প্রতিবিম্ব

লেখিকাঃ আফিয়া আফরিন

প্রকাশকালঃ অক্টোবর ১২, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

দেখতে দেখতে অনিতার বিয়ের আজ দশটা বছর পূর্ণ হয়ে গেল। গত দশটা বছরে তার জীবনে অপ্রাপ্তি কী ছিল, তার হিসেব সে আর রাখে না। প্রাপ্তি হিসেবে একমাত্র মেয়ে তার বুকের ধন মেঘকে তো পেয়েছেই। এতো শান্তিতে আবার অপ্রাপ্তি থাকে নাকি? অপ্রাপ্তির হিসাব কষলেও তো অন্যায় হবে। সে শুধু জানে, তাকে চুপচাপ সংসার করতে হবে একদম বাঙালি লক্ষ্মী মন্ত্র বউয়ের মত। বিয়ের পর সে সবই পেয়েছে। টাকা পয়সা, ধনদৌলতে পূর্ণ শ্বশুরবাড়ি আর সমাজের

দৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠিত স্বামী। ব্যাস, এরপর আর জীবনে ভালো থাকতে গেলে কি লাগে? আসলেই কি লাগে না? টাকা পয়সা, খ্যাতিই কি পৃথিবীর সব? এর বাইরেও যে ভালোবাসার আরেকটি জগত আছে, সেই জগতে পা রাখার সৌভাগ্য অনিতার আর শ্বশুরবাড়িতে আসার পর হয়ে উঠেনাই।

ভালোবাসার জগতে পা রাখার সৌভাগ্য অবশ্য একবার হয়েছিল, তাও অনেক কাল আগে। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে ভালোবেসে ছিল নাহিনকে। কিন্তু সম্পর্কটা যখন অনিতাদের বাড়িতে জানানো হলো, মেনে নিল না কেউ। সবাই বলল, 'আমাদের স্ট্যাটাস এর সাথে ওই ছেলে যায় না। ভুল করেছ কাজেই দ্রুত ভুল শুধরে নাও।'

আফিয়া আফরিন এর লেখা অনুগল্প প্রতিবিম্ব এর ইমেজ

ভুল? ভালোবাসায় কোথায় ভুল সেটাই বুঝল না অনিতা। পরিবারের বিরুদ্ধে বেঁকে বসল। যাইহোক, যার বিনিময়েই হোক তার নাহিনকেই চাই। বাবাকে যখন আরেকবার অনুরোধ করে বলতে গেল, তখন বাবা সোজাসাপ্টা বললেন, 'ওসব রাস্তার ছেলের নাম ভুলে যাও। কি আছে ওই ছেলের? আমার মেয়েকে পারবে সুখে রাখতে? পারবে তোমাকে সুন্দর একটা ভবিষ্যত উপহার দিতে? কিচ্ছু পারবেনা, কোন যোগ্যতা নেই ওর। আমি খুব শীঘ্রই অন্যত্র তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করব।'

সেই মুহূর্তে অনিতার পাগল পাগল লাগছিল নিজেকে। যাকে নিয়ে স্বপ্নের ঘর সাজিয়েছিল, সেই মানুষটা জীবন থেকে মুছে যাবে? না, এ হতে পারে না। বিয়ে সে কিছুতেই করবে না। সারা জীবন মা-বাবার বাধ্য এক পলকে অবাধ্য, লাগামছাড়া হয়ে উঠল। সাফ জানিয়ে দিল, বিয়ে করলে সে নাহিনকেই করবে।

অনিতাকে ঘরবন্দী করে রাখা হলো। অনিতার খবর না পেয়ে নাহিন এসেছিল অনিতার বাড়ি। মা-বাবা তাকে চূড়ান্ত অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। সেদিন একটা কথা নাহিনের খুব গায়ে লেগেছিল।

'তোমার মত দুই টাকার ছেলের হাতে আমি আমার মেয়েকে কিছুতেই তুলে দেব না। বামন হয়ে চান্দের পানে হাত বাড়িয়েছ। স্ব-সম্মানে সেই হাত নিচে নামিয়ে নাও। না হয় পরে দেখবে সে হাতটাই তোমার আর অবশিষ্ট নেই।'

এই কথাটা শোনা মাত্রই নাহিন তার জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিয়েছিল। আসলেই সে হয়তো জেগে জেগে দিবা স্বপ্ন দেখছে। অনিতাকে সুখে বা স্বাচ্ছন্দ্যে রাখার ক্ষমতা তার নেই। অনিতা তার জন্য নয়। চাটাইয়ে শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার অধিকার তার কোনভাবেই নেই। বুকে পাথর চাপা দিয়ে ভালোবাসার মানুষের আশা ছেড়ে দিয়েছিল। সে অনিতার চাচাতো বোনের মাধ্যমে তাকে শেষ একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল।

প্রিয় মানুষ,

'মেনে নাও অনি। আমি তোমার কপালে নেই। তোমার মা বাবা তোমাকে যেভাবে সুখে দেখতে চায়, সেই তথাকথিত সুখ আমার কাছে তুমি পাবে না। তবে, লোক চক্ষুর আড়ালে গিয়ে তোমার ভালবাসতে পারব আমি। মনে রেখো, আমার বুকের বাঁ পাশটার মালিকানা শুধুমাত্র তোমার। তুমি সুখে থেকো কেমন। তুমি সুখে থাকলে আমার এই আর এক জীবনে চাওয়ার কিছু নেই। আমিও তোমার ভালোবাসায় ভালো থাকব, আমার প্রতিবিম্বের আমি তোমাকে নিয়ে সুখের জগত গড়ে তুলব!

ইতি,

তোমাকে ধরে রাখতে না পারা ব্যর্থ প্রেমিক।

বিজ্ঞাপন

অনিতা ঠিকই বুঝে ছিল এর পেছনে হাত রয়েছে তার দাম্ভিক, নাকউঁচু, অহংবোধ সম্পূর্ণ মা বাবার। অনিতা সেই মুহূর্তে রাগ হচ্ছিল নিজের উপর। সে কেন বেছে বেছে এইরকম জঘন্য পরিবারের জন্মাল? যেখানে ভালোবাসার কোন দাম নেই। বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে সেই উপায়টাও নেই। ছোট বাচ্চাদের মতো হাত পা ছুড়ে কেঁদেছিল অনিতা, কান্নার সময়ও ভরসা দেওয়ার মতো একজন মানুষ সে পায় নাই। সেদিন বুঝেছিল, পৃথিবীতে মানুষেরও খুব অভাব। ভালোবাসা আর মানুষ একে অপরের পরিপূরক কি-না! দুটোরই অভাব বেশ।

অবশেষে বিয়েটা হয়েই গেল শহরের নামকরা বিজনেসম্যান আতিফ আহমেদের সাথে। অনিতার খ্যাতিমান বর বাসর রাতে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস না করে অনিতাকে দায়িত্বের কথা বলেছে। বলেছিল, 'আমার মা এই সংসারের প্রধান। ভুল করেও তার উপর কোনো উচ্চবাচ্য চলবে না। তোমার যতটুকু দায়িত্ব পালন করা দরকার ঠিক ততটুকু করবে। আর মায়ের মুখে মুখে কোন কথা আমি বরদাস্ত করব না। মায়ের মুখে কোন অভিযোগ শুনলে এর জন্য অবশ্যই তোমাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।'

ঠিক সেই মুহূর্তে অনিতা নিজের পাঁজরের হাড় গুলো ভেঙ্গে চুরমুর হয়ে যাওয়ার স্পষ্ট শব্দ শুনতে পেয়েছিল। এত কষ্ট বুকের ভেতর! এত কষ্ট চোখের কার্নিশে! এ নিয়ে কী করে সে পাড়ি দিবে সারাটা জীবন? আজ আতিফের জায়গায় যদি নাহিন থাকত, তবে কি সেও এইরকম করে সংসারের বোঝা তার উপর চাপিয়ে দিত? না তো। তার মন মানসিকতা, ধ্যান ধারণা একদম অন্যরকম ছিল। সেতো বলতে শুধুমাত্র ভালোবাসার কথা। নিশ্চয়ই দু'হাত উজাড় করে বলতো, 'আজ আমি আমার আকাশ পেয়েছি, আমি আমার সুখের ঠিকানা পেয়েছি। পেয়েছি আমার বুকের বাঁ পাশের মালিক কে।'

অনিতা জানে নাহিনকে। সে যে অনিতাকে জিতে নিয়ে এসবই বলতো সেটা তার অজানা নয়। ছেলেটাকে যে মাত্র দেড় বছরে যে আগাগোড়া পুরোটাই জানা হয়ে গেছে তার। আর আশ্চর্যের ব্যাপার হল, আতিফের সাথে দীর্ঘ ১০ বছর সংসার করেও আজও তার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা হলো না। একটুও বোঝা হলো না তাকে। অবশ্য অনিতা কখনো বোঝার চেষ্টাও করে নাই। আতিফ অনিতার কোন অভাবই অপূর্ণ রাখেনি। শারীরিক চাহিদা, দৈহিক চাহিদা সবটাই পূরণ করেছে। শুধু পূরণ করতে পারে নাই মানসিক চাহিদা। নির্জীব হয়ে যাওয়া অনিতা কখনো তাকে ভালবাসে নাই। সেও বলেনি কোনোদিন ভালোবাসার কথা। অবশ্য ভালবাসলে তো বলবে!

তারপরের জীবনটা সংসারে অন্তরালে একপ্রকার বন্দি হয়েই কাটছিল। এখন আর চাইলেও পাখির মত মুক্ত আকাশে ডানা মেলে ওড়া হয় না। জীবন নিয়ে রংধনুর মত সাজানো স্বপ্ন দেখা হয় না। বিয়ের দু বছরের মাথায় কন্যা সন্তানের মা হয় অনিতা, মেয়ের মুখ দেখে বেঁচে থাকার আরেকটি ক্ষীণ সম্ভাবনা তার ভেতর উঁকি দেয়।

আফিয়া আফরিন এর লেখা প্রতিবিম্ব গল্পের ছবি

তারপর সবকিছু আগের নিয়ম মেনে চলছে। যে তথাকথিত সুখের জন্য অনিতার বাবা আতিফের সাথে বিয়ে দিয়েছিল, সেই সুখ তো সে পেয়েই গেছে। শুধু ভালোবাসাটা নেই। না থাকুক। অনিতার আফসোস নেই। মাঝে মাঝে এই ভেবে আনন্দ হয় যে, নাহিন তো বুকের বাঁ'পাশে মালিকানা অনিতাকে দিয়েই দিয়েছিল। আর দুঃখ কোথায় এই জীবনে?

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পিঠ দুটো প্রতিবিম্ব লক্ষ্য করছিল অনিতা। আয়নার উল্টো পাশের মানুষটাই বোধহয় সবচেয়ে সুখী আর স্বাধীন। ওই পাশের জগতের অনিতার পাশে সে নাহিনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। দুজনের খুনসুটি দেখে। যে যে স্বপ্ন সে আর নাহিন মিলে দেখেছিল সেই স্বপ্নগুলোর বাস্তবায়ন ঘটে প্রতিবিম্বের অনিতা আর নাহিনের মধ্যে।

এই বাস্তব জগতে দাঁড়িয়ে অনিতা মন খুলে হাসে। অনেকদিন পর সে এতো হাসে। হাসিতে সারা শরীর কেঁপে উঠে। চোখের কোণে জল জমে। নাহিন আর তার কল্পনায় থাকা অনিতাকে দেখে বেশ আনন্দ লাগে। তারমানে নাহিনও খারাপ নেই। সে তার কথা রেখেছে। বুকের বাঁ'পাশটা অনিতার নামে উজাড় করেছে। অনিতার আনন্দ হয়, উড়তে ইচ্ছে হয়, একটাবার নাহিনকে চোখের দেখা দেখতে ইচ্ছে হয়। চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, 'তুমি কি আসলেই প্রতিবিম্ব অনিতাকে নিয়ে সুখে আছ!'

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প
👁️ ২ বার পড়া হয়েছে | 💬 ০টি মন্তব্য