প্রকাশকালঃ এপ্রিল ২৪, ২০২৬
সকালে অফিস যাবার পথে হঠাৎ এক রূপবতী তরুণীকে দেখে আমার দম আটকে এলো। নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখলাম মোড়ের মাথার সাদা বাড়িটার দোতলার বারান্দায় সে দাড়িয়ে। হাতে একটা কাপ, কাপের গায়ে সুন্দর ইংরেজী ফন্টে লেখা ' coffee'. গরম ধোঁয়া ওঠা কাপে চুমুক দিতে দিতে মেয়েটা আনমনে তাকিয়ে আছে আকাশপানে। আমার বুকের ভেতরটায় মোচড় দিয়ে উঠলো! সর্বনাশের শুরুটা বুঝি সেখানেই!
অফিসে আমার মন বসলো না। কাজকর্ম উলটপালট হয়ে গেল। বসের ঝাড়ি খেলাম। ছুটির আধ ঘণ্টা আগেই ব্যাগ-পত্র বগলদাবা করে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু বাড়ি এলাম না। রাস্তায় হাঁটলাম উদ্দেশ্যহীন।
কেবল এক ঝলকের দেখায় কেউ কারো হৃদ-সিংহাসনে আরোহণ করে ফেলতে পারে? কি জানি।
তারপর আমাকে এক কঠিন ব্যাধিতে ধরলো। রোজ রোজ পাড়ার মোড়ের সেই বাড়িটির দিকে তাকিয়ে পথ হাঁটার অভ্যাস হয়ে গেল। অফিসের জন্য দৈনিক দু' বার যাতায়াত তো ছিলই। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনেও ছিল। আমি ওকে দেখে বখাটেদের মতো শীষ বাজাই নি। উল্টোপাল্টা মন্তব্য করি নি, নীল খামে ভরা চিরকুটও ছুঁড়ে দেই নি ওর বারান্দায়। শুধু দেখে গেছি নীরবে। মাত্র মিনিট দুয়েকের একটি দর্শন! সেই যে আমার কাছে ঢের।
ওকে আমি যতো দেখি ততো অবাক হই। মেয়ে হিসেবে সে সুন্দরী বটে তবে আহামরি কিছু নয়। চেহারায় মাধুর্য আছে, কোমলতা-মিষ্টতা আছে। কিন্তু তা তো অনেকেরই থাকে। আমার চেনাজানা অনেক মেয়ের মাঝেই এই বৈশিষ্ট্য আমি খুঁজে পেয়েছি। সেই হিসেবে মেয়েটি সাধারণ। তারপরও কেন যে এই সাধারণ মেয়েটিকেই আমার অসাধারণ মনে হয়! এই প্রশ্নের অনুসন্ধানে কেটে যাচ্ছে আমার দিন।
লাঞ্চ টাইমে আমি বাড়ি ফিরি না। ক্যান্টিনেই খেয়ে নেই। কিন্তু সেদিন কি যেন ভেবে বাড়ি আসছিলাম। পথে দেখি শশীকে। হ্যাঁ, মেয়েটির নাম শশী। পাড়ার মেয়েদের মুখে শুনেছি। কিন্তু ওকে দেখে আমাকে চমকাতে হলো। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো শশী বাইক চালিয়ে আসছে।পরনের পার্পেল লেডিস শার্টের হাতা গোটানো কনুই পর্যন্ত, টাখনুর উপর ফোল্ড করে রাখা জিন্স, পায়ে স্নিকার্স। পিছনে চূড়ো করে বাঁধা চুলের ঝুঁটি, সেখান থেকে ক' গাছি চুল বেরিয়ে কানের পাশে দুলছে, লেডিস শার্টের বোতাম খোলা, ভেতরের টি-শার্ট দেখা যাচ্ছে—আমার মধ্যবিত্ত মস্তিষ্কের ভাষায় পুরোদস্তুর বখাটে কন্যা! পেছনে দুজন মেয়েকে বসিয়ে বাইক ছুটিয়ে এসে ওরা হৈ-হৈ করতে করতে পাড়ার মন্টু ভাইয়ের চায়ের দোকানে ঢুকলো। আমার বিস্ময় তখন তুঙ্গে! সেদিনের দেখা স্নিগ্ধ সুন্দর কোমল পদ্মের ন্যায় মানবীর চরিত্রের সঙ্গে এই চরিত্র কি যায়?
অদ্ভুত একটা দ্বন্দ্বে পরে গেলাম যেন। বাড়ির ব্যালকনিতে দাড়িয়ে থাকা শান্ত-স্নিগ্ধ শশী হলো শুভ্রতার প্রতীক। আর বাড়ির বাইরের শশী? হ্যাঁ, ওকে আমি কখনো বখাটেপনা করতে দেখি নি। তবে পাড়ায় ওর প্রভাব দেখে আড়ালে-আবডালে ঠিক বুঝতাম কি প্রবল প্রতাপশালী আমার শশী!
মেয়েদের উচ্ছৃংখল আচরণ আমার কোনোকালেই পছন্দ নয়। মেয়েরা হয় দ্বিপ্রহরের নির্জন প্রহরের মতো, কখনো ঝর্ণার মতো চপল, প্রকৃতির মতো অপরূপ, মোহনীয়—তাদের কি ঔদ্ধত্য মানায়? আর শশীর অমন বখাটে মার্কা চলন-বলনের কথা আমি মাকে বলবো কি করে? পরিবার কি মানবে আমার?
অতএব দূরত্ব দরকার। তারপরও আমি শশীকে ভুলতে পারলাম না।ভবিষ্যৎ কি হবে জানি না কিন্তু শশীকে আমি ভুলতে পারি না। ওর ভাবনা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারি না। আসলে আমি তখনো নেশার ঘোরে আছি। সেই ঘোরের নাম 'শশী'!
__
সেদিন সকালে দেখি অন্য এক শশীকে। বাসন্তী রঙের শাড়ি জড়িয়ে, খোঁপায় রজনীগন্ধার গাজরা গুঁজে, হাত ভর্তি লাল রেশমি চুড়ি পরে সে সেজেছে আমার স্বপ্নবতী। এতো রূপ, এতো শোভা আমি আর দেখি নি।
রাস্তা পার হয়ে এপাশের ফুটপাথ ধরে হাঁটতে শুরু করলো শশী। আমি ওর পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। কুচি সামলে হাঁটতে বেচারির কষ্ট হচ্ছিল বেশ বুঝেছিলাম। তবুও সে দ্রুত চলার চেষ্টা করছে। বোধ হয় তাড়া আছে খুব। আমার ইচ্ছে করেছিল ওর হাত ধরে ধীরে ধীরে হাঁটিয়ে নিয়ে যাই। কিংবা একটা রিকশা ডাকি। কিন্তু সেসবের কিছুই আমি করি নি। অধিকার নেই বলে।
একটু দূরেই রিকশা পাওয়া গেল। ও রিকশায় চড়ে বসবে তখনই কোত্থেকে একটি মেয়ে এলো। আপাদমস্তক ওকে দেখে হেসে বললো,
—“শশীদি তোমাকে তো আজ দারুণ লাগছে!”
শশী লজ্জায় লাল টুকটুকে হয়ে গেল। রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়লো ওর নরম মুখশ্রী জুড়ে। আমার বুকে ঝড় উঠলো তীব্র। এই নারী, এই নারীতেই আমার সর্বনাশ লেখা। আমি এরই সন্ধানে খুঁজে বেড়াই হাজার বছরের পথ।
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু'দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।
______
কতদিন এমন শুধু চেয়ে থাকার খেলা খেলেছি মনে নেই। শুধু মনে আছে এক বিকেলের কথা।
অফিস থেকে ফিরছি। এসময়ও শশীকে ব্যালকনিতে দেখা যায়। এককাপ কফি হাতে মেয়েটা ব্যালকনিতে এসে দাড়ায়। বিকেলের মিষ্টি হাওয়ায় ওর চুল ওড়ে। আনমনা সেই নারী হয়ে ওঠে আমার কাল্পনিক প্রেয়সী। কিন্তু সেদিন ওর দেখা পেলাম না। মন খারাপ করে এগোতেই হঠাৎ নিজের সামনে এসে আবিষ্কার করলাম তাকে।
স্ট্রাইপ দেয়া অলিভ গ্রিন লেডিস শার্ট আর ধূসর জিন্সে ওকে পাক্কা রাগিণী দেখাচ্ছিল। এসেই কলার চেপে ধরলো আমার,
—“এই যে মি. আপনার সমস্যাটা কি?”
এমন সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদে ভড়কে গেলাম। ওর পেছনে একগাদা ছেলেমেয়েও ছিল। কিছুক্ষণ ওর কোমল অথচ রাগে ক্ষিপ্ত লালচে মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে নিরীহ গলায় বললাম,
—“সমস্যা? কীসের? আমার তো কোনো সমস্যা নেই।”
—“কোনো সমস্যা নেই তো আমাদের বাড়ির দিকে এমন ভ্যাবলার দিকে তাকিয়ে থাকেন কেন?”
একথার কি জবাব দিবো ভেবে পেলাম না। মেয়েটা তার আগেই বললো,
—“কি বাড়িটা খুব পছন্দ হয়েছে? ওই বাড়িতে থাকার শখ?”
আকস্মিক আক্রমণের টাল সামলাতে দেরি হয় নি। সহজ হয়ে আসছিলাম। তাই শশীর টিটকারী গায়ে না মেখে ফট করে বলে ফেললাম,
—“বাড়ি পছন্দ হয়েছে তো বটেই। তবে বাড়ির মানুষগুলো একটু বেশিই পছন্দ হয়েছে।”
—“ওহ্ হো। তাই না-কি!”
পেছন থেকে শীষ দিলো কেউ। ওদের দলের একজন আবার বললো,
—“মানুষগুলো না কোনো নির্দিষ্ট মানুষ?”
শশী পেছনে ফিরে ওদের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গেই চুপসে গেল ওরা। আমি বললাম,
—“আপনাদের তো খুব বুদ্ধি। সঠিকই ধরেছেন। নির্দিষ্ট মানুষ।”
—“খুব বুলি ফুটেছে দেখছি।”
খানিকটা দর্প আর খানিকটা তাচ্ছিল্য নিয়ে বললো শশী। আমি হাসলাম,
—“বুলি আমার আগেই ফুটেছে। শুধু আপনি সামনে আসেন নি বলে দেখেন নি।”
—“শম্পাদি, এ কিন্তু তোমায় কথার জালে ফাসাচ্ছে। এ রোজ তোমার দোতলার ব্যালকনির দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে।”
আমার মনে খটকা লাগলো। শম্পা? ওর নাম তো আমি জানি শশী। শম্পা হলো কোত্থেকে? ভাবনার সুতো ছিঁড়লো শশী। আমার দিকে তাকিয়ে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে, রাগী কণ্ঠে বললো,
—“এতো ফটরফটর না করে যা বলছি মন দিয়ে শুনুন। ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট ওয়ার্নিং দিয়ে দিচ্ছি, এরপর থেকে যদি আমার বোনের ব্যালকনির দিকে আপনার চোখ যায়, তো—ওই চোখ দুটো খুলে আমি মার্বেল খেলবো। ফাজলামো পেয়েছেন, না? রোজ রোজ বাড়ির সামন দিয়ে যেতে যেতে টাংকি মারা? টাংকি মারা আমি ছুটিয়ে ছাড়বো। হুহ্!”
রাগে কাঁপতে কাঁপতে হনহন করে হেঁটে শশী চলে গেল। আমার মাথায় তখন প্যাঁচ লেগে গেছে। শশীর বোনের ব্যালকনির দিকে আমি কেন তাকাবো? আমার চোখ তো থাকে ওর বারান্দার দিকে। আবার নাম নিয়েও বিভ্রান্তি। শশী না শম্পা?
বিভ্রান্তির অবসান ঘটলো দিন কতক পরেই। পাড়ার রানু আপার বিয়েতে।
আমাদের পাড়ার মেয়ে রানু আপা। বেশ বড়লোক বাবার সন্তান। তাই মেয়ের বিয়েতে পুরো পাড়াসুদ্ধ লোককে দাওয়াত করেছিলেন রহমান চাচা। আমরাও সেই দাওয়াতে গিয়েছিলাম পুরো পরিবারসহ। শশীরাও।
কনের স্টেজের কাছে দাড়িয়ে আছে শশী। পরনে মেরুন রঙা কাতান শাড়ি। খোঁপায় রজনীগন্ধার গাজরা, সঙ্গে দু'টো টকটকে লাল গোলাপ। মুখে প্রসাধনের হালকা ছোঁয়া। ঠোঁটে মানানসই লিপস্টিক। ব্যস! শশীকে লাগছিল অপরূপ রূপবতী। শ্বাস আটকে আমি তাকিয়ে রইলাম অপলক।
খেতে বসার জন্য বাড়ির সবাই ডাকছে। আমিও যাচ্ছি তখনই হঠাৎ আরেকটা কান্ড ঘটে গেল। এক মেয়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তার হাতের ফুল ভর্তি ডালা উল্টে ফেললাম। দোষ আমারই ছিল, না দেখে হাঁটছিলাম। মাফ চাইবো তার আগেই মেয়ে গর্জে উঠলো,
—“চোখ কি বাসায় রেখে আসছেন? দেখেন না কিছু? ধাক্কা দিলেন ক্যান?”
চমকে তাকিয়ে দেখি শশী দাড়িয়ে। অথচ পরনের পোশাক একেবারই আলাদা। গাঢ় খয়েরি রঙের ল্যাহেঙ্গা পরে দাড়িয়ে আছে সামনে। সত্যি বলছি, ওকে দেখে আমার মস্তিষ্ক উল্টে-পাল্টে গেল। মিনিট খানেক আগেই যাকে দেখলাম শাড়িতে, দোতলায় স্টেজের কাছে দাড়িয়ে থাকতে, সে কি করে এতো দ্রুত কাপড় বদলে ফুলের ডালা হাতে নিচতলায় ঘুরঘুর করতে পারে! অথচ অবিকল একরকম দেখতে!
—“এই মিয়া! আপনার সমস্যা কি? এমন হ্যাবলাকান্তের মতো তাকিয়ে আছেন ক্যান? আজব!”
আমি নিশ্চিৎ এ শশী নয়। অন্য কেউ। কিন্তু কে? সে চিন্তা ক্ষণিকের জন্য মুলতবি রেখে আমতা আমতা করে বললাম,
—“দুঃখিত, দেখতে পারি নি। আপনি যান, প্লিজ।”
—“যান মানে? ফুল তুলে দেবে কে? এগুলো আপনি ফেলেন নি?”
—“ওহ্। হ্যাঁ, আমি তুলে দিচ্ছি।”
আমি তড়িঘড়ি করে তুলে দিলাম ফুলগুলো। ভাবলাম সে ধন্যবাদ দিবে, কিন্তু তা না করে সে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,
—“আপনি কি ভেবেছেন আমি আপনার ন্যাকামো বুঝি না? ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়ে আমার সময় নষ্ট করা তাই না? আপনাকে তো আমি চিনি। রোজ রোজ বাসার সামনে..”
আরও অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিল, আমি বললাম,
—“আপনার নামটা কি?”
সে রাগী রাগী মুখ করে বললো,
—“ইয়ার্কি মারছেন? রোজ রোজ বাড়ির সামন দিয়ে টাঙ্কি মেরে যান, আর নাম জানেন না?”
বিপন্ন হয়ে বললাম,
—“টাংকি মারি বলেই নাম জানি না। ডিস্টার্ব করলে ঠিক জেনে ফেলতাম।”
—“শম্পা! শম্পা আমার নাম।”
অহমিকা মিশ্রিত তীব্র ঝাঁঝালো স্বর শুনিয়ে সে প্রস্থান করলো। আমিও উল্টো পথে হাঁটা ধরলাম। মাথায় একটা জট খুচখুচ করছে! শম্পা আর শশী! এরা কি তবে যমজ বোন নাকি? তাই যদি হয়, তবে আমি কাকে ভালোবাসি? আমি তো এতদিন জানতামই না একজন ভেবে আমি দুটি ভিন্ন সত্ত্বা, দুটি ভিন্ন মানবীকে এক করে আমার কল্পনার আসর সাজিয়েছি। হৃদ সিংহাসনে আরোহণ করিয়েছি তাদের। সম্মুখে এখন প্রশ্নের জোয়ার! কাকে চাই আমি? কাকেই বা চাই না!
কয়েক পা এগোনোর পরই আমার সব সন্দেহ, হতাশা নিমিষে বিলীন হয়ে গেল। শাড়ি পরা স্বর্গীয়দেবী শশী এলো সামনে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার মন বলে উঠলো,
—“এইতো পেয়েছি তারে! হাজার বছরের পথে আমি অনুসন্ধান করে চলেছি যারে!”
মনের ভেতর জীবনানন্দ কাব্য করে বললো,
চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের 'পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, 'এতোদিন কোথায় ছিলেন?'
পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।
কবিতা আমার প্রিয় নয় কোনোদিনও। অথচ শশীকে দেখবার পর থেকে আমি নিয়মিত কবিতা পড়ি। কবিতা ওর পছন্দ কিনা জানি না। কিন্তু আমার মনে হয় এই আশ্চর্য সৌন্দর্য যেই মেয়ের আছে তাকে আর যাই হোক সাহিত্য বিদ্বেষী বলে মনে হয় না। অন্তত ডজন খানেক কবিতা আমি শুধু ওকে শোনাবো বলেই মুখস্থ করেছি। তন্মধ্যে বনলতা সেন আমার সবচে' প্রিয়। ওকে দেখলেই বনলতা সেন যেন জীবনানন্দের কবিতায় নয় আমার সমুখে এসে দাড়ায়!
শশী একা একা হেঁটে ফিরছিল। আমি বুকে সাহস সঞ্চার করে মৃদু গলায় ডেকে উঠলাম,
—“শশী? একটু শুনবে?”
আনমনে ব্যস্ত শশী হঠাৎ সম্বোধনে চমকালো। মাথা তুলে সোজা হয়ে তাকাতেই চোখাচোখি হলো আমাদের। কয়েক পলের জন্য। ধীরে অথচ জোরালো কণ্ঠে বললো,
—“বলুন।”
আহা কণ্ঠ! কি সুমধুর সেই সুর। কানে বাজে আজও। ঠিক কি বলবো গুছিয়ে উঠতে পারছিলাম না। এলোমেলো ভাবনা নিয়ে বললাম,
—“তুমি আমাকে চেন?”
—“চিনি।”
—“কি করে?”
—“একই পাড়ায় থাকেন। এবাড়ির দু' বাড়ি পেছনে আপনাদের বাড়ি। জানি সেটা। তাছাড়া রোজ রোজ..”
এইটুকু বলে থেমে তাকালো। আমি ওর অসম্পূর্ণ কথা সম্পূর্ণ করলাম,
—“রোজ রোজ অফিস যাবার পথে তোমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকি। এইতো?”
বোধ হয় লজ্জা পেল। চট করে কথা ঘুরালো,
—“এটা জিজ্ঞেস করবার জন্য ডেকেছেন?”
—“না, ঠিক তা নয়। তবে..”
—“তবে?”
সরু চোখে তাকালো। আমি একটু সময় নিয়ে সাজিয়ে বলতে চাইলাম,
—“ভদ্র বাড়ির ভদ্র মেয়েরা প্রেম করে না। আমিও তেমন ছেলে নই।..”
—“আপনি তবে কেমন ছেলে?”
বিদ্রুপ করলো বুঝি? খেয়াল করি নি। বললাম,
—“তোমাকে সেটা জানানোর জন্যই ডাকা। শোনো, শশী। হাজার বছরের অনুসন্ধানের পর আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি। ঠিক বনলতা সেনের মতো। ও-কি! তুমি হাসছো? হেসো না, মেয়ে। আমি কাব্য করছি বটে কিন্তু ঠাট্টা মোটেই নয়।”
সে হাসি বন্ধ করে আমার চোখে চোখ রাখলো। আশ্চর্য শীতল তার দৃষ্টি। আমার বুক ধ্বক করে উঠলো। কি জবাব দেবে সে আমায়?
—“আমার সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের আলাপ চলবে না, মশাই। সাহিত্য দিয়ে জীবন চলে না। আমাকে পেতে হলে সুপ্রিমকোর্টে মামলা তুলতে হবে। আপিল করতে হবে। সাহস থাকলে আমার বাবার সঙ্গে দেখা করবেন।”
—বলেই সে চলে গেল। মন ব্যাঙাচি লাফিয়ে উঠলো আমার। হৃৎপিন্ডের স্পন্দন হার এতো বেড়ে গেল যে মনে হতে লাগলো দু' এক সেকেন্ডের মধ্যেই সেটা বুক ফুঁড়ে ছিটকে বেরিয়ে আসবে। বাঁ হাতে বুকে চাপা দিয়ে, আমি কোনমতে বাড়ি ফিরলাম। আনন্দে আত্মহারা আমি।
সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।
____
তারপরের ঘটনা বিস্তারিত না বলি। নিজের বিয়ের কথা বলতে শরম লাগে না কার, বলুন তো? তবু শুধু জেনে রাখুন, এরপরের ঘটনাটা ঘটিয়েছেন আমার আর শশীর পরিবার মিলেমিশে। ধুমধাম আয়োজন করে শশীকে আমার ব্যক্তিগত নারী হিসেবে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে। যদিও বিয়েতে আমার ছোট শ্যালিকা শম্পা (এরা যমজ। শশীর কয়েক মিনিটের ছোট শম্পা) বেশ হাঙ্গামা বাঁধাবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারে নি। পারলে কি আর শশী এখন আমার বৌ হয়?
হ্যাঁ, শশী আমার বৌ। আমার স্বপ্নবতী নারী। যাকে দেখে আমার প্রতিটি সকাল শুরু হয়, রাত শেষ হয়। বিয়ের আগে ওকে আমি যেমন দেখেছি, যতোটা মুগ্ধ হয়েছি বিয়ের পর তা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। ওর মধ্যে 'কি যেন' একটা আছে। যার তীব্র আকর্ষণে আমি বাঁধা পড়েছি। বহু আগেও আমি এই ' কি যেন '—যেমন করে খুঁজে চলেছি এখনও তেমন করে খুঁজি। তবুও খুঁজে পাই না। সুদীর্ঘ কাল ধরে সেই অনুসন্ধান করেও বোধ হয় তা পারবো না।
আমাদের সুখের সংসারে ঝগড়া-ঝাটি যে নেই তা নয়। বাজারে অপটুতা, কাজে আলসেমি, ইত্যাদি ইত্যাদি নানা ঘরোয়া ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে সে প্রায়ই আমার সঙ্গে খুটখাট বাঁধিয়ে দেয়। তারপরও এই নীড়ে আমার সুখ আছে। বাঁধনহারা সুখ আমার এখানেই নিহিত। মাঝরাতে সে যখন কপট রেগে বলে,
—“করছোটা কি?”
আমি বিস্তর হেসে বলি,
—“অনুসন্ধান। তোমার অনুসন্ধানে সময় ব্যয় করছি।”
আমার ব্যক্তিগত নারীটি তখন লাজুকতায় মুড়িয়ে যায়। রক্তিম আভায় রাঙা মুখটা লুকানোর জন্য সে আমার বুকটাই খুঁজে। সেখানেই যে তার নির্ভরতার স্থান।