বালিকা বঁধু

পর্ব - ২

বালিকা বঁধু বাংলা গল্প - লেখিকা আফরোজা আঁখি

মিহরিমার কানে গিয়ে ধাক্কা খেলো নবাবের বলা কথা।সে হাত নাড়ালো।শাড়ির আঁচল দিয়ে টানা ঘোমটাটা আরেকটু টেনে নিলো।ওর চুড়ির শব্দ নবাবের কানে লাগলো।না চাইতেও চোখ চলে গেলো মেয়েটার দিকে।এবার সে গলা খাকারি দিয়ে বলল,

"ভয় পাচ্ছো আমাকে?"

মেয়েটা উপর নিচ মাথা নাড়ে।নবাব বলে,

"ভয় নেই।আমি তোমাকে মা রতে নই বাঁচাতেই বিয়েটা করেছি।এবার একটা সত্যি কথা বলো তো।"

"কি কথা?"

"উনাকে বি ষ খাইয়েছো কীভাবে?"

মিহরিমা ভালো মতো শোনেনি নবাবের বলা কথা।তাই পতিক্রিয়া জানালো না।বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা মিহরিমার দিকে তাকিয়ে নবাবের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।সে ধীরপায়ে উঠে গিয়ে ঘরের বিশাল জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে তখন নিশুতি রাত,জমিদার বাড়ির বিশাল উঠানটা নিঝুম অন্ধকারে ডুবে আছে।নবাবের গম্ভীর কণ্ঠস্বর আবার প্রতিধ্বনিত হলো ঘরের দেয়ালে,

"আমি জানি মিহরিমা,তুমি এখন কী ভাবছ।সবাই ভাবছে এই বিশাল জমিদারির লোভ আর ক্ষমতার মোহে আমি আমার নিজের জন্মদাতা পিতাকে বি ষ খাইয়েছি।কিন্তু আসল সত্যিটা তো কেবল আমি আর তুমিই জানি,তাই না?"

নবাবের মুখের এই কথাটি শুনে মিহরিমার ফর্সা মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।ভয়ার্ত চোখে সে নবাবের পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল।নবাব ঘুরে দাঁড়াল,তার চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন মিহরিমার মনের সব গোপন কথা এক পলকে পড়ে ফেলল।সে খাটের দিকে এগিয়ে এসে মিহরিমার মুখোমুখি বসল।মিহরিমা ভয়ে নিজের দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

"কি জানেন আপনি?"

নবাব হাসলো।মিহরিমার ভয় আরও বাড়লো।কিছু বলতে নিলেই নবাব শান্ত গলায় বলতে শুরু করল,

"তুমি ভেবেছিলে ৫৫ বছরের এক বুড়োকে রূপের জাদুতে কুপোকাত করে এই বাড়িতে রাজরানি হয়ে আসবে,আর কেউ কিচ্ছু টের পাবে না?নায়েব খানকে যে বুনো ওষুধি গাছগাছড়ার বি ষাক্ত রস খাওয়ানো হয়েছে,তা এই হেমন্তপুর গ্রামের কোনো সাধারণ মানুষের চেনার কথা নয়।কিন্তু আমি চিনি।কারণ, আজ থেকে ঠিক সাত বছর আগে,আমার চোখের সামনে এই একই বি ষ খেয়ে একজন আত্মহত্যা করেছিলেন।তিনি আর কেউ নন—তোমার আপন ফুপি,সুলতানা!উনি এই জমিদার বাড়ির মেয়েদের নাচ শেখাতেন।উনি আমার দেখাশোনাও করতেন!"

সুলতানা নামটা শুনতেই মিহরিমা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল। এতক্ষণের ভয়ের জায়গাটা নিমেষেই তীব্র ক্ষোভ আর প্রতিশোধের আগুনে রূপ নিল।সে চোখের পানি মুছে সোজা হয়ে বসল।নবাবের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ়ভাবে বলল,

"হ্যাঁ! বি ষ আমিই খাইয়েছি!আপনার বাবা নায়েব খান কোনো মানুষ নন, উনি একটা নরপিশাচ! আজ থেকে সাত বছর আগে আমার ফুপি যখন উনার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিলেন,তখন এই জমিদার বাড়ির বড় কর্তা নিজের ক্ষমতার দাপটে আমার ফুপিকে জোরপূর্বক নিজের লালসার শিকার বানিয়েছিলেন! উনার ওই পাশবিক অত্যাচারের পর লজ্জায়,অপমানে আমার ফুপি ওই বুনো বি ষাক্ত রস খেয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। কিন্তু আমরা দরিদ্র বলে সমাজ কোনো বিচার করেনি!পুলিশের তদন্ত টাকার জোরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল!আমার ফুপিমণি ন্যায় বিচার পাননি।"

মিহরিমা দম নেওয়ার জন্য একটু থামল,তার চোখ দুটো তখন জ্বলন্ত অঙ্গার।সে আবার বলতে লাগল,

"আমি তখন ছোট হলেও ফুপির ওই নিথর দেহ আর বাবার চোখের জল ভুলিনি।আমার দাদির আহাজারি এখনো আমার কানে বাজে।আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম,এই পাপিষ্ঠকে আমি নিজের হাতে শাস্তি দেব।যখন শুনলাম নায়েব খান আবার বিয়ে করতে চান এবং উনার নজর আমার ওপর পড়েছে, আমি নিজে থেকে এই বিয়েতে রাজি হয়েছি। উনার বিশ্বস্ত কর্মচারীর ভাগ্নী হয়ে উনার শোবার ঘরে বি ষ মেশানো শরবত পৌঁছে দেওয়া আমার জন্য কঠিন ছিল না।আজ কবুল বলার ঠিক আগমুহূর্তে উনাকে আমি ফুপির মৃত্যুর ঠিক সমপরিমাণ যন্ত্রণার স্বাদ চখিয়েছি!"

মিহরিমার এই স্বীকারোক্তি শুনে নবাবের চোখে কোনো রাগ বা বিস্ময় ফুটল না।বরং সে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নবাবের চোখ দুটোও কেমন যেন অপরাধবোধে ছেয়ে গেল। সে মিহরিমার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

"আমি সবটাই জানি মিহরিমা।তোমার ফুপির সাথে সেদিন কী অন্যায় হয়েছিল,তা আমি খুব ভালো করেই জানি।"

"আপনি নিশ্চয়ই আমাকে শাস্তি দিবেন?"

"উঁহু!"

মিহরিমা অবাক চোখে তাকায় নবাবের পানে।নবাব উঠে দাঁড়িয়ে আলমারি থেকে একটা চাবির তোড়া বের করে মিহরিমার সামনে রাখল। তারপর অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,

"আমি তোমাকে বিয়ে করেছি।তুমি আমার স্ত্রী।এই জমিদার বাড়ির বড় বউ! আর সেই মর্যাদা আমি তোমাকে দেব।আমি তোমাকে আমার স্ত্রীর অধিকার দেব,চিন্তা নেই—আমি তোমাকে কোনোদিনই জোর করব না।তুমি এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারো,তোমার কোনো ভয় নেই।"

তারপর অনেক সময় মিহরিমা আর নবাব গল্প করলো।নবাব তার জীবনের খারাপ সব স্মৃতি গুলো এক এক করে মিহরিমাকে বলল।নবাবের মায়ের মৃত্যু ঘটেছে নায়েব খানের জন্যই।তার শৈশব নষ্ট হয়েছে কেবল নায়েক খানের জন্য।নবাব ভুক্তভোগী ছোট বেলা থেকেই কষ্ট পেয়ে এসেছে সে।বাবার প্রতি তার একটা চাপা রাগ আগে থেকেই ছিলো।আজ লোকটার ওমন অবস্থা দেখে একটুও কষ্ট লাগছে না।আনন্দ হচ্ছে খুব।মিহরিমা অবাক হয়ে নবাবের দিকে তাকিয়ে রইল। যে নবাবকে পুরো জমিদার বাড়ির ছোট-বড় সবাই বাঘের মতো ভয় পায়,সেই মানুষটার ভেতরে এত বড় একটা ক্ষত লুকিয়ে আছে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি।প্রতিশোধের আগুন নিভে গিয়ে ঘরের ভেতর তখন অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো।মিহরিমা বুঝতে পারল,নায়েব খানের পাপের অবসান ঘটলেও,নির্দোষ নবাবের চোখের এই আজীবনের অপরাধবোধ হয়তো কোনোদিনই মুছবে না।সে তার বাবার কাজে লজ্জিত! তবে মিহরিমাও ভেবে নিয়েছে আজ থেকে এই বিশাল জমিদার বাড়ির দেওয়ালে লুকিয়ে থাকা শত শত গোপন পাপের ইতিহাস চিরতরে বন্ধ হবে মিহরিমারই হাত ধরেই।সেসব কথা আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল মিহরিমা আর নবাব দুজনেই।এই কিছু সময়ের ব্যাবধানে নবাব মিহরিমাকে একটা নাম দিয়েছে।নামটি হলো— বালিকা বঁধু।নবাবের বালিকা বঁধু! মিহরিমা বেশ খুশি হয়েছে। কাছ থেকে নবাবকে দেখে বুঝতে পারছে নবাব তার বাবার মতো নয়।পুরোপুরি ভিন্ন সে!মিহরিমা নবাবের প্রেমে মজলো.... নবাবও ভালোবাসার চাদরে মুডিয়ে নিলো তার বালিকা বঁধুকে।

বিজ্ঞাপন