরু করলো।
আগামী মাসেই পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে।এই পরীক্ষা টা দেওয়া এখন তার জন্য বড়ো এক চ্যালেঞ্জ এ পরিণত হয়েছে।
একটুপর দরজায় টোকার শব্দে লিখা বন্ধ করে গিয়ে দাঁড়ালো সে, মিশা এসেছে দেখে মুচকি হেসে ফের লিখতে বসলো।
মিশা দরজা লাগিয়ে দিয়ে খাটে বসে বলল"কী রে তুই দেখি তৈরি হোস নি, তারওপর সামনেও জাসনি কারো।
সারাদিন তো খুব অপেক্ষা করেছিলি।
লিখতে লিখতে এক পলক মিশার দিকে তাকিয়ে বলল"তোমার মনে হয়, চাচী আমাকে তাদের আনন্দে সামিল করবে?"
না একদম না "সোজা সাপটা স্বীকার করলো মিশা। " হ্যাঁ তবে কেউ একজন তোমার খোঁজ করেছে আমার কাছে। "
পেখমের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে গেছে।লিখা থামিয়ে বলল "এসেছেন উনি?"
মিশা তড়িঘড়ি করে বলল দেখতে চায়লে দ্রুত চল, শুনেছি উনার কাজ আছে তাই জলদিই চলে যাবেন।
"উফফ! তুমি এতো দেড়িতে বললে কেন? " পেখম তাড়াহুড়ো করে একটা কালো শাল জড়িয়ে নিলো গায়ে।"
"আরেহ! আমি ভেবেছি হয়তো সামনে যাবে না যেহেতু মামি বারণ করেছে। "মিশার হাত টেনে দ্রুত পায়ে ছুটে গেল সামনের ঘরে কিন্তু মিশা চেক করে জানালো উনি বাইরে, পায়ে পায়ে উঠনে গিয়ে দেখলো গাড়ি প্রায় ছেড়েই দিয়েছে, উইন্ডোর কাঁচ নামিয়ে পেখম কে দেখতে পেয়ে,তখনই এক মার্জিত নারী হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো। শাঁই করে গাড়ি গেইট পার করে চলে গেল।
পেখমের মুখখানা এইটুকু হয়ে গেছে দেখে মিশা হাত বাড়িয়ে একটি কাগজ দিলো।
" কী এটা?"পেখমের শান্ত চাহনি
"আরেহ ম্যাডাম দিয়েছেন তোর জন্য, আগে খুলে তো দেখ" মিশা চঞ্চলতার সাথে বলল।
পেখম কাগজ টা খুলে একটা ফোন নম্বর আর মেইল আইডি দেখতে পেল। ডক্টর হৃদিশাহ এর নাম লিখা আছে তাতে।
"ম্যাডাম বলেছেন এটা উনার পার্সোনাল নম্বর।যদি ব্যস্ততার কারণে কল এটেন্ড করতে না পারেন তাই তুই চায়লে রেগুলার মেইল করতে পারবি।আর তাছাড়া উনি তো সবসময় দেশে থাকেন না।"
দীর্ঘশ্বাস ফেলে কৃতজ্ঞতার সহিত আসমানে তাকিয়ে বলল :
তিনিই আল্লাহ্, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ্ নাই, তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা; তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু।(সূরা আল হাশর : ২২)
চাচী রুমানা বেগম দুয়ারে এসে গলা টেনে উঁকিঝুঁকি দিয়ে বলল"কী করছ তোমরা এখানে? ছাদ থেকে কাপড় নামিয়েছিলে?"
পেখমের টনক নড়ল জিবে কামড় দিয়ে বলল "যাচ্ছি আমি।"
তিন তলার হাফ ছাদে গিয়ে গুনগুন করে নাশাদ গাইছিল।হাতের কাগজ দেখে-
পেখমের মনে পড়লো, গতমাসে মামার বাড়ি থেকে পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়েছে। তা সে পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে রেখেছিল। চমক দুই হাজার টাকা ধার নিয়েছে সেখান হতে, তার হবু বর কে নাকি ভালো কিছু উপহার দিতে চায় কিন্তু কিছু টাকা কম পড়ছে। আগামী মাসেই পেখম কে দিয়ে দেবে । পেখম ও ভেবেছে নির্ধারিত দিনে টাকাটা কলেজে জমা করে দিলেই হলো কিন্তু
টাকা জমা দেওয়ার দিন ঘটলো অঘটন, সর্বনাশ কোথাও বাকি টাকা টা খুঁজে পাচ্ছে না সে।এইদিকে দুদিন আগেই চাচী মাইক্রো ওভেন কিনে তার বহুদিনের শখ পূরণ করল, এমন সময় খুব ভয়ে ভয়ে পেখম, রুমানা বেগমের কাছে গিয়ে বলল"চাচী মা আমার টাকাটা যেন কোথায় পড়ে গেছে। ফর্ম ফিলাপের তারিখ চলছে,আমাকে কী কিছু টাকা ধার দিতে পারবেন? মামা কে বলে শোধ করে দেবো। "
"ছিঃ ছিঃ ওভাবে করে বলছো কেন। আমি কি তোমার পর নাকি। কেন দেবো না টাকা?"
পেখমের একটু স্বস্তি হলো কথাটা শুনে কিন্তু রুমানা বেগম এবার একটু ইতস্ততভাবে বলল"তবে হয়েছে কী এখন তো আমার হাতে বার্তি কোনো টাকা নেই। ক'দিন পর দিলে হবে না?"
"হ্যাঁ হ্যাঁ হবে,,,আপনি দিবেন বলেছেন এটায় বড় ব্যাপার। " পেখম সেই স্বস্তির সাথেই কলেজে চলে গেল।
দিন গড়িয়ে যাচ্ছে, তিন-চারদিনের জায়গায় সাতদিন হয়ে গেল এইদিকে কলেজের স্যার কে অনেক রিকোয়েস্ট করে সময় পেল মাত্র একদিন। পেখম চাচীর কাছে গিয়ে আবার আকুতি মিনতি করে বলল"টাকাটা কাল খুব প্রয়োজন। প্লিজ চাচী মা আজ যদি দিয়ে দিতেন।"
"হয়েছে কী তোমার চাচা কে বলেছিলাম কিন্তু উনার দোকানে নাকি কিছু বাকিতে মালপত্র তুলেছেন।তাই হাতে বেশি পয়সা নেই। যে টুকু হাত খরচা আমাকে দিয়েছিল তা তো টগর আর চমকের পেছনেই খরচ হয়ে গেছে আর বাকিটা ঘরের কাজে।তুমি না হয় এইবার পরীক্ষা টা না দাও। "
পেখমের চক্ষুমনি চুঁয়্যে দু ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো। আস্তে আস্তে পলক তুলে বলল"পরীক্ষা দেবো না?"
"মন খারাপের কী আছে? এইবার না হয় দিলে না,হাতে সময় থাকলে তো আমি টাকা দিয়ে দিতাম।"
"সামান্য টাকার জন্য আমি পুরো বছর টা ভেস্তে দেবো?" কথাগুলো ভীষণ ধীরেসুস্থে বলল পেখম, যেন সে একটা ঘোরে আছে।সে বুঝে গেছে প্রশ্ন এখানে টাকার নয় আর যা ই হোক এই ঘরে অন্তত তার চাহিদার কদর নেই।
চমকের কাছে গিয়ে বলল "মিশা কে একটা কল দিতে পারবে? জরুরি কথা আছে।"
পেখম ভেবে নিয়েছিল টাকা টা সে ফুফি থেকে নিবে কিন্তু চমক জানালো মিশার মুঠোফোন এ কল যাচ্ছে না, বন্ধ জানাচ্ছে।
কী মুশকিল, ফুফি কে জানাতে না পারলে সামান্য টাকার কাছে হেরে যাবে তার এতো এতো মূল্যবান সময় যা সে পড়ার পেছনে ব্যয় করেছে। চাচী যদি মিথ্যে আশ্বাস না দিত তাহলে সে, যেকোনো উপায়ে টাকা টা আজ ম্যানেজ করে ফেলত কিন্তু হাতে যে আর সময় নেই।
ভোরের কাজ বাজ ছেড়েই আজ রওনা দিলো ফুফির বাড়ি কিন্তু বিধিবাম সেখানেও তালা ঝুলানো। প্রতিবেশীদের একজন বলল"উনারা তো সিলেট গিয়েছেন দুদিন আগে।"
বাধ্য হয়ে কলেজ ফিরল পেখম। স্যার এর কাছে আরেকটি বার সুযোগের আশায় বিনয় নিয়ে শুধালো "আমি কি আরেকটু সময় পেতে পারি স্যার।"
স্যার কিছু বলবেন তার আগেই অফিস রুমে বসা একজন মার্জিত নারীকন্ঠে বললেন "কতো টাকা লাগবে স্যার?"
জয়নুল স্যার বললেন "বেশি নয় ম্যাডাম, তবে তারিখ চলে গেলে, হলে বসতে পারবেনা মেয়েটি।"
"টাকা টা আমি দিয়ে দিচ্ছি, আপনি তাকে হলে যেতে দিন। " হৃদিশাহ এর এমন কথায় পেখম কাছে ছুটে গিয়ে বলল "কিন্তু ম্যাডাম আমি তো আপনাকে চিনি না। "
"কী হবে না চিনলে?"
"আপনার কাছ থেকে টাকা কীভাবে নেব?" পেখম খুব অনুনয় করে বলল।
হৃদিশাহ হেসে বলল "ওসব নিয়ে ভেবো না, তুমি শুধু বলো, পরীক্ষার ভালো প্রস্তুতি নিতে পারবে তো?"
জয়নুল স্যার উত্তর টা দিয়ে দিলেন "অবশ্যই পারবে সে ক্লাসের টপার ছাত্রী।
হঠাৎ পেখমের ভাবনায় ছেদ ঘটাল একটা শুষ্ক কাশি।
মেয়েটি সচেতন হয়ে, দ্রুত তার হতে কাপড় নিয়ে হাতে রাখল।আস্তে আস্তে পালাবে ওমনি পেছন ফিরতেই ধাক্কা লাগলো একজন শক্তপোক্ত পুরুষের সাথে। ছিটকে দূরে সড়ে গিয়ে পালাতে চায়লো।
আবছা আলোয় নিকটিনের ঘ্রাণ উড়ছে। পুরুশ কন্ঠ বলে উঠলো " কে তুমি?"
পেখম গলার স্বর চিনতে পেয়ে চুপসে গেল।কিছু না বলে চলে যেতে চায়লেও পারলো না, আটকে গেছে তার ওড়না।