প্রকাশকালঃ মে ৫, ২০২৬
-"তুমি সত্যিই চইলা যাবা?"
-"হ্যা।"
-"ফিরা আইবা কবে?"
-"দুই বছর সময় লাগবো। এরপর আইসাই তোমারে বিয়া করমু।"
-"সত্যিই আইবা তো আমার কাছে? নাকি বিদেশেই কাউরে বিয়া কইরা সংসার কইরা ফেলবা?"
-"কি যে কও না, মধু। তোমারে ছাড়া আর কাউরে বিয়া করতে পারমু আমি? এ যে অসম্ভব।"
মধু হাসলো একটু। অপার বিশ্বাস থাকলেও কিশোরীমনের শঙ্কা পুরোপুরি দূর হলো না। বিচ্ছেদপূর্ব তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না ইশতিয়াকের দিকে। মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে রইলো বয়ে চলা নদীর পানে। আর ইশতিয়াক মন ভরে দেখতে লাগলো তার কিশোরী প্রেমিকাকে।
গ্রামের সাধারণ পরিবারের ছেলে-মেয়ে দু'জনেই। মধুমিতা সবেমাত্র পনেরোতে পা দিয়েছে। সে-কালে মেয়েদের এই বয়সে সংসার পাঁতার উপযুক্ত মনে করেই পিতা-মাতারা বিয়ে দিয়ে দিতো দ্রুতই। এই আবেগের উড়ু-উড়ু বয়সেই ইশতিয়াক রেজার প্রেমে পড়লো মধুমিতা।
ইশতিয়াকের তখন সবে বাইশ বছর। মা-বাবা চেষ্টা করছিলেন, ছেলেকে বাইরের দেশে পাঠানোর। এদিক-সেদিক থেকে ঋণ করে শেষমেশ ছেলের বিদেশ যাত্রার ব্যবস্থা করতে সফল হলেন তারা। যেদিন রাতে ইশতিয়াকের যাওয়ার কথা, সেদিন বিকেলেই সে লাল টুকটুকে সুতোর কারুকাজ করা একটা ওড়না নিয়ে হাজির হলো মধুমিতার সামনে। জানালো বিদেশ গমনের খবর।
মধুমিতার মন খারাপ দেখে ইশতিয়াক বলল,
-"মধু, মন খারাপ করো ক্যান? আমার তো যাওন লাগবোই। তুমি এমনে বেজার মুখে আমারে বিদায় দিবা? তাইলে কি আমার যাত্রা ভালো হইবো, কও? হাসি-খুশি বিদায় দিবা। তাইলে দেখবা, আমি জলদিই সফল হমু। এরপর আইয়া তোমারে আমার বউ বানামু। অপেক্ষা করবা না আমার লেগা?"
মধু জানে, এই অপেক্ষা তার জন্য বিষাক্ত হবে। তার মা-বাবা এখনই তাকে বিয়ে দিতে চাচ্ছে। সৎ মা যখানে এখনই তাকে বিদায় দিতে চাচ্ছে, সেখানে দু'বছর বিয়ে আটকে রাখা বড় মুশকিল বিষয়। তবুও ইশতিয়াককে চিন্তায় ফেলতে চায় না সে। তাই আশ্বাস দিয়ে বলল,
-"তুমি চিন্তা কইরো না। আমি তোমার লাইগা অপেক্ষায় থাকমু। যতদিন না আইবা, অতদিন।"
ইশতিয়াক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মৃদু হাসলো। হাতে থাকা ওড়নাটা খুলে মধুমিতাকে পড়িয়ে দিলো, একদম বউয়ের মতো করে। এরপর তার থুতনিটা একটু উঁচু করে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকে পরখ করে ইশতিয়াক বলল,
-"তোমারে পুরা বউ বউ লাগতাছে। আমার বউ। আজকে খালি এই লাল ওড়নাটাই তোমারে দিয়া গেলাম। যেদিন আমি ফিরা আমু, তোমার লেগা লাল টুকটুকে শাড়ি আনমু। ওই শাড়ি পইড়া তুমি আমার বউ সাজবা। আমি তোমারে বিয়া কইরা বাসায় নিয়া আমু। এরপর আমি তোমারেও বিদেশ নিয়া ঘুরামু। কি, এইবার খুশি তো?"
মধুমিতা উপর-নীচ মাথা নাড়লো। চোখে জল নিয়ে হাসলো। বলল,
-"সাজমু। তোমার লেইগাই বউ সাজমু। তোমারে যে আমি ভালোবাসি।"
ইশতিয়াক মধুমিতার মুখখানা নামিয়ে এনে কপালে চুমু খেলো। বিচ্ছেদের বিষাদে বুক ভারী হলেও প্রকাশ করছে তারা। অথচ বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে তাদের বিচ্ছেদের বার্তায়।
মধুমিতা আবারও বলল,
-"আমারে রাইখা যাইতাছো, ভালো কথা। প্রত্যেক মাসে একটা কইরা চিঠি দিবা কিন্তু। নাইলে তোমার লগে কথা নাই।"
ইশতিয়াক প্রতিত্তোরে বলল,
-"দিমু। প্রত্যেক মাসে-মাসে আমি তোমারে চিঠি লিখমু। তুমিও লিখবা, কেমন?"
মধুমিতা সম্মতি জানালো। আবদার করলো,
-"একবার ভালোবাসি কও।"
ইশতিয়াক হেসে ফেলল এই আবদারে। দু'ফোটা চোখের জলও নেমে এলো অজান্তেই। খানিকটা উঁচু আওয়াজেই বলল,
-"ভালোবাসি, ভালোবাসি। আমার মধুরে আমি অনেক ভালোবাসি।"
**********
চিঠিপ্রেমেই কেটে গেলো তাদের দু'বছর। ইতোমধ্যে মধুমিতার বাবা অনেক প্রস্তাব এনেছেন বিয়ের। মধুমিতা এক না এক বাহানায় কাটিয়ে দিচ্ছে সবগুলো। প্রেমের কথা জানায়নি বাসায়। এভাবেই পার করলো দু'টো বছর।
শেষের চারমাস অনবরত চিঠি লিখেছে ইশতিয়াক। কিন্তু বিপরীতপক্ষ থেকে কোনো জবাব আসেনি। ইশতিয়াক চিঠি লিখেই গেছে আর অপরপক্ষ নীরব থেকেছে।
এইসব ভাবনা-চিন্তায় ডুবেই ইশতিয়াক হবু বউয়ের জন্য পছন্দের লাল টুকটুকে শাড়ি কিনলো। বাসায় মা-বাবা, ভাই-ভাবী, ভাতিজা সবার জন্যই টুকটাক জিনিসপত্র কিনে ফিরে এলো দেশে। এবার মধুমিতার কাছে ফেরার পালা।
এতদিন পর ইশতিয়াক দেশে ফিরেছে, আশে-পাশের অনেক প্রতিবেশী চলে এসেছে দেখা করতে। কিন্তু মধুমিতার দেখা নেই। তাহলে কি সে খবর পায়নি? নাকি খানিক অভিমান জমিয়ে নদীর পারে বসে আছে?
সকলকে একপ্রকার উপেক্ষা করে নদীর ধারে চলে এলো ইশতিয়াক। নাহ, মধু উপস্থিত নেই সেখানে। এরপর কেবল একটাই পথ বাকি, মধুর বাসায় যাওয়া।
ইশতিয়াক ভয়-ডরহীন এসে হাজির হলো মধুমিতার বাড়ির সামনে। কিন্তু তাদের বাড়িটাও খালি পড়ে আছে। ভেতরে কারো উপস্থিতি টের পাওয়া গেলো না। ইশতিয়াক ডাকলো কয়েকবার, তবুও না।
এদিকে তার কন্ঠস্বর শুনে মধুমিতার এক প্রতিবেশী বেরিয়ে এলো। মধুমিতার সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিলো তার। এসে ইশতিয়াককে জিজ্ঞেস করলো,
-"ভালো আছেন, ভাইয়া?"
ইশতিয়াক পরিপূর্ণ শুদ্ধ ভাষায় বলল,
-"আমি ভালো আছি। মধু কই?"
প্রতিবেশী মেয়েটার মুখের হাসি মিলিয়ে গেলো। আমতা-আমতা করে বলল,
-"মধুরা তো আর এই গেরামে থাহে না। ওরা অনেকদিন আগেই অন্য গেরামে চইলা গেছে। আর.. আর মধু আপনার লেগা একটা জিনিস রাইখা গেছে। আমারে কইছিলো, আপনে দেশে আইলে যেন আপনারে দেই।"
-"নিয়ে আসেন।"
ইশতিয়াক অনুমতি দিতেই রিমা ছুটে বাড়িতে ঢুকলো। বেরিয়ে এলো মাঝারী সাইজের একটা বাক্স হাতে। এনে সেটা বাড়িয়ে ধরলো ইশতিয়াকের দিকে।
বাক্সটা নিতে গিয়ে ইশতিয়াক টের পেলো, তার হাত কাঁপছে। অজানা আশঙ্কায় ধড়ফড় করছে বুক। গলবিল শুকিয়ে এসেছে। সে শুকনো ঢোক গিলে বাক্সটা খুলল। ভেতরে তার দেয়া সেই লাল ওড়নাটা। সাথে একটা ছোট্ট চিরকুট। ভাজ খুলে পড়তে গিয়ে ঝাপসা হয়ে এলো ইশতিয়াকের দু'চোখ। সেথায় অপটু হাতে লেখা কিছু শব্দ,
❝এই লাল ওড়না তুমি আমারে দিছিলা আর কইছিলা, আমি তোমার বউ হমু। সত্যিই লাল শাড়ি পইড়া বউ সাইজা তোমার বাড়িতে যাওয়ার শখ ছিলো আমার। কিন্তু সেটা হইতেছে না।
আম্মা-আব্বায় তোমার চিঠি পইড়া ফালাইছিলো। আমি তাগোরে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করছি। তারা মানে নাই। তারা এহন আমারে অন্য কারো লগে বিয়া দিতে চায়। কিন্তু আমি তোমারে ছাড়া কাউরে বিয়া করতে পারমু না, ইশতিয়াক।
লাল শাড়ি পইড়া তোমার বউ হইয়া যাওনের কথা ছিলো তোমার ঘরে..
অথচ আমি সাদা কাপড়ে নিজেরে জড়াইয়া যাইতাছি কবরে..
ভালো থাইকো। আর হুনো, তোমার মধুও তোমারে অনেক ভালোবাসে।
ইতি,
তোমার মধু।❞
মধু নেই। এই পৃথিবীতে মধুর অস্তিত্ব নেই। কথাটা মানতে গিয়েই মস্তিষ্ক ঘোলা হয়ে এলো ইশতিয়াকের। যাকে এতদিন ধরে বউ সাজে দেখার শখ করলো, তাকে আর দেখা হবে না। কোনোদিনও না। অপূর্ণ থেকে গেছে তাদের ভালোবাসা।
ইশতিয়াকের মুখে একটাও শব্দ নেই। নিঃশব্দে অশ্রু ঝরাচ্ছে কেবল। রিমা তাকে দেখে বেশ মন খারাপ করে বলল,
-"মধুরে জোর কইরা বিয়া দিতে চাইছিলো। মধু রাজি হইতে চায় নাই, আপনারে চিঠিও দিতে চাইছিলো। কিন্তু ওর বাপে ওরে সুযোগ দেয় নাই। ঘরে বন্ধ কইরা রাখছিলো মধুরে। অনেক মারছিলোও। জানেনই ওর সৎ মা-য় কেমন আছিলো। পরে আর কী.. বিয়ার আগেরদিন আমি মধুর লগে দেখা করতে গেছিলাম। ওয় আমারে এই বাক্সটা দিয়া কইলো, আপনি আইলে যেন দিয়া দেই। ওইদিনই মধু আত্মহত্যা করে।"
বড় করে শ্বাস ফেলল ইশতিয়াক। জিজ্ঞেস করলো,
-"মধুর কবরটা কই?"
রিমা নিজের স্বামীকে ডেকে বলল মধুর কবরটা দেখিয়ে দিতে। ভদ্রলোক ইশতিয়াককে নিয়ে গেলেন গ্রামের কবরস্থানে। একটা নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে বলল,
-"ওইডাই মধুর কবর। ওনেই দাফন করছে ওরে। পরে ওর সৎ মা আর বাপ গ্রাম ছাইড়া অন্য গ্রামে গেছে গা। ওগো আর খোঁজ নাই।"
ইশতিয়াক বসে পড়লো মধুর কবরের পাশে। শুকনো মাটিতে হাত বুলিয়ে বলল,
-"তুমি যেমন আমারে ছাড়া অন্য কাউরে বর মানো নাই, আমারে ছাইড়া গেলা, তাও মানো নাই। আমিও ওয়াদা করতাছি, তোমারে ছাড়া অন্য কাউরে আমি আমার বউ বানামু না। যেই লাল শাড়ি আমি তোমার লেগা আনছিলাম, ওইটা তুমি ছাড়া কেউ পড়তে পারবো না, কেউ না।"
ইশতিয়াক বেশ অনেকক্ষণ বসে কাঁদলো সেখানেই। সন্ধ্যা পড়তেই রিমার স্বামী আজাদ বলল,
-"উঠেন ভাই, রাইত হইতেছে। বাসায় যান। মধুর ঘরের কেউ তো আর রইলো না। আপনেই না হয় একটু ওর কবরটা জিয়ারত করতে আইসেন।"
চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো ইশতিয়াক। মাগরিবের আজানের পর বাসায় ফিরলো সে। বাড়ির সকলে তখন উৎকণ্ঠিত, চিন্তিত। ইশতিয়াকের মা জিজ্ঞেস করলো,
-"কই ছিলি, বাবা? এতক্ষণ ধইরা তোর কোনো খোঁজ নাই।"
ইশতিয়াক লাল শাড়িটা বের করে দেখালো পরিবারের সবার সামনে। বলল,
-"এডা আমি মধুর লেগা আনছিলাম। ওয় তো কোনোদিনও পিনতে পারবো না। হুনো, এডা আমি আর কাউরে দিমু না। কোনোদিনও না।"
পরিবারের সকলে যা বুঝার বুঝে গেলেন। মুখে রা' নেই কারো।
ইশতিয়াক শেষ পর্যন্ত নিজের কথা রেখেছিলো। তার মধুকে দেয়া ওয়াদা পালন করেছে।