প্রকাশকালঃ এপ্রিল ২৭, ২০২৬
মাথার উপর চৈত্রের রোদ। সূর্যের প্রখর তেজে আমার সারা গা দিয়ে ঘাম ছুটছে দরদর করে। গায়ের শার্টটা ভিজে লেপ্টে আছে। মাথা ধরানো একটা বিশ্রী গন্ধ বেরোচ্ছে কাঁধ থেকে। কি বিদঘুটে!
আমার চেহারা উদ্ভ্রান্ত। পরনের শার্টটাও বেশ ময়লা। অবশ্য যখন পড়েছিলাম তখন ছিল সদ্য ভাঁজ খোলা পরিচ্ছন্ন কাপড়। অথচ এখন! আমি আয়না দেখি নি তবুও নিশ্চিৎ বলতে পারি আমাকে এখন পুরো পাগল দেখাচ্ছে। হয় তো সে কারণেই রাস্তার লোকেরা এভাবে আড়চোখে দেখছে আমাকে!
তাতে আমার কোনো বিকার নেই। আমি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাঁটছি। হঠাৎই কে যেন খুব জোড়ে ধাক্কা দিলো আমাকে। ঠিক ধাক্কা না, হ্যাচকা টানে নিজের দিকে টেনে নিলো। আচমকা এমনটা হওয়ায় চমকে ফিরে তাকালাম। সঙ্গে রাগ নিয়েও। কোন পুরুষের এতো সাহস আমাকে ধাক্কা দেয়? এক্ষণই দেখে নেব একহাত। তবে আমাকে আরও অবাক করে দিয়ে দেখা গেল, ধাক্কাদানকারী কোনো পুরুষ নয়। নারী!
মেয়েটা তীব্র ক্ষোভ নিয়ে বলছে,
-- "এ্যাই! মন কোথায় থাকে আপনার? এতো জোড়ে হর্ন দিলো কানে শোনেন নি? এক্ষুনি তো বাসটা আপনাকে চাপা দিয়ে চলে যেত!"
সঙ্গে সঙ্গে আমি সামনে তাকালাম। সাঁই সাঁই করে একটা বাস পেরিয়ে গেল আমাদের। বলাই বাহুল্য অতি দ্রুত গতিতে। আরেকটু হলেও এই বাস আমাকে পিlষে দিয়ে চলে যেত। আচ্ছা, চাপা দিলে কি হতো? আমি কি মlরে যেতাম? হয় তো। তাহলে তো ভালোই হতো। অন্ততঃ এই অসহ্য যাতনা থেকে মুক্তি পেতাম। ভাবতেই মনটা বিlষিlয়ে এলো।
ঠিক তখনই কিন্নরকণ্ঠী নারী আবারও কথা বলে উঠলো। বিরক্ত ভঙ্গিতে বললো,
-- "কি হলো? কথা বলেন না কেন? মlরার কি খুব শখ ছিল?"
আমি একপলক তাকালাম ওর দিকে। টুকটুকে লাল রঙের একটা শাড়ি পরনে, হাত ভর্তি চুড়ির পসরা, মাথার কালো চুলে বৃহৎ খোঁপা, রজনীগন্ধার গাঁজরা লাগানো। মুখশ্রী রlক্তিlম। ভীষণ রেগে আছে এই অল্পবয়স্কা তরুণীটি। ওকে দেখেই আমার পুরোনো কথা মনে পড়লো। স্বাতীর সঙ্গেও তো আমার ঠিক এভাবেই দেখা হয়েছিল। একই ভাবে, একই প্রেক্ষাপটে। তারপরেই তো প্রেম! প্রকৃতি কি সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটালো?
ভাবতেই তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলাম। মেয়েটা সে হাসি অবলোকন করে ভয়াবহ ক্ষেপে গিয়ে বললো,
-- "আপনি কি পাগল? মানসিক রোগী? বেকুবের মতো রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন, একটু হলেই বাসের চাপায় প্রাlণটা দিতেন। আমি বাঁচালাম। আর এখন আবার পাগলের মতোন হাসছেন?"
মেয়েটার কথায় আমার আরো হাসি পেল। ওকে যে ভালোমন্দ একটা জবাব দিবো, সে সুযোগটাই পেলাম না। হো হো করে হাসতে শুরু করলাম। মেয়েটা বোধ হয় এবার সত্যিই খুব ত্যক্ত হলো। তীব্র রাগে গজগজ করলো,
-- "দূর! যত্তোসব পাগলের কারবার!"
অতঃপর প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে গটগট করে হেঁটে পাশ কাটিয়ে গেল। সঙ্গে বিড়বিড় করে কি কি যেন বলছে। আমি একশো ভাগ নিশ্চিৎ সে আমার উদ্দেশ্যে ভয়াবহ কিছু গাlলি ছুঁড়ছে। সেটাই স্বাভাবিক।
একটু পর আমিও হাঁটতে শুরু করলাম। ঠিক আগের মতো করে। অন্যমনস্ক হয়ে। হঠাৎ করে আকাশের সূর্যটা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেছে। তেজ কমে গেছে কিরণের। কিন্তু গরমটা কমে নি। গা ক্রমাগত ঘেমে যাচ্ছে। কপাল-গলা দিয়ে ঘামের নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। রুমালের খোঁজে পকেট হাতড়ালাম। রুমালের পরিবর্তে হাতে এসে ধরা দিলো একখানা খাম। চাকরির নিয়োগপত্র!
আজ সকালে আমার নতুন চাকরিতে যোগদানের কথা ছিল। পঞ্চাশ হাজার মাইনে! কিন্তু আমি সেখানে না গিয়ে, উদ্দেশ্যহীন হয়ে ঘুরছি পথে-পথে।
অন্যসময় হলে এই সুযোগ কখনোই হাতছাড়া করতাম না। লুফে নিতাম। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। 'বেঁচে থাকা যেখানে অনিশ্চিত, চাকরি-বাকরি করা সেখানে বিলাসিতা।' নিশ্চয় আপনাদের মনে জাগছে, 'কেন?'
মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান আমি। বাবা ছিলেন বেসরকারি অফিসের খুবই অল্প বেতনভুক্ত কর্মচারী। 'ছিলেন' বলছি কারণ, তিনি এখন বেঁচে নেই। বছর পাঁচেক আগে গত হয়েছেন। তখন আমি স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়ছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
বাবার জীবদ্দশায় আমার জীবনটা খুব রঙিন ছিল। আহামরি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলেও দুঃখ ছিল না। ছোট-খাটো বায়না মেটাবার জন্য বাবা ছিলেন। আদর দিয়ে আগলে রাখতেন।
বাবার মৃlত্যুতে সবটা বদলে গেল। কোত্থেকে আসা দমকা হাওয়ায় সব উলট-পালট হয়ে এলো। পরিচিত মানুষেরা এক-এক করে বদলে যেতে লাগলো। সরে গেল দূরে-বহুদূরে!
একমাত্র সন্তান হওয়ায় সংসারের হাল ধরতে হলো। টিউশনি শুরু করলাম। দু' তিনটা ছাত্র পড়িয়ে আমার পড়ালেখা আর সংসার খরচ চালাতাম। সংসার বলতে তখন শুধু আমি আর মা। আর কেউ নেই। দিনগুলো কাটছিল তার মতোই। একটু একটু করে গুছিয়ে উঠছিলাম। ঠিক তখনই দ্বিতীয় ধাক্কাটা খেলাম!
মা'র হঠাৎ পায়েলস্ ক্যান্সার ধরা পড়লো। লাস্ট স্টেজ। আমি তখন মাস্টার্সের ছাত্র। ফর্ম ফিল আপ হয়ে গেছে। মার অবস্থা খারাপ হতে লাগলো। ডাক্তার পরামর্শ দিলো কেমো থেরাপি দেয়ার। তার খরচা অনেক। হাতে জমানো টাকা নেই একটাও। বাধ্য হয়ে গ্রামে ছুটলাম জমি বেচার জন্য। মা'র ভাগের কিছু জমি বেচা হলো। নেহাৎ পানির দরে। বাবার পৈতৃক যেসব সম্পত্তি ছিল সেসবের উপরেই নদী প্রবাহিত। ব্রহ্মপুত্রের করাল গ্রাসে সব লুটপাট। সে জমি কখনো ভেসে উঠবে সে সম্ভবনা ক্ষীণ।
মার চিকিৎসার পেছনে অকাতরে টাকা ব্যয় করলাম। না করেই বা কি করবো? এই জগতে সে ছাড়া আমার আর আছেই বা কে? আমার পরীক্ষা, মার চিকিৎসা, টিউশনি--সবমিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলাম। ক্লান্তির চূড়ান্তে!
এরকমই একটা দিনে খুব উদাস হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। সেদিন এরকম একটা দ্রুত গতির বাস প্রায় চাপা দিয়ে ফেলেছিল আমায়, তখনই আমার জীবনে আগমন ঘটলো স্বাতীর। বৈশাখের খাঁ খাঁ রোদ্দুরে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে।
স্বাভাবিক ভাবেই এই বিশৃঙ্খল জীবনে কাউকে গ্রহন করতে ঘোর আপত্তি ছিল আমার। এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছি স্বাতীকে। কিন্তু মেয়েটা বড়ই জেদী। সহজে দমবার পাত্রী নয়! আমার পারিবারিক পুরো গল্পটাই ও জানতো। জেনেই পাশে ছিল। হাতে-হাত রেখে চিরকাল চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। সময়ের পালাবদলে আজ সেই প্রতিশ্রুতি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!
আসলে তখন ওর আবেগের বয়স। সবে অনার্স ফার্স্ট ইয়ার, বাস্তবতা বুঝেই বা কতটুকু? তবুও সান্ত্বনা এই যে তখন আমার মানসিক শান্তির প্রধান কারণ হয়ে উঠেছিল এই মেয়েটি। সারাদিনের ধকল আর পরিশ্রান্ততা আমার নিমিষেই হারিয়ে যেত ওর সাথে বলা দশ মিনিটের ফোনকলে।
একবার কেমো নিয়েই মা হাঁপিয়ে উঠলো। অতো তেজ তার শরীর সইতে পারে না। খুব কাহিল হয়ে পড়ে। বাসায় যত্ন নেয়ারও কেউ নেই। সব আমিই সামলাই।
ছয়মাস পর মার অবস্থা কিছুটা স্ট্যাবল হলো। মৃত নয় অর্ধমৃত অবস্থায় বেঁচে থাকলো। তবুও সান্ত্বনা। মা মlরে গেলে আমি বাঁচতাম কি করে?আমার জীবন আগের মতো চলতে লাগলো। টিউশনি আর চাকরির পিছে ছুটে-ছুটে। মাস্টার্স শেষ করার পর আজ আড়াই বছর ধরে আমি চাকরী নামক সোনার হরিণের পেছনে ছুটছি। বাবা অঢেল টাকা-পয়সা কিংবা সম্পদ-সম্পত্তি রেখে যান নি যে তাই বেঁচে ব্যবসা দাড় করাবো। মধ্যবিত্তের ছা-পোষা মানুষ আমরা। লোন করে ব্যবসা করবো সে সৎ সাহসেরও বড় অভাব!
সেকেন্ড ইয়ারে উঠতেই স্বাতীর বাড়ি থেকে বিয়ের চাপ দেয়া শুরু হলো। ভুলিয়ে-ভালিয়ে ম্যানেজ করলো ও। কিন্তু কতোদিন? আড়াই বছর ধরে হাজারটা প্রস্তাব উপেক্ষা করে শেষমেষ হাল ছাড়তে বাধ্য হলো। আসলে শেষ অবধি ওও বাস্তবতা বুঝতে পারছিল। মধ্যবিত্ত হলেও ওদের পরিবার আমাদের চেয়ে ধনী ছিল। প্রকৃতপক্ষে বাবার মৃlত্যুর পর আমরা মধ্যবিত্তের স্ট্যাটাস থেকে একেবারে নিম্নবিত্তের পর্যায়ে চলে গিয়েছিলাম। এমতাবস্থা়য় বেকার একটি ছেলের কথা বাসায় বলবে কি করে ও?
অবশেষে বাস্তবতার কাছে হার মানলো আমাদের ভালোবাসা। স্বাতী বিয়ের জন্য রাজি হয়ে গেল। এছাড়া আর ওর উপায়ও ছিল না। সে জন্য ওকে আমি ভুলও বুঝি না। কেউ না জানুক, মধ্যবিত্তের টানাপোড়নের যাতনা কি আমি তো ভালোই জানি।
গতকাল বিকালে স্বাতীর বিয়ে ছিল। আমি মানিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে। শত হোক, প্রেমিকার বিয়ে বলে কথা। কষ্ট হবে না, তাই কি হয়? অদ্ভুত একটা অভিমানে মন ভারী হয়ে ছিল। উদাস হয়ে একা একা রাস্তায় হাঁটছিলাম। এক-একবার মনে হচ্ছিল,
'সব ছেড়ে-ছুঁড়ে আমি যাযাবর হয়ে যাচ্ছি না কেন? তাহলেই তো মুক্তি মেলে এই জীবনের কষ্ট থেকে! লাঞ্ছনা-গঞ্জনা থেকে!'
অনেক রাতে বাড়ি ফিরে দেখি আমার মা খুব অসুস্থ্য। আমার আকাশ ভেঙে এলো। গত কিছুদিন ধরেই মার শরীরটা খারাপ করছিল। ডাক্তার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। মা না-কি আর বাঁচবেন না! ওনার শেষ পর্যায়ে পাশে না থেকে আমি রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে দুঃখবিলাস করছি? ছিঃ, ধিক্কার আমাকে!
আমি রাতভর ছোটাছুটি করলাম। ডাক্তার-নার্সের কাছে ধর্ণা দিয়ে বেড়ালাম। কিন্তু আমার সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে, নিঃস্ব-রিক্ত করে, মা আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল!
শেষরাতের দিকে মারা গিয়েছেন। আমাকে একা ফেলে পারি জমিয়েছেন ওপারে। লোকে বলে মায়েরা খুব উদার হয়। কিন্তু আমার মা'টা এত্তো সার্থপর! কি করে আমায় ছেড়ে চলে গেল, বলুন তো?
মা'র দাফন শেষ করে বাড়ি ফিরলাম। ঘরে পেলাম এই খাম। চাকরির নিয়োগপত্র। হায় রে চাকরি! তোর জন্য কি-না-কি করলাম। কতো কিছুই না হারালাম। যখন দরকার ছিল তখন পেলাম না, আর এখন.. রাগে-দুঃখে খামটা ছিঁlড়ে টুlকরো-টুlকরো করে ফেললাম। ফুঁ দিয়ে ভাসিয়ে দিলাম বাতাসে। এই চাকরির এখন আর কোনো প্রয়োজন নেই আমার!
আমার জন্মের সময় মা খুব শখ করে নাম রেখেছিলেন 'সার্থক'। ভেবেছিলেন, আমার জীবনটা হয় তো নামের মতোই 'সার্থক' হবে। কিন্তু হলো তার উল্টো। সার্থক নামের ব্যক্তিটির সারা জীবনেও সার্থকতা নেই। হায়রে ভাগ্য আমার!
নিজের ভাগ্যের কথা ভাবতেই পেট ফেটে হাসি পেল আমার। হাসি দমাতে পারলাম না। হো-হো করে অট্টহাসিতে মেতে উঠলাম। আমি হলফ করে বলতে পারি, রাস্তার মানুষ এখন তাদের কাজ ছেড়ে আমায় দেখছে। অবাক হয়ে ভাবছে,
'লোকটা পাগল না-কি?'
_______(সমাপ্ত)_____