প্রকাশকালঃ মে ২, ২০২৬
❝এত কষ্ট করে, এত টাকা খরচ করে পড়াশোনা করিয়েছিলাম এই দিন দেখার জন্য? শেষমেশ পরীক্ষায় ফেল করলি তুই? এখন প্রতিবেশীদের সামনে মুখ দেখাবো কি করে? আমাদের মান-সম্মান সব ধূলোয় মিশিয়ে দিলি!❞
রাগান্বিত স্বরে চেঁচিয়ে কথাগুলো বলতে বলতে নওমীর গালে আরেকটা চ*ড় বসালো তার মা। নওমী কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। চুপচাপ ঘরের দেয়াল ঘেঁষে বসে অঝোর ধারায় অশ্রুবর্ষণ করতে লাগলো।
আজ সকাল এগারোটায় নওমীর এসএসসির রেজাল্ট বেরিয়েছে। একরাশ উত্তেজনা নিয়ে কাঁপা হাতে ওয়েবসাইট ওপেন করে সেখানে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নাম্বার বসিয়েছিলো নওমী। ঠিক তার পরমুহূর্তেই তার সমস্ত সপ্ন-আকাঙ্ক্ষা ভেঙে গুড়িয়ে গেলো। একটা বিষয়ে ফেইল করেছে ও। গণিতে এমসিকিউ দুই মার্কস কম পাওয়ায়, এই বিষয়ে উত্তীর্ণ হতে পারে নি। একটা বিষয়ের জন্য পড়াশোনার সমাপ্তিরেখাটা এখানেই টানা হলো। কিন্তু পরিবার ও সমাজ? তারা কি মেনে নিবে এই হার?
নওমী রেজাল্ট দেখার পর থেকেই বিধ্বস্ত। নওমীর মা নওমীর মানসিক অবস্থায় বিন্দুমাত্র পরোয়া করে নি। বরঞ্চ অন্যান্য যারা পাশ করেছে তাদের নজির টেনে একাধারে কথা শুনিয়েই যাচ্ছে। সাথে দু'চারটে থা*প্পড় তো আছেই।
ঘরের উত্তাল অবস্থা। নওমীর ভাই তাহসানও রেগে আছে বোনের উপর। পরীক্ষায় ফেলের সমস্ত দোষ নওমীর। এর শাস্তিও নওমীকেই ভোগ করতে হবে। মেনেও নিয়েছে মেয়েটা। সকাল থেকে সহ্য করা ছাড়া এক শব্দের প্রতিবাদও করে নি। এরইমধ্যে আগুনে ঘি ঢালতে মিষ্টিসমেত বাড়িতে এলো নওমীদের পুরোনো প্রতিবেশী। মেয়ের পাশের খুশিতে যত না এসেছেন, তার থেকে বেশি আগ্রহ নওমীর রেজাল্ট জানতে। যখন শুনলেন নওমী এক বিষয়ে ফেল করেছে তৎক্ষণাৎ পৈশাচিক হাসি ফুঁটলো তার মুখে। লক্ষ্য করে নি কেউ!
নওমীর মা মেয়েকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন,
❝তোর পড়াশোনা আর হবে না। ফেল করার জন্য এতদিন পড়াশোনা করাই নি। আর ভবিষ্যতে দ্বিতীয়বার ফেল দেখার রিস্ক আমি নিতে পারবো না। কিছুদিনেই বিয়ে দিয়ে দিবো তোকে!❞
সব সপ্নের ইতি ঘটলো সেখানেই।
*********
আফনিন নিজেকে উজাড় করে সশব্দে কাঁদছে। কোনো বিরাম নেই তার। বোন অহনা ও মা যে এত স্বান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে কোনো কাজই হচ্ছে না। নিজের কাছে সে ব্যর্থ। সপ্ন পূরণে সে ব্যর্থ। এসএসসিতে পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় দুই মার্কের জন্য ফেল করেছে। এই অকৃতকার্যতা মেনে নিতে বিস্তর আপত্তি তার।
অহনা জড়িয়ে ধরে রেখেছে আফনিনকে। আফনিনের মা ওর মাথায় লাগাতার হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন। মেয়ের কষ্টে তারও কষ্ট হচ্ছে। একটা রেজাল্টের জন্য নিজের মেয়ের দুঃখগুলো ভুলে যাবেন, এতটাও অমানবিক হননি। তিনি মেয়েকে স্বান্ত্বনা দিয়ে বললেন,
❝কেঁদে কিচ্ছু হবে না, আফনিন। একবার ফেইল এসেছে তো কি হয়েছে? জীবন কি শেষ হয়ে গেছে? তুই আগামীবছর আবার পরীক্ষা দিবি। আমার বিশ্বাস তুই পাশ করবি।❞
তবুও মন মানে না আফনিনের। কান্নার বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে মুহুর্তে মুহুর্তে। পরিবারের এত বোঝানোতেও কাজ হচ্ছে না। মায়ের পর এবার অহনা বলল,
❝একটা বিষয়েই ফেল এসেছে। ভালোভাবে পড়াশোনা কর। মনোযোগ দিয়ে পড়লে আগামী বছর নিশ্চিত পাশ আসবেই।❞
আফনিনের পাশের বাসা থেকে প্রতিবেশী এসেছে। আফনিনের কান্নারত মুখটা দেখে মনে মনে মনে বেজায় খুশি। তোষামুদে হেসে বলল,
"আফনিনের তো আজ রেজাল্ট দিয়েছে, তাই না? তা কি পেলো ও?❞
আফনিনের কাছে এর উত্তর নেই। মুখ ফুটে কিছু বলার ভাষাও নেই। ওর হয়ে উত্তর দিলো অহনা। থমথমে কন্ঠে বলল,
❝একটা বিষয়ে ফেইল এসেছে। আগামীবছর আবার পরীক্ষা দিবে ও।❞
হতভম্ব হলেন উনি। বিস্মিত স্বরে বললেন,
❝আবার পরীক্ষা দেওয়াবে? এবার ফেল করলে পরেরবার পাশ করবে নাকি? এসব পড়াশোনা বাদ দিয়ে, বিয়ে দিয়ে দাও। মেয়েদের পড়াশোনার এত কি দরকার?❞
আফনিনের মা বললেন,
❝মেয়েটা আমার। অন্যের মেয়েকে পড়াশোনা করাবে নাকি বিয়ে দিবে, অন্যের মেয়ে পাশ করেছে না ফেল করেছে সেটা জেনে আপনার এত কি দরকার?❞
যেমন প্রশ্ন সেরকম তার উত্তর। অপমানে কালো হয়ে গেলো সেই প্রতিবেশীর মুখ। কথা না বাড়িয়ে দ্রুত বিদায় নিলো সেখান থেকে। নিজের পরিবারের এতখানি ভালোবাসা ও সাপোর্ট পেয়ে অভিভূত আফনিন। রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় যতটা খারাপ লাগছিলো, সেই খারাপ লাগা অনেকাংশে কমে গেলো। তার পরিবার ভিন্ন। সমাজের আরও চেনা-অচেনা পরিবার থেকে ভিন্ন। যেখানে লোকের কথা না ভেবে, নিজের মেয়ের কথা ভেবেছে। ভেবেছে মেয়ের ভবিষ্যতের কথা। এরকম পরিবার কয়টা মেয়ের ভাগ্যে জোটে?
********
পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো বছর। নিজের পরিবারের বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছে আফনিন। পরিবারের অনুপ্রেরণায় পুনরায় পরীক্ষায় বসেছিলো ও। পাশও করেছিলো। সেই এসএসসি পরীক্ষায় ফেইল হওয়া ছিলো আফনিনের জীবনের চরম শিক্ষা। জীবনে মানুষ চিনতে এরকম কিছু শিক্ষার প্রয়োজন হয়। আফনিনও চিনেছে। চিনেছে সমাজে ভালো মানুষের মুখোশধারী, অথচ খারাপ চাওয়া মানুষদের। চিনেছে কিছু অতি আহ্লাদ দেয়া আত্মীয়দের, যারা এই রেজাল্টের কারণে তাকে লাঞ্চনা করেছে। সবকিছুর ভিড়ে পরিবারটাই ছিলো তার শক্ত অনুপ্রেরণা। তাদের জন্যই আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে ও। পড়াশোনা করেছে। নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন একটা প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরী করে ও।
একদিন ছুটির আগ-মুহুর্তে ব্যাংকে ঢুকলো একটি মেয়ে। বয়সের তুলনায় বার্ধক্য যেনও ঘিরে ধরেছে তাকে। এক দেখায় মেয়েটাকে চেনা ঠেকলো আফনিনের কাছে। কিছুক্ষণ ভাবতেই মনে পড়লো, এই তো তার সহপাঠী নওমী। এসএসসিতে ফেল করার অপরাধে যার বিয়ে দেয়া হয়েছিলো ত্রিশোর্ধ পুরুষের সাথে। সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে, সমাজের কথা মেনে চলতে গিয়ে মেয়ের জীবনটাকে বিষিয়ে দিয়েছে নওমীর মা। পড়াশোনাটা আর করা হয় নি। স্বামী-সংসারেই ব্যস্ত হয়েছে নওমী। এরমধ্যেও ছিলো কাজে উনিশ থেকে বিশ হলে শাশুড়ীর অকথ্য নির্যাতন। অপরিপক্ক অবস্থায় গর্ভধারনে অল্প বয়সেই শরীরে বাঁধা বেসেছে নানান শারীরিক জটিলতা। একটা বিষয়ে মাত্র দুই মার্ক কম পাওয়ায় পুরো জীবনটা তার এক নিমিষেই বদলে গেলো!
আফনিন নওমীর অবস্থা দেখে অবাক। নিজে থেকেই এগিয়ে গেলো নওমীর কাছে। দু'চারটে কথা শেষে একপ্রকার পালিয়ে বাঁচলো নওমী। নওমী লুকালেও ওর মুখ দেখেই আফনিন আন্দাজ করলো সুখে নেই ও। কত ঝড় গিয়েছে মেয়েটার উপর অজানা নয়। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আফনিনের। নিজমনে ভাবলো,
❝কি এমন হতো, যদি নওমীর পরিবারটা আমার পরিবারের মতো হতো? কি এমন হতো, যদি ওর পরিবারও ওকে সাপোর্ট দিতো? তাহলে হয়তো মেয়েটার সুন্দর ভবিষ্যৎ অচিরেই নষ্ট হতো না!❞