বনলতা

লেখিকাঃ আফরোজা আঁখি

প্রকাশকালঃ অক্টোবর ৯, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

তোর প্রেমিক তো বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে রে লতা!এবার তোর কী হবে? এতকাল লোকটার জন্য অপেক্ষা করে শেষমেশ কিনা লোকটা তোকে ঠকালো!আগেই বলেছিলাম... পুরুষ মানুষের মন আকাশের রঙের মতো,কখন পালটায় বলা যায় না। তুই কেন লোকটাকে এত ভালোবাসলি বল তো!’

​বনলতা জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।তার পরনে একটা ছাই রঙের শাড়ি। শ্যামলা মুখখানিতে হালকা প্রসাধনের ছোঁয়া। মেয়েটা আজ শখ করেই সেজেছিল। কত দিন পর ওর মনের মানুষ শুভ্র ভাই বাড়ি ফিরেছেন! উনার জন্যই তো এই সাজ। কিন্তু সেজে কী হলো? লোকটা ওর দিকে তাকিয়ে দেখল না পর্যন্ত।সে নতুন বউ নিয়ে বাড়ি ফিরেছে; তাকে দেখবে না বনলতাকে দেখবে? মেয়েটার একে তো মন ভেঙেছে,তার ওপর নিতিতা এসে কানের কাছে বারবার একই কথা বলছে।বনলতা বিরক্ত হয়ে বলল,

‘জানি না। আমি কিছুই জানি না। তুই যা তো, আমাকে একা থাকতে দে।’

আফরোজা আঁখি এর লেখা অনুগল্প বনলতা এর ইমেজ

​নিতিতা চলে গেল। বনলতা গিয়ে টেবিলে বসল। গুনগুন করে গেয়ে উঠল,

‘এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম,প্রেম মেলে না।

শুধু সুখ চলে যায়,এমনি মায়ার ছলনা...

এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম,প্রেম মেলে না!’

​বনলতা থামল। অতীতের কথা মনে পড়তেই বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। মানুষ এতটাও পাষাণ হয়?মানুষ কী করে পারে কথা দিয়ে কথা না রাখতে? ওদের কি বুক কাঁপে না? এই যে শুভ্র ভাই! সে ছিল বনলতার মাস্টারমশাই।বনলতাকে পড়াত সে। শান্ত, চশমা পরা শুভ্রকে সে ভালোবাসত বড্ড গোপনে।শুভ্র ছিল ভীষণ লাজুক আর গম্ভীর প্রকৃতির ছেলে,যার পকেটে থাকত ফাউন্টেন পেন আর ডায়েরি।বনলতা সেই গম্ভীর যুবকের শান্ত চোখ দুটোতে নিজের প্রতি ভালোবাসা দেখেছিল।দেখেছিল তাকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা!বনলতাও সব ভুলে মত্ত হলো যুবকের প্রেমে; জানাল সেও শুভ্রকে ভালোবাসে।

​ওদের প্রেমটা ছিল চিঠির যুগের।নিয়ম করে প্রতিদিন তার আর শুভ্রের মধ্যে চিঠি দেওয়া নেওয়া হতো।বনলতার বাড়িতে সবটা জানাজানি হলে তাকে কত কথা শুনতে হয়েছিল।বনলতা সবটাই সামলে নেয়।মধ্যবিত্তের টানাপোড়েনে শুভ্র হঠাৎ করেই একটা চাকরির খোঁজে গ্রাম ছেড়ে দূরে মফস্বলে চলে যায়। যাওয়ার আগে বনলতাকে বলে গিয়েছিল,

‘নিজের একটা পরিচয় তৈরি করে ফিরতে অনেকটা সময় লাগবে লতা,অপেক্ষা করবে তো?’

​বনলতা উত্তরে বলেছিল,

‘আমি অপেক্ষা করব শুভ্র ভাই।আপনি প্রতিষ্ঠিত হয়ে ফিরে আসুন!আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করব।’

​সেদিন শুভ্র চলে গেল চাকরির জন্য। বনলতা অপেক্ষা করেছিল। প্রতিটি দিন, প্রতিটি বিকেল সে জানালার গ্রিল ধরে কাটিয়ে দিয়েছে শুভ্রের চিঠির আশায়।কিন্তু চিঠি আসেনি,আসেনি শুভ্র নিজেও। তারপর কতগুলো বছর কেটে গেল।বনলতা আশায় বেঁচে রইল শুভ্র একদিন আসবে, তাকে বিয়ে করবে,ওদের সুন্দর একটা সংসার হবে। শুভ্র তো এল; আজ বিকেলেই সে এসেছে। সবাই এসে বনলতাকে বলল,

‘শুভ্র তো মস্ত বড় ডাক্তার হয়ে গেছে রে লতা। ও ফিরে এসেছে। দেখতে কী সুন্দর হয়েছে! আগের শুভ্র আর এই শুভ্রের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ, জানিস?’

​বনলতা লজ্জা পাচ্ছিল। শুভ্রের ফিরে আসার খবরে ওর খুশি দেখে কে! বনলতা গিয়ে জানালার গ্রিলের কাছে দাঁড়ায়।ওখান থেকে শুভ্রদের বাড়ির গেট অব্দি স্পষ্টই দেখা যায়। বনলতা খেয়াল করল শুভ্র এসেছে, কিন্তু পাড়ায় কোনো একটা বিষয় নিয়ে হইচই হচ্ছে।কৌতূহল আর আনন্দ মেশানো বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে বনলতা বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়াল।

'​গলির মুখে একটা রিকশা এসে থামল। রিকশা থেকে নামল সুন্দর কারুকাজ করা পাঞ্জাবি পরিহিত এক অতি সুদর্শন পুরুষ। তাকে প্রথম দেখাতেই চিনে ফেলল বনলতা। ওর শুভ্র ভাই যে—যার পথ চেয়ে এতগুলো দিন অপেক্ষা করেছে বনলতা।বনলতা যেই ভাবল দৌড়ে গিয়ে শুভ্রকে জড়িয়ে ধরবে, তখনই খেয়াল করল রিকশার অপর পাশ থেকে লাল শাড়ি পরা এক তরুণী নেমেছে,যার মাথায় বড় করে ঘোমটা টানা।কপালে লাল-সাদা চন্দনের ফোঁটা।পুরো বউ বউ লাগছে মেয়েটাকে।

​শুভ্রের হাত ধরে মেয়েটি রিকশা থেকে নামল। শুভ্র একবার গলির চারপাশটা দেখল, বনলতার রুমের খোলা জানালার দিকেও তাকাল; তার চোখে তখন অপরাধবোধ নাকি ক্লান্তি, তা বোঝা গেল না। সে মেয়েটিকে নিয়ে তার বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। ফেলে রেখে গেল এক ভাঙা হৃদয়ের নারীর একজোড়া বিস্ময়-মিশ্রিত ছলছল চোখ!

বিজ্ঞাপন

​বনলতা দরজার আড়ালে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, পায়ের তলার মাটিটা বুঝি এক নিমেষে সরে গেছে।কোনো চিৎকার নেই, কোনো কান্না নেই, শুধু আছে বুকের ভেতর তীব্র হাহাকার। শুভ্র তার পারিবারিক চাপে কিংবা ভাগ্যের পরিহাসে অন্য কাউকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছে,কিন্তু বনলতাকে একটা খবর দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি।বনলতা যে তা মানতে পারছে না। ইশ! কার জন্য এতদিন অপেক্ষা করে গেল সে?কার জন্য এত আবেগ জমাল, রাত জেগে চিঠি লিখল! কার জন্য বাবা-মা ও পরিবারের বিরুদ্ধে গেল!আজ বড্ড আফসোস হচ্ছে বনলতার। সে বুঝি ভুল পাত্রে আবেগ ঢালল! ভুল মানুষকে ভালোবেসে বিরাট বড় ভুল করল।

-

​তারপর কেটে গেছে প্রায় দুটি বছর।তখনকার সময়ে বয়স ১৬ পেরোলেই মেয়েদের বিয়ের বয়স পার হয়ে যেত।সে হিসেবে বনলতার বিয়ের বয়স পেরিয়েছে বহু আগেই।পাড়া-প্রতিবেশী সবাই তাকে নানা কটু কথা বলেছেন, পরিবারও যে কম কথা শুনিয়েছে তা নয়। তবে তাকে ফেলে দিতে পারেনি, তাই ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছে। বনলতা এখন গ্রামের স্কুলে মাস্টারি করে। এই দুটো বছরে তার জীবনটা পুরোপুরি বদলে গেছে। একটা ভালো মনের মানুষ পেয়েছে বনলতা। সে মানুষটা বনলতা সম্পর্কে সব জেনেশুনে তাকে গ্রহণ করেছে। বনলতার জীবনটা ভালোভাবেই কাটছে। অথচ সে কিনা ভেবেছিল শুভ্র প্রতারণা করায় দুঃখে-কষ্টে সে মরেই যাবে! মরেনি তো,দিব্যি বেঁচে আছে বনলতা।

​কিন্তু শুভ্র!সে যে ভালো নেই।এই দুই বছরে তার জীবনটা পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে।সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে তার স্ত্রী ও সন্তান দুজনেই মারা গেছে।চিকিৎসায় গাফিলতি করায় আজীবনের মতো ডাক্তারির পেশাও ছাড়তে হয়েছে তাকে।

​প্রায় পাঁচ মাস আগে গ্রামের গণ্যমান্য চেয়ারম্যান আজলান সিদ্দিকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় বনলতা।লোকটা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল বহু আগেই।কিন্তু শুভ্রকে ভালোবাসত বিদায় কাউকেই গুরুত্ব দিত না বনলতা।শেষবার যখন বনলতার দরজায় সে আসে,তাকে আর ফিরিয়ে দিতে পারেনি লতা; বিয়েটা করেই নেয়।সেদিন শুভ্র ওদের বাড়িতে এসেছিল।কনের বেশে থাকা বনলতাকে বলেছিল,

‘তোমাকে বড্ড সুন্দর লাগছে লতা!’

​বনলতার হাসি পায়। বিড়বিড় করে বলে,

‘অথচ আমার এই সৌন্দর্য দিয়েও আপনাকে আটকে রাখতে পারলাম না শুভ্র ভাই!আপনি ছুটলেন স্বার্থ,মোহ আর টাকার পেছনে!’

​শুভ্র এগিয়ে এল।হুট করেই বনলতার হাত দুটো ধরে বলল,

‘আমাকে ক্ষমা করো লতা।আমি ভুল করে ফেলেছি।তোমাকে কাঁদিয়ে আমি বিরাট বড় ভুল করেছি।আমাকে ক্ষমা করে দাও!একটু দয়া করো!’

​‘আপনি ভুল করেননি,পাপ করেছেন। আমার মন ভেঙেছেন। আপনার জন্য আমার সব পুরুষকে স্বার্থপর মনে হয়,জানেন? কাছে যেতে ভয় লাগে।বিয়ে, ভালোবাসা নামক শব্দগুলো শুনলেই প্রচণ্ড ঘৃণা হয় শুধু আপনার জন্য!’

​সেদিন শুভ্রকে ফিরিয়ে দিয়েছিল বনলতা।আর ফিরিয়ে দিয়েছিল বলেই সে একটা ভালো জীবনসঙ্গী পেয়েছে, সুখের সংসার পেয়েছে।বনলতার জীবন থমকে নেই। সে বুঝতে পেরেছে,

‘কেউ চলে গেলে জীবন থেমে থাকে না,আমাদের খুব প্রিয় মানুষ গুলো হুট করে বদলে গেলে আমরা শেষ হয়ে যাই না।তাদের আচরণ আমাদেরকে কষ্ট দেয় ঠিকই তবে বাস্তবতা চেনাতেও সাহায্য করে।কেউ প্রতারণা করলে আমি মরে যাই না।শুধু ক্ষত ভুলতে কিছুটা সময় লাগে।এছাড়া ভালো বৈ ক্ষতি কিছুই হয় না।'

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প
👁️ ৪ বার পড়া হয়েছে | 💬 ০টি মন্তব্য