প্রকাশকালঃ অক্টোবর ৯, ২০২৬
স্বামীকে সন্তানসুখ দিতে না পারায় তিনি দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন। আমার শাশুড়ি মা নিজেই ছেলের বিয়ের আয়োজন করলেন, অথচ আমাকে দেখেশুনে ঘরে নিয়ে এসেছিলেন উনি নিজেই! আজ দুইটা বছর হলো আমি ওই বাড়ি ছেড়েছি; ছেড়েছি স্বামী নামক নির্দয় পুরুষটির মায়া! এত দিনে হয়তো উনি বিয়ে করে সুখে সংসার করছেন!
এদিকে আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে আছে। আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা ছিলেন তিনিই। উনাকে আঁকড়ে ধরেই আমি সারা জীবন বাঁচতে চেয়েছিলাম, কিন্তু লোকটা মাঝপথে এসে আমার হাত ছেড়ে দিলেন! আমি অসহায় হয়ে পড়েছিলাম সেদিন। কোথায় যাব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বাবার বাড়িতে আমার বাবা-মা কেউ নেই। ভাইয়েরা আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসেন, তবে বিবাহিত বোন স্বামী-সংসার ছেড়ে আজীবনের জন্য ওই বাড়িতে চলে গেলে উনারা তা বরদাস্ত করবেন না! কিন্তু আমারও যে যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। অনেক ভেবেচিন্তে আমি সেদিন বাবার বাড়িতেই গেলাম।
উঁহু, আমার ভাইয়েরা আমাকে ফেলে দেননি। তারা আমাকে আগলে নিয়েছিলেন। তবে ভাবিরা আমার ওপর খুবই বিরক্ত হতেন। একদিন বড় ভাবির সাথে ভাইয়ের তুমুল ঝামেলা হলো, তাও আমাকে নিয়ে! ভাবি রেগে তার এমপি ভাইকে বাড়িতে ডেকে পাঠালেন।ভদ্রলোক এসে জিজ্ঞেস করলেন,
"তোমাদের সমস্যার কারণ সৌমি,তাই তো?"
ভাবি সাথে সাথেই উত্তর দিলেন,
"হ্যাঁ! ও আসার পর থেকেই একের পর এক ঝামেলা হচ্ছে।আমি আর নিতে পারছি না ভাইয়া। তুমি কিছু একটা করো,নইলে আমি এ বাড়ি ছাড়ব!"
এমপি সাহেব আড়চোখে সৌমির পানে তাকালেন।উনি সৌমিকে খুব পছন্দ করেন। একসময় বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন, কিন্তু সৌমির বাবা মানেননি। না মানার কারণও আছে; মিতা মানে সৌমির বড় ভাবি এ বাড়িতে আসার পর থেকেই সবার সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। সে খুবই জঘন্য মন-মানসিকতার। সৌমির বাবা ভেবেছিলেন তার ভাইও হয়তো তেমনই হবে, তাই বিয়েতে রাজি হননি। কিন্তু মিতা আর সাহেব যে পুরোপুরি আলাদা।এ বাড়িতে হওয়া সব সমস্যার কারণ যে মিতা তা সাহেব নিজেও ভালো করে জানে। আর আজ যা ঝামেলা হয়েছে, তার কারণ সৌমি নয়, বরং মিতা নিজেই।সেজন্যই সাহেব বলল,
"তোকে এ বাড়ি ছাড়তে হবে না মিতা।সৌমিকে নিয়ে যেহেতু তোমাদের এত সমস্যা,ও এবার থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকবে!"
সৌমির ভাই সুবহান ভ্রু কুঁচকাল গম্ভীর স্বরে বলল,
"আপনাদের বাড়িতে থাকবে মানে? শুনুন ভাইয়া, আমার বোন আমার কাছেই থাকবে, আমার বাড়িতেই থাকবে। আপনি বরং মিতাকে নিয়ে যান। এত ঝগড়া-ঝামেলা আমার ভালো লাগছে না!"
সাহেব পায়ের ওপর পা তুলে সোফায় বসে আছে।সে সৌমির দিকে দৃষ্টি রেখেই সুবহানকে বলল,
"তোমার বোনকে আমি এমনি এমনি নিয়ে যাব না সুবহান।বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে তারপর নিয়ে যাব!"
মিতা অবাকের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছাল। কী বলছে ওর ভাই! মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? মিতা বলল,
"ভাইয়া... তোমার মাথা ঠিক আছে? কী বলছ এসব? এই মেয়েকে তুমি বিয়ে করবে? জানো,ও বন্ধ্যা নারী! বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছে না বলেই তো ওর বিয়েটা ভেঙেছে!"
সাহেব বিরক্ত হলো। রক্তচক্ষু নিয়ে মিতার দিকে তাকাতেই সে চুপ করে গেল। সাহেবের বাবা-মাও ছিলেন ওখানে। উনারা কোনো আপত্তি করলেন না; বরং ছেলে বিয়ে করবে শুনে খুশিই হলেন। সাহেব যে সৌমিকে পছন্দ করে, তা উনারা আগে থেকেই জানতেন। আর সে কারণেই তো এতগুলো বছর ধরে সাহেব বিয়েই করেনি! সুবহানের সাথে কথা বললেন সাহেবের বাবা-মা। ঠিক হলো, আজ রাতেই সৌমি আর সাহেবের বিয়ে হবে।সৌমি পুরোটা সময় চুপ করেই ছিল। সুবহান তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বিয়েতে রাজি করাল।
সেদিনই সাহেব আর সৌমির বিয়ে হলো। প্রথম দিকে সাহেবকে পছন্দ না হলেও আস্তে আস্তে সৌমি বুঝতে পারে মানুষটা ওতটাও খারাপ নয়। সৌমিকে সে যথেষ্ট সম্মান করে, ছোট ছোট জিনিসগুলোর খেয়াল রাখে।তারপর আস্তে আস্তে সবকিছু স্বাভাবিক হলো।সৌমির জীবনে ২য় বসন্ত এলো!সাহেবের হাত ধরে সৌমি নতুন জীবন পেলো।ওদের বিয়ের আজ দেড় বছর হলো!
-
"সিরিয়াল নাম্বার ৩৬।"
ডাক পড়তেই এক দম্পতি উঠে গেল ডাক্তারের কেবিনের দিকে। ভেতরে গিয়ে সামনে পাতা দুটো চেয়ারে দুজনে বসল।মহিলা ডাক্তার সাহেবকে দেখে হাসিমুখে বললেন,
"আসসালামু আলাইকুম! ভালো আছেন এমপি সাহেব?"
সাহেব সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
"জি, আপনি ভালো আছেন?"
"আল্লাহ ভালো রেখেছেন।"
তারপর উনি সৌমির সাথে কথা বললেন। কিছু মেডিক্যাল রিপোর্টস ওদের সামনে রেখে হাসিমুখে বললেন,
"অভিনন্দন! মি. এন্ড মিসেস আহমেদ! আপনাদের পরিবারে নতুন সদস্য আসতে চলেছে।"
সৌমির হাত কাঁপছে। বুক ধুকপুক করছে।বারবার কানে বাজছে কথাটা! ও কি ঠিক শুনল? সত্যিই কি সৌমি মা হতে চলেছে? সৌমি তখন সাহেবের বাহু আঁকড়ে ধরেছে।ছলছল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলছে,
"শুনছেন, উনি কি ঠিক বলছেন?"
সাহেব মুচকি হেসে মেয়েটার কপালে চুমু খেলো। ওর চোখ থেকে টুপ করে পড়া পানিটুকু মুছে দিয়ে বলল,
"হ্যাঁ সত্যি! আল্লাহ আমাদের ডাক শুনেছেন সৌমি। আমরা মা-বাবা হতে চলেছি।"
খুশিতে সৌমির কান্না পেয়ে গেল। নিজেকে চরম দুঃখিনী ভেবে আসা সৌমি আজ সব পেয়েছে— স্বামী, সংসার, মাতৃত্বের সুখ, সব! সে এক ফোঁটা জল চেয়েছিল,আর আল্লাহ তার জন্য বৃষ্টির বন্দোবস্ত করে দিলেন।আজ নিজেকে পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে সৌমির!
-
ডাক্তারখানা থেকে বেরোনোর সময় সাহেব সৌমিকে নিয়ে একটা পার্কে যায়। সৌমিকে গাড়ির কাছে দাঁড় করিয়ে রেখে সে যায় আইসক্রিম আনতে। সেখানেই ওর সাথে দেখা হলো অয়নের। অয়ন হলো সৌমির প্রথম হাজব্যান্ড! ওর পাশেই এক রমণী দাঁড়িয়ে, হয়তো ওর বউ।দুজনে খুব তর্কাতর্কি করছিল—বাচ্চা না হওয়া নিয়ে! মেয়েটা বারবার বলছিল, বাচ্চা হচ্ছে না এতে ওর কোনো দোষ নেই, আসলে সমস্যাটা অয়নেরই। অয়ন তা মানতে নারাজ! একসময় মেয়েটি রেগেমেগে চলে গেল।
তখনই অয়নের চোখ পড়ল সৌমির দিকে। মেয়েটা পেটে হাত বুলিয়ে হাসছে,খুশি উপচে পড়ছে তার চোখ-মুখে।অয়ন মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।ওকে জিজ্ঞেস করল,
"ভালো আছো সৌমি?"
সৌমি উত্তর দিল,
"খুউব ভালো আছি!আপনি ভালো আছেন তো?"
অয়ন উত্তরে কিছুই বলল না।সে সৌমিকে বলল,
"তুমি একা দাঁড়িয়ে আছো যে?"
"একা নই, সাথে আমার হাজব্যান্ড আছেন। উনি ওদিকটায় গেলেন।"
"হসপিটাল থেকে বেরোতে দেখলাম। তুমি অসুস্থ বুঝি?"
"না তো।"
"তাহলে?"
সৌমি হেসে বলল,
"আমি মা হতে চলেছি।"
অয়ন অবাক হলো, ভীষণ অবাক হলো! সেই সাথে এও বুঝল যে সমস্যাটা আসলে ওরই ছিল, সৌমির নয়। আর কিছুই বলার সাহস পেল না সে, না রইল ক্ষমা চাওয়ার মুখ! ইশ! কত বড় ভুল করেছে অয়ন! সৌমিকে সে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে। প্রকৃতি বুঝি এভাবেই বিচার করে? সৌমিকে কাঁদানোর শাস্তি প্রকৃতি অয়নকে হাতেনাতে দিয়েছে! আজীবন তাকে এই অনুশোচনাবোধেই ভুগতে হবে।