লোকে পাগল বলুক

লেখিকাঃ অভ্রায়ীনি ঐশি

প্রকাশকালঃ জুন ১৩, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

কক্ষ নং ৫৭৮ এ থাকা বর্তমান লোকটির হাসিতে মুখরিত হচ্ছে পুরো মেন্টাল এসাইলামটা।সারাদিন হাসির মাঝে সে যেন নিজের প্রনয়ীনির সঙ্গ অনুভব করে।কান্নার লেশ মাত্র খুজে পাওয়া দায় সেই কক্ষ হতে।সামনে থাকা অন্য কক্ষের মানসিক বিপদগ্রস্ত লোকগুলোর কান্নাও যেন সহ্য হয়না তার।সে শুধু হাসতে জানে,নির্মল হাসি দিয়ে রঙিন করতে পারে তার তথাকথিত পাগল জীবন।আসলেই কি সে পাগলের তকমা গায়ে লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা?

স্নাতকোত্তর লাভ করা একজন নাম করা সাইক্রেটিস্ট রওনক রাজভীর।৫৭৮ নং কক্ষের রোগীটিকে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব আপাতত তার। আজই প্রথম সাক্ষাৎ সেই রোগীর সাথে।এই মুহুর্তে সেই কক্ষেই উপস্থিত ডাঃ রওনক।,,

রোগীর নাম তাপস সিকদার।বয়স এবার ২৭ এর কোঠায় পড়বে।লম্বা চওড়ায় একজন সুপুরুষ বলা যায়।তবে বেশ ভুসায় এখন তাকে দেখলে লোকে একটাই উপাধি দেবে,'পাগল'

অভ্রায়ীনি ঐশি এর লেখা অনুগল্প লোকে পাগল বলুক এর ইমেজ

কক্ষটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলো রওনক।ছোট ছোট ইটের কনার ছড়াছড়ি।সেগুলোর দ্বারাই কক্ষটার তিন দিকের দেওয়াল জুড়ে এলো মেলো ভাবে একটা শব্দই লিখা,,,"প্রিয়তরী"

রওনক তাকালো তাপসের দিকে।সে পেছন ফিরে খালি দেওয়ালে প্রিয়তরী লিখতে ব্যস্ত।আলতো ভাবে ডাকলো রওনক তাকে...

"তাপস??"

ধ্যান দিলো না তাপস।আবারও ডাকলো রওনক..

"তাপস,,শুনতে পাচ্ছো তুমি?"

ফিরে তাকালো তাপস।মুখে তার অর্বাচীন হাসি।এলোমেলো ভাবে নাচতে নাচতে এলো রওনকের কাছে,,,উদগ্রীব হয়ে বললো...

"নতুন মানুষ,নতুন মানুষ,,হাসতে জানো?মুখে হাসি আনো।"

বলেই হাত তালি দিয়ে প্রাণ খুলে হাসতে লাগলো তাপস।পাশ ফিরে আপন মনেই বললো...

"এই, এই তরী,দেখ দেখ,,নতুন মানুষও হাসবে,,হাসবে। "

রওনক তাকালো তাপসের পাশে।মুচকি হেসে বললো...

"এটা কে? "

তাপস পাশে আঙুল তাক করে বললো..

"এটা?এটা তরী,,আমার প্রিয়তরী।খুব মিষ্টি না?হ্যা,হ্যা,,আমার তরী খুব মিষ্টি। খুব মিষ্টি। "

"তুমি দেখতে পাচ্ছো প্রিয়তরীকে?"

উৎসুক হয়ে তাপস বললো..

"হ্যা তো,,এই তো আমার তরী।আমার সাথেই থাকে সারাক্ষণ। আমার সাথে গল্প করে,আমাকে খাইয়ে দেয়,ঘুম পাড়িয়ে দেয়,ঘুড়তে নিয়ে যায় তো আমার তরী।"

"তোমার তরীর সম্পর্কে বলবে আমায়?,"

"শুনবে তুমি??আমার তরীকে নিয়ে?শুনবে??,,তাহলে বসো, বসো এখানটায়।"

বলতে বলতে নিজেই ফ্লোরে হাটু ভাজ করে হাসতে হাসতে বসে পড়লো তাপস।রওনকও বসলো তাপস বরাবর।

বিজ্ঞাপন

"বলো,শুনি?"

",,,ও,,,ও হচ্ছে আমার তরী।আমার প্রাণ।,,ঐ যে আমাদের বাড়ি থেকে ঠিক ১৮ কদম পেরোলেই যে বাড়িটা আছে না?ওটাই আমার তরীর বাড়ি।জানো?আমি না,দু দুটো বছর ওর পিছু পিছু ঘুরেছি।তরী আমার বড্ড নাছোড়বান্দা,, মানতোই না।বেশ কষ্টে তরী আমার হলো।মন বাগানে প্রেম ফুল ফোটালো তরী।কি যে সুন্দর সেই ফুল,,জানো?"

আলতো হাসলো রওনক..

"তাই?,,তা সেই ফুলে কাটা নেই?"

"ছিলো তো,, অনেকগুলো কাটা ছিলো।সব গুলো উপড়ে ফেলেছি,,হিহিহি,,,সব গুলোই।না হলে যে ওরা আমার প্রিয়তরীর হাতে হুল ফোটাতো?,,তা হয় নাকি বলো??,,কখনো নাহ।"

"তরী যদি ছেড়ে যায় তোমায়?"

কথাটা যেন খুবই হাস্যকর ঠেকলো তাপসের কাছে।কি যে মারাত্মক একটা হাসি দিলো ছেলেটা?,,কুসুম বলে শাপলা ফোটার হাসি।রওনক ভাবলো,,,আচ্ছা এই ছেলে যদি এখন মানসিক রোগী না হতো,তাহলে ঠিক কতগুলো মেয়ে ওর জন্য উতলা হতো?কতগুলো মেয়ে ওর ভালোবাসার কাঙাল হতো,,পিছু পিছু ঘুরতো তাপসের?অগনিত,,সত্যিই তা অগনিত,,,কারন তাপসের সৌন্দর্যটাই অন্যরকম,রওনকই এক অদ্ভুত নয়নে তাকিয়ে আছে ওর দিকে,মেয়েরা তো দৃষ্টি সরানোর কথাই নাহ।

"ত্ তুমি পাগল নাকি গো?,,হ্যা?,কি বলছো এটা? আমার তরী আমায় ছেড়ে যাবে??যাবে না যাবে না।কোনোদিন যাবে না।এই যে আমার সাথে আছে,,,সারাজীবনই থাকবে।তাই না রে তরী?? হিহিহি।"

আবার উৎসুক হয়ে রওনককে বললো..

"তুমি জানো?ও তো একবার হারিয়ে গিয়েছিলো আমার থেকে।,,তারপর,,তারপর আবার এলো আমার কাছে।সেই থেকেই তো আমার পাশে থাকে সারাক্ষণ,। "

"হাসতে বুঝি খুব ভালোবাসো?"

"ওমাহ,,আমার সুখেই তো হাসি আমি।আমার তরী তো আমার কাছেই।ও-ই তো আমার সুখ,।ওকে পেয়েছি,আর কি দুঃখ থাকার কথা?তাই তো হাসি আমি।সুখে হাসি।খুশিতে হাসি।প্রিয়তরীকে পেয়েছি বলেই হাসি।"

বলতে বলতেই উঠে হাত তালি দিয়ে আপন মনে নাচতে লাগলো তাপস।,,,ক্লান্ত নিঃশ্বাস ত্যাগ করে এসাইলাম থেকে বেরিয়ে এলো রওনক।

বাইরেটায় ঝুম বৃষ্টি। তোয়াক্কা করলো না রওনক।সেই বৃষ্টির লেশ ধরেই হাটতে লাগলো সরু রাস্তা বরাবর।

৪ মাস আগেই মরণব্যাধী রোগে আক্রান্ত হয়ে দুনিয়া ছেড়েছে তাপসের প্রিয়তরী।প্রিয়তরীর মৃত্যুর পর থেকেই অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে তাপস।সহ্য ক্ষমতার বাইরে হওয়ায় এই সুপুরুষকেই মেন্টাল এসাইলামে ভর্তি করাতে বাধ্য হয় তার বিত্তশালী পরিবার।সেই থেকেই তাপস হাসে এসাইলামের সেই ৫৭৮ নং কক্ষে তার প্রিয়তরীকে নিয়ে।সুখে ভাসে তার প্রিয়তরীর সাথে।

মুখটা উপরে তুলে রিনিঝিনি বৃষ্টির ফোটাগুলো গায়ে মাখছে রওনক।বুকে ব্যথার সংক্রমণ। তবে সেই ব্যথা প্রশমনের ঔষধটা পৃথিবীর কোনো ফার্মেসিতেই আর হয়তো কখনো পাওয়া যাবে না।বয়স ২৬ থেকে ৩২ এ পা দিয়েছে। এই ৬ বছরেও সেই তিব্র ব্যথার ঔষধ খুঁজে পেলো না রওনক।

চোখের পানি গুলে বৃষ্টির সাথে মিশেই ধুলিস্মাৎ হয়ে যাচ্ছে। গত ৬ টা বছর তো এভাবেই লুকিয়ে কাঁদে রওনক।,,,চোখ বন্ধ করে তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে ব্যথিত কন্ঠে শূন্যে বলে উঠলো রওনক...

"প্রিয়তরীর মতো তুমিও তো আমায় ছেড়ে পালিয়েছো অঙ্গার।চলে গেলে না ফেরার দুনিয়ায়।,তাপস তো বেশ খুশিই আছে গো অঙ্গার?তাহলে আমি কেন সুখ খুজে পাই না?,,আমি কেন তাপসের মতো তোমায় পাশে দেখি না?তোমায় আপন বক্ষে লুকাতে পারিনা?,,তাপস তো সারাটাক্ষন হাসতে থাকে। আমি কেন প্রতিরাতে তোমার খোঁজে দুঃখ বিলাস করি?কেন এমন হয়?তোমার মৃত্যু দেখেছি বলে?সাদা কাফনে মোড়ানো অঙ্গারকে দেখেছি বলে?,,সে তো তাপসও দেখেছে গো অঙ্গার।কই তাপস তো আমার মতো বুকে ছুরি চালানোর যন্ত্রণা পাচ্ছে না।,,কেন?,কেন সে পায় না এই ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাটা?,,লোকে তাকে পাগল বলে, এই জন্য?,,, কি ভাগ্য দেখো অঙ্গার,আমরা দুজনই নিজের প্রাণের সনে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছি।তারপর তাপস হলো পাগল,,আর আমি,পাগলের ডাক্তার।,,এটাই কি তবে পার্থক্য?,, তাপসের মতো পাগল না হয়ে আমার এতো কষ্ট? তাহলে প্রয়োজন নেই আমার পাগলের ডাক্তার হওয়ার,,আআমি পাগল হতে চাই অঙ্গার।তাপসের মতো পাগল হয়ে তোমার সনে হাসতে চাই আমি।,লোকে আমায় পাগল বলে না কেনো অঙ্গার?কেন??,,,বলুক,বলুক,,হাজার বার বলুন আমায়।,,,লোকে পাগল বলুক আমায়।।,,,,লোকে পাগল বলুক,,

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প