রেড ফ্ল্যাগ্স

পর্ব - ১

রেড ফ্ল্যাগ্স বাংলা গল্প - লেখিকা সূচনা জাফরিন

খুব কষ্ট করে এইচএসসি পরীক্ষার ফি টা জোগাড় করেছিলাম, বিশ্বাস ভাঙ্গার গল্প যদি বলি, শুধুই অবাক হবেন!

ম্যাসেজ টা পাঠিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো পেখম।জীবন এতোটাও সহজ না সেটা দু বছর আগেও জানতো না মেয়েটি।

পাশে বসা মিশা এক নজর চেয়ে বলল" কিছু খেয়েছিস? "

"শুকনো পোড়া মরিচ পেয়াজের সাথে ডলে গরম ভাতে মাখালাম, ওমনি চাচী গলা টেনে চোখ দিয়ে পরখ করে নিলো আমার ভাতের বাসন কারণ কড়াইয়ে একপাশে ভাজা এক টুকরো মাছ আর দু খানা মুরগির গোশতও ছিল। ভেবেছিল বোধহয়, আমি এর কোনো একটা নিয়ে খেতে বসে গেছি!

মিশা কটাক্ষের সুরে হেসে বলল "আচ্ছা! কখনো সাহস করে নিয়ে ফেলিস না কেন? ঐ মাছ মাংসে কী শুধু তোর চাচাতো ভাই-বোনদের হক। আর তোর চাচী এতো মিষ্টি মুখ যার, চায়লেই তো পারে তোকে নিজ হাতে এক টুকরো ভালো খাবার তুলে দিতে।

" দিয়েছে তো, চাচী এক গাল হেসে কী বলেছে জানো? এই নাও লবণ, স্বাদ বাড়বে এতে।জানোই তো "চমক আর টগর "সবজি দিয়ে খেতে পারেনা, গলা দিয়ে নাকি ভাত নামেনা মাছ -মাংস না দেখতে পেলে, পরের বেলায় রান্না করলে, তুমিই সবার আগে খেয়ে নিবে কেমন? ওদের ভালো মানুষ করতে পারলাম না গো।এক তুমিই মানুষ হয়েছ আমার হাতে, ওরা দুই ভাই বোন, কোনো কথায় শুনেনা আমার। "পেখম দীর্ঘশ্বাস ফেললো কথা গুলো বলে।ব্যাপার টা দুঃখের হলেও হাসিমুখে শুনালো।

" তা পরের বেলার টাটকা মাছ-মাংস, সবার আগে তোকে খেতে দেয় বুঝি?"মিশার প্রশ্নবোধক চাহনি।

পেখম নত মাথা নাড়িয়ে বলল "না, ঐ এক বেলাতেও বলে দেয় কোন টুকরো কার প্রিয়। গুনে গুনে আট টুকরো রান্না করে রোজ, পরের দিন চাচা বাইরে লাঞ্চ করে, চাচী আগেই খেয়ে নেয় আর বাকি থাকি আমরা তিনজন।সুতরাং,,

মিশা বসা থেকে উঠে কাপড় ঝেড়ে নিয়ে বলল" হুম জানতাম মামী এমনই করবে।তাই জিজ্ঞেস করলাম । "

"এক্ষুনি চলে যাবে নিচে? আরেকটু বসো না।"

মিশা হাত বাড়িয়ে বলল"একটু পরেই সন্ধ্যে নামবে, ছাদে এ সময় বসতে নেই, চল। "

"আজানের আগে করে নেমে যাবো প্লিজ বসো।"পেখমের আকুতি শুনে মিশা হাটু মুড়ে বসে, তার দিকে কিছুক্ষণ মায়াভরা দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলল" খুব কষ্ট হয় তাই না? কীভাবে থাকিস এখানে? কতবার বলেছি চল আমাদের বাড়ি। ফুফি নিশ্চয়ই চাচীর মতো হয়না!"

পেখম ঠোঁট ভাজ করে কিছু একটা ভাবলো। "না আপু এইচ এসসি টা শেষ হোক, তারপর না হয় ছুটিতে তোমাদের বাড়ি যাব।"

মিশা আবার বলল" মা কে বলবো, তোকে আমাদের ঘরেই রেখে দিতে, এখানে আর আসতে হবে না, তুই এডমিশন নিয়ে বাকি পড়া ওখান থেকেই শেষ করবি।"

পেখম মুখে কিছু না বললেও, সে আসলে চায় না ফুফির বাড়ি যেতে, বাকি সব বলে হাল্কা হলেও; এই একটা ব্যাপার মিশা কে বলতে পারেনা।এস,এস,সির পর যখন ফুফির বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল, সে এক অন্য ঝামেলায় পড়ে গিয়েছে।

মিশার বড় দুই ভাই আছে, রুবাদ আর রাদিফ ।

গতবার তো রাদিফ হুট করেই একটা আংটি তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল "আজ থেকে আমাদের প্রেম শুরু, আমি সেটেল্ড হয়ে তোমার কথা জানাব মা কে।"

হুট করে দমকা হাওয়ার মতো এসে চলে গেল সে,পেখমের হাসি পেল, দুঃখের হাসি। তাকে ভালোবাসে দাবি করা ছেলেটা সবে মাত্র এস এস সি দিয়েছে, তাহলে বয়স টা ধরুন সতেরো।

এই বয়স টা যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা প্রেমের বয়স,নির্ভেজাল খাঁটি ভালোবাসার মৌসুম খুঁজে , দিকবিদিক হারিয়ে পাগলামির সময় মানে না, এসব কিছু না অনুভব করতে পারলেও সে বুঝে গেছে তার একটা লক্ষ্য স্থির করতে হবে।স্কুলের বান্ধুবীরা যখন খেয়ালি পোলাও রাঁধতে ব্যস্ত ছিল। পেখমের এই করুণ পরিস্থিতি যেন একটা দুস্বপ্নের মতো এসেছিল কিন্তু সেই ঘুম আর ভাঙ্গাইনি কেউ।

পুরনো যাতার কলে যেন তাকে কেউ পিশেই যাচ্ছে,পিশেই যাচ্ছে।

রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে চায়লেও আগের মতো বিছানায় যাওয়া যায় না। চাচী বলেন মেয়েদের সব শিখতে হয়। এই এক কথা বলা শুরু করেছে বাবার মৃত্যুর একচল্লিশ তম দিন থেকে।

সব কিছু গুঁছিয়ে দিয়ে রুমে এলো, তার ছোট পড়ার টেবিলে বসে ল্যাম্প জ্বালিয়ে বাকি পড়া গুলো শেষ করবে বলে।

চাচাতো বোন চমক আগে থেকেই বিছানায় শুয়ে মোবাইলে কিছু দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে।

সে জেগে থাকে অনেক রাত অব্দি কিন্তু তারপরও রুমের বাতি জ্বালানো নিষেধ, তাই তো রোজ অল্প আলোয় পড়তে হয় পেখমের।

পড়ালেখা নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস পেখম, বাবার ইচ্ছে ছিল ডাক্তারি পড়াবে। পাঁচ বছর বয়সেই মা দুরারোগ্য তে গত হয়েছেন, তাই মায়ের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই মেয়ের।চাচীদের সাথে আগেও ছিল তবে তখনের পরিস্থিতি ভিন্ন একেবারে, কেউ যেটা সেটা বলতে পারতো না,এমনকি তেমন কোনো ঘরের কাজ ও করা হয়নি।পেখম প্রায় পড়ালেখা নিয়েই ব্যস্ত থাকতো, ঘুরাঘুরি, টিভি, নাচ-গান এসবের প্রতি কোনো আগ্রহ ই ছিল না। চমক সমবয়সী হলেও বন্ধুর মতো হতে পারেনি কারণ তার স্বভাব পেখমের বিপরীত।

চমক বলল হঠাৎ "উফফ তুই আর তোর পড়ালেখা। জানিস ও আমাকে ম্যাসেজ পাঠিয়েছে।"

"কে?"

"কে আর?আমার হবু বর। " এক গাল হেসে আবার মোবাইলের কিপ্যাড গুতোতে লাগলো চমক।

:::

:::

:::

ভোরের আলো ফুঁটতেই পেখমের দায়িত্বের খাতা খুলে যায়।চাচী মান অভিমানের খেলায় প্রায়শই পেখমের ঘাড়েই নাস্তার কাজ তুলে দেন।চাচার সাথে এইবার ও নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে,সকাল সকাল চাচী বলল"আমি এই ঘরের এক দানা ও খাবো না, কে কী খাবে! কার অফিস আছে না আছে ওসব আমি জানিনা।

কথাটা বলেই এক গ্লাস পানি ঢেলে খেয়ে নিলো।জালাল সাহেব বাথরুম থেকে বের হতেই রুমানা বেগম হনহনিয়ে রুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো।

অর্থাৎ পরোক্ষভাবে সে চায় পেখম করুক নাস্তার আয়োজন।

সত্যি বলতে পেখমের একটুও ইচ্ছে করেনা সাজ সকালে উঠে একটা সংসারের দায়িত্ব নিতে।আজ রুমানা বেগম রান্নাটা ও করতে চায়বেন না।

সবাই যেমন টা ভাবছে চমক কে দিয়ে করানোর কথা তেমনি পেখম ও ভেবেছিল।একদিন বলেছিল আমার অনেক প্র‍্যাক্টিকেল এর লেখা বাকি প্লিজ তুমি করে নাও।

"কিন্ত আমার শরীর টা রাত থেকেই খারাপ তুমি না হয় অল্প করে হেল্প করে দাও ।"চমকের এমন উক্তি শুনে

অগত্যা পেখমের ও উঠতে হয়। এই অল্প হেল্প বলতে পরোটা বানাবে পেখম, ভাজবে চমক।সামান্য তরকারি মাছ-গোশত ই তো কেটে ধুয়ে রাখে পেখম আর রান্নার মতো অসামান্য কাজটা করে চমক। তারপর এতো মজার রান্নার হাত বলে পুরো বাড়ি জুরে জয় জয়কার চলে চমকের।

নিয়তির এই খেল কে যদি বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এই জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে পারতো। না না তবে পেখম বিয়ে টিয়ে করার কথা একেবারেই ভাবতে চায়না।

সে এসব সংসারের কাজের জন্য নিজেকে উপযুক্ত মনে করে না, তার খুব শখ ছিল এই দেশ থেকে দূরে কোথাও গিয়ে থাকার, যেখানে সমাজের কানাঘুষা থাকবে না, জীবন টা হবে স্বাধীন, পাখির মতো। আদৌ স্বাধীনতা বলে কিছু আছে কিনা তার জানা নেই।

::::

:::

:::

:::

"আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন কর,

তাহাদের পথ, যাহাদেরকে তুমি অনুগ্রহ দান করিয়াছ, তাহাদের পথ নহে যাহারা ক্রোধ - নিপতিত ও পথভ্রষ্ট।"(‏সূরা ফাতিহা:৬,৭)"

ভোরের প্রার্থনা শেষ হতেই শুরু হয়ে গেছে আয়োজন, আজ চমকের এনগেজমেন্ট, তারই ঠিক করা পাত্রের সাথে তবে এই বিষয়টা চার দেওয়ালের বাইরের জন্য নয়।সবাই জানে পাত্রের পরিবার কোনো এক বিয়েতে চমক কে দেখে পাগলের মতো পিছে পড়েছে। তাই আর না দিয়ে উপায় নেই।

একে একে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা আসতে শুরু করেছে, যেমন মামা, ফুফি, খালা -নানী। পেখমের আজ আর কলেজ যাওয়া হলো না।রুমানা বেগম তাকে তো আর মেহমান বানিয়ে বসিয়ে রাখবেন না।তার ফুফি বেগম রাহিমা কাছে টেনে বলল " পেখম কেমন আছিস মা?"

এই এক কথায় মেয়েটি মাখনের মতো গলে গেল। এই দুনিয়ায় তাকে ভালোবাসার মতো খুব কম মানুষই অবশিষ্ট রয়েছে। ফুফিকে জড়িয়ে ধরতেই রুমানা বেগম তার আহ্লাদী গলায় বললেন "ইশ পেখম একা হয়ে যাবে, চমকের বিয়েটা হয়ে গেলে। তাই তো ওমন গোমড়ামুখী হয়ে ঘুরছে। "

ঠিক তখনই ঘরে জোরালো কন্ঠে সালাম দিয়ে প্রবেশ করল রুবাদ "হাতে ধরা নাস্তার কাটুন টেবিলে রেখে বলল " মামীজান তাহলে তো চমকের আগে পেখমের পালকি তুলতে হয়।"

রুমানা বেগম কেমন অপ্রস্তুত হয়ে বললেন "না না না, ওর বিয়েতে একেবারেই মত নেই। তাছাড়া একা হাতে চমকের আয়োজন করবো কীভাবে? "

রুবাদ ক্লেশ যুক্ত কন্ঠে বলল "সেটাই তো আসল ব্যাপার। " গলা খাকারি দিয়ে উঠোনে চলে গেল সে।

মামী তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো "হকের ব্যাপারী" হুহ!"

::

::

পেখম সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছে বিশেষ কারো জন্য। সন্ধ্যা হতেই যেন তার পাইচারি দ্বিগুণ হয়েছে, মনে মনে বেশ কয়েকবার বলল "আসবে তো সে?"

বিজ্ঞাপন