চোখের আলোয় দেখেছিলেম

লেখিকাঃ মৌরিন আহমেদ

প্রকাশকালঃ মে ১২, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

চায়ের কাপটা মাত্র হাতে নিয়েছি, আগুন গরম কাপে চুমুক বসানোর সুযোগও হয় নি অমনি কোত্থেকে এক বৈশাখী ঝড় এসে পড়লো আমার উপর! চায়ের কাপ ছলকে গরম চা পড়লো সারা গায়ে, আতঙ্কে প্রায় চেঁচিয়েই উঠলাম,

—উহ্, কি গরম!

তৎক্ষণাৎ পেছনে ফিরতেই একটা মেয়েলি কণ্ঠ কানে এলো। উদ্বেলের সহিত মার্জনা চাইলো সে,

মৌরিন আহমেদ এর লেখা অনুগল্প চোখের আলোয় দেখেছিলেম এর ইমেজ

—-স্যরি। স্যরি। আমি একটুও দেখতে পাই নি। মাফ করবেন। আমার তাড়া আছে তো!

দাঁড়ালোও না এক সেকেন্ড। বাহুতে নেমে আসা ব্যাগটা কাঁধে তুলে ফের ছুট লাগালো। হন্তদন্ত হয়ে!

আমি হতবাক, হতবিহ্বল, বিস্ময়ে বিমূঢ়!

সেদিন কলেজ রোডে এক পুরোনো বন্ধু; অমিতের সঙ্গে দেখা। বহুদিন পর ছুটিতে বাড়িতে এসেছি। আমার শহর, আমার প্রাণের রংপুরে। দু’ মাসের লম্বা ছুটিটা সুন্দর করে উপভোগ করতে সেই বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। ভাবলাম, কলেজের ওইদিক থেকে একটু ঘুরে আসি। ক্রিকেট গার্ডেনের সামনেই অমিতকে দেখলাম। আমি প্রথমটায় চিনতে পারি নি, সাতবছর আগে শেষ দেখা কি-না!

অমিতের সঙ্গে একটা ছেলে ছিল। বাইক নিয়ে দাড়িয়ে ছিল গার্ডেনের গেটে। আমি কিছু না বলেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম হঠাৎ অমিত দেখে ফেললো। হাত উঁচিয়ে ডাকলো,

—আরে শানীল না-কি? এতোদিন পর? যাওয়া হচ্ছে কই?

তারপর ছেলেটাকে বিদেয় করে এলো আমার কাছে। কুশল বিনিময়ের পর আমায় বগলদাবা করে চললো চায়ের দোকানে। দোকানী চা দিচ্ছিল, আর সেখানেই এই গল্পের শুরু!

মেয়েটাকে ভালো করে দেখা হয় নি। একঝলক শুধু চেহারা দেখেছি, উজ্জ্বল গৌড় বর্ণের সুডৌল মুখখানিতে রাজ্যের তাড়া। আমি মিনিট খানেক হতভম্ব হয়ে দেখলাম ওর প্রস্থানের দৃশ্য।

দু’দিন পরের কথা। বিকেলে অমিতের সঙ্গে ঈদগাহ মাঠে দাঁড়িয়েছি, হুট করে দেখি সেই হন্তদন্ত কন্যা, আজও ছুটছে হন্তদন্ত হয়ে! বলা বাহুল্য, এ সাক্ষাৎটা বেশ কাকতালীয় ছিলো। কিন্তু পরের গুলো আর কাকতলীয় নয়। বরং আমার ইচ্ছাকৃত। কেন এই ইচ্ছা আমি জানি না!

রোজই বিকেলে মেয়েটাকে দেখি। ত্বরিৎ পায়ে ছোটে। এক কাঁধে নেয়া ব্যাগটা ওর চপল পায়ের তালে কখনোই কাঁধে আটকে থাকে না, বারংবার বাহুতে নেমে আসে। কোনদিন সেটাকে টেনে তোলে; কোনদিন সে সময়টুকুও জোটে না; যেমন আছে তেমনই যায়। নির্বাচন অফিসের পেছনের ওই ছোট রাস্তা ধরে ভূমি অফিসের সামন পর্যন্ত সে প্রায় উল্কার বেগে যায়। অতখানি রাস্তা মাত্র দু’ মিনিটে লাগে ওর যেতে!

ওর তুফানি চালচলন দেখে আমার বুকে ঝড় ওঠে। মাঝে মাঝে অমন হুড়মুড় করে ছুটতে গিয়ে দেখি হোঁচট খেয়েও পড়ে। তখন আমার মনে হয় এগিয়ে যাই। হাত ধরে টেনে তুলি আর কষে দেই এক ধমক,

“মেয়ে, এতো তাড়া কীসের তোমার? রোজ অমন হুড়মুড় করে না চলে একটু আগে বেরোতে পারো না? তবে সময়টাও বাঁচে আর আমার বুকের ধুকপুকানিও একটু কমে!”

কিন্তু বলা হয় না। কি এক কঠিন সংকোচ, দ্বিধার দেয়ালে আটকে যাই বারংবার।

ওর যাবার সময়টায় আমি লুকিয়ে থাকি আশেপাশেই। কখনো চারুতার সামনে, ঝালমুড়িওয়ালার পাশে কখনো বা ঈদগাহ মাঠটায় একা বসে থাকি বই কোলে নিয়ে। লোকে দেখলে ভাবে আমি পড়ছি নিবিষ্ট চিত্তে কিন্তু আমি জানি, পড়ার ছলে আমি তাকেই দেখি! দু’ মিনিটের ওই একটুখানি দেখা আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া!

আমার মত এমন পাগলামি ক’টা লোকে করে আমি জানি না। অবশ্য গল্প-উপন্যাসের আদর্শ প্রেমিকেরা হয় তো এরচেয়েও উন্মাদনা করে। কিন্তু আমি তো প্রেমিক নই। হবো কি করে, আমি তো মেয়েটা সম্বন্ধে কিছু জানি না, নামটা অবধি না। ও কীসে পড়ে, কেন ব্যাগ কাঁধে ছুটতে ছুটতে যায়, কখন ফিরে --- কিছুই না। কেবল জানি প্রতিদিন বিকেল চারটায় এক তুমূল ব্যস্ত কন্যা হন্তদন্ত পায়ে ছুটে যায় আমার সম্মুখ দিয়ে, আমার দুই চক্ষুকে ভীষণ রকমের বিস্মিত করে, বুকের হৃদপিণ্ডটাকে অস্থির করে!

ছুটির দিনগুলো আমার এভাবেই কাটছিল। হঠাৎ আমার গৎবাঁধা রুটিনে ব্যতিক্রম হলো। লক্ষ্য করলাম টানা তিনদিন মেয়েটা এলো না। অবাক হলাম, গত একমাসে একটা দিনও যার মিস যায় নি সে হঠাৎ নেই কেন? এতসময় ধরে নিখোঁজ কেন?

ভেতরে একটু উচাটন হলো। অজানা কিছু শঙ্কায় শঙ্কিত হলো মস্তিষ্ক। মেয়েটার সম্পর্কে একটু জানতে উদগ্রীব মন। কিন্তু আমার প্রাণের আনচান কমিয়ে হন্তদন্ত কন্যা এলো না, দেখা দিলো না তার!

চারুতার সামনের দিকটায় মানে ঈদগাহ্’র উত্তর দিকের খোলা অংশে একা দাঁড়িয়ে এই কথাই ভাবছিলাম। মানসপটে ধারণ করা স্মৃতিগুলো একটু হাতড়ে দেখছি; আকস্মিক কে যেন শার্টের হাতা টেনে ধরলো,

—-এই শুনেন?

হতচকিত হয়ে পিছু ফিরে তাকাতেই তীব্র তড়িৎ’র ঝটকা লাগলো!

সেই ব্যস্ত নারীটি বর্তমানে আমার সম্মুখে দাড়িয়ে, তবে আজ তার ভেতর কোনো অস্থিরতা নেই। খুব শান্ত হয়ে চেয়ে আমার পানে!

কয়েকপল নিঃশব্দে কেটে গেল; বলবার মতো কথাই খুঁজে পেলাম না আমি। শূণ্য শব্দভাণ্ডার আর আবেগে উদ্বেলিত হৃদয় নিয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলাম। সে বললো,

—-আমি অন্বেষা। আপনি তো শানীল?

আরও একটা চমক খেলাম। এই মেয়ে আমার নাম জানলো কি করে? আশ্চর্য!

বিস্ময়াহত আমার কণ্ঠটা খাপছাড়া শোনালো নিজেরই কানে,

—আপনিই… না মানে তুমিই…

—-এতো নার্ভাস হতে হবে না। চলুন এগিয়ে কোথাও বসি। কলেজ রোডে ফুসকার স্টল আছে অনেক। যাবেন?

কি নিঃসংকোচে আবেদন! আমি কোনোমতে মাথা নাড়লাম,

—হু

–-যাওয়া যাক তবে।

তাল মিলিয়ে একসঙ্গে হাঁটলাম দু’জন। চারুতা, ওপাশে টেনিস ক্লাবের সামন দিয়ে যে ছোট সুন্দর রাস্তাটা গেছে, দু’ পাশে কৃষ্ণচূড়ার গাছের ছায়া ঢাকা সে পথে গোধূলির সোনালী রোদ্দুরের সঙ্গে খানিক লুকোচুরি করে সোজা ক্রিকেট গার্ডেনের সামনে এসে পৌঁছলাম। কলেজ রোড এটাই। ডানে ঘুরেই শিশু একাডেমী আর তারপর সার বাঁধা ফুসকার স্টল। অন্বেষা আমায় সঙ্গে নিয়েই চললো।

নিরিবিলি দেখে একটা স্টলে ঢুকে পড়লাম দু'জনে। অর্ডার অন্বেষাই দিলো। দোকানিকে সব বুঝিয়ে সে আমার দিকে চাইলো, লক্ষ্য করলাম কি স্নিগ্ধ সেই মুখশ্রী! কি কোমল, কি মায়ায় জড়ানো!

দই ফুচকা অর্ডার করেছিল অন্বেষা। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সেটা হাজির হলো টেবিলে। অন্বেষা খুব স্বাভাবিকভাবেই খাওয়া শুরু করলো। একটা আস্ত ফুসকা মুখে পুরে দিয়ে বললো,

–-এখানকার দই ফুচকাটা জোস্, বুঝলেন? আমি প্রায়ই এখান থেকে খাই।

আমি কিছু না বলে ওর মুখের দিকে তাকালাম। আশ্চর্য সরল ওর চেহারা, সংকোচহীন স্বাভাবিক ভঙ্গিমা। ব্যাপারটা মুগ্ধ করলো আমায়!

খেতে খেতে টুকটাক আরও কথা হলো। সবই অবশ্য অন্বেষার তরফ থেকে, আমি শুধু ‘হু হা’ করে সায় দিলাম। কেননা কথা বলবার অবস্থা আমার ছিল না। কেমন অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্যে বিরাজ করছিলাম যেন!

খাওয়া শেষ হলো আমাদের। টিস্যু দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে ও হঠাৎ বলে বসলো,

—-কাল থেকে এসময় আর দাড়াবেন না। পাঁচটায় দাড়াবেন, কলেজ গেটে। আমি পড়া শেষ করে বেরোব। ঠিক আছে?

আমার দৃষ্টি কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলো। মেয়েটা বিনিময়ে চমৎকার প্রাণখোলা হাসি দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠলো। এখন বিদায়ের পালা!

সে ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে এগোচ্ছে আর আমি অনুভব করছি আমার বুকের স্পন্দন! পেটের ভেতর রঙিন প্রজাপতিরা ডানা মেলেছে বোধ হয়, সার বেঁধে উড়ছে। ইসস, এতো ভালো কেন লাগছে?

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর চেয়ারের দিকে তাকালাম। একধ্যানে পুরো ঘটনাটা মনে করতে করতে শিহরিত হতে লাগলাম। হঠাৎ চটকা ভাঙলো অন্বেষার কণ্ঠে। হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে যেতে জানিয়ে গেল,

—-আর হ্যাঁ, সঙ্গে একটা গোলাপ আনবেন তো! আমার পছন্দের শুভ্র রঙের!

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প