হঠাৎ করে

লেখিকাঃ মৌরিন আহমেদ

প্রকাশকালঃ মে ১২, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাতে এসে সাত বছর পর প্রাক্তনের দেখা মিললো হুট করেই! স্কুলের প্রিন্সিপালের কেবিনে এখন তারা দু' জন। মুখোমুখি বসে আছে। একজনের চাহনিতে বিস্ময় আরেকজন খুব নির্লিপ্ত। প্রথম কথা বললো সার্থক, রেইনবো স্কুলের সম্মানীয় প্রিন্সিপাল,

-- "কেমন আছো, স্বাতী?"

ওহ্! কি আশ্চর্য শীতল তার কন্ঠস্বর! কি অসাধারণ নির্বিকার চিত্তে থেকেই না সে প্রশ্নটা করলো! যেন তাদের বিচ্ছেদের পর আজ সাত বছর পর দেখা নয়, কাজের চাপে ফুসরত না পেয়ে আজ মাত্র দু' দিন পর দেখা!

মৌরিন আহমেদ এর লেখা অনুগল্প হঠাৎ করে এর ইমেজ

-- "দেখতে পারছো না কেমন আছি? অনেক ভালোই আছি আমি। অনেক ভালো!"

কণ্ঠে ক্ষোভ ঝেড়ে ফেললো স্বাতী। সার্থক হাসলো। ঠোঁটের কোণের হাসিটা সেই আগের মতোই উজ্জ্বল! কি সুন্দর, মোহনীয় হাসি!

-- "ভালো তো। এখানে আসলে যে?"

-- "তোমার কি মনে হয় আমি স্কুলে ভর্তি হতে এসেছি? আমার সে বয়স আছে?"

ঝাঁঝ মেশানো গলায় জবাব দিলো সে। এবারে একটু ব্যঙ্গ করার সুযোগ পেল সার্থক,

-- "চাইলে ভর্তি হতেই পারো। কথায় আছে না, শেখার কোনো শেষ নেই, আর মা:র খাওয়ার কোনো বয়স নেই? হা হা হা।"

সার্থক হো হো হাসলো। অনেক অনেক দিন পর আজ তাকে প্রফুল্ল লাগছে। সেই সাত বছর আগের সেই সার্থকই যেন সে আছে। সাতাশ বছরের সেই তাগড়া জোয়ান, সদা প্রাণবন্ত!

স্বাতী সে হাসি চোখে দেখলো না। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো খুব দ্রুতই। এই হাসিই তো তার সর্বনাশ ডেকে এনেছিল। বাধ্য করেছিল প্রেমে পরতে, ভালোবাসতে! যার দুর্ভাগ্য আজ অবধি বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে!

-- "তা বললে না তো, কি কারণে এসেছ এখানে? আমি এখানে আছি বলে.."

হাসি থামিয়ে জানতে চাইলো সার্থক। চোখে চোখ রাখলো স্বাতীর। সে অস্বস্তিতে নুইয়ে গেল। অথচ একটা সময় ছিল যখন এই চোখের দিকে তাকিয়ে থেকেই তারা পার করতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা! একেবারে নিশ্চুপ, নির্দ্বিধায়! এ চোখে কতোই না স্বপ্ন দেখতো তারা! সব আজ বিবর্ণ হয়ে গেছে। ফ্যাকাশে আস্তরণে চাপা পড়েছে হৃদয়ের কোণে!

-- "আমি জানতাম না, এখানে তুমি চাকরী করো। জানলে.."

-- "আসতে না নিশ্চয়?"

-- "অবশ্যই না। এসেছিলাম একজনকে ভর্তি করাতে.."

-- "কে? তোমার বাচ্চা?"

সে কথার ঠিক জবাব দিলো না স্বাতী। চোখের চশমাটা পেছনের দিকে ঠেলে দায়সারা ভাবে উত্তর করলো,

-- " নয় তো কি? অন্যের বাচ্চা নিয়ে আমি কেন মাথাব্যাথা দেখাবো?"

-- "তা অবশ্য ঠিক! তুমি তো আবার চিরকালই স্বার্থপর। অন্যের বিষয় দেখবে কেন.."

ভর্ৎসনা করলো কি? না, এটা ভর্ৎসনা নয়। এটা হলো আক্ষেপের সুর। প্রাক্তন প্রেমিকের বিষাদ ভরা তীব্র আক্ষেপ! কথাটা গায়ে লাগলেও কিছু বললো না স্বাতী। এককালে এরকম ছোট-খাটো ব্যাপার খুব ভাবত সে। কেউ কিছু বললেই চট করে জবাব দিয়ে দিতো! ঝগড়া করতো, বাক-বিতন্ডার সৃষ্টি করতো। এখন আর সে ইচ্ছা হয় না। বলুক না লোকে, যা খুশি! কি যায় আসে তাতে?

-- "বিয়ে করেছ?

হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন করলো সে নিজেই জানে না। তবে প্রশ্নটা করার পর মনে হলো, জিজ্ঞেস করা ভুল হয় নি। বিচ্ছেদের পর সার্থক আবারো নিজেকে কারো সঙ্গে গুছিয়ে নিতে পেরেছে কি না, সেটা জানা দরকার। ছেলেটা খুব ইমোশনাল, চাপা স্বভাবের। সে যে খুব সহজে মুভ অন করতে পারবে না সেটা জানে সে। তবুও তো জীবনের প্রয়োজনে মুভ অন করতেই হয়। সময় তো বহমান। সে তো অপেক্ষা করে না কারো জন্য! তাই সার্থক তার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে এটা ভাবা অন্যায়! ঘোরতর পাপ!

-- "করবো না কেন? তুমি বিয়ে করে বাচ্চা পয়দা করতে পারলে আমার সমস্যা কোথায়?"

কথাটা উচ্চারণ করতে কি কষ্ট হচ্ছিল ওর? কে জানে! খেয়াল করে নি স্বাতী। আজকাল নিজের দুঃখ আর কষ্ট ছাড়া অন্যের কষ্ট তার চোখে পড়ে না। ঠিক চোখে পড়ে না বললে ভুল হবে, পড়ে। তবে গুরুত্ব দিতে মন চায় না।

-- "নাহ্, সমস্যা হবে কেন? এমনই জানতে চাইছিলাম।" জীর্ণ ঠোঁটে মলিন হাসি ফুটে উঠলো।

-- "ওহ্।"

-- "বাচ্চা কয়টা? তুমি তো বলতে ক্রিকেট টিম বানাবে.. বানিয়েছ? বৌ আপত্তি করলো না? হা হা হা।"

জোরপূর্বক হাসলো। সার্থকও হাসলো সে কথায়। বললো,

-- "সেটা আর হলো কোথায়? তিনটা বাচ্চা নিয়েই তিনি হাঁপিয়ে উঠলেন!"

কণ্ঠে হতাশার ছাপ। স্বাতী প্রাণপনে সামলালো নিজেকে। সার্থক যদি এতোটা শান্ত, স্বাভাবিক থাকতে পারে তবে সে কেন নয়? কপট আঁতকে উঠলো,

-- "তি-ন-টা? ও মাই গড!"

সার্থক হো হো করে হাসলো। বিনিময়ে একটু লজ্জাই পেল স্বাতী। কিছুক্ষণ চললো নীরবতা। তারপর আবারো কথা শুরু করলো স্বাতী,

-- "তুমি সুখে আছো তো?"

কি মলিন তার কন্ঠস্বর! কতো আকুতি ভরা সুর। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠলো সার্থক। অন্যমনস্ক চাহনিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। সত্যিই তো, সে কি সুখে আছে? এই একলা একলা জীবনে সে কি সুখে আছে?

কিন্তু স্বাতী তো সুখে আছে। তার স্কুলে বাচ্চাকে এনেছে ভর্তি করাতে, চোখে মুখে হাসি, আনন্দ, মহা সুখেই আছে, না? তাহলে সে কেন নিজের সত্যিটা ওকে বলবে? আর এই জীবন নিয়ে সে যে খুব দুঃখী তাও তো নয়! সে যথেষ্টই সুখী মনে করে নিজেকে। সুন্দর, নির্ঝঞ্ঝাট জীবন! ঠোঁটের কোণে জোর পূর্বক হাসি ঝুলিয়ে বললো,

-- " সুখে থাকবো না কেন? আমার বৌ আমায় যথেষ্ট ভালোবাসে, সে তো আর তোমার মতন নয়!.."

কথাটা বুকে এসে বিঁধল যেন ওর। কলিজাটা কেউ যেন টেনে হিঁচড়ে বের করলো শরীর থেকে। টুকরো টুকরো করলো ছুরির তীক্ষ্ণ ফলা দিয়ে! ওহ্, কি নিদারুণ যন্ত্রণা!

নিজেকে শেষ পর্যন্ত সামলাতে পারলো না স্বাতী। এতক্ষণ নিজেকে গুছিয়ে রাখার যে প্রাণপণ প্রচেষ্টা ছিল, সেটা আর নেই। সব ভুলে গিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো,

-- "হ্যাঁ, কেউ আমার মতো নয়!.. আমার মতো করে কেউ ভালোবাসে নি তোমায়! তুমিও বাসো নি। বাসতে পারো নি। যদি পারতে ছেড়ে যেতে না!"

স্বাতী ছুটে বেরিয়ে এলো কেবিন থেকে। নেত্র দ্বয় তার জলে ভরে উঠেছে! জলকণা উপচে পড়ছে নরম কপোল বেয়ে! অবিরাম ধারায়। তা ঠেকানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই তার মাঝে। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সে হেঁটে যাচ্ছে!

অথচ দুজনের কারোরই জানা হলো না জীবনের চরম সত্য কিছু কথা। স্বাতী যেমন জানলো না তার বিরহে শেষ পর্যন্ত আর বিয়ে করতে পারে নি সার্থক, ঠিক তেমনই সার্থকেরও জানা হলো না তাকে ভুলতে না পেরেই স্বামীর সাথে ঘর হলো না স্বাতীর! আর যাকে ভর্তি করতে সে এনেছিল সে যে স্বাতীর ছেলে নয়, ভাতিজা, সেটাও আর জানা হলো না। দুজনের কেউই বুঝতে পারলো না একে অপরের গভীর ভালোবাসাটা! ভুল বুঝে দুজন দু' পথে চলে গেল। পেছনে ফেলে গেল অব্যক্ত কিছু অনুভূতিকে! জীবনের সহযাত্রী হতে চেয়েও হওয়া হয়ে উঠলো না। অবুঝের মতো হেরে গেল তাদের অনুভূতি কিছু ভুলের কাছে! ঠিক যেমনটা হয়েছিল সাত বছর আগে!

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প