উপাখ্যানের এক পাতা

লেখিকাঃ তিয়াশা চৌধুরী

প্রকাশকালঃ মে ১০, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

"তো মিস মেহের, আপনার হাফ ডে ছুটি লাগবে? কারণ আপনার আত্মীয় অসুস্থ, তাকে দেখতে যাবেন। আমি কি এটা বিশ্বাস করবো?"

মেহের মাথা নিচু করে রেখে ভদ্রভাবে বলল,

"জি।"

তিয়াশা চৌধুরী এর লেখা অনুগল্প উপাখ্যানের এক পাতা এর ইমেজ

মেহেরের সামনে বসা লোকটি পুরোদস্তুর ভদ্রলোক সেজে আছে। কালো প্যান্টের সাথে সাদা শার্ট ইন করে পড়েছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করছে মেহেরকে। এমনিতে যতই ভদ্রভাব ধরুক, মেহের যে ঠিক কেমন স্বভাবের তা সারহানের ভালো করেই জানা।

সারহান গুরুগম্ভীর গলায় বলল,

"আপনি সকালবেলা আমার কেবিনের সামনে পানি ঢেলে রেখেছিলেন যেন আমি পা পিছলে পড়ে যাই। এটা আপনি ভীষণ অন্যায় করেছেন। এই অন্যায়ের শাস্তিস্বরূপ যদি আমি আপনাকে ছুটি না দেই, তাহলে কেমন হবে?"

মেহের নিষ্পাপস্বরে বলল,

"আমার কিছুই হবে না, স্যার। কিন্তু আমি যেই আত্মীয়কে দেখতে যাচ্ছি তিনি আমাকে ভীষণ আদর করেন। অসুস্থ অবস্থায় আমাকে দেখতে চেয়েছেন। আমি না গেলে নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবে, কেন যাইনি? তখন অন্যরা উত্তর দিবে, আপনি আমাকে ছুটি দেননি বলেই যেতে পারিনি। তারপর আর কি? বদদোয়াটা মনের ব্যাপার। মুখে বলে তো দেয়া লাগে না!"

তপ্ত শ্বাস ঝাড়লো সারহান। এই মেয়ের সাথে তর্কে জড়ানো সহজ, কিন্তু তর্কে জেতা কঠিন। পরিচয়ের এক সপ্তাহে এমন কোনো অঘটন নেই, যেটা মেহের ঘটায় নি। পিএ হয়েছে বলে কি লবণ দিয়ে কফি খাওয়াও শেখাবে? এ কেমন মেয়ে!

সারহানকে চুপ থাকতে দেখে মেহের পুনরায় প্রশ্ন করলো,

"স্যার, আমি কি ছুটি পাবো?"

সারহান প্রতিত্তোরে বলল,

"আপনার আত্মীয় কি আমার বিয়ে না হওয়ার বদদোয়া দিবে?"

মেহের মহাবিরক্ত হলো। কিন্তু সেসব প্রকাশ করা হচ্ছে না, কারণ সারহান অফিসের বস। না চাইলেও ভদ্রতাসূচক কথা-বার্তা বলতে হচ্ছে। সে বলল,

"দিতেও পারে।"

সারহান চিন্তিত ভাব প্রকাশ করে বলল,

"তাহলে তো আপনাকে ছুটিটা দিতেই হচ্ছে। অর্ধবেলারই তো ব্যাপার। যান আপনি।"

অনুমতি পেতেই মেহের উঠে দাঁড়ালো। কষ্টেসৃষ্টে ভেতর থেকে সৌজন্যতা টেনে বলল,

"ধন্যবাদ, স্যার।"

সারহান চৌধুরীর কেবিন থেকে বের হতেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল মেহের। বিড়বিড়িয়ে বলল,

"এই লোক যতদিন বিদেশ ছিলো, আমি শান্তিতে ছিলাম। নিহাল স্যারই ভালো ছিলো। এই লোক এক সপ্তাহ ধরে এসেই আমার জিন্দাগি হারাম করে দিচ্ছে। চাকরী করার শখ জন্মের মতো মিটিয়ে দিচ্ছে।"

নিহালের নাম নিতেই সে হাজির হলো সামনে। সম্পর্কে সে সারহানের খালাতো ভাই। সারহান দেশের বাইরে থাকাকালীন সে-ই সামলেছে অফিস। মেহেরকে সামনে দেখামাত্রই নিহাল হেসে সালাম দিলো। জিজ্ঞেস করলো,

"ভালো আছেন, আপু?"

বিপরীতে মেহেরও হেসে জবাব দিলো,

"জি স্যার। এতক্ষণ ছিলাম না। তবে এখন কেবিন থেকে বেরিয়ে ভালোই আছি।"

নিহালের হাসি থামলো। সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

"কেন? সারহান ভাইয়া আবার কিছু বলেছে নাকি?"

মেহের ঘনঘন মাথা নেড়ে বলল,

"না তেমন কিছু বলে নি। ছুটি দিতে চাচ্ছিলো না। তবে এখন দিয়েছে আর কোনো সমস্যা নেই।"

********

মেহের মিথ্যা কথা বলে সারহানের থেকে ছুটি নিয়েছে। আসলে ওর কোনো আত্মীয়ই অসুস্থ নেই। বরঞ্চ সব সুস্থ-সবল অবস্থায় আয়োজনে ব্যস্ত আছে কারণ আজ মেহেরকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। মেহেরের বড় বোন মুনতাহার শশুড়বাড়ি থেকেই আসছে সব।

মুনতাহার সাথে সৌহার্দ্যর বিয়ে হয়েছে মাস ছয়েক আগে। সৌহার্দ্যর ছোট ভাই তখন দেশের বাইরে ছিলো। অল্প কিছুদিন আগে বিদেশ থেকে ফিরেই সে মেহেরকে বিয়ে করতে চেয়েছে। তাই পারিবারিকভাবে বিয়ে পাকাপাকি করতে আজকে বিকেলে চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা আসছেন।

মেহের সাধারণ একটা থ্রি-পিস পড়ে লম্বা চুলগুলো খুলে দিয়ে খাটের উপর বসে ফোন টিপছে। মেহেরের চাচাতো বোন কুহু বারবার তাড়া লাগালেও মেহেরের হেলদোল নেই। শেষমেশ মেহেরের মা সাহেলা বেগম এলেন মেয়ের রুমে। মেয়ের অবস্থা দেখে হায়হায় করে বলে উঠলেন,

"তুই এখনো রেডি হস নি? পাত্রপক্ষ তো এসে পড়লো বলে! আর তুই এইভাবে বসে আছিস?"

মেহের কপাল কুঁচকে তাকালো। বলল,

"এইভাবে বসে আছি মানে? আমি তো রেডিই। এই দেখো, থ্রি-পিস তো পড়েছিই।"

সাহেলা বেগম কপাল চাপড়ে বললেন,

"থ্রি-পিস? পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে তো তুই শাড়ি পড়বি না? একটু শাড়ি পড়ে সেজেগুজে বসবি। তা না! তুই তো করবি তোর ত্যাড়ামি।"

মেহের বলল,

"পাত্রপক্ষ আসলে শাড়িই কেন পড়তে হবে? থ্রি-পিস পড়ে দেখলে সমস্যা? আর সাজতে হবে কেন? আমি কি সারাবছর সেজে বসে থাকবো নাকি? আমাকে দেখলে এভাবেই দেখবে। যদি পছন্দ হয়, তাহলে বিয়ে করবে। নাহলে রাস্তা মাপুক, আই ডোন্ট কেয়ার।"

সাহেলা বেগম রেগে গিয়ে বললেন,

"ওরা তোকে প্রথমবার দেখছে না, মেহের। যে পছন্দ-অপছন্দের কথা আসছে। ওরা আসছে বিয়ে পাকাপাকি করতে। তুই এসব বাহানাবাজি ছেড়ে রেডি হবি?"

মেহের দু'পাশে ঘাঁড় নেড়ে বলল,

"উহু। শাড়ি-টাড়ি আমি পড়তে পারবো না।"

সাহেলা বেগম হাল ছাড়লেন। তার মেয়ের সিদ্ধান্ত নড়ানো সহজ কাজ নয়। ভদ্রমহিলা হতাশ হয়ে বললেন,

"আমি সৌহার্দ্যর ছোট ভাইয়ের চয়েজ দেখে অবাক হচ্ছি। তোকে বিয়ে করে কোন পাগল? অন্য কেউ হলে তোর এসব কাহিনি দেখলেই মাঝ রাস্তা থেকে পালাতো। এমন ছেলে তোকে কেন বিয়ে করতে চাইলো, কে জানে?"

মেহের ফোনের ভেতর মনোযোগ দিয়ে বলল,

"নিজের কপাল নিজে পুড়াতে চাইছে। আমার কি?"

এমনসময় নিচে হৈ-চৈ এর শব্দ পেতেই বুঝা গেলো পাত্রপক্ষ চলে এসেছে। সাহেলা বেগম আর দাঁড়ালেন না। ছুটে চলে গেলেন আপ্যায়নের কাজে৷ কুহুও গেলো পিছুপিছু। খানিক বাদেই মুনতাহা এসে হাজির হলো রুমে। দৌড়ে এসে বোনকে জড়িয়ে ধরে কোনোরূপ সম্ভাষণ ছাড়াই বলল,

"মেহের, আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না আমরা বোন থেকে জা হতে যাচ্ছি। এরপর তো আলাদা হওয়ার কোনো টেনশনই নেই। দু'বোন সারাজীবন একসাথে থাকবো।"

বোনের উৎফুল্লতা দেখে মেহের হাসলো। বলল,

"আগেই এত লাফালাফি করো না, আপু। আমাকে দেখার পর তোমার দেবর ডিসিশন চেঞ্জও করে ফেলতে পারে।"

মুনতাহা বলল,

"উহু৷ তুই নিচে গিয়ে বেশি কথা বলবি না। চুপচাপ থাকবি, তাহলেই হবে।"

মেহের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"এটাই তো সমস্যা! আমি চুপ থাকতে পারি না। আচ্ছা আপু, পাত্র-পাত্রীকে কি আলাদা কথা বলতে দিবে?"

মুনতাহা ভাবুক হয়ে বলল,

"সুযোগ না দেয়াই ভালো। নাহলে নির্ঘাত তুই এমন কিছু বলবি, যাতে বিয়ে ভেঙে যায়। আর আমি চাই না এই বিয়েটা ভাঙুক।"

মেহের ওর দুশ্চিন্তা দেখে হেসে ফেলল। বলল,

"আচ্ছা আচ্ছা। আগে তোমার দেবরকে তো দেখি, তারপর ভাববো বিয়ে করবো কি না?"

*********

আধা ঘন্টা পর্যন্ত রুমের মধ্যে বসেই কথা বলল মুনতাহা, মেহের ও কুহু। ইতিমধ্যে মুনতাহা কয়েকবার জোরাজুরি করেছে শাড়ির জন্য। কিন্তু মেহেরকে টলাতে পারে নি।

অবশেষে তাদের ডাক পড়লো ড্রইংরুমে। ঘরের পড়ার সাধারন থ্রি-পিসের ওড়নাটা দিয়েই মাথা ঢেকে বের হলো মেহের। পিছু পিছু মুনতাহা ও কুহু।

পাত্রের মুখখানা দেখামাত্রই মেহের উলটো ঘুরে ছুটে রুমে চলে এলো। বিছানায় বসে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। মুনতাহা অবাক হয়ে বলল,

"কি হয়েছে তোর? এভাবে ছুটে এলি কেন?"

মেহের বিভ্রান্তির সুরে বলল,

"আরেহ আপু! সারহান স্যার আমাদের বাসায় কি করছে?"

মুনতাহা চোখ পিটপিট করে বলল,

"সারহান বাসায় কি করছে মানে? ওই তো আমার দেবর। ওর সাথেই তোর বিয়ে ঠিক হয়েছে।"

মেহের বিস্ময়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেলো। লাফিয়ে উঠে বলল,

"কিহ! উনাকে বিয়ে করবো আমি? আপু আমি উনার মতো খাটাশ বস জীবনে দু'টো দেখিনি। মাত্র এক সপ্তাহে অর্ডারের পর অর্ডার দিয়ে জিন্দাগী হারাম করে রেখেছে। তাহলে বিয়ে করলে কি করবে? এছাড়াও আমি আজ ছুটি নিয়েছিলাম আত্মীয় অসুস্থ বলে। আর এখন যদি গিয়ে উনার সামনে হাজির হই তো...."

কাঁদো কাঁদো হয়ে গেলো মেহেরের চেহারা। মুনতাহা হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে রইলো মেহেরের দিকে। সে হাসবে নাকি কাঁদবে সেটাই বুঝতে পারছে না। কিন্তু কুহুর মধ্যে সেই বিভ্রান্তি নেই। মুখ চেপে হাসতে শুরু করেছে সে। হাসতে হাসতে বলল,

"মিথ্যে বলে ছুটি নিয়েছো আর এখন সারহান ভাইয়াই চলে এসেছে বাড়িতে। এবার কি জবাব দেবে মেহের আপু?"

মেহের বিরক্তি নিয়ে বলল,

"তো কি করতাম? বলতাম, আমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে। ছুটি দিন? বলদ কোথাকার!

হায় খোদা, এ কোথায় ফেঁসে গেলাম আমি। এই লোকের সামনে আমি আর যাবোই না।"

মুনতাহা এখনো বোকার মতো চেয়ে আছে মেহেরের দিকে। তার এই হা-হুতাশ শুনে মুনতাহা বলল,

"ঝামেলা পাকিয়েছিস, এখন আর কি করবি? পাত্রপক্ষের সামনে তো যেতেই হবে।"

মেহের দ্রুতগতিতে মাথা নেড়ে বলল,

"না না। একদমই না। সারহান স্যারের সামনে যাবো না আমি। এরচেয়ে এই চারতলা থেকে লাফ দেই, তাও আমার জন্য ভালো।"

কথায় কথায় এমন সিনেমাটিক ডায়লগ দেয়া মেহেরের স্বভাব। তাই মুনতাহা বিশেষ পাত্তা দিলো না এতে। হাত ধরে টানাটানি শুরু করলো নিয়ে যাওয়ার জন্য। বলতে লাগলো,

"ভদ্রভাবে ওদের সামনে যা, মেহের। তুই গরু নয় যে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া লাগবে।"

মেহের প্রতিত্তোরে বলল,

"আমি গরু না। কিন্তু তোমার দেবর তো ষাঁড়! উনার সামনে যাবো না আমি.."

********

মেহেরের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ওকে পাত্রপক্ষের সামনে হাজির করলো মুনতাহা আর কুহু। এতক্ষণ ছটফট করতে থাকা মেয়েটা এখন চুপচাপ বসে রইলো সোফায়। আড়চোখে চাইতেই দেখলো সারহান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তারই দিকে। নির্ঘাত দুপুরের মিথ্যে কথাটার ব্যাপারেই ভাবছে। মেহেরের মনে হচ্ছে এমন কঠোরভাবে ধরা খাওয়ার থেকে রাস্তায় ঠাডা পড়ে মরে যাওয়া ভালো ছিলো।

এতটুক পর্যন্ত তাও ঠিকঠাক ছিলো। মেহের সামলেই নিয়েছিলো নিজেকে। তন্মধ্যে ভেজাল লাগিয়ে দিলো সৌহার্দ্য। ভাইয়ের সাপোর্টে গিয়ে প্রস্তাব রাখলো,

"আচ্ছা, এবার বর আর কনেকে একটু আলাদা কথা বলতে দেয়া উচিত না? ওদেরও তো নিজেদেরকে চেনা-জানার ব্যাপার আছে!"

চোখ বড়বড় হয়ে গেলো মেহেরের। অদৃশ্য হাতে কপাল চাপড়ালো নিজের। চেঁচিয়ে বলতে চাইলো,

"আমি উনার সাথে কথাও বলতে চাই না, উনাকে চিনতেও চাই না।"

কিন্তু মনের কথা আহুতি দিলো মনেই। বয়োজ্যেষ্ঠরা মেনে নিলেন এই প্রস্তাব। মুনতাহাকে বললেন, ওদের আলাদাভাবে কথা বলার সুযোগ করে দিতে।

ওমনিই সৌহার্দ্য বলল,

"তাহলে আমরা চারজন ছাদে যাই?"

সাহেলা বেগম হেসে সম্মতি দিতেই উঠে দাঁড়ালো দুই ভাই। মুনতাহা মেহেরের হাত ধরে বলল,

"চল, আমাদের সাথে।"

মেহের অনুনয়ের সুরে বলল,

"আপু প্লিজ! তোমার ওই খাটাশ দেবরের হাত থেকে বাঁচাও আমাকে।"

মুনতাহা চোখ রাঙিয়ে বলল,

"তোর এসব নটাংকি বন্ধ করবি মেহের? নাহয় মার খাবি আমার হাতে।"

অগত্যা মেহেরকে যেতেই হলো ওদের সাথে। সৌহার্দ্য ও মুনতাহা সাথে থাকার সময়টুকু সারহান একদম চুপচাপ রইলো। ছাদে পৌঁছে সারহান ও মেহেরকে আলাদা স্পেস দিতে বউ নিয়ে অন্যদিকে সরে গেলো সৌহার্দ্য।

মুনতাহাকে নিয়ে ছাদের একপাশে গিয়ে বলল,

"ওদের মাঝেই দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি? আমাদেরও তো আলাদা স্পেস দরকার আছে, বউ।"

মুনতাহা স্মিত হেসে বলল,

"অবশ্যই। আমি তো শুধু দেখতে চাইলাম সারহান কি বলে? মেহের আজ আত্মীয় অসুস্থের কথা বলে ছুটি নিয়ে এসেছে অফিস থেকে।"

সৌহার্দ্য হেসে বলল,

"বেচারি মেহের! ও তো জানতোই না সারহানই আসবে বাড়িতে। তোমারাও তো মিলেমিশে বোকা বানিয়েছো মেয়েটাকে।"

মুনতাহা ঠোঁট উলটে বলল,

"আমার কি? ওদের ব্যাপার, ওরাই বুঝে নেবে। আচ্ছা শুনুন, ওদের বিয়েতে কিন্তু আমরা কাপল আউটফিট কিনবো। ম্যাচিং শাড়ি আর পাঞ্জাবি। ভালো হবে না?"

সৌহার্দ্য সম্মতি জানালো মুনতাহার কথায়। পরপর মেয়েটা নিজের সব পরিকল্পনা একে একে বলতে লাগলো। সৌহার্দ্যও শুনলো, ধৈর্যশীল শ্রোতা হয়ে।

*******

মুনতাহা ও সৌহার্দ্য ওদের একা রেখেই চলে গেলো। তৎক্ষনাৎ মেহেরের মনে হলো, তার এই ছাদ থেকে লাফ দেয়া উচিত। আচ্ছা, এই দশতলা এপার্টমেন্টের ছাদ থেকে পড়লে কি সে বেশি ব্যাথা পাবে? হাত-পা ভাঙবে? নাকি একেবারেই পগার-পার হয়ে যাবে?

মেহেরের ভাবনার মাঝেই গলা খ্যাঁকাড়ি দিলো সারহান। জিজ্ঞেস করলো,

"আপনার তো কোন এক অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে যাওয়ার কথা ছিলো। তাকে দেখা শেষ?"

কথার সুরে স্পষ্ট টিটকারী। মেহের জানতো ঠিক এমনটাই হবে। খোঁচা মারার কোনো সুযোগ এই লোক ছাড়বেই না।

মেহের ঢোক গিলল। উত্তর দিলো না কোনো। সারহান পুনরায় বলল,

"আপনি বলেছিলেন আপনার আত্মীয় নাকি আপনাকে অনেক আদর করে! কিন্তু আমি এমন কিছু করেছি বলে, আমার মনে পড়ছে না।"

চমকে গেলো মেহের। হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক কম্পন অনুভব করলো মুহুর্তেই। উত্তর খুঁজতে গিয়ে মস্তিষ্ক শূন্য শূন্য মনে হলো। এহেন কথার আদ্যো উত্তর হয় কোনো?

আচমকা সঠিক উত্তরটা খেলে গেলো মাথায়। মেহের মিনমিনিয়ে বলল,

"আপনার কথা বলেছে কে? আত্মীয়ের মধ্যে তো আপনার মা-ও এসেছে আমাদের বাড়িতে। উনার কথাও তো ভাবতে পারতেন নাকি? অবশ্য সেটা ভাববেন কেন? নেগেটিভ মানুষের মাথায় পজিটিভ ভাবনা আসা করাও বেকার।"

সারহান ভ্রু যুগল কুঁচকে একযোগে চেয়ে রইলো মেহেরের নিষ্পাপ মুখখানার দিকে। এই নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকালে কেউ ভুলেও ধারনা করবে না তার পেটে পেটে ঠিক কতখানি দুষ্টুবুদ্ধি ঘুরে।

সারহান প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল,

"এই মাসের শেষের দিকে আমাদের বিয়ে। অর্থাৎ দুই সপ্তাহ পরে। জানেন তো?"

মেহের বলল,

"জি স্যার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমি যেখানে জব করি, সেখানকার বস ভীষণ কড়া। বিয়ে উপলক্ষে ছুটি দেবে কি না কে জানে?"

সারহান মেহেরকে অবাক করে বলে বসলো,

"আমার সামনে ভদ্রতা করে বসকে কড়া বলছেন। অথচ আড়ালে কি বলেন আপনি?"

মেহের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইল। মুখের উপর উত্তর দিয়ে বসলো,

"আমি আড়ালে কি বলি, কি করি তাতেও নজর রাখেন? আপনার নজর তো সুবিধার না, স্যার।"

"আমার নজরে আপনার সুবিধা থেকে অসুবিধাই বেশি হবে, ম্যাডাম।"

সম্বোধনটায় মেহের মুচকি হাসলো। বলল,

"ম্যাডাম? নিজের থেকেও উচ্চপদে আমাকে প্রমোশন দিচ্ছেন নাকি, স্যার?"

সারহান ও মেহেরের উচ্চতার পার্থক্য অনেকটা। ফলাফল কাছাকাছি আসতে সারহানকে ঝুঁকতে হলো খানিকটা। মেহেরের চোখে চোখ মিলিয়ে বলল,

"দিচ্ছি তো প্রমোশন। আমার হোম মিনিস্টার পদে।"

হেসে ফেলল দু'জনেই। চোখ নামিয়ে বহিঃপ্রকাশ ঘটালো ভেতরকার অন্যরকম ভালোলাগার।

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প