প্রেমরঙা ক্যানভাস

লেখিকাঃ তিয়াশা চৌধুরী

প্রকাশকালঃ মে ১০, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

-❝পাপা, রাত আটটার পর বাসায় আসলে ভেতরে ঢোকা নিষেধ। জানো না তুমি?❞

ছোট্ট ছোট্ট দু'হাত কোমড়ে রেখে গুরুগম্ভীর ভঙ্গিমায় বাপকে শাসন করছে ফারিশা। ডায়লগটা অবশ্য তার মায়ের শিখিয়ে দেয়া।

ফাইজান অফিস থেকে বাড়িতে ফিরেছে রাত্রি নয়টায়। ফারিশা ভালো করেই জানে, এটা তার বাবার বাড়ি ফেরার সময়। তাই অপেক্ষায় থাকে, কখন কলিংবেলের শব্দ পাবে আর ছুট লাগাবে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। পা দু'টো যথাসম্ভব উঁচু করে নব ঘুরিয়ে দরজা খুলেছে। দরজা খুলতে দেরি, তবে মায়ের শেখানো বুলি আওড়াতে এক মুহুর্ত দেরি নয়।

তিয়াশা চৌধুরী এর লেখা অনুগল্প প্রেমরঙা ক্যানভাস এর ইমেজ

মেয়েকে ভুজংভাজাং শিখিয়ে শায়রা নিজেও রুম থেকে বেরিয়ে দরজার কাছেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। মালেকা বেগমও বেরিয়েছেন। দেখছেন নাতনীর শাসন করা।

ফাইজান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মেয়ের ভাব-ভঙ্গি দেখলো। এরপর তাকালো বউয়ের দিকে। শায়রা ঠোঁট উল্টিয়ে বোঝালো, সে কিছু জানে না। ফাইজান পরপর আবার মেয়ের দিকে চেয়ে দাঁতে জিভ কাটলো। কানে ধরে হাঁটু গেড়ে বসলো মেয়ের সামনে। অনুতপ্ততার সুরে বলল,

-"বিরাট বড় ভুল হয়ে গেছে, আম্মা। এর জন্য কি শাস্তি দেবেন? যা শাস্তি দেবেন তাই মাথা পেতে নিবো। তাও অন্তত ঘরে ঢুকতে দেন।"

ফারিশা ভ্রুদ্বয় কুঁচকে বলল,

-"তোমার শাস্তি হচ্ছে আমাকে চকলেট এনে দিতে হবে আর আম্মুকে ফুচকা। তাহলেই ভেতরে ঢুকতে দিবো।"

তৎক্ষনাৎ ফাইজানের নজর ঘুরে এলো শায়রার উপর থেকে। এতক্ষণে ভেবেই নিয়েছিলো ফারিশাকে এসব শিখিয়ে দেয়ার কাজ শায়রার। এখন তো শতভাগ নিশ্চিত।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল বেচারা। পকেট থেকে দুটো বড়বড় ডেইরি মিল্কের প্যাকেট বের করে মেয়ের হাতে দিয়ে বলল,

-"এই নাও, আম্মাজান। তোমার আম্মুর ফুচকাও এনে দিবো। এবার ভেতরে ঢুকতে পারি?"

বাচ্চা মেয়েটা চকলেট পেয়েই খুশিতে লাফিয়ে বাপের কোলে উঠে গেলো। মায়ের শেখানো কাহিনি বেমালুম ভুলে বসলো। ফাইজান ওকে কোলে নিয়েই এসে বসলো সোফায়। মালেকা বেগম দরজা বন্ধ করে গেলেন ওদের কাছে। সাথে শায়রাও।

ফারিশা আধো বুলিতে কি যেন বলছে ফাইজানকে। ফাইজানও খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে। ওর কথা শেষে ফাইজান বলল,

-"আম্মু, তোমার চকলেট এনে দিয়েছি না? এবার পাপাকে একটা পাপ্পি দাও।"

ফারিশা খুব আহ্লাদ করে বাবার দু'গালেই চুমু খেলো সঙ্গে সঙ্গে। তা দেখে শায়রা মন খারাপ করে বলল,

-"যাহ বাবা! সব ভালোবাসা বাবার জন্য? মা কি দোষ করলাম?"

ফারিশা হাত বাড়িয়ে ইশারায় বুঝালো, শায়রাকে কাছে ঝুঁকতে। শায়রা মুচকি হেসে ঝুঁকতেই তারও দু'গালে চুমু দিলো ফারিশা। বিনিময়ে মেয়ের গাল চেপে ধরে একইসাথে দু'জনেই চুমু দিলো দুই গালে।

মালেকা বেগম গাল ফুলিয়ে বললেন,

-"তোদের আদর-আহ্লাদ হলে এবার ফারিশাকে আমার কাছে দিয়ে ফ্রেশ হতে যা, ফাইজান।"

ফারিশাও বুঝলো বাবাকে ফ্রেশ হতে দেয়া উচিত। তাই ভদ্র মেয়ের মতো লাফিয়ে উঠে গেলো দাদির কোলে। ফাইজান সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

-"ফ্রেশ আর কিভাবে হই? তোমার নাতনী কি শর্ত দিয়েছে দেখো না? ওর মা-কে ফুচকা না খাওয়ালে বাড়িতে প্রবেশ নিষেধ। আমি কি অমান্য করতে পারি?"

মালেকা বেগম নাক-মুখ কুঁচকে বললেন,

-"জীবনে মায়ের শাসনকে তো পাত্তা দাও নি। এখন চলো মেয়ের শাসনে। অক্ষরে অক্ষরে পালন না করলেই হয়েছে!"

ফাইজান হতাশ শ্বাস ফেলে বলল,

-"কি আর করবো? মেয়ে তো হয়েছে মায়ের মতো ভাঙা রেডিও। একজন চেঁচায় তো আরেকজন কাঁদে।"

শায়রা ঝগড়ার প্রস্তুতি নিয়ে মুখ খুলেছিলো সবে। বাঁধ সাধলো মালেকা বেগম। বললেন,

-"হয়েছে। এটা নিয়ে আর ঝগড়া করিস না তোরা। ফুচকা খেতে বাইরে না যাচ্ছিলি তোরা? যা, তাহলে। ফারিশা আমার কাছেই থাক।"

ফারিশাও রাজি দাদির কাছে থাকতে। এমনিতেও মা-বাবাকে জ্বালানোর মতো মেয়ে নয় ও। ফাইজান-শায়রা বাইরে গেলে ভালোভাবেই থাকে দাদা-দাদির কাছে। অনেকসময় দাদির থেকে গল্প শুনতে শুনতে ওদের ঘরেই ঘুমিয়ে পড়ে৷ তখন একটু একান্ত মুহুর্ত কাটানোর সময় পায় ফাইজান-শায়রা। নয়তো মেয়ের ব্যাপারে দু'জনেই বেশ সতর্ক।

*********

আধাঘন্টা সময় লাগিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে ফাইজান। ততক্ষণে শায়রা পুরোপুরি প্রস্তুত বাইরে যাওয়ার জন্য। ফাইজান ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে শায়রার রেডি হওয়া দেখে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,

-"কিরে? রাত-বিরেতে এত সেজেছিস কেন?"

শায়রা অবাক হয়ে বলল,

-"কেন মানে? আমাদের না বাইরে যাওয়ার কথা ছিলো?"

ফাইজান বলল,

-"ওটা তো ফারিশার সামনে ওকে বুঝ দিতে বলেছি। তাই বলে এত রাতে ফুচকা খেতে বাইরে যাবো নাকি? তুই পাগল, শায়ু?"

শায়রার হৃদয় ভীষণরকম আহত হলো। কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল,

-"তার মানে আমরা যাবো না? তুমি মিথ্যে আশা দিয়েছিলে আমাকে?"

ফাইজান ওর এরূপ ভাব-ভঙ্গি দেখেও নির্বিকার হয়ে বলল,

-"আরে বাবা, মিথ্যে আশার কি হলো এখানে? এটা ভাত খাওয়ার সময়। এত রাতে কে ফুচকা খেতে যায়? এছাড়াও সারাদিন অফিসে ব্যস্ত ছিলাম। ভীষণ ক্লান্ত আমি। এখন বাইরে যেতে পারবো না।"

দমে গেলো শায়রা। মন খারাপ করলো ভীষণ। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

-"আচ্ছা। তাহলে খেয়ে রেস্ট নাও তুমি। আমি খাবার রেডি করছি।"

ফাইজান ভ্রুদ্বয় দ্বিগুন কুঞ্চিত করে বলল,

-"এইভাবে সেজেগুজে কেউ খাবার রেডি করতে যায়? নিজেকে কি ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের নায়িকা মনে করছিস?"

শায়রা উত্তর দিলো না। নাক টেনে বিড়বিড়িয়ে বলল,

-"আপাতত ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের নায়িকাই মনে হচ্ছে। ওখানেও নায়করা নায়িকাকে পাত্তা দেয় না। আর এখন বাউন্ডুলেটাও আমাকে পাত্তা দিচ্ছে না। ও এত বদলে গেলো? আমার শখেরও কোনো দাম নেই ওর কাছে?"

ফাইজান তোয়ালেটা বারান্দায় রেখে শায়রার কাছে আসলো। দু'হাতে শায়রার গাল দুটো স্পর্শ করে বলল,

-"ফুচকা খেতে বাইরে যাবি?"

শায়রা না বোধক ইশারায় ঘাড় নাড়লো। ফাইজান পাত্তা দিলো না। বিপরীতে নিজেই বলল,

-"নিয়ে যাবো। তবে একটা শর্ত আছে।"

শায়রা অবাক দৃষ্টিতে তাকালো ফাইজানের দিকে। কৌতুহলী মন জানতে চাইলো ফাইজানের শর্ত। কোনোকিছু বুঝে উঠার আগেই হুট করে ফাইজানের অধরদ্বয় হামলে পড়লো শায়রার লিপস্টিক রাঙা ওষ্ঠপুটে।

কিছুক্ষণ বাদে ফাইজান সরে আসতেই লম্বা লম্বা শ্বাস নেয়া শুরু করলো শায়রা। লিপস্টিকের অবস্থা লেপ্টে গিয়ে নাজেহাল। এতক্ষণের দমবন্ধ অবস্থাটা সামলানোর চেষ্টা করছে। তৎক্ষনাৎ ফাইজান নির্লজ্জের মতো বলে বসলো,

-"যা হয়েছে, তার জন্য আই এম নট সরি।

তোকে এই লিপস্টিক লাগাতে কে বলেছে? এটার টেস্ট একদম ভালো ছিলো না৷ জলদি মুছ। নেক্সট টাইম থেকে এই লিপস্টিক আর লাগাবি না।"

শায়রার হতভম্বভাব তখনো কাটে নি। তন্মধ্যে ফাইজানের এমন কথায় বিস্ময়ের মাত্রা আকাশ ছুঁলো। চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করলো,

-"লিপস্টিকের টেস্ট ভালো না তো এতক্ষণ কিস করলে কেন?"

কিন্তু লজ্জার কারণে মুখ ফুঁটে আর সেটা বলা হয়ে উঠলো না। বাধ্য বউয়ের মতো মাথা নাড়লো স্রেফ। বুঝালো- এই লিপস্টিক আর লাগাবে না৷

ফাইজান বলল,

-"যেসব লিপস্টিকে আমার প্রবলেম নেই ওগুলো লাগাতে পারিস। প্রয়োজনে আমি আরও এনে দিবো।"

শায়রা চেষ্টা করেছিলো নিজের মুখটা বন্ধ রাখার। কিন্তু হলো কই? বেহায়া শব্দগুলো বেরিয়ে এলো মুখ ফঁসকে,

-"তুমি কি তাহলে লিপস্টিক টেস্ট করে তারপর এনে দিবে আমাকে?"

কথাখানা বলে নিজেই হতবিহ্বলতায় মুখ চেপে ধরলো শায়রা। ঢোক গিলল সঙ্গে সঙ্গে৷ ফাইজান অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওর দিক তাকিয়ে থেকে বলল,

-"তুই কি ভালো হবি না, শায়ু?"

শায়রা মাথা নিচু করে ওড়নায় আঙুল প্যাঁচালো। উত্তর দেয়ার মতো কোনো শব্দ খুঁজে পেলো না৷ অবশ্য এসব প্রশ্নের উত্তরও হয় না।

**********

গৃহযু*দ্ধ শেষে বহিঃযু*দ্ধ করতে বের হলো দু'জনে। রুমের ঘটনার পর আর লিপস্টিক লাগানোর সাহস করে নি শায়রা। এমনেই বেরিয়েছে৷ শায়রার পড়নে নীল রঙের থ্রি-পিস আর ফাইজানের গায়ে সাদা শার্ট। সাধারণ সাজে এক অসাধারণ দম্পতি।

বাড়ির গ্যারেজে এসে বাইকে উঠে বসলো ফাইজান। শায়রাও বসলো তার পেছনে। পরমুহূর্তেই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো ফাইজানকে। ছেলেটা খোঁচা মারতে দেরি করলো না,

-"বসতে না বসতে আমার মতো একটা অবলা ছেলের সাথে লেপ্টালেপ্টি শুরু করেছে!"

ফাইজান সবেমাত্র বাইক স্টার্ট দিয়েছিলো। শায়রা চেঁচিয়ে উঠলো তখনই,

-"এই, বাইক থামাও। আমি যাবো না তোমার সাথে।"

হকচকিয়ে বাইক থামিয়ে দিলো ফাইজান। শায়রাও নেমে গেলো সাথে সাথে। ফাইজান বলল,

-"কি হলো আবার?"

শায়রা তীক্ষ্ণ স্বরে উত্তর দিলো,

-"আমি জড়িয়ে ধরলে সেটা অবলা ছেলের সাথে লেপ্টালেপ্টি হয়ে যায়? আর নিজের বেলা?"

ফাইজান নেমে পড়লো বাইক থেকে। প্রতিত্তোরে বলল,

-"আমার উপর মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছিস কেন? আমি কি করেছি? আমার মতো নিষ্পাপ, অবলা ছেলের উপর মিথ্যা অপবাদ দিতে লজ্জা করে না তোর?"

শায়রা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

-"তুমি নিষ্পাপ? অবলা?"

ফাইজান পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,

-"অবশ্যই।"

শায়রা ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,

-"হ্যাঁ, তুমি তো অবলাই। কিচ্ছু জানো না। কিচ্ছু বুঝো না। ভাজা মাছও উল্টে খেতে জানো না। মেয়ে তো আমার আকাশ থেকে টপকেছে।"

ফাইজানের কথা-বার্তার লাইন আগেও ছিলো না, এখনও নেই। মাঝ দিয়েই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল,

-"মেয়ের কথায় মনে পড়লো। আচ্ছা, তোর মনে হয় না আমাদের মেয়ের আরেকটা সাথী দরকার?"

শায়রা এক মুহুর্তেই ইঙ্গিত ধরে ফেলল। পরপর অবিকল ফাইজানের মতো করে বলল,

-"ছিহ! যেখানে-সেখানে একটা মেয়েকে এরকম প্রস্তাব দিতে লজ্জা করলো না তোমার?"

ফাইজান বলল,

-"এ্যাই মুটকি! এইবার কিন্তু তুই আমার ডায়লগ নকল করছিস!"

শায়রা মুচকি হেসে বলল,

-"মিস্টার বাউন্ডুলে, বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে নিউটনের থার্ড ল'। অর্থাৎ- প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।"

ফাইজান বিতৃষ্ণায় নাক-মুখ কুঁচকে বলল,

-"নিউটন কোনটা? ওই আপেলওয়ালা? ধুর! জীবনে ভালো করে পড়াশোনাই করিনি, আবার নাকি আপেলওয়ালার সূত্র মুখস্ত রাখবো! তোর যে কি করে এতকিছু মনে থাকে, এটাই আমি বুঝি না।"

টাস করে কপালে বারি মারলো শায়রা। বলল,

-"হায় খোদা! নিউটনের মাথায় আপেল পড়েছিলো। সে তো আপেল বিক্রি করতো না৷ তুমি তাকে আপেলওয়ালা কেন বলছো?"

ফাইজান ভাব নিয়ে বলল,

-"আমি তো অন্তত সম্মান দিয়ে আপেলওয়ালা বলেছি। লোকে যে আরও কত কি বলে, তার হিসেব জানিস?"

শায়রা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

-"হয়েছে হয়েছে। এবার কি বাইরে যাবে? নাকি ডেটিং এই গ্যারেজ পর্যন্তই চলবে?"

ফাইজান বাইকে উঠতে উঠতে বলল,

-"হ্যাঁ, বস।"

ফাইজা বাইকটা স্টার্টও দিতে পারলো না, তার আগেই শায়রা ছুটে পালালো। অর্থাৎ পরিষ্কার, সে বাইকে যাবে না। অগত্যা ফাইজানকেও বাইক রেখেই বের হতে হলো।

পিচঢালা পরিষ্কার এবং শান্ত রাস্তা। সময় প্রায় দশটা বাজতে চলেছে বিধায় রাস্তাঘাটে মানুষ নেই বললেই চলে। খোলামেলা রাস্তায় ঠান্ডা বাতাস খানিক পরপরই ছুঁয়ে দিচ্ছে শরীর। চাঁদের ম্লান আলো ছড়িয়ে রয়েছে পথে-ঘাটে। তার মধ্যে দিয়ে খুব ধীরগতিতে সোজা হেঁটে যাচ্ছে শায়রা। ফাইজানও শায়রার পিছু-পিছু খানিকটা দূরত্ব রেখে হাঁটছে।

দু'জনের হাঁটার গতিই ক্ষীণ। যেন কোনো তাড়াহুড়ো নেই এই সময়টা পার করার। শায়রা হাঁটছে, আবার ক্ষণে ক্ষণে পিছু ঘুরে লক্ষ করছে ফাইজানের ভাব-গতিক। সে ছেলে দু'হাত পকেটে খুঁজে ভীষণ নিশ্চিন্তে অনুসরণ করে চলেছে বউকে। শায়রার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ দেখছে সূক্ষ্ম নজরে। তবে কে বলবে, এটা তার বউ? মনে তো হচ্ছে, ঠিক যেন স্কুল জীবনের প্রেমিক-প্রেমিকা দু'জনে। প্রেমিকা আগে আগে যাচ্ছে, আর প্রেমিক তার পিছু নিচ্ছে। এহেন মিষ্টি মুহূর্তে শুধু ফাইজানের হাতে একটা গোলাপ অনুপস্থিত।

সময়টা এখানেই থেমে গেলে কি খুব বেশি খারাপ হতো? হয়তো। এজন্যই বহমান সময় পেরিয়ে গেলো অনেকদূর। অবশেষে ফাইজান অধৈর্য হয়ে ডাক ছুড়লো,

-"এভাবেই সারারাত হাঁটবি নাকি?"

শায়রা ঘুরলো। দু'হাত পেছনে গুজে উলটোদিক হাঁটতে হাঁটতে বলল,

-"উহু। রিকশা নেবে? একটু দূরে কোথাও গিয়ে ফুচকা খেয়ে আসি?"

-"তুই এমন দূরত্ব রেখে চললে রিকশা নেবো কিভাবে? এমনভাবে দূরে দূরে আছিস, যেন আমি তো প্রেমিক। আমার কাছে আসা বারণ।"

শায়রা মুচকি হেসে বলল,

-"আমি তো আর তোমায় বারণ করিনি। তুমি তো কাছে আসতেই পারতে!"

তৎক্ষনাৎ আচমকা তীব্র শব্দে বিদ্যুৎ চমকালো। খালি রাস্তায় হঠাৎ এমন শব্দে ঘাবড়ে গেলো শায়রা। নিজেই ছুটে এলো ফাইজানের কাছে। বলল,

-"বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে। চলো বাসায় যাই। ফুচকা আরেকদিন খাওয়া যাবে।"

ফাইজান মাথা নেড়ে বলল,

-"উহু। বেরিয়েছি যখন, তো এমনি এমনি তো আর বাসায় যাচ্ছি না। আমরা রিকশা করে যাবো আর আসবো। বৃষ্টি নামার আগেই বাড়ি চলে আসবো।"

ফাইজানের কথার উপর আর না করলো না শায়রা। এমনিতে ওর নিজেরও প্রবল ইচ্ছা এই মুহুর্তটা দীর্ঘ করার। পারলে সারারাতই ফাইজানের হাত ধরে খোলা আকাশের নিচে ঘুরতো। কিন্তু সে সুযোগ হচ্ছে কই?

শায়রার ভাবনার মাঝেই দূর থেকে একটা রিকশা ডাকলো ফাইজান। রিকশা কাছাকাছি আসতেই আগে শায়রাকে হাত ধরে উঠালো সেথায়। এরপর নিজে উঠে একদম গা ঘেঁষে বসলো শায়রার।

দু'জনে রিকশায় চড়ে কাছাকাছি জায়গাগুলোতে একটা চক্কর কাটলো। ঘুরে-ফিরে এসে নামলো এক স্ট্রিটফুডের দোকানের সামনে। ফাইজান জোর করেছিলো রেস্টুরেন্টে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এক্ষেত্রে শায়রা ঘাড়ত্যাড়ামি করে এখানেই নেমেছে। এই ঘাড়ত্যাড়ামির মামলাতে আবার কেউ কারো থেকে কম নয়।

সুন্দর মুহুর্তগুলো যেন কেটে যায় খুব দ্রুতই। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। কিভাবে কিভাবে যে রাত্রি সাড়ে এগারোটা বেজে গেলো, টেরই পেলো না দু'জনে। খেয়ালে আসতেই ফিরতি পথ ধরলো।

রিকশায় উঠা মাত্রই আকাশ ফুঁড়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো ধরণীতে। ভিজিয়ে দিলো সারা শহর। হিমেল হাওয়া ও বৃষ্টির ফোঁটার সম্বনয়ে ঠান্ডা লাগতে শুরু করলো শায়রার। কাঁপতে কাঁপতে বলল,

-"উফফ! তোমার জন্য হয়েছে যত জ্বালা। বলেছিলাম, চলো বাসায় যাই। কিন্তু না। তুমি তো ঘাড়ত্যাড়ামি করবেই। দেখলে এখন? বৃষ্টি নেমে গেলো না?"

ফাইজান বলল,

-"বৃষ্টি পড়ছে, তোর শীত লাগছে আর তুই আমার উপর ঝাড়াঝাড়ি করছিস। এভাবে তোর ঠান্ডা লাগা কমবে?"

শায়রা বিরক্তির ভঙ্গিমায় বলল,

-"আবার কথা ঘুরাচ্ছো তুমি? বলতে চাচ্ছো, আমি বিনা কারণে ঝাড়াঝাড়ি করি? অথচ নিজের দোষের বেলায় তুমি কানা।"

ফাইজান ভ্রুদ্বয় কুঁচকে ফেলল। বলল,

-"বাইরে বের হতে চেয়েছিলো কে?"

শায়রা মুখের ডগায় এনে রাখা জবাবটা ফটাফট বলে দিলো,

-"তোমার মেয়ে। আমি কি একবারও বলেছিলাম, আমাকে বাইরে নিয়ে যাও? তোমার মেয়েই তো বলল। এটাতে আমার দোষ হলো?"

ফাইজান কটমট করে বলল,

-"তোর দোষ না হলে কি আমার দোষ? মেয়েকে এসব উদ্ভট শর্ত যে তুই শিখিয়ে দিস, এটা আমি জানি না ভেবেছিস? আজকেও ফারিশাকে তুই শিখিয়ে দিয়েছিলি।"

-"কোনো প্রমাণ আছে আমি শিখিয়ে দিয়েছি?"

শায়রা পালটা চেঁচালো। এখন আর তার শীত লাগছে না। ঝগড়া জমে গেছে দু'জনের। অবিরাম তর্ক-বিতর্ক চললে ঠান্ডা লাগার প্রশ্নই আসে না। আপাতত এমনিই পুরো রাস্তাটা পার করতে পারলেই হলো!

********

বারোটার খানিক আগে পুরো কাকভেজা হয়ে বাড়িতে ফিরেছে দু'জন। রিকশায় আসলে পানির ঝাপটা লেগে ভিজে যাওয়া স্বাভাবিক। মালেকা বেগম দরজা খোলামাত্রই দু'জনের এই অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলেন,

-"এ কি? দু'জনে তো পুরো ভিজে এসেছিস!"

ফাইজান ভিতরে ঢুকে চুলের পানি ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,

-"আর বলো না। আসার সময় রিকশাতে উঠেছি আর বৃষ্টি নেমেছে। রিকশাওয়ালাকেও ডাবল ভাড়া দিতে হয়েছে।"

মালেকা বেগম বললেন,

-"আচ্ছা আচ্ছা, এসব কথা বাদ দে। এখন দু'জনে গিয়ে ফ্রেশ হ। আর...."

ফাইজান মাঝপথেই জিজ্ঞেস করলো,

-'ফারিশা কই?"

মালেকা বেগম উত্তর দিলেন,

-"ফারিশা আর তোর আব্বু ঘুমিয়ে গেছে। এখন তোরা গিয়ে জামা-কাপড় পালটা। খেয়ে এসেছিস, নাকি খাবার বাড়বো?"

ফাইজান প্রশ্ন করলো,

-"তুমি খেয়েছো?"

-"হ্যাঁ, বাবা। আমি খেয়ে নিয়েছি। তোদের আসার কোনো ঠিক-ঠিকানা আছে নাকি? এখন তোরা খেলে আবার খাবার গরম দিতে হবে।"

ফাইজান মাথা নেড়ে বলল,

-"দরকার নেই। পেটে একদম জায়গা নেই। তোমার বউমা নিজে হরেকরকম স্ট্রিটফুড খেয়েছে, আবার আমাকেও জোর করে ঠুসিয়েছে। সাধে কি ওকে মুটকি বলি আমি?"

শায়রা মুখটাকে গোমড়া করে বলল,

-"মা, তোমার ছেলে আবার আমার স্বাস্থ্য নিয়ে খোঁটা দিচ্ছে।"

মালেকা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

-"এসব আর নতুন কি তোদের? এখন কি এসব নিয়ে ঝগড়া না করলে হয় না? আরে ঠান্ডা লাগবে তো দু'জনের।"

শায়রা বলল,

-"লাগুক ঠান্ডা। আগে তোমার ছেলের বিচার করো। ও আমাকে মুটকি বলল কেন? একদিন বাইরে খাইয়ে বিশ্ব উদ্ধার করে ফেলেছে?"

ফাইজান প্রতিত্তোরে বলল,

-"বিশ্ব উদ্ধার না করি, তোকে তো উদ্ধার করেছি নাকি? সবসময় খালি স্ট্রিটফুডের নেশা। এবার অসুস্থ হলে খবর আছে তোর!"

শায়রা কপালে বিস্তর ভাজ ফেলে বলল,

-"তুমি যেভাবে আমার খাবারে নজর দাও, তাতে আমার অসুস্থ হওয়াটাই কি স্বাভাবিক না?"

-"দেখ, শায়ু...."

হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন মালেকা বেগম,

-"চুপ কর দু'জন। একদম চুপ। আর একটা কথাও বললে ঘর থেকে বাইরে বের করে দাঁড় করিয়ে রাখবো সারারাত। খেয়ে এসেছে, এখন খাবার তো হজম করতে হবে নাকি? আর ঝগড়া না করলে তো তোদের পেটের ভাত হজমই হয় না!

ফাইজান, তুই জেনে-বুঝে কেন মেয়েটাকে জ্বালাস ?

আর শায়রা, তুই জানিস ফাইজান তোকে রাগাতেই এগুলো বলে। তাও লেগে যাস। এগুলো কোনো ঝগড়ার টপিক?

আজকের জন্য অন্তত ক্ষেমা দে বাবারা। তোদের মেয়ে উঠে যাবে নইলে।"

মায়ের লেকচার শুনে ক্ষান্ত দিলো দু'জনেই। তবে এটা নিয়ে যে পরবর্তীতেও নির্ঘাত লাগবে, সেটা নিশ্চিত। এরা জামাই-বউ কখন কি মুডে থাকে, সেটা বলা মুশকিল! মালেকা বেগমের কথামতো এখন রুমে চলে গেলো দু'জনেই। ওদের গমনপথে চেয়ে কপাল চাপড়ালেন ভদ্রমহিলা। বিড়বিড়িয়ে বললেন,

--"এদের শুধরানোর কোনো সম্ভাবনাই নেই!"

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প