প্রকাশকালঃ মে ২৮, ২০২৬
মায়ানের সাথে আমার সম্পর্কটা বেশ অদ্ভুত ভাবে শুরু হয়েছিল। তার মতো অদ্ভুত-নিরাসক্ত মানুষ আমি আমার ইহজনমে দ্বিতীয়টি দেখি নি। দুনিয়ার কোনো কিছু নিয়েই তার কোনো ভাবনা নেই। সদা আপনখেয়ালে মত্ত। এতো অদ্ভুত এই পুরুষটি!
ফেব্রুয়ারির বইমেলায় প্রথম দেখা। সেবার ওর বই বেরিয়েছে। নতুন লেখক, তেমন একটা প্রচার হয় নি। শুধু বইয়ের প্রচ্ছদ আর নামটা দেখেই মুগ্ধ হয়ে বইটা কিনে ফেলেছি আমি। বাসায় ফিরে পড়ার পর একদম বিমোহিত। এত্তো পরিষ্কার, সাবলীল ভাষায় লেখা। একেবারে বাস্তবিক ঘটনা সাজিয়েছে সে মনের মত করে। বইয়ের শেষ পাতায় লেখক পরিচিতি দেখে ওর ছোটখাটো বায়োডাটা জেনে ফেললাম। ফেসবুকে সার্চ দিতেই হাতে পেলাম আইডিটা। বই নিয়ে উচ্ছাস তখনো রয়ে গেছে, তাই দেরি না করে চটপট নিজের মনের কথাগুলো লিখে পাঠিয়ে দিলাম ইনবক্সে। মিনিটখানেক পরই রিপ্লে এলো। টুকটাক কথা চললো। খুবই সাধারণ কিছু। টিভির ফ্যান-ফলোয়ারদের সাথে সেলিব্রেটিদের কথার মতোন কিন্তু নয়। একেবারে সাদামাটা আলাপন।সেখান থেকেই এই গল্পের শুরু।
মানুষ হিসেবে লোকটা ভীষণ ভালো। সাদামাটা ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তার চরিত্রের সবচেয়ে বড় দোষ, সে ভlয়ংlকর নিরাসক্ত একজন মানুষ। কোনো কিছুতেই তার আগ্রহ নেই। প্রথমে ভেবেছিলাম সে আমার সাথে কথা বলতে আগ্রহী নয় বলেই এমন আচরণ করছে। বাস্তবে তা নয়। দুদিন কথা বলতেই বুঝতে পারলাম সে চরিত্রগত ভাবেই এরকম। গান শোনে না, নাটক-মুভি দেখে না। বর্তমানের জনপ্রিয় সব অভিনেত্রী, সেলিব্রেটি অধিকাংশই তার অচেনা। নির্বিকার এই মানুষটি তখন কর্পোরেট অফিসে জব করছেন, নেহাৎ শখের বশে চলছিল লেখালেখি। সোশ্যাল মিডিয়ায় তেমন একটা অ্যাক্টিভ নন। আইডি প্রায়ই ফাঁকা।
বইমেলার শেষ সপ্তাহ। শেষবারের মত আরেকবার ঘুরতে এলাম। বই কিনেছি এবারও অনেকগুলো। তো কি যেন ভেবে ওর বই যে প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে সেই প্রকাশনীতে ঢু মারতে গিয়েছি। হুট করেই দেখা মিললো আমার প্রিয় লেখকটির, 'মায়ান সাদিত'! আমি ওকে দেখে ভীষণ রকমের উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়লাম। কিন্তু অতি আশ্চর্যের কথা সে একটুও চমকালো না। খুশি বা বিরক্তির কোনো লক্ষণই তার মাঝে দেখা গেল না। অটোগ্রাফ চাইলাম সে শুধু তাই দিলো, নিজ থেকে দু'টি কথাও লিখলো না। অন্যরা তো সৌজন্যে কিছু হলেও লিখে!
এরপরও ওর উপর থেকে আমার আগ্রহ কমলো না। বইমেলা শেষ হবার পর নিয়মিত ফেসবুকে যোগাযোগ করলাম। তেমন কিছু না, তার প্রতি আমার অদম্য একটা আগ্রহ জন্মেছিল। এই যে সে এতো নির্বিকার, জাগতিক আবেগ থেকে এতো দূরের মানুষ, যার লেখায় এতো সুন্দর আবেগ আসে অথচ ব্যক্তিত্বে একদমই অন্যরকম, আবেগহীন তার প্রতি একটা আগ্রহ জন্মানোরই কথা। আমি ওর ভালো বন্ধু হতে চেয়েছিলাম।
একটা সময় পর আমরা সত্যি সত্যিই খুব ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্কে জড়িয়ে গেলাম। মায়ান খুব চাপা স্বভাবের। শান্ত-শিষ্ট চরিত্রের। দিনে যেকোনো একটা সময়ে বসে আমি ওর সঙ্গে অনেক কথা বলতাম। সারাদিন কি করেছি না করেছি সবটা বলতাম। ও কখনো নিজে থেকে কিছু বলতো না। অফিসের কাজ করতে করতে শুধু নীরব শ্রোতার ভূমিকা পালন করে যেত।
প্রায় দেড় মাস পর একদিন হুট করেই ও আমাকে বললো,
-- "বাসা থেকে বিয়ের কথা বলছে, আমি তোমার কথা বলেছি, ফারিন। তোমার বাসায় প্রস্তাব যাবে।"
তখনও প্রণয়ের সম্পর্কটা গড়েই ওঠে নি। কোনো পক্ষই স্বীকার করি নি 'ভালোবাসি', কিংবা ঐ জাতীয় কোনো কথার। অথচ মায়ান সরাসরি আমার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠালো! একবার জিজ্ঞেসও করলো না। আমার মতামতও নিলো না। নিজের কাজ নিজে সেরে ফেললো। এরপর খুবই অল্প দিনের মধ্যে আমি মায়ান সাদিতের সঙ্গে 'বিবাহ' নামক পবিত্র একটি বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেলাম।
এরপর 'মায়ান' চরিত্রটাকে আরও গভীর ভাবে উপলদ্ধি করতে শিখলাম। প্রফেশনাল লাইফে খুব পানচুয়াল, কো-অপারেটিভ। নিজের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে জানে। কিন্তু কৌতুহল বিষয়টা তার একবারেই কম। মানবীয় আবেগ, ভালোবাসা-ক্ষোভ এগুলো বোধ হয় থেকেও নেই।
___
একদিনকার কথা। রিকশা করে মার্কেট থেকে ফিরছি। হঠাৎ দূরের চুরির দোকানে চোখ আটকালো। লজ্জায় ঠিক সরাসরি ওকে বলতে পারলাম না, যে চুড়ি কিনে দিতে হবে। ইনিয়ে-বিনিয়ে সাজগোজের কথা তুললাম। চুড়ির কথাও উঠলো। তবুও সে বান্দা বুঝলো না আমি কি চাই। শেষমেশ লজ্জার মাথা খেয়ে বললাম,
-- "আমার চুড়ি চাই। কিনে দাও!"
সে আশপাশে তাকালো। চুড়ির দোকানে নিয়ে এলো। বললো,
-- "পছন্দ করো।"
বেশ কয়েকটা রঙ পছন্দ হলো। কোনটা নিবো জিজ্ঞেস করতেই স্বাভাবিক স্বরে বললো,
-- "একটা নিলেই হয়। চুড়িই তো!"
মন ছোট হয়ে গেল আমার। মনে হলো এসব চুড়ি-ফুরি কিনে কোনো লাভ নেই। কিছু না বলে চলে আসলাম। সে আমার পছন্দের সবগুলো চুড়ির একসেট করে কিনে ফিরে এলো। প্যাকেট হাতে দিতেই ফিরিয়ে দিয়ে কঠিন গলায় বললাম,
-- "নিবো না।"
সে চুপচাপ প্যাকেট হাতে বসে রইলো। দ্বিতীয়বার দিলোও না।
বাড়ি ফেরার একটু পর সে কাজে বেরিয়ে গেল। ঘরে ঢুকে চুড়ির প্যাকেটটা দেখলাম ড্রেসিং টেবিলের কাঁচ ঘেরা ড্রয়ারে সুন্দর করে সাজিয়ে ফেলেছে। ও যদি সেটা না করে ছোট্ট একটা চিরকুট লিখে রেখে যেত, তাতেও আমার ভালো লাগতো। কিন্তু নিরাসক্ত মানুষদের তো এসব সাজে না!
বিয়ের দু' মাস পরের কথা। কি যেন ভেবে রাতে ভীষণ রকমের সাজগোজ করলাম। সুন্দর করে শাড়ী পরে, হাতে-পায়ে আলতা লাগিয়ে, চুলে গাজরা-টাজরা পড়ে, হুলস্থূল কারবার! কিন্তু যার জন্য সাজলাম সে লোক ফিরেও তাকালো না। নিজের কাজে ব্যস্ত থাকলো সারাটা সময়! শেষে ধৈর্যে কুলোতে না পেরে বলেই ফেললাম,
-- "তুমি দেখছ না আমি সাজগোজ করেছি? তোমার কি এখন উচিৎ না এটা বলা যে আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?"
সে তাকালো। একঝলকের একটি দৃষ্টি বিনিময় হলো। অতঃপর আবারও নিজের কাজে ডুবে যেতে যেতে বললো,
-- "রূপবতী নারীরা সাজলে তাদের সুন্দর লাগবেই, কিন্তু সেটা বলার কি আছে?"
-- "মানে কি মায়ান? সুন্দর লাগছে বলে কি তোমার আলাদা করে বলা যাবে না, যে সুন্দর লাগছে?"
কিঞ্চিৎ রাগ, কিঞ্চিৎ বিস্ময় নিয়ে শুধালাম। চিরকালের শান্ত স্বভাবের নির্লিপ্ত পুরুষ এবারও নির্বিকারে বললো,
-- "না, বলার দরকার নেই। তুমি যদি অ-রূপবতী হতে তাহলে আমি বললেই তুমি সুন্দর হয়ে যেতে না। এখনো যদি সুন্দর বলি, তবুও তোমার রূপের ঝলক বদলে যাবে না। তাই এসব বলা অর্থহীন। রাত হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়ো।"
অগত্যা সব সাজ খুলে রেখে ঘুমিয়েই পড়লাম।
__
মানুষের না-কি সবসময় নিজের বিপরীত ধর্মী মানুষের সঙ্গেই জোড়া বেঁধে দেয়া হয়। কথাটা আমি এতকাল বিশ্বাস করতাম না। এখন করি।
কারণ, মায়ানের চরিত্র আমার ঠিক বিপরীত! আমি যদি উত্তর হই, ও হবে দক্ষিণ। পূর্ব হলে পশ্চিম। ভুলক্রমেও আমাদের দিক এক হবার কথা নয়। অথচ ভাগ্যের লীলাখেলায় এই দুই প্রজাতির ভিন্ন প্রাণীই একত্রিত হয়ে গাঁটছড়া বাঁধলাম।
রোজার ঈদে বাড়ি গিয়েছি। এখানে বলে রাখা ভালো, বাড়িতে আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি নেই। ওটা আমার মামা-শ্বশুর মশাইয়ের বাড়ি। মায়ান ছোট বেলা থেকে সে বাড়িতে বড় হয়েছে। ওর বাবা-মা ওর অনেক ছোট বেলায় গত হয়েছেন। বোনের মৃত্যুর পর তাই ভাগ্নেকে নিয়ে নিজের ছেলের মতোই মানুষ করেছেন মামা।
ঈদের তৃতীয় রাতে হঠাৎ করেই মামী-মার বুকে ব্যথা শুরু হলো। শ্বাস আটকে আসছে, ঘেমে-নেয়ে একেবারে বেহাল দশা। আমরা তড়িঘড়ি করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকলাম। হসপিটালে নেয়ার আগে রাস্তাতেই মামী-মা মারা গেলেন। হার্ট অ্যাটাকের দরুণ!
বাড়ির সবাই কান্নাকাটিতে ভেঙে পড়লো। আমি নতুন বৌ হলেও মামীমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল খুব মধুর। খুব ভালোবাসতেন তিনি আমাকে। সেই তার মৃত্যুতে ভীষণ খারাপ লাগলো আমার। অথচ মায়ান? তেমন কোনো অনুভূতিই নেই! পরদিন সকালেই ও ব্যাগ নিয়ে রেডি, ফিরে আসবার জন্য! আমি ছুটি নিতে বললাম। বললো, ' ছুটি নেই। তুমি চাইলে কিছুদিন থাকতে পারো। ' আমি থেকে গেলাম। মায়ান নির্লিপ্ত হয়ে ফিরে এলো।
এই নিয়ে ফিরে এসে মায়ানের সাথে একদফা চোটপাট হলো। আমার রাগের বিপরীতে ওর কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখালো না। ওকে 'পাথর-পাlষাlণ-নিlষ্ঠুlর' কতকিছু বলে আখ্যায়িত করলাম। কিছু বললো না, শুধু জানালো,
-- "অনুভূতি থাকলেই সেটা প্রকাশ করতে হবে? পৃথিবীতে সবচেয়ে অসহায় সে-ই যে অনুভূতির প্রকাশ ঘটায় বেশি।"
_____
একদিন বিকেলে দুজনে উদ্দেশ্যহীন হয়ে হাঁটতে বেরিয়েছি। সাধারণত প্রেমিক যুগলরা এই কাজটা করে একান্তে নিরিবিলি সময় কাটাতে, সময়টুকু কে ভালো করে উপভোগ করতে। কিন্তু মায়ান এ সম্পর্কে কোনো আগ্রহ দেখালো না। হাঁটতে বেরিয়েছি বলে রোবটের মতো চুপচাপ হাঁটতে লাগলো। বাড়তি কোনো কথা নেই।
ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ করলাম না। প্রকৃতির নীরবতার আলাদা একটা সৌন্দর্য আছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলে সেই সৌন্দর্যটা আমাদের চোখে পড়ে। এবং মোহিত করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এই নীরব নিসর্গ আমাকে বিমোহিত করে ফেললো।
হঠাৎ কে যেন কথা বলে উঠলো,
-- "আরে মায়ান ভাই না? কেমন আছেন আপনি?"
আচমকা এমন হওয়ায় খানিক চমকে সামনে তাকালাম। এক দম্পতি আমাদের ঠিক বিপরীত দিক থেকে আসছেন। তাদের আমি কখনো দেখি নি। কিন্তু চিনি। মায়ানের প্রাক্তন এবং তার স্বামী। কিন্তু ওর প্রাক্তনের স্বামী কেন ওকে দেখে কথা বলছে? অবাক করার বিষয় না?
তাকে দেখে মায়ান সৌজন্যে হাসলো। এগিয়ে গিয়ে কথা বললো। আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো। ওর সাবলীল ভঙ্গি আমাকে চমৎকৃত করে ফেললো। স্ত্রীর সামনে নিজের প্রাক্তনের সাথে সাক্ষাৎ ঘটলে কোনো পুরুষ স্বাভাবিক আচরণ করবে না। একই ঘটনা ঘটবে স্বামীর সম্মুখে প্রাক্তনকে দেখলেও। বিশেষ করে প্রাক্তন আর বর্তমানের মুখোমুখি দাড়ালে যে কেউই অস্বস্তি বোধ করবে। কিন্তু ওরা খুব সহজভাবেই ব্যাপারটা দেখছিল। সবচেয়ে বিস্ময়, মায়ান এত্ত স্বাভাবিক ছিল!
মায়ান আমার কাছে নিজেই স্বীকারোক্তি দিয়েছিল ওর সেই প্রেমিকাকে (প্রাক্তন)-কে সে অসম্ভব ভালোবাসতো। কিন্তু ওর নিরামিষ টাইপ চরিত্রের কারণেই ওকে পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছিল। এটা নিয়ে দুঃখ হয় তো ছিল, কিন্তু কখনো সেটা প্রকাশ করে নি। যেমন করলো না আজও!
_____
পরের বছর বইমেলায় ওর দু'টো বই বেরোলো। একটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ধাঁচের। আর একটা প্রাচীন মিথলোজির উপর। পাঠকদের মধ্যে খুব সাড়া ফেলে দিলো বই দু'টো!
ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখালো পাঠকেরা। মিথলোজির বইটার জন্য লোকে হাজার কথা বললো। সমালোচনার ঝড় উঠলো। কিছু মানুষ এতো বিদঘুটে ভাষায় কথা বললো! প্রকাশক সোজা না করে দিলো, তিনি আর 'মায়ান সাদিতে'র কোনো বই বের করবেন না। সেখানেও মায়ান নির্লিপ্ত।
আগের প্রকাশক পাত্তা না দিলেও নতুন বেশ কিছু প্রকাশক ওকে অফার করলো বই লেখার জন্য। প্রথম আলোর পুরস্কার পেল ওর সেই মিথলজির বইটা। তারপর ওকে আর পায় কে!
তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়ে গেল। পুরোপুরি সাহিত্যে ডুবে গিয়ে চাকরি ছেড়ে দিলো। সারাদিন বই পড়ে, রাত জেগে লেখালেখি করে, মাঝেমাঝে হুট করে দু' তিনদিনের জন্য নিখোঁজ হয়ে যায়। নির্জন কোনো পরিবেশে গিয়ে ঘুরে আসে মানসিক প্রশান্তির জন্য। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ওর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বেড়ে গেল দু'টো থেকে অনেকগুলোয়। পুরোদস্তুর লেখক বনে গেল একেবারে।
কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে আমার চোখে পড়লো ওর পরিবর্তন। আমাদের মানসিক দূরত্ব বেড়ে গেছে অনেক! এখন আগের চেয়েও চুপচাপ আর চাপা স্বভাবের হয়ে গেছে যেন!
আসলে মায়ানের এখানে কোনো দোষ নেই। একটা পর্যায়ে এসে আমি বুঝতে পারলাম, মায়ান প্রকৃতিগত ভাবে এমন নয়। বরং ওর পরিপার্শ্বই ওর এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী। কীভাবে? বলছি।
আগেই বলেছি, মায়ান ওর মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছে। মা-বাবার আদর কপালে জোটে নি। মধ্যবিত্ত মামার বিশাল পরিবারে বড় হতে গিয়ে প্রায়ই এমন অবস্থায় ওকে পড়তে হয়েছিল যেখানে চাইলেই কোনো ইচ্ছে পূরণ করা সম্ভব ছিল না। অত্যন্ত কঠিন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল।
এই মধ্যবিত্তের কঠিন পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠা 'মায়ান সাদিত' তাই হয়ে উঠেছিল প্রচণ্ড আসক্তিহীন। চাইলেই যা করা যায় না, তাই তার প্রতি আকর্ষিত হওয়া থেকে বিরত থাকতো। না পাওয়ার আক্ষেপ কি ও সেটা ভালো করে জানতো বলেই তার থেকে দূরে থাকতে ও ছিল সদা সচেষ্ট। এভাবেই বদলে গিয়েছিল। নির্লিপ্ততা ওকে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল। যে বাঁধন এতোই শক্ত যে পরিবর্তী কালে সেটা কাটাতে চেয়েও আর পারে নি মায়ান। কিংবা কাটাতে চেষ্টাও করে নি!
_______
আমার ভার্সিটির পড়া তখন শেষ। অন্যান্য কিছু ফ্রেন্ডস অ্যাব্রোড যাবে পিএইচডি করতে। কি যেন ভেবে মায়ানকে বললাম আমিও পিএইচডি করতে চাই। মায়ান না করলো না। সম্মতি দিয়ে দিলো।
খুব অবাক হলাম। আমি বিদেশে চলে যাচ্ছি সেটা নিয়ে ওর ভাবনা নেই? এতগুলো দিন ও আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে? প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খেল। ওকে জিজ্ঞেস করা হলো না।
মায়ান নিজ দায়িত্বেই আমার পাসপোর্ট, ভিসা তৈরি করালো। পিএইচডির বিষয়ে যাবতীয় কাজকর্ম করলো। তাতে কোনো বিকার নেই। কিন্তু আমি তো সেটা চাই নি। ওকে একটা পরীক্ষা করবার জন্য বলেছিলাম মাত্র। সে পরীক্ষাতেও আমার হার হবে? নির্লিপ্ত মায়ান জিতে যাবে হামেশার মতো? আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। ওর কলার চেপে বুকের উপর হামলে পড়ে কান্নার রোল তুললাম,
-- "তুমি আমাকে কেন যেতে দিচ্ছ?"
-- "বা-রে! তুমিই তো যেতে চাইলে!"
-- "আমি যেতে চাইলেই তুমি রাজি হবে? তোমার নিজস্ব কোনো অভিব্যক্তি নেই? নেই কোনো চাওয়া-পাওয়া?"
-- "সবক্ষেত্রে চাওয়া-পাওয়া থাকা উচিৎ নয়।"
কি বুঝদার কথা! অবুঝ স্বরে বললাম,
-- "আমি চলে গেলে, তোমার রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া এসব কে দেখবে? রোজ-রোজ ইস্ত্রির ভাঁজ খোলা জামা-কাপড় ছাড়া তো তোমার চলেই না। আমি না থাকলে, কে দেখবে এসব?"
সে বরাবরের মতোই শীতল স্বরে বললো,
-- "কারো জন্য কিছু তো আটকায় না, ফারিন। তুমি যখন ছিলে না তখন কি আমি দিন কাটাই নি? সকাল নয়টার মধ্যে ফ্রেশ হয়ে অফিসে পৌঁছাই নি?"
অবাকের চূড়ান্তে পৌঁছে বললাম,
-- "আমি না থাকলে তোমার কিচ্ছু যাবে-আসবে না?"
-- "সত্যিই বলতে কি.. না। পৃথিবীর কারো কোনো কিছু নিয়েই আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। জীবনকে আমি সহজভাবে দেখতে জানি, ফারিন। আমার সহজ জীবনটা আবেগ বিবর্জিত!"
কি সহজ-সরল কথা! কপাল আমার! এতো সাধ্য-সাধনা করে আমি পেয়েছি এই নির্লিপ্ত পুরুষকে। নিজেকে নিজেই প্রবোধ দিলাম। ওকে পাল্টাবো সাধ্যি কি? থাক না ও ওর মতো।
কিন্তু মানুষের মন যে বড়ই বিচিত্র। এই যে আমি বললাম, ওকে নিয়ে ঘাঁটাবো না। ওকে নিয়ে ভাববো না। কিন্তু না ভেবে কতক্ষণ? বিশেষ করে যে মানুষটা দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই আমার আশেপাশে থাকে তাকে কি না ভেবে থাকা যায়? আমি ভাবি, ভাবতে ভাবতেই ভালোবাসি, আবার ভুল করেই নিজের কল্পনার জগতে ভেসে বেড়াই ওকে নিয়ে। পরক্ষণেই গালের উপর অদৃশ্য চপেটাঘাত পরে অনুধাবন করি, কল্পনা আর বাস্তব আলাদা। সে আপাদমস্তক নিরাসক্ত একজন মানুষ। অন্যের চাওয়া-পাওয়া তার কাছে মূল্যহীন।
এয়ারপোর্টে এসে যখন ফর্মালিটিস মেইনটেইন করায় সবাই ব্যস্ত। আমি সেই মুহূর্তেও ওই নিরাসক্ত মানুষটি ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারলাম না। দিন-দুনিয়া ভুলে মানুষটার বুকে লেপ্টে কেঁদেছি। সে অত্যধিক শান্ত হয়ে বলেছে,
-- "জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে কিছু ছাড় দিতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। তাতে কান্নাকাটির কি আছে?"
আমি সেবার অবাক হই নি একটুও। কারণ ততদিনে তার এরকম নির্লিপ্ততা সম্পর্কে আমার ভালো মতোই জ্ঞান হয়ে গেছে! তার কথার প্রত্ত্যুতরে আমি কিছুই বলতে পারি নি। শুধু জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছি।
আজ তিনমাস হলো আমি এই অচেনা শহরে আছি। তার থেকে যোজন-যোজন দূরে! একা থাকতে থাকতে তার সেই নির্লিপ্ত স্বভাব আমাকেও গ্রাস করে ফেলেছে। আমিও অনুধাবন করেছি, পৃথিবীতে আশ্চর্য বলে কিছু নেই। মানুষ যা করে সবই স্বাভাবিক। এই-যে সে আমার পাশে নেই, এই-যে সে আমার সবচেয়ে আপন হয়েও এইমুহূর্তে আমার থেকে হাজার-হাজার মাইল দূরত্বে আছে, এটা তেমন জটিল কিছুই না। স্বাভাবিক পৃথিবীতে এসব ঘটনা অতি স্বাভাবিক!
নির্লিপ্ততার পুরু আস্তরণে আমি ঢাকা পড়েছি। কৌতুহল-আকাঙ্খা-ভালোবাসা বিবর্জিত হয়ে পরে আছি এখানটায়। বিশ্বাস করুন, তাতে আমার একটুও খারাপ লাগে না। কিন্তু বদলে গিয়েছে মায়ান। ইদানিং প্রায়ই মাঝরাতে সে কল করে ফিসফিস করে বলে,
-- "সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে তুমি কেন আমায় ভুলে অন্য কিছুতে মত্ত হবে? তুমি তো শুধু আমার। এই 'তুমি'টা শুধুই আমার ব্যক্তিগত! আমার একা ফেলে চলে যাওয়ার অধিকার তো তোমার নেই! ফিরে আসো জলদি, তোমায় ছাড়া আমার যে চলবে না!"