মেঘে ঢাকা দিনে

লেখিকাঃ মৌরিন আহমেদ

প্রকাশকালঃ এপ্রিল ২৩, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

ভার্সিটির টিচার ছাত্রীকে বিয়ে করতে পারবে না শুনে আমার মন চাইলো আমি প্রত্যয় স্যারের গলায় ঝুলে বলি, "স্যার গো! আপনার গলায় ঝুলে পড়ি, আমি ভার্সিটি ছাইড়া দেব তাও আপনি আমারে বিয়া করেন!'

কিন্তু নেহাতই মান-সম্মানের ভয়ে আমার মুখ দিয়ে সে কথা বেরোল না। আজকে আমাকে পাত্র দেখতে এসেছে। পাত্র কে সেটা আমি একটু আগেও জানতাম না। সম্ভবত পাত্র নিজেও জানত না। কিন্তু এই মাত্র সেজেগুজে ড্রইং রুমে আসতেই পাত্রকে দেখেই চমকে উঠলাম। ভরকে গেলাম কয়েক মুহূর্তেই জন্য! তারপরেই আবার খুশির চোটে বুকের ভেতর 'লা লা লা লা লা' গান বাজতে শুরু করলো। ভার্সিটিতে আমার প্রিয় স্যার! আমার একমাত্র ক্রাশ, কি-না এসেছে আমাকে দেখতে! 'ও মা গো! আমি তো খুশির ঠেলায় ম রেই যাবো!'

সে উচ্ছাস অবশ্য প্রকাশ করতে পারি নি। কারণ স্যারের সাথে বিয়ের কথা শুনে যদি এখনই 'বেলি ড্যান্স' দেয়া শুরু করি তাহলে তো আবার পাত্রপক্ষ পছন্দই করবে না। যদি মেয়ের আদব নেই বলে রিজেক্ট করে দেয়? এই দুঃখ কী আমি সইতে পারবো? না, কখনো না। তাই লক্ষ্মী, ভদ্র মেয়ের মতো চুপটি করে বসে রইলাম। পুতুল পুতুল স্টাইলে বসে মাথা নুইয়ে একেবারে থুতনি-চিবুক সব এক করে ফেললাম। আমার অতি বিনয়ী এবং লজ্জাশীলতা দেখে আমার হবু শাশুড়ি তথা প্রত্যয় স্যারের মা মুচকি হাসলেন। খুশি হয়ে প্রশংসা করলেন। আমার খুশি আর কে দেখে!

মৌরিন আহমেদ এর লেখা অনুগল্প মেঘে ঢাকা দিনে এর ইমেজ

আমি চুপচাপ বসে থেকে ফাইভ জি স্পিডে আমার বিয়ের প্ল্যানিং করা শুরু করে দিলাম। গায়ে হলুদ, বিয়ে, বৌ ভাত -- এমনকি হানিমুন আর বাচ্চার প্ল্যানিং পর্যন্ত। আমি একা একাই সব সেরে ফেলে যখন 'তা ধিন তা ধিন' নাচছি (মনে মনে) তখনই আমার সব স্বপ্ন, আশা-ভরসা কে ভে ঙে টু ক রো টু ক রো করে কথা বলে উঠলেন প্রত্যয় স্যার,

-- "তাবাসসুম কে আমি বিয়ে করতে পারবো না, মা। ও আমার ছাত্রী! আর ভার্সিটিতে ডিপার্টমেন্টের স্যার-স্টুডেন্ট বিয়ে করতে পারে না। ব্যাপারটা নিয়ম বহির্ভূত তো অবশ্যই সঙ্গে ভীষণ অস্বস্তিকর!.."

মুহূর্তেই শুনতে পেলাম কাঁচ ভা ঙা র শব্দ! কে যেন খান খান করে ভে ঙে চুরমার করে দিলো আমার ছোট্ট হৃদয়খানি। বাংলা সিনেমার শাবানার মতন তখন আমার মনটা চিৎকার করে উঠলো,

' না-আ-আ-আ! এ হতে পারে না। আমি বিশ্বাস করি না। ক্রাশ গো, তুমি এমন করতে পারো না!'

কিন্তু বাহিরে তার কিঞ্চিৎ প্রকাশ ঘটলো না। নিরবে নত মস্তক আরও বেশি নত করে ফেললাম। ঠিক সেই সময় শুনতে পেলাম বাবার কণ্ঠস্বর,

-- "তুমি জানতে না, তাবাসসুমের কথা?"

-- "নামটা শুনে বুঝতে পারি নি। একই ভার্সিটির জানতাম, কিন্তু একই ডিপার্টমেন্টে পড়ে সেটা জানতাম না।.."

উত্তর দিতে উনি একটু অস্বস্তি বোধ করলেন বুঝলাম। বাবাও বোধ হয় পরিস্থিতি বুঝলেন। ভুলবশত এমনটা ঘটে গেছে। স্যারের মা বসেছিলেন আমার পাশেই। আর তার পাশেই ওপাশের সিঙ্গেল সোফাটায় বসা স্যার। স্যারের মা তার ছেলের দিকে একটু চেপে ধীরে ধীরে বললেন,

-- "কিন্তু তাবাসসুমকে তো আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে, প্রত্যয়! মেয়েটা কি সুন্দর লক্ষ্ণী!.."

-- "প্রশ্নটা মেয়ের চেহারা বা ব্যবহারের নয়, মা। এটা একটা নিয়মের কথা। চেয়ারম্যান স্যার এটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আর যেখানে চাকরি করি, যার কর্তৃত্ব মানতেই হবে, সেখানে শুধু শুধু নিয়ম ভঙ্গ করা কেন?"

স্যারের কথাগুলো ঠিক তী রে র মতো বুকে এসে বিঁ ধ ল যেন। একটা নিয়ম! শুধু একটা নিয়মের জোরে আমার ক্রাশের সাথে আমার বিয়ে হবে না? এটা কোনো কথা? আমার ইচ্ছা হলো স্যারের গলা ধরে ঝুলে বলি,

'স্যার, আপনি বললে আমি পড়ালেখা ছেড়ে দেব ভার্সিটি বদলাবো, না হয় ভার্সিটি যাওয়া বাদ দিবো। তবুও আপনি আমায় বিয়ে করুন!'

কিন্তু বলা হলো না। আমি ভীষন রকম অপ্রস্তুত হয়ে কথা বলার খেই হারিয়ে ফেললাম। একই অবস্থা এখানে উপস্থিত সবারই। কিছুটা সময় লাগলো সবার ধাতস্ত হওয়ার। এরকম একটা বিদিগিস্তি অবস্থা হবে তা-ই বা কে জানতো?

যাই হোক, বিয়ের আলাপন সেখানেই সমাপ্ত হলো। তবে মেয়ের শিক্ষক হিসেবে প্রত্যয় স্যার আর তার মা'কে বেশ অ্যাপায়নই করলেন মা-বাবা। দুপুরের খাবার খেয়ে তারা চলে গেলেন।

এখানে দোষ কিন্তু কারোরই নেই। সম্বন্ধ নিয়ে এসেছে ঘটক সাহেব। কোনো পক্ষই আগে থেকে জানতো না। অতএব কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই!

________

ঘটনার পর আমার হঠাৎ করে কি যেন হলো! আগে স্যার ছিলেন আমার ক্রাশ, তার ক্লাস করতে আমার ভালো লাগতো। তার কথাবার্তা, ভাব-ভঙ্গি, চাল-চলন, এক কথায় তার পুরো ব্যক্তিত্বটাকেই আমার ভালো লাগতো। আমি বিমুগ্ধ নয়নে নির্নিমেষ তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম ক্লাসে। ক্লাসের বাইরে কোথাও স্যারের দেখা পেলেই লাফাতে লাফাতে ছুটে যেতাম তার কাছে, কুশল বিনিময়ের ছলনায় দু' একটা কথা বলতাম। স্যারও ভালো মতোন জবাব দিতেন। আমার ভালোলাগা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তো! কিন্তু ঘটনার পরেই আমার কি যেন হলো। আমি বদলে গেলাম। আমার সবটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। উড়নচণ্ডী আমিটাই হুট করে শান্ত, লাজুক আমিতে পরিণত হলাম।

জীবনের কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করলাম যেন। সেই থেকে শুরু হলো আমার পরিবর্তন। উচ্ছল প্রাণবন্ত আমি বদলে গিয়ে ধীর-শান্ত হয়ে পড়লাম। তপ্ত দুপুরে ক্লান্ত পুকুরের নির্মল জলের মতো ঠান্ডা আর নিশ্চল। আমার 'হা হা' করে উচ্চস্বরে হাসি, কোথায় যে লুকালো! স্যারের দিকে সরাসরি তাকানোর ক্ষমতাটা আমার বিলীন হয়ে গেল কোনো এক অজানা কারণে! লজ্জায় না-কি দ্বিধায় আমি জানি না। তবে তার প্রতি আমার আকর্ষণ কমলো না একবিন্দুও! বরং চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে লাগলো! আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখতাম, আড়নয়নে দূর থেকে। বরাবরের মতই মুগ্ধ হতাম। ভালো লাগতো ভীষণ!

সময় গড়ালো। অনেকগুলো দিন পেরোল। বাড়িতে পুনরায় বিয়ের কথা উঠলো আমার। বাবা এবার বেশ খোঁজ-খবর নিয়ে তারপর পাত্র পক্ষকে আমন্ত্রণ করলেন। পাত্র ম্যারিন ইঞ্জিনিয়ার। হ্যান্ডসাম স্যালারি, বেনিফিটসও বেশ ভালো। দেখতে আসার দিনই পাকা কথা হয়ে গেল প্রায়। দু' পক্ষই রাজি। বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হলো। আমার অনার্স ফাইন্যাল এক্সাম দিয়েই বিয়ের আয়োজন করা হবে। পুরো ব্যাপারটায় আমার কোনো আগ্রহ বা আপত্তি কোনোটাই ছিল না। কারণ আমি তখনও জানতাম না, আমার মন আসলে কি চায়! প্রত্যয় স্যারের প্রতি আমার যে আবেগ তা ভালোলাগা না ভালোবাসা! আই রিয়েলি ডিড'ন্ট নো ইট দেন!

দিনগুলো পার হচ্ছিল খুব স্বাভাবিক ভাবেই। আমার হবু বর মানে তানভীর তখন প্রায় প্রায় এ বাড়িতে যাতায়াত করতো। আমার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা চালাতো। আমাকে ইমপ্রেস করার জন্য প্রায়ই সঙ্গে করে আনতো গোলাপ, চকলেট, প্রিয় উপন্যাসের বই ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার সাথে আমার কথা বলতে ভালো লাগতো না। সে কল দিলে আমি ফোন কানে রেখে চুপচাপ, নির্লিপ্ত ভাবে বসে থাকতাম। যা বলতেন তার প্রতি উত্তর করতাম। বাড়তি কথা বলতাম না। ঘুরতে যাওয়ার আবদার করলে আমি এটা-সেটা'র অজুহাত দেখিয়ে কাটিয়ে দিতাম। আমি বুঝতে পারছিলাম আমার তাকে পছন্দ নয়!

একটা সময় এসে তানভীর আমার এই নিরাসক্ততা'টা ঠিক টের পেয়ে গেলেন। আমাকে অনুরোধ করলেন সবকিছু তাকে খুলে বলতে। ভীষণ দ্বিধা দ্বন্দ নিয়েই আমি তাকে পুরোটা বললাম। প্রত্যয় স্যারকে ভালোলাগা থেকে শুরু করে স-ব! আমি ভেবেছিলাম তানভীর হয় তো সবটা জেনে খুব রাগ করবেন, বাসায় জানিয়ে বিয়ে ভেঙে দেবেন। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সে খুব শান্ত স্বরেই বললো,

-- "অনুভূতি কখনো চেপে রাখা ঠিক না, তাবাসসুম। যার প্রতি তোমার অনুভূতি আছে তাকে তুমি যদি সে কথা না জানাও, তবে নতুন সম্পর্কের সৃষ্টি কি করে হবে? হতেও তো পারে, অপরপক্ষ তোমার অপেক্ষা করছে?"

-- "আমি তাহলে কি করবো?"

-- "অবশ্যই তাকে জানাবে।"

তানভীরের আচরণ দেখে অবাক হয়েছিলাম। বিমূঢ় হয়ে জানতে চেয়েছিলাম,

-- "যদি উনি না করে দেয় তো?"

-- "তাহলে তুমি যা বলবে তাই হবে। যদি এই বিয়েটা করতে না চাও, আমাকে জানাবে। আমি ব্যবস্থা করবো। আর যদি.."

-- "করতে চাইলে?"

আমি তাকাতেই চোখ নামিয়ে নিলেন। লহু স্বরে জানালেন,

-- "তোমার জন্য আমার দুয়ার সারাজীবন খোলা। তোমাকে বলা হয় নি, প্রথম দেখায় তোমাকে ভালো লেগেছে আমার। তাই বিয়ের কথা এগিয়েছে। আর তারপর তোমার সাথে মিশে পুরোপুরি তোমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি।.."

আমার কান গরম হয়ে উঠলো। ভীষন অস্বস্তিতে পড়লাম। মানুষটা এভাবে না বললেও পারতো। সেদিনের সাক্ষাৎটা সেখানেই সমাপ্ত করে ফিরে এলাম।

বাড়ি এসে নিজেকে যুঝতে লাগলাম। বোঝার চেষ্টা করছিলাম আসলে আমি কি চাই। একসময় তানভীরের বলা কথাগুলোই মনে হলো সঠিক। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম প্রত্যয় স্যারকে সবটা জানাতে হবে।

ভাবনা অনুযায়ী আমি স্যারকে সবটা জানালাম। এক নির্জন দ্বিপ্রহরে, তপ্ত বেলায় রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি বসে আলাপ করলাম।

-- "তুমি আমাকে পছন্দ করো?"

স্যারের প্রশ্ন শুনে আমি মাথা নুইয়ে ফেললাম। ছাত্রী হয়ে শিক্ষককে এই কথা বলা যে কি পরিমান লজ্জার! সাথে ভীষন বিব্রতকর। তবুও আমাকে বলতে হলো। কারণ আমি নিরুপায়। চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে সায় দিলাম। স্যার কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বেশ ঠাণ্ডা গলায় বললেন,

-- "তুমি যে কী বিশ্রী একটা কথা বলেছ তুমি জানো? I am your teacher. The relationship between us is the teacher and student. Do you know how sacred relationship it is?"

-- "স্যার.."

-- "হ্যাঁ, মানছি। তুমি ভার্সিটিতে পড়ো। এখানে এসে তোমাদের কাছে শিক্ষক-ছাত্রদের সম্পর্কটা ছোট বেলার মতোন তেমন মান্য করার নয়। কিন্তু ভার্সিটিতে যে এই কাজ নিয়ম বহির্ভূত, জানো না?.."

স্যার কিন্তু মোটেও রেগে-রেগে কথা বলেন নি। যথেষ্ট ঠান্ডা-শীতল স্বরে বলেছেন। তবে চেহারাটা ছিল গম্ভীর। আমি লজ্জায় নুইয়ে গেলাম। কিন্তু অবাধ্য, বে য়া দব মনটা তো তখনো মানতে নারাজ! লাজ-শরমের মাথা খেয়ে একসময় বলেই ফেললাম,

-- "এমনটা যে আগে কখনো হয় নি, তা তো নয়। অনেকেই এমন করেছে। আপনি যদি কাউকে বিয়ে করেন সে কি কোনো ছাত্রী হবে না? হোক আপনার ছাত্রী, কিংবা অন্য কারো। ছাত্রী-ই তো!"

-- "তুমি বিষয়টাকে অন্য ভাবে দেখছ। সহজ ভাবে দেখলে এমন মানে দাড়ায় না, তাবাসসুম!.."

-- "আপনিও সহজ ভাবে দেখছেন না, স্যার। ধরুন, আমি এই ভার্সিটির ছাত্রী নই। আপনি যে ডিপার্টমেন্টে লেকচার দেন, সেখানে 'আমি' বলে কেউ নেই। তখন সেই পরিস্থিতিতে দাড়িয়ে যদি আপনার সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ধ হতো, তখন? আপনি নিশ্চয় না করতেন না? সেখানে আমি আপনার ডিপার্টমেন্টের ছাত্রী বলেই কি.."

-- "পৃথিবীতে নিয়ম বলে কিছু আছে!.."

আমার কথা তিনি শেষ করতে দিলেন না, তার আগেই নিজের মুখস্ত বুলি আওড়ানো শুরু করলেন। আমি নিরবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। এলোমেলো হয়ে গেল আমার চিন্তা-ভাবনা। পাগলের মতো উদগ্রীব হয়ে বলে বসলাম,

-- "আ-মি-আমি যদি ভার্সিটি চেঞ্জ করে ফেলি, আপনি আমায় বিয়ে করবেন? হোক আমার ইয়ার লস, ক্যারিয়ার ফেইল। আই ডোন্ট কেয়ার!.."

তারপর খানিক থেমে, শ্বাস নিয়ে বললাম,

-- "আ-আমি আপনাকে ভা-ভালোবাসি, স্যার! প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড! এই অনুভূতিটা ভীষন খারাপ। এই অনুভুতির জালে ফেঁসে যাওয়া খুব খুব খারাপ। আমি এই জালে আটকাতে চাই নি। কি-ন্তু-কিন্তু কি করে যেন..."

-- "তুমি অনেক দেরি করে ফেলেছ, তাবাসসুম! আ'ম অলরেডি এনগেইজড উইথ সামওয়ান। নেক্সট মান্থে আমার বিয়ে!"

কথাগুলো শোনার পর আর কিছু করার রইলো না আমার। শান্ত মুখে ফেরৎ চলে এলাম আমি। "আ'ম অলরেডি এনগেইজড উইথ সামওয়ান। নেক্সট মান্থে আমার বিয়ে!" --এই কথা শোনার পর আসলেই কিছু বলার থাকে না।

--

তখনো আমার বিয়ের অনেক দিন বাকি। কোনোপক্ষেরই কোনো জবরদস্তি নেই। কেমন তোড়জোড় ছাড়া, আলগা হওয়া অবস্থা। মাঝে মাঝে তানভীরের পরিবারের লোকদের সাথে দেখা হয়, দাওয়াত দেয়া-নেয়া হয় দু' পরিবারের। আমি নির্লিপ্ত। কিছুদিন তানভীরের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে রাখলাম। ভাবছিলাম, বিয়েটা করবো কি-না। আমার এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সময়ও পাশে পেয়েছিলাম তানভীরকে। নিজ উদ্যোগে আমাকে সঙ্গ দিয়েছিল সে। সত্যিই লোকটা বাস্তবিকই ভদ্রলোকের কাতারে পরে! সে পাশে না থাকলে আমি হয় তো মুভ অন করতে পারতাম না। সে আমার জন্য অনেক করেছে। এক পাক্ষিক পছন্দ নিয়ে অপেক্ষা করেছে কতগুলো দিন!...'

ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ ও ঘর থেকে আমার শাশুড়ি মায়ের কণ্ঠ শোনা গেল,

-- "তাবাসসুম! কোথায় তুমি? আকাশের অবস্থা দেখেছ? এক্ষুনি বৃষ্টি নামবে। ছাদের কাপড় কি উঠিয়ে এনেছ? এই!"

-- "যাচ্ছি, মা।"

আমি তড়িঘড়ি করে ছাদের দিকে ছুটলাম। সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দরজায় আসতেই নজর পড়লো আকাশের দিকে। কৃষ্ণমেঘে আচ্ছাদিত পুরো গগন। যেন অভিমানী কন্যার একরাশ অভিমান জমিয়ে রেখেছে বুকে। একটু পরেই কান্না হয়ে ঝরে পড়বে অঝোরে! বলতে না বলতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বড় বড় ফোঁটায়। মুহূর্তেই তা বৃহদাকার ধারণ করে, মুষল ধারে পরতে লাগলো ধরণীর বুকে। আমি এদিক-সেদিক না তাকিয়ে হুড়মুড় করে কাপড় গুলো তুলে আনতে আনতেই ভিজে উঠলাম। কাপড় নিয়ে নিচে নামছি আর নিজেকে বকছি,

ইসস! এমন বেখেয়ালি হয় কেউ? আরেকটু হলেই তো কাপড় গুলো ভিজে যেত। এত্তগুলা কাপড়! ভিজে গেলে শুকোতে পুনরায় সময় লাগতো না? কেন যে সেই পুরনো কথা ভাবতে যাই আমি। ধ্যাত!

তানভীরের সাথে আমার বিয়ের দু' বছর চলছে। আহামরি আরাম আয়েশ না থাকলেও বলবো যা আছি ভালোই আছি। জীবনে দুঃখ একেবারেই নেই তা নয়। তবে দুঃখের পর যে সুখটা জীবনে আছে তাতেই আমি সন্তুষ্ট। আর দুঃখ তো জীবনের বাইরের কিছু না। একই মুদ্রার এ পিঠ, ও পিঠ হলো সুখ-দুঃখ। একটা থাকলে আরেকটা তো থাকবেই। মানিয়ে নিতে হয় সেগুলো।

দু' বছরে সব বদলেছে। আমার মাস্টার্স শেষ হয়েছে। ভার্সিটির পাঠ চুকিয়ে গেছে। প্রত্যয় স্যার দেড় বছর আগেই বিদেশ গিয়েছেন পি এইচ ডি ডিগ্রী নিতে। এখনো বোধ হয় ফিরে আসেন নি। যাওয়ার আগে অবশ্য বিয়েও করে গেছেন। এখন আর আমি তাকে মনে করি না। বলা হয় না, চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল হয়? তিনি চোখের আড়াল হতেই তাকে ভুলে গিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছি। যদিও ভোলাটা সহজ ছিল না। তবুও.. তানভীরকে কম তো আর অপেক্ষা করাই নি! আর বিয়ে যখন করতেই হবে তখন আর ভেবে কি? তাই বিয়েটা করেই ফেললাম।

সবকিছুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছি এখন। প্রত্যয় স্যার আর এই মনে বসবাস করেন না। বরং মনের সকল অনুভূতি এখন তানভীরের জন্য। কে বলে দ্বিতীয়বার ভালোবাসা যায় না? যায় তো, তানভীরের মতো ছেলে থাকলে খুব যায়!

অনুভূতিতে এখন প্রত্যয় স্যার নেই, না চিন্তা-ধারায়। কারণ অন্যের স্বামীকে মনে করা কোনো ভালো বিষয় নয়। তাছাড়া আমি যখন অন্য কারো স্ত্রী তখন তাকে মনে করার কি আছে? শুধু শুধু সমাজের কাছে, নিজের কাছে, নিজেকে ছোট বানানো।

কিন্তু মন যে বড়ো অবাধ্য! কোনো এক মেঘে ঢাকা দিনে, বি ষ ণ্ণ প্রহরে, আকাশের দিকে তাকালে আমার তার কথা মনে পরে। আমি হুট করেই আনমনা হয়ে যাই। তখন মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে জীবনের সমীকরণটা কি এমন না হলেই চলতো না? এমন হওয়ার কি খুব দরকার ছিল? তারপর সংবিৎ ফিরে পেলে আমি আমার ' আমি' কে ব কা-ঝ কা করি। কেন তাকে নিয়ে ভাবতে হবে আমার? না ভাবলেই কি নয়? নিজেকে ব্যস্ত রাখতে আমি অন্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ভুলেও যাই তাকে। কিন্তু সময়ে-অসময়ে মেঘে ঢাকা দিনগুলোতে ঠিক তাকে মনে পড়ে যায়!

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প