সুইসাইড নোট

লেখিকাঃ আফিয়া আফরিন

প্রকাশকালঃ অক্টোবর ১২, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

আজ প্রায় ০২ বছর পর আরুজের বন্ধ রুম টা খুললেন তার মা রেশমা বেগম। আরুজ চলে যাওয়ার পর, একেবারে এই রুমটা তালাবদ্ধ করে রেখেছিলেন তিনি। হয়ত বা নিজের একমাত্র ছেলের অগোছালো স্মৃতি গুলোকে আর নতুন করে এলোমেলো করতে চান নি।

বারান্দার দরজা খুলতেই ঘরের মধ্য হুড়মুড় করে আলো ঠিকরে পড়ল। অনেকদিন পর বোধহয় আলো দেখা দিল এই ঘরটায়। দীর্ঘকাল আটকে থাকার কারণে ভ্যাপসা গন্ধ হয়ে গেছে।

আরুজ চলে যাওয়ার পর আর কোনোদিন কোনো জিনিস না এ রুম থেকে সরানো হয়েছে, না কেউ এই রুমে ঢুকেছে। নিজেদের ভালো থাকার জন্য হলেও কিছু স্মৃতি বদ্ধ রাখতে হয় খুব যত্ন করে।

আফিয়া আফরিন এর লেখা অনুগল্প সুইসাইড নোট এর ইমেজ

ঘরটা পরখ করে রেশমা বেগমের চোখটা কেবল ঝাপসা হয়ে এল। তখনই বিছানার উপর বালিশের সাইডে পড়ে থাকা একটা নিল মলাটবদ্ধ ডায়েরি তে চোখ আটকে গেল।

রেশমা বেগম ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। খুব যত্ন করে ডায়েরিটা হাতে নিয়ে, হাত বুলালেন। প্রথম পাতা উল্টাতেই বড় বড় অক্ষরে লেখা দেখতে পেল,

—“মা আমি সত্যি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। যতই খারাপ ব্যবহার করি না কেন, ভালবাসি তো! কিন্তু সেটা কেমন জানি প্রকাশই করতে পারি না।”

২২.০৭.২০১৯

রেশমা বেগমের চোখের পানিগুলো বাঁধ মানল না, অঝোর ধারায় ঝড়তে শুরু করল। বুকের ভেতর থাকা চাপা দীর্ঘশ্বাসও তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠল,

"চলে গিয়ে ভালোবাসা দেখাচ্ছিস?"

আলতো হাতে তিনি পরের পৃষ্ঠা উল্টালেন।

—“তোমার মায়ায় খুব বাজে ভাবে আটকে গিয়েছিলাম প্রিয়তা। বের হতে তো পারতামই না, উল্টো তোমার চিন্তা ভাবনা মাথা থেকে সরাতে গিয়ে সবার সাথে ভীষণ বাজে ব্যবহার করে ফেলেছি।”

০১.০৮.২০১৯

—“তুমি বলেছিলে, তুমি আমায় ভালোবাসো। কিন্তু এ কেমন ভালোবাসা তোমার প্রিয়তা? যে ভালোবাসা কেবলমাত্র আমাকে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছে!”

০৯.০৮.২০১৯

—“আজ আমার জন্মদিন ছিল। মা কত যত্ন করে রান্নাবান্না করল। যেখানে আমার সকালটা মাকে দিয়ে শুরু করার কথা ছিল, সেখানে সকালটা তোমাকে দিয়ে শুরু করেই ভয়াবহ বিপত্তি বাধাঁলাম। তুমি আমাকে ব্যস্ততার হাজার টা এক্সকিউজও শুনিয়ে দিলে। তোমার ওপর রাগটা মায়ের উপর দেখালাম। এরপর আমার পরিবার হয়ত আমার কাছ থেকে কিছু আশা করতেও ভয় পাবে।”

১৫.০৮.২০১৯

—“মা-বাবা আমার ভুলের কি ক্ষমা হয় না? তোমরা কি আমাকে পারো না ক্ষমা করতে? তোমাদের সাথে কি খুব বেশি বাজে ব্যবহার করি? কিন্তু, তোমরা কি জানো না আমি কতটা ভালোবাসি তোমায়। ভালোবাসাটা যে প্রকাশই করতে পারি না। তোমাদের বেলায়ও না, প্রিয়তার বেলায়ও না! তাইতো জীবন থেকে একে একে সব হারিয়ে যাচ্ছে। তোমরা আমায় সরিয়ে দিও না কেমন? আমি আর বাঁচতে পারব না।”

২৬.০৮.২০১৯

—“আমি কী এতটাই খারাপ? নাকি আমার ভালোবাসা খারাপ?”

০১.০৯.২০১৯

—“অতঃপর তুমি আর আমার হলে না প্রিয়তা!”

০৫.০৯.২০১৯

—“তোমায় ভালোবাসি বলে বারবার তোমার সবকিছুর কাছে হার মেনে যাই, তোমার অভিমান অভিযোগ সবকিছুর কাছে নির্মমভাবে হেরে যাই। যদি তুমি পায়ে ধরতে বলতে, তাতেও হয়ত রাজি হয়ে যেতাম।”

১২.০৯.২০১৯

—“ইদানিং মেয়ে মানুষ সম্পর্কে ধারণা গুলো খুব করে পাল্টে যাচ্ছে। শুনেছিলাম মেয়ের জাত স্বর্গের জাত। কিন্তু না, তারা স্বার্থপর আর প্রতারক। শুধুমাত্র মায়ের জাত ছাড়া।”

১৮.০৯.২০১৯

—“সেদিনও দেখলাম কী সুন্দর খাচ্ছ, ঘুরে বেড়াচ্ছ। আমাকে কি একটুও মনে পড়ে না?”

২০.০৯.২০১৯

—“তোমার স্মৃতিগুলো বড্ড পোড়াচ্ছে আমায় প্রিয়তা। পারছি না নিজেকে কন্ট্রোল করতে। বারবার ছুটে যেতে ইচ্ছা করছে। স্মৃতিগুলো যে বড্ড বেহায়া। না স্মৃতি নয়, বেহায়া বোধহয় আমি।”

২৫.০৯.২০১৯

—“জন্মের পর থেকেই তো তোমার সাথে জড়িয়ে ছিলাম মা। আমার সময় বোধহয় ফুরিয়ে আসছে। ক্ষমা করবে তো আমায়, মা!”

২৮.০৯.২০১৯

—“প্রিয়তা ভালোবাসি।”

০১.১০.২০১৯

—“দুনিয়ার দুটি মাত্র নারীকে খুব বেশি ভালোবাসা দিয়েছি। প্রথম আমার মা। মায়ের সাথে ভালোবাসাটা আজও অপ্রকাশিত, তাই হয়তো ২৩ বছর পরও বিদ্যমান।

তোমার ভালবাসাটা প্রকাশ করেছিলাম তাই বোধহয় ময়লা আবর্জনার মতো ছুড়ে ফেলে দিলে।”

০২.১১.২০১৯

—“তোমার ভালোবাসার কাঙ্গাল ছিলাম। তার ফলই তো পেলাম।”

১১.১১.২০১৯

—“আজও স্বপ্নে এসে হানা দাও কেন? সব নিয়ম ভেঙ্গে বাস্তবে চলে আসতে পারো না?”

৩০.১১.২০১৯

—“তোমার নামের পঞ্চ প্রহর।”

০৫.১২.২০১৯

—“তুমি বিধাতার রঙে আঁকা এক অস্পষ্ট ছবি।”

বিজ্ঞাপন

১০.১২.২০১৯

—“আমার বৃষ্টি শেষে, নীল খোলা আকাশে সাদা ভেসে বেড়ানো মেঘ তুমি!”

২৬.১২.২০১৯

—“নতুন বছরটা যেখানে তোমাকে নিয়ে শুরু করার কথা ছিল সেখানে তুমি বিহীন একলা আমি। কোথায় তুমি? তোমাকে খুঁজে পাই না আমি। নিজের মানুষ হারিয়ে যাওয়ার মত তীব্র যন্ত্রণা পৃথিবীর আর কোথাও কিছুতেই নেই। ভালো থেকো তুমি। নতুন বছরের শুভেচ্ছা। তুমি আমার না থাকো, আমার শুভেচ্ছা গুলো তোমার থাকুক।”

০১.০১.২০২০

রেশমা বেগম আঁচলে মুখ চেপে কেঁদে ফেললেন। তার চোখের পানিতে ডায়েরির পাতাগুলো ভিজে যাচ্ছে। ছেলেটা তার এত অভিমানী ছিল অথচ সে টেরই পেল না। ডায়েরির আরেকটা মাত্র একটা পৃষ্ঠা বাকি ছিল। তিনি চোখ মুখ মুছে পরের পৃষ্ঠা অর্থাৎ শেষ পৃষ্ঠা উল্টালেন।

—“আসলে আমার সময় শেষ। এত দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার নিয়ে আমি বাঁচতে পারছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে। সবাই আছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে কেউ নেই। আমি নিরুপায়।

একজন নারী আমাকে দুনিয়ায় এনেছিল। আরেকজন নারীর কারণে আমি দুনিয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমি জানি আত্মহত্যা মহাপাপ। কিন্তু এভাবে তিলে তিলে মরে যাওয়ার থেকে একেবারে মরে যাওয়াই ভালো! আজ এমন একটা দিন, যে দিন মরলে প্রতিবছর এই দিনে আমার আর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে হবে না।”

২৯.০২.২০২০

.

প্রিয়তা হঠাৎ করে এক ভয়ানক অসুখে আক্রান্ত হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসা করে সে জানতে পারে তার মাথায় অর্থাৎ ব্রেইনে টিউমার। ডাক্তাররা কোন আশা দিতে পারছেন না, কারণ টিউমারটা অনেক দিনের পুরনো, আর একদম লাস্ট স্টেজে। প্রায় সময় তার মাথাব্যথা করত, কিন্তু পাত্তা দিত না সাধারণভাবেই ধরে নিয়েছে। তখন সদ্য আরুজ এর সাথে তার সম্পর্ক শুরু।

এভাবে দুই বছর পর হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেলে প্রিয়তাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করায় তার বাবা। তখন ডাক্তার টিউমারের কথাটা বলেন এবং এটাও বলেন যে,

"চিকিৎসার দ্রুত ব্যবস্থা করতে হবে। যদি ভাগ্যে বেঁচে থাকা লেখা থাকে তাহলে বাঁচবে। মরণ লেখা থাকলে আমাদের কিছুই করার নেই। অনেক দেরি হয়ে গেছে।"

তারপর ডাক্তারের কয়েক মাস চিকিৎসা চালিয়ে অপারেশনের ডেট দেয়। প্রিয়তার পরিবার কোনরূপ রিক্স নিতে চাইনি, তাই অপারেশনটা ইন্ডিয়ায় করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

প্রিয়তা এই টিউমারের কথাটা জানার পরপরই আরুজ এর সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিতে চেয়েছিল। আরুজকে একদিন বলেছিল,

"আমার ব্রেকআপ চাই। তোমার সাথে আমার আর সম্পর্ক রাখা সম্ভব হচ্ছে না।"

আরুজ যেন ব্যাপারটাকে পাত্তাই দিল না। সে হেসে বলেছিল, "ফাজলামি করছ তাইনা?"

"সব সময় সব কিছুকে ঠাট্টা বা মজা ভেব না, আমি সিরিয়াস।"

সেদিন আরুজের করুণ আর অসহায় চাহনির কাছে হার মেনেছিল প্রিয়তা। কী করবে সে? এই বাধঁন থেকে আরুজকে এখন মুক্ত না করলে যে পরে স্রেফ পাগল হয়ে যাবে ছেলেটা।

সরাসরি ব্রেকআপ করতে না পেরে, প্রিয়তা পুরোদমে অবহেলা শুরু করে দিল।

একদিন আরুজ বলেছিল,

"তুমি আর আমায় ভালোবাসো না প্রিয়তা।"

"কই? বাসি তো।"

বলেই হাওয়া। মেপে মেপে দু'একটা কথা বলত। দেখা হতো, তবে অনিয়মিত বা হুটহাট। প্রিয়তা নিজের এরূপ নিষ্ঠুর ব্যবহারে কত রাত যে বালিশের মুখ গুঁজে কেঁদেছে, তার হিসেব দেওয়া মুশকিল।

সে তো আরুজ কে একপ্রকার মায়ায় বেঁধে ফেলেছিল। দুর্ভাগ্যবশত, যদি তার মৃত্যু হয় সে তার ভয়ে আরুজ কে অবহেলা দিয়ে সরাতে চেয়েছিল। আরুজ তো সরেইনি, উল্টো পাগলামি করেছে। প্রিয়তার হৃদয়টাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছিল সেই পাগলামি গুলো।

প্রিয়তার অপারেশনের ১৫ দিন আগে তারা ইন্ডিয়া চলে গেছে। আরুজের খবরা-খবর সবই তার বোন প্রিয়ন্তীর মাধ্যমে রাখছে।

অবশেষে ঘনিয়ে এল অপারেশনের অন্তিম সেই মুহূর্ত। ডাক্তাররা অস্ত্র পাচার করলেন, সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু পরমুহুর্তে কী হলো কিছু বুঝতে পারলেন না। প্রিয়তা কোন রেসপন্স করছিল না। হার্টবিট ঠিকঠাক ছিল। অবশেষে জানতে পারা গেল, সে কোমায় চলে গিয়েছে। এই দিকে প্রিয়তার কোন খবরই আরুজ জানে না। শহরের অলিতে, গলিতে, রাস্তার বাঁকে বাঁকে প্রিয়তাকে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু সেই অদৃশ্যমান প্রিয়তা সামনে আসে না। সে তার ব্যক্তিগত প্রিয়তাকে ডাইরির পাতায় পাতায় বেঁধে রাখে, বিনি সুতোর সঙ্গে।

তারপর পুরো চার মাস পর প্রিয়তার জ্ঞান ফিরে। পরিবারের আনন্দ সেদিন আর দেখে কে! এত কিছুর মধ্য প্রিয়তা আরুজের কথা জিজ্ঞেস করে তার বোনকে।

"আরুজ কেমন আছে?"

"যেমন ছিল আগে।" নির্বিকার ভাবে উত্তর দেয় তার বোন।

প্রিয়তা হেসে বলে, "যেমনই থাকুক না কেন, এখন আমি তো এখন একদম পুরোপুরি সুস্থ। ফিরে যাব আমার আরুজের কাছে। আর কয়েকটা দিনের অপেক্ষা শুধুমাত্র তাইনা বল আপু? ও আমার জন্য অপেক্ষা করবে তো?"

বলতে বলতে প্রিয়তার চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

প্রিয়ন্তী বলে, "করবে রে করবে। যে এতদিন অপেক্ষা করতে পারল আর কিছুদিন পারবে না অপেক্ষা করতে, বল?"

উত্তরে প্রিয়তা হাসে। আর দিন গোনে সেই শুভক্ষণের। যখন অন্তত আরশের বুকে নিজেকে সঁপে তো দিতে পারবে, এই আশায় কেটে গেল আরও পনের দিন।

সেদিন হাসপাতালে চেকআপের জন্য এসেছিল প্রিয়তা। ডাক্তার অক্সিজেন নিতে বলল তাকে। কেবিনে আসতেই প্রিয়তার ফোনে প্রিয়ন্তী মেসেজ পাঠাল। মেসেজটা এরকম ছিল, "আরুজ ভাই সুইসাইড করছে আজকে। কী কারণ বা কী বৃত্তান্ত কেউ জানে না।"

নিঃশ্বাস ক্রমেই ভারী হয়ে উঠল প্রিয়তার।

আরুজ সুইসাইড করছে, সে নিতে পারছে না ব্যাপারটা। কী হতো আর দুই দিন মাত্র অপেক্ষা করলে!

কেউ না জানুক প্রিয়তা তো জানে কেনো আত্মহত্যা করেছিল আরুজ। নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছে।

চোখের পানি বাঁধ মানছিল না। হঠাৎ করেই শ্বাস কষ্ট শুরু হলো। একপর্যায়ে রক্তবমি করে হাসপাতালের বিছানায় লুটিয়ে পড়লো প্রিয়তা। পরে ডাক্তার রা তাকে মৃত ঘোষণা করে।

একই দিনে মৃত্যু হল দুজনের। একজন ভুল বুঝে আত্মহত্যার পথ বেছে নিল। তার ধারণা মতে, শখের নারী তার মৃত্যুর কারণ। আরেকজন ভালোবাসার মানুষের মৃত্যুর খবর লুটিয়ে পড়ল মৃত্যুতে।

দুটো মৃত্যুতেই রয়েছে গভীর ভুল। একজন ভুল করল ভুল বুঝে, আরেকজন ভুল করল সত্য গোপন করে। থাক, তারা ওপারেই ভালো থাক। কিছু ভালোবাসা পূর্ণতা না পাওয়াই ভালো।

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প
👁️ ১১ বার পড়া হয়েছে | 💬 ০টি মন্তব্য