বিভ্রান্তির দায়

লেখিকাঃ মৌরিন আহমেদ

প্রকাশকালঃ জুন ১২, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

একদিন রাতের বেলা আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ এলো,

' তুমি আমার সাথে এমনটা করতে পারলে ফারু? আমি খুব রাগ করেছি। '

একদম অচেনা একটা নাম্বার। এর আগে কোনো কল বা মেসেজ কিচ্ছু আসে নি। আমি সাধারণত আননোন নাম্বার থেকে আসা কল রিসিভ করি না, টেক্সটের রিপ্লে লিখি না। কিন্তু এই মেসেজটা দেখার পর বেশ কৌতুহল জাগলো। আমার নাম ফারিয়া হওয়ায় অনেকেই 'ফারু' বলে সম্বোধন করে। তাই সে আমার পরিচিত হতে পারে। তাই আর কিছু না ভেবে রিপ্লে লিখলাম,

মৌরিন আহমেদ এর লেখা অনুগল্প বিভ্রান্তির দায় এর ইমেজ

-- "কেন গো? কি করেছি আমি?"

নাম্বারটা কার হতে পারে আমি নিশ্চিৎ ছিলাম না। ধারণা করলাম এটা আমার পরিচিত একজনের নাম্বার। ওহ্, পরিচিত একজন যখন বললাম, তখন তার পরিচয়টা দিয়েই দেই। আমার ফ্রেন্ড চৈতির এক কাজিন রাতুল আমাকে অনেকদিন ধরে পছন্দ করে। প্রপোজাল দিয়েছে বহুবার। কিন্তু প্রতিবারই আমি রিজেক্ট করেছি। তারপরও ছেলেটা পিছু ছাড়ছে না। অবশ্য সে ছেলে হিসেবে খারাপ নয়, যথেষ্ট ভালো। কিন্তু আমার কেন যেন ওকে পছন্দ না। একটা ছেলে মানুষ হিসেবে ভালো বলেই কি তাকে বয়ফ্রেন্ড বা প্রেমিক হিসেবেও ভালো লাগবে?

আমার ভাবনার মাঝেই মেসেজ নোটিফিকেশনের 'টুং' শব্দ হলো। স্ক্রিনে চোখ রাখতেই দেখলাম,

-- "এখন ন্যাকামি করা হচ্ছে? তুমি জানো না তুমি কি করেছো?"

রাতুল বেশ নাছোড়বান্দা ধরণের। এই নিয়ে বহুবার ওকে 'না' করার পরও সে আমার আশা ছাড়ে নি। মাঝে মাঝে অজান্তেই অতিরিক্ত করে ফেলেছে, বিনিময়ে আমি বিরক্ত হয়ে কটু কথা শুনিয়েছি। তবুও সে হাল ছাড়ে নি। তার ধারণা একদিন-না-একদিন আমার মত বদলাবে।

রাতুলের সাথে চৈতির সম্পর্ক খুব ভালো। ওরা কাজিনেরা একজন আরেকজনের সাথে খুব ফ্রেন্ডলি। চৈতির রিলেশনে হেল্পও করেছিল রাতুল। বিধায় রাতুলের সাথে চাইলেও খারাপ ব্যবহার করতে পারি না। তাছাড়াও প্রপোজ করার আগে রাতুলের সাথে আমার ফ্রেন্ডলি একটা সম্পর্ক ছিল। আমরা বেশ ফ্রাঙ্কলি কথা বলতাম।

উত্তর দিলাম,

-- "না। আমি জানি না, আমি কি করেছি। তবে যা করেছি, একদম ঠিক করেছি। এটাই তোমার প্রাপ্য। মেসেজ দিবে না আর।"

-- "আচ্ছা, আচ্ছা। এতো রাগছো কেন? আজকের জন্য আমি সরি। আমিই এক্সেস করে ফেলেছিলাম।"

আমি রিপ্লে করলাম না। ফোনটা রেখে দিলাম। হুট করেই সকালের কথা মনে পড়ে গেল। আজ সকালে রাতুলের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। অবশ্য আমি একাই নয়। সঙ্গে একদল বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে। এটা নিয়েই রাতুল একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিল। ও আমাকে একা ডেকেছে দেখা করতে, আমি কেন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে হাজির? আমার যুক্তিও খারাপ নয়। ওর সাথে তো আমার এমন সম্পর্ক নয় যে একা একা ডেটে যেতে হবে! এই নিয়ে একটা সিনক্রিয়েট করে ফেলেছিলাম। খুব বাজে সে ঘটনাটা। ভাবতেই মেজাজ বিগড়ে গেল।

বিজ্ঞাপন

বান্ধবী স্বাতীর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। সুন্দর করে শাড়ি পরে সেজেগুজে বেরিয়েছি। রিকশায় চড়েছি তখনই টুং করে নোটিফিকেশন সাউন্ড বাজলো। আবার সেই নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে,

-- "নীল শাড়ির নীলাম্বরী তুমি, আকাশ থেকে নেমে এসেছ মর্ত্যলোকে। সাবধানে যেও, কারোর নজর না লাগে।"

ছোট্ট একটা মেসেজ। পড়েই কেমন যেন একটা অনুভুতি হলো। ভালোলাগার আবেশে মন ছুঁয়ে গেল। হাবাগোবা রাতুল এতো সুন্দর করে বলতে পারে?

সময় গড়াচ্ছিল। চার-পাঁচ দিনের মতো পেরিয়ে গেল রাতুলের কোনো খোঁজ-খবর নেই। ভার্সিটিতে গিয়েছি সেদিন হুট করেই আবারও মেসেজ দিলো,

-- "এটা কি রঙের জামা পড়েছ গো? আlগুlন রঙা কমলা?"

আমার পরনে ছিল মেটে রঙের একটা থ্রি পিচ। তার উপর লালচে রঙের সুতোর কাজ করা। দূর থেকে দেখলে জ্বলজ্বলে লাগারই কথা। কিন্তু রাতুল মেটে রঙ চেনে না? রঙের প্রতি আমার বিশেষ গুরুত্ব আছে বলেই বেশ বিরক্ত হলাম। রিপ্লে করলাম,

-- "চোখে কি ছানি পড়েছে? রঙ চেনো না?"

-- "চিনি গো চিনি। কিন্তু এই রঙে যে তোমায় কি রূপবতী লাগছে তা তুমি জানো না। আগুনপরী লাগছে!"

প্রায় একমাসের মতো এই অপরিচিত লোকটিকে আমি রাতুল ভেবে ছিলাম। একমাস পরে একদিন হুট করে রাতুলের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হতেই আমি ডাকলাম,

-- "আরে রাতুল না? কী ব্যাপার? চিনছোই না যে?"

-- "কই? আমি তো তোমাকে দেখতেই পারি নি।"

অপ্রস্তুত হেসে বললো। আমি কপট অভিমান করে বললাম,

-- "হয়েছে। হয়েছে। আর বলতে হবে না। আমাকে কি তুমি খেয়াল করো, যে চিনতে পারবে?"

রাতুল তখন আমার কাছ থেকে এরূপ ব্যবহার প্রত্যাশা করে নি। তাই হয় তো খুব অবাক হলো। বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। আমি বললাম,

-- "এমন হ্যাবলার মতো চেয়ে আছো কেন? মুখে কথা নেই? মেসেজে তো খুব সুন্দর.."

-- " মেসেজ?"

-- "এমন ভান করছো, যেন কিচ্ছু জানো না? আমি কি বানিয়ে-বানিয়ে বলছি?"

একটু রাগ হলো আমার। তুলনামূলক জোরেই বলে ফেললাম তাই। ও আশেপাশে চোখ ঘুরালো। কেউ কেউ আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। বললো,

-- "খুব ব্যস্ত না-কি? চলো কোনো ক্যাফে-তে বসি?"

-- "বসবে? চলো যাই।"

আমি খুব স্বাভাবিক ভাবেই এগোলাম। 'ক্যাফে নির্ঝর'-এ এসে বসলাম।ছিমছাম-নিরিবিলি পরিবেশে বসে দু' জনে টুকটাক কথা বলছিলাম। সঙ্গে ছিল দু ' কাপ কফি অ্যান্ড স্যান্ডউইচ। সময়টা ভালো কাটছিল। আমি পুরোটা সময় বেশ উৎফুল্ল ছিলাম। সচ্ছন্দে আলাপ করছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি, ততদিনে আমি নিজেও যেন ওর প্রতি ঝুঁকে গিয়েছিলাম। ওর ছোটো ছোটো টেক্সট, কাব্যিক দু' একটি লাইন, আমার মন ছুঁয়ে দিতো। কিন্তু অদ্ভুতভাবে রাতুলের কথার সঙ্গে মেসেজের মিল ছিল না। কেমন একটা অমিল খুঁজে পাচ্ছিলাম। মেসেজে সে চটপটে, সুচতুর ভঙ্গিমায় কথার মারপ্যাঁচে দারুণ দারুণ রিপ্লে লিখতে জানে, বাস্তবে সে যেমন হাবাগোবা তেমনই রয়ে গেছে। আমার চঞ্চল কথার পৃষ্ঠে সে অল্পতেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। বিব্রত মুখ লুকোবার উপায় পায় না। একই মানুষ অথচ দু'টি ক্ষেত্রে দুই রকম-- ব্যাপারটা খটকা লাগার মতো নয়?

সরাসরি জিজ্ঞেস করবো ভেবেও করি নি। রাতুলের সাথে এই ঘনিষ্ঠ আচরণ, মধুর আলাপন ওকে ভীষণ রকমের অবাক করে দিলো। ওর চোখেমুখ দেখে সে আভাস আমি পাচ্ছিলাম। তাতে ঘোলাটে বিষয় আরও বেশি ঘোলাটে হয়ে উঠলো। কফি ডেটের শেষ পর্যায়ে রাতুল হঠাৎ বললো,

-- "ফারু, তোমার নাম্বারটা একটু দেবে?"

আমি ভ্রু কুঁচকে হাসলাম। একটু ঠাট্টা করেই। তারপর সন্দিহান দৃষ্টি মেলে দিয়ে বললাম,

-- "আমার নাম্বার তোমার কাছে নেই?"

-- "ছিল। কিন্তু হারিয়ে গেছে।"

-- "সামান্য একটা নাম্বার রাখতে পারো না? তা কীভাবে হারালো, শুনি?"

-- "ইয়ে.. মানে.. লাস্ট মান্থে কক্সবাজারে গিয়েছিলাম। সি-বিচেই ফোনটা হারিয়ে গেছে। আর সাথে সাথে তোমার নাম্বারটাও।"

এবার আমার চমক খাওয়ার পালা। লাস্ট মান্থে ফোন হারিয়ে গেছে? তাহলে গত একমাস ধরে আমার সঙ্গে চ্যাট করছে কে? সন্দেহ নিয়ে বললাম,

-- "সত্যিই?"

রাতুল মাথা নেড়ে সায় দিলো,

-- "হ্যাঁ। তারপর চৈতির কাছে আমি চেয়েছিলাম। কিন্তু বদ-টা দেয় নি। তুমি না-কি আমার উপর খুব বিরক্ত? আজকের আচরণে তো তা মনে হচ্ছে না।"

আপনমনেই বলছিল সে। আমার সেদিকে খেয়াল নেই। ততোক্ষণে আমার মস্তিষ্কে অন্য জট লেগে গেছে। সে জট সারাতে গিয়ে আরও বেশি তালগোল পাকিয়ে ফেলছি। বললাম,

-- "গত একমাস তবে তুমি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করো নি?"

-- "চেয়েছিলাম। কিন্তু সুযোগ ছিল না। তুমি তো আমাকে হোয়াটস অ্যাপ, ইন্সটা, ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, সবকিছু থেকে ব্লক করে রেখেছ।"

মন খারাপের সুরে বললো। আমি বিমূঢ় হয়ে শুধালাম,

-- "তাহলে কে ছিল সে?"

-- "কে?"

রাতুল বোকা চোখে তাকালো। আমি নিজেও বোকা বনে গেছি। কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। রাতুল নিজেই বললো,

-- "এখন তো সব ঠিকঠাক, তাই না? আমাদের সম্পর্ক নিয়ে তুমি ভেবেছ.."

-- "আমি তোমার সাথে এই নিতে পরে কথা বলবো, রাতুল। খুব মাথা ধরেছে। বাসায় যাবো।"

ব্যাগ কাঁধে নিয়ে উঠে দাড়ালাম। রাতুল অসহায় চোখে তাকালো,

-- "আচ্ছা, যাও। পৌঁছে জানিও।"

আমি কিছু না বলে ফিরে এলাম। সবটা এলোমেলো হয়ে এসেছে আমার। তালগোল পেকে গেছে। বাসায় এসে নিজেকে সময় দিলাম। দু' ঘণ্টার দীর্ঘ গোসলে মাথায় আধ বালতি পানি ঢাললাম। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে শুরু করলাম ব্যাপারটা।

আমি বুঝতে পারছিলাম মেসেজে যার সঙ্গে আমার আলাপ হয় সে রাতুল নয়। অন্য কেউ। তবে পরবর্তীতে সে কে, কি তার পরিচয় সেসব জানা হয় নি। কেন-যেন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে নি আমার। পুরো বিষয়টাকে আমি ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। কেননা, লোকটার প্রতি আমার একটা মায়া জন্মেছিল। আমি ঠিক জানি না, অনুভূতিটা কি। তবে সম্ভবত আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম।

সবকিছু জানার পর আমার উচিৎ ছিল অপরিচিত লোকটিকে সবকিছু বুঝিয়ে বলা। লোকটাও হয় তো এরকম কোনো ভুল করছে। একটা মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং নিয়ে কি গল্প হয়? তাও আবার প্রেমের গল্প? কিন্তু তবুও আমি বলতে পারি নি। কেন পারি নি?

মায়া খুব অদ্ভুত একটা অনুভুতি। কারো প্রতি মায়া জন্মে গেলে সেটা কমে না, বরং বাড়তে থাকে। অতিরিক্ত মায়ার থেকেই ভালোবাসার সৃষ্টি। আর ভালোবাসা মানেই পিছুটান। আলগোছে চলা সম্পর্কটা আমার মনে সেই মায়ার-ই জন্ম দিয়েছিল।

প্রকৃতি নিজেই তার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছে, সম্পর্কের সূচনা ঘটিয়েছে, অতএব এর সমাপ্তিও প্রকৃতির উপরেই ছেড়ে দিলাম।

___

ঠিক মাস দেড়েক পরের কথা। দুপুরের খাবার খেয়ে আমি ভাতঘুমে মগ্ন। এমন সময়ে তুমুল শব্দ নিয়ে বেজে উঠলো আমার সেলফোন। বিরক্তিতে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি সেই নাম্বার থেকে ফোন কল এসেছে! যা এতদিনে প্রথম। বিস্ময় নিয়ে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে উদ্বেগ মিশ্রিত কণ্ঠ শোনা গেল,

-- "আপনি আসলে কে?"

চমৎকার পুরুষালী কণ্ঠ। মুহূর্তেই আমার বিরক্তি উবে গেল। ধীরে-সুস্থে বললাম,

-- "ফারিয়া। কেন?"

আমার বুক কেঁপে উঠেছিল। সে সবটা জেনে ফেলেছে? নয় তো এতোদিন এই প্রশ্নটা সে করে নি কেন? এরপরেই সে আমার বাসা কোথায়, কি করি, কীসে পড়ি, ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারটা প্রশ্ন করলো। আমি ভয়ার্ত মুখে সবটার জবাব দিলাম। শেষ অবধি সে আমাকে বুঝিয়ে বললো,

-- "আসলে আমি আপনাকে ফারিহার সাথে গুলিয়ে ফেলেছিলাম। ফারিহাকে আমি পছন্দ করি। ওর নাম্বারের সাথে আপনার নাম্বারের একটা ডিজিট উল্ট-পালট হয়ে গিয়েছিল।"

আমি কি বলবো ভেবে পেলাম না। আমি তো জানতাম এই পুরো ব্যাপারটাই একটা মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং। উনিই ভুলবশত মেসেজ দিয়েছিলেন। যোগাযোগ শুরু করেছিলেন। আমি প্রথমে বুঝতে না পারলেও পড়ে তো বুঝেছিলাম। কিন্তু মিরাকেল হয়ে কিছু একটা হবার আশায় আমি তাকে বলি নি। লোকটা অনুতাপের সুরে বললো,

-- "আ'ম সরি।"

উনি ফোন রেখে দিলেন। আমি বেশ কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে বসে ছিলাম।

এরপর উনি আর কোনদিনই আমাকে মেসেজ দেন নি। কোনোদিনও না। অথচ উনি জানতেন না, ওনার মেসেজের অপেক্ষায় আমি আজও বসে থাকি। এখানে ভুলটা কি আমার ছিল? সে ভুল করে আমায় নিজের বাঁধনে জড়িয়ে ফেলেছিল, আমি তো জড়াতে চাই নি। যখন জড়িয়ে গেলাম তখন সেই বাঁধনটাই ছিঁড়ে গেল। আমার মনে এখনো প্রশ্ন জাগে, এই বিভ্রান্তির দায় কার?

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প