অভিলাষীর আবরণ

লেখিকাঃ নবনীতা চৌধুরী

প্রকাশকালঃ এপ্রিল ২৮, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

--" আপনি এমন কেন আবরণ ভাই?"

--" কারণ তুই অভিলাষী তাই আমি এমন শক্ত আবরণ। অভিষালীকে আবরণ দ্বারা ঢেকে রাখতে হয়। নাহলে অল্প ঝড়েই ধ্বংস হয়ে যায়।"

--" সব সময় এমন কঠিন কথা বলবেন না তো। আমি কবি বা সাহিত্যেক না যে আপনার এমন কঠিন কথা বুঝবো।"

নবনীতা চৌধুরী এর লেখা অনুগল্প অভিলাষীর আবরণ এর ইমেজ

--" যা এখান থেকে। বেশি বুঝতে হবে না তোকে।"

আবরণের বকা খেয়ে মন খারাপ করে ছাদ থেকে নেমে পড়ে অভিলাষী। ছাদ থেকে নেমেই রান্নাঘরে চলে যায় মা - মণিদের কাছে।

-------------

আজ অভিলাষীর খালাতো বোনের গায়ে হলুদ। সে জন্যেই একসাথে সবার গ্রামে আসা। আবরণ অভিলাষীর মামাতো ভাই। টিনেজ বয়স থেকেই আবরণের উপর আসক্ত অভিলাষী। কিন্তু সেই প্রেম বা আসক্তি বুঝতে বা স্বীকৃতি দিতে নারাজ আবরণ। অভিলাষী বড় আপু ভাইয়াদের কাছে আবরণকে বলতে শুনেছে তার নাকি প্রেম ভালোবাসায় বিশ্বাস নেই। মেয়ে পছন্দ আছে একসাথে বিয়ে করবে সে। কথাগুলো ভাবলেই মনে মনে মুখ ভেকচি কাটে অভিলাষী। সে তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে দিবে না আবরণ ভাইকে। মগের মুলক নাকি।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। নিকষ কালো আঁধারে চেয়ে গেছে প্রকৃতি। ধরনীতে আঁধার নামতেই আলোয় ঝলমল করে ওঠে আহসান ভিলা।

বড়রা সবাই ব্যস্ত রান্নাবান্না আর ডেকোরেশনের কাছে। ছোটোরা সবাই সাজ গোজে ব্যস্ত। মেয়েরা ডার্ক গ্রিন কাতানের সাথে কানে টকটকে রক্ত লাল গোলাপ গোঁজা।

সবার কানে গোলাপ গোঁজা থাকলে ও অভিলাষীর কানে নেই। সবার ছোটো হওয়ায় তার কাছ পর্যন্ত গোলাপ পৌছায়নি।

শত ব্যস্ততার মাঝে হঠাৎ অভিষালীর সামনে হাজির হয় আবরণ। শরীরে সাথে লেপ্টে আছে কালো ঘর্মাক্ত পাঞ্জাবি। আবরণ কে দেখেই বোঝা যাচ্ছে ব্যস্ততায় তার পোশাক পাল্টানোর সময় এখনো পায়নি। এই অবস্থাতেই কি সুন্দর লাগছে তাকে। অগোছালো চুল গুলো কপালে এসে খেলা করছে। একমুহূর্তের জন্য জমে যায় অভিলাষী। আবরণের ধমকে ধ্যান ভাঙে তার।

--" তোর মাথার ফুল কই?"

--" ফুল শেষ তাই দেইনি। আমাকে এমনিতে সুন্দর লাগছে না আবরণ ভাই?"

--" না।"

অভিলাষী কে মুখের উপর না বলে গটগট পায়ে স্থান ত্যাগ করে আবরণ। আবরণের মুখে সুন্দর লাগছে না শুনে মুখ কালো হয়ে যায় তার। মন খারাপ করে কাজিনদের সাথে ছাদে চলে যায় অভিলাষী।

------------

ছাদে বসে হলুদের অনুষ্ঠান উপভোগ করার এক পর্যায়ে সবার চিৎকারে থেমে যায় সব অনুষ্ঠান আয়োজন। এতোক্ষণের হৈহুল্লোর শান্ত পুরীতে রুপ নেয় নিমেষেই।

হঠাৎ অভিলাষীর মাথায় আসে সন্ধ্যার পর থেকে তার সাথে আর আবরণের দেখা হয়নি। কোথায় উনি? চিৎকার বাড়তেই তড়িঘড়ি করে নামতে গিয়ে শাড়িতে পা পেঁচিয়ে পড়ে যায় অভিলাষী। রেলিং এ লেগে কপাল কেটে গেছে তার। কপালে হাত ছুঁয়ে রক্ত দেখে বুক কেঁপে ওঠে অভিলাষীর। কিন্তু কানে একটা কথা আসতেই নিজের ব্যথা ভুলে দৌড় লাগায় সে।

--" তোর কি হলো রে আবরণ আব্বা?"

মামানীর বলা এই কথাটাই যথেষ্ট ছিলো অভিলাষীকে উন্মাদ বানানোর জন্য। দৌড়ে এসে দেখে মেঝেতে আবরণ শুয়ে আছে। চোখ জোড়া বন্ধ। বলিষ্ঠ দুহাত ও নিস্তেজ ; মেদহীন পেটখানা উঠানামা করছে না। পেট উঠানামা করছে না কেন? তারমানে কি শ্বাস নিচ্ছে না আবরণ ভাই?

সাদা পাঞ্জাবি টাতে লাল লাল কি যেনো দেখা যাছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে অভিলাষীর। আর কিছুই ভাবতে পারে না সে। দিক বেদিক ভুলে অভিলাষী ঝাঁপিয়ে পড়ে আবরণে বুকে। অভিলাষী আবরণ কে ধরতেই দেখলো ওর শরীর ঠান্ডা হয়ে আছে।বলিষ্ঠ হাতখানা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে দু'হাতে ঘষা শুরু করে। হাত ছেড়ে বুকে মাথা রেখে দেখে শ্বাস চলছে কিনা। অভিলাষী যখনি বুঝতে পারে শ্বাস নিচ্ছে না আবরণ। মাথা তুলে সাথে সাথে আবার ডলে পড়ে আবরণের বুকের উপর ।

এতোক্ষণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা মা- মণিরা এবার ছুটে এলো । অভিলাষী টেনে তোলে আবরণে বুক থেকে। পানি ছিটায় তার চোখে - মুখে। একমাএ মেয়ের এমন দশা দেখে পাগল প্রায় অভিলাষীর বাবা-মা। গ্রাম্য ডাক্তার আনতে ছুটে অভিলাষীর খালাতো ভাই।

ডাক্তার এলো ! এসে যেই খবরটা শোনালো তা শোনার থেকে না শোনাই ভালো ছিলো সবার। "অভিলাষী আর নেই"। হঠাৎ পাওয়া শকে দুঃখে কষ্টে হার্ট আট্যাক করেছে সে। সাথে হার্টে ব্লক হয়ে যায় ; যার দরুণ শ্বাস - প্রশ্বাস আচঁল হয়ে পড়ে।

আবরণে বুকে তিনটে গুলি বিঁধেছে। আবরণের বাবার বিপক্ষ দলের ছেলেরা করেছে এই কাজ। কে করেছে তা এখনো জানা যায়নি। থানা থেকে ওসি আর পুলিশ এসেছে চেয়ারম্যানের ছেলের এমন অবস্থা শুনে।

একমাত্র ছেলে - মেয়ে হারিয়ে দুই পরিবারের কেউই কথা বলার অবস্থায় না থাকায় পুলিশ পোস্ট-মর্টেম করতে নিতে চায় আবরণকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর তা পারেনি আবরণের মায়ের জন্য।

একসপ্তাহ পেরিয়েছে সেই কালো রাতের। আবরণ আর অভিলাষীকে একসাথে দাফন করা হয়েছে। তার অবশ্য কারণ ও আছে। আবরণের মায়ের ইচ্ছে। ছেলে মেয়ে গুলো বেঁচে থাকতে একসাথে থাকতে পারেনি। কবরটা না হয় পাশাপাশি হোক।

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প