প্রকাশকালঃ মে ৪, ২০২৬
নিজের টিউশনের শিক্ষক রোহান স্যারের সাথে বিয়ের কথা-বার্তা চলছে শুনে মনে মনে লাড্ডু ফুটতে শুরু করলো কবিতার। তবে উপর উপর একটা লাজুক ভাব ধরে রাখলো। আজ সন্ধ্যায় রোহানের মা-বাবা এসে কথা পাকা করে গিয়েছেন। রোহান আসে নি তাদের সাথে। বিয়ের কথাটা জানে কি না, সেটা সম্পর্কেও অনিশ্চিত কবিতা।
ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে উঠার পর, গত ছয় মাস ধরে রোহানের কাছে প্রাইভেট পড়ছে কবিতা। মূলত পূর্বপরিচিত থাকার কারণে কবিতার বাবা-ই রোহানকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন কবিতাকে পড়ানোর। কবিতার বাবার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে রোহান। হিসেবে কবিতার দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই হয়৷ কিন্তু রোহানের আচরণে কোনোদিনও মনে হতো না, তারা আদ্যো কাজিন। ভীষণ চাপা স্বভাবের ছেলে সে। আরও অনেকগুলো দিক যাচাই-বাছাই করে কবিতার বাবা রোহানের সাথেই মেয়ের বিয়ে দেয়ার চিন্তা করে রেখেছিলেন৷ এতদিন অপেক্ষায় ছিলেন পড়াশোনা শেষ করে রোহানের একটা চাকরী হওয়ার। সেই অপেক্ষা শেষ হতেই এক মুহুর্ত দেরি করেন নি!
রোহান মাথা নিচু করে ঢুকতো আর পড়া শেষে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যেত। এরকম ভদ্র ছেলে সচারাচর দেখা যায় না। ওর সেই ব্যক্তিত্বের কারণেই কবিতা আস্তে-আস্তে প্রেমে পড়েছিলো রোহানের। কিন্তু প্রকাশ করতে ছিলো বিস্তর আপত্তি। ভেবেছিলো, তার এই অপ্রকাশিত ভালোবাসা বুঝি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন সেটা অপ্রত্যাশিত পূর্ণতায় রুপ নিয়ে নিলো!
বিয়ের কথা পাকা হতে না হতেই দু'সপ্তাহের ভেতর বিয়ে হয়ে গেলো রোহান ও কবিতার। মাসের সেদিন পাঁচ তারিখ। বাসরঘরে বড়সড় ঘোমটা টেনে বসে আছে কবিতা। মনের মধ্যে আনন্দ, ভয়, লজ্জা সবকিছুর মিশ্র এক অনুভূতি কাজ করছে। তার অনুভূতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে শেরওয়ানি পরিহিত ভদ্র গোছের ছেলেটা ঘরে ঢুকলো। কবিতা গুটিয়ে গেলো আরেকপ্রস্থ। ঘোমটা টেনেটুনে পারে না পুরো নিজেকেই আবৃত করে ফেলে ওড়নার আড়ালে।
রোহান দরজা বন্ধ করে এসে টেবিলের কাছে এসে পকেট থেকে ফোন, মানিব্যাগ সব বের করে সেখানে রাখলো। এরপর ক্লান্ত ভঙ্গিতে বিছানায় এসে বসে বলল,
"এত ভারী বেনারসি এখনো পড়ে আছো? তোমার অস্থির লাগছে না? তার উপর এত বড় ঘোমটা টানা। গরমে তো অবস্থা কাহিল হয়ে যাবে।"
নিরামিষ বরের কথাগুলো শুনে ভীষণ হতাশ হলো কবিতা। ভেবেছিলো, রোহান বিয়ের পর অন্তত একটু রোমান্টিক হবে! কিন্তু তার আশায় পুরোপুরি পানি ঢেলে রোহান ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। এমনকি নতুন বউয়ের ঘোমটা অব্দি তুলল না!
শেষে অধৈর্য হয়ে কবিতা নিজেই ঘোমটা খুলে তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে বলল,
"রোহান ভাইয়া, বিয়ের রাতে নতুন বউকে কেউ এসে এগুলো বলে?"
রোহান ফটাফট জবাব দিলো,
"নতুন বউকে এসে কি বলতে হয়, তা তো আমার জানা নেই। আমি তো আগে কখনো বিয়ে করিনি। এটাই প্রথম।"
কবিতা বিরক্ত ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"আপনার বিবাহিত কোনো বন্ধুর থেকেও কোনোদিন শুনেন নি? এখন আমাকে শিখাতে হবে?"
রোহান প্রতিত্তোরে বলল,
"যেভাবে হঠাৎ করে বিয়েটা হয়ে গেলো, বিবাহিত বন্ধুর থেকে জানার সুযোগ কোথায়? আচ্ছা, তুমিই বলে দাও।"
কবিতা মুখ গোমড়া করে বলল,
"বিয়ের রাতে নতুন বউকে অন্তত একটা উপহার দিতে হয়। এনেছেন সেটা? নাকি তাও জানতেন না?"
রোহান মুখশ্রীতে এমন এক ভাব ধরলো, যেন উপহার কি জিনিস, সেটাই সে জানে না! ভাবখানা এমন, হঠাৎ এতকিছুর আয়োজনে রোহানের খেয়ালেই ছিলো না উপহারের কথা৷ অন্ততপক্ষে নতুন বউয়ের জন্য একটা উপহার আনা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু চাপে পরে সেটাও পূরণ করতে পারে নি।
মনের কথা মুখে প্রকাশ করলো না রোহান। উদ্ভট এক বাহানা দাড় করালো কবিতার সামনে,
"এই মাসে তো টিউশনের বেতনটাই পেলাম না। বেতন পেয়ে গেলেই তোমাকে গিফট এনে দিবো।"
কবিতা হতভম্ব, হতচেতন। বিয়ে উপলক্ষে তার বাবার অনেক বেশিই খরচ করতে হয়েছে। উপরন্তু তিনি ভেবেছিলেন, যার কাছে মেয়ে বিয়ে দিচ্ছে তাকে আবার কিসের বেতন দিবেন?
আর রোহান বিয়ের প্রথম রাতেই কবিতাকে বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে ছেড়েছে, এই কথা বলে।
কবিতা নিজেকে আটকাতে না পেরে বলে ফেলল,
"এখন থেকে আমি আপনার বউ। আর আপনি বউকে টিউশন পড়ানোর টাকা খুঁজছেন?"
রোহান জ্বিভে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
"আচ্ছা, বউ হলে টিউশন ফি নেয়া যায় না? জানতাম না। আসলে আগে কখনো বিয়ে করিনি তো!"
একটা মানুষ সহজ-সরল হতে পারে। তাই বলে এত?কবিতার পক্ষে আর নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। লজ্জা, আনন্দ সব অনুভূতি জানালার বাইরে ছুড়ে ফেলে বিছানা থেকে নেমে পড়লো সে৷ খুঁজে খুঁজে রোহানের মানিব্যাগ নিয়ে সেখান থেকে গতমাসের টিউশনের টাকাটা বের করে রোহানের হাতে তুলে দিলো। রাগান্বিত স্বরে বলল,
"বাবার দায়িত্ব শেষ, বরের দায়িত্ব শুরু৷ টিউশনের টাকা এবার বরের মানিব্যাগ থেকে খসিয়ে দিয়েছি। এবার গিয়ে গিফট নিয়ে আসুন, তারপর ঘরে ঢুকতে দিবো।"
রোহান হাসি চেপে বলল,
"আমার টাকা আবার আমাকেই দেয়া হচ্ছে? এটা কেমন কথা!"
কবিতা ঝাড়ি মেরে বলল,
"এটাই কথা। এবার বের হন রুম থেকে।"
কবিতার রাগের বিপরীতে রোহান শান্ত স্বরে বলল,
"আচ্ছা আচ্ছা। বলো কি গিফট চাই?"
কবিতা ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই বলল,
"যেকোনো কিছু। একটা ফুল হলেও চলবে।"
বলতে দেরি হলো, রোহানের টেবিলের এক চিপা থেকে দুটো গোলাপ আর দুটো চকলেট বের করে আনতে দেরি হলো না। পরপর সেটাকে কবিতার হাতে গুজে দিয়ে বলল,
"আপাতর আমার সামর্থ্যে এতটুকুই আছে। জানোই তো, সবে চাকরীতে জয়েন করেছি। প্রথম-প্রথম এভাবেই ম্যানেজ করতে হবে তোমাকে। পারবে?"
রোহান গিফটের কথা মনে রেখেছে ভেবেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো কবিতা। বুঝতে পারলো, রোহান এতক্ষণ মজা করছিলো।
মনে হচ্ছে খুশিতে এখনই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলবে কবিতা। সে অশ্রু সংবরণ করে বলল,
"পারবো। শুধু এভাবে মনে রাখলেই হবে!"
রোহান পুনঃবার বলল,
"পারতে হবে। তোমার বাবা গতমাসের টিউশনের টাকাটা দেয়নি আমায়।"
কবিতা মেকি রাগ দেখিয়ে বলল,
"আপনি এখনো ওটা নিয়ে পড়ে আছেন?"
রোহান অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
"কি বলো? ছেড়ে দিবো নাকি?"
কবিতা রোহানের দিকে তাকিয়ে হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,
"ইতিহাসে লেখা থাকবে এমন বিবাহের বর, যে বাসর রাত্রে নিজের বউয়ের কাছ থেকে টিউশনের ফি চায়!"