একে একে চারটে বিয়ে করেছেন জমিদার বাড়ির বড় কর্তা নায়েব খান।কিন্তু নিয়তির পরিহাস,প্রথম স্ত্রীর ঘরে একটিমাত্র পুত্রসন্তান ছাড়া আর কোনো স্ত্রীর পক্ষ থেকেই তিনি বাবা ডাক শোনার সৌভাগ্য লাভ করেননি।কোনো স্ত্রীই তাঁকে সন্তান সুখ দিতে পারেননি।তাই বংশের প্রদীপ আর নিজের অপূর্ণ ইচ্ছেকে পূর্ণ করতে আজ পঞ্চমবারের মতো বিয়ে করতে যাচ্ছেন তিনি।
আজ নায়েব খানের পঞ্চম বিয়ে।পাত্রী তাঁরই এক বিশ্বস্ত কর্মচারীর ভাগ্নী। মেয়েটার বয়স ১৬ মতো হবে! নাম মিহরিমা। অতি দরিদ্র ঘরের মেয়ে হলেও মেয়েটি দেখতে ভারী সুন্দর, সাক্ষাৎ পরী সে! আর এই রূপের জাদুতেই কুপোকাত হয়েছেন নায়েব খান; মিহরিমার সৌন্দর্যে তিনি একপ্রকার পাগল।শুধু নায়েব খানই নয়।হেমন্তপুর গ্রামের প্রায় অধিকাংশ যুবকই মিহরিমাকে পাওয়ার জন্য মরিয়া।
কে জানতো সেই সুন্দরী মিহরিমা ৫৫ বছর বয়সী নায়েক খানের কপালেই আছে! আজ ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন চলছিল।সবকিছু ঠিকঠাকই এগোচ্ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটল ঠিক কবুল বলার আগমুহূর্তে। হঠাৎ করেই জমিদার কর্তার শরীর কেমন যেন করতে লাগল।সবার চোখের সামনে মুখ দিয়ে গলগল করে ফেনা উঠতে শুরু করল তাঁর। অবস্থা দেখে উপস্থিত কারোরই বুঝতে বাকি রইল না যে,কেউ তাঁকে বি ষ খাইয়েছে!কিন্তু এই ভরা মজলিশে,এত মানুষের মাঝে এমন ভয়ানক কাজ কে করতে পারে? কেনই বা করবে?
তা নিয়ে আপাতত মাথা না ঘামিয়ে দ্রুত তাঁকে ডাক্তারখানায় নিয়ে যাওয়া হলো।জমিদার বাড়ির দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত এক অভিজ্ঞ ডাক্তার উনার চিকিৎসা শুরু করলেন।কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ভেতর থেকে খবর এলো—নায়েব খান কোমায় চলে গেছেন। তাঁকে সাধারণ কোনো বি ষ নয়,বরং মাত্রাতিরিক্ত বি ষাক্ত কোনো বুনো ওষুধি গাছগাছড়ার রস খাওয়ানো হয়েছে।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো জমিদার বাড়িতে যেন এক কালবৈশাখী ঝড় নেমে এলো। উৎসবের আলো নিভে গিয়ে চারপাশ অন্ধকারে ছেয়ে গেল।বাড়ির সবার চোখে-মুখে এখন চিন্তার চেয়েও বেশি এক অজানা আতঙ্ক।নায়েব খান অসুস্থ বলে যে তারা খুব ভেঙে পড়েছেন,তা কিন্তু নয়। সবার আসল ভয় অন্য জায়গায়—জমিদার কর্তার এই রহস্যময় অসুস্থতার তদন্ত করতে নিশ্চয়ই এবার গোয়েন্দারা আসবে!পুরো বাড়ি ঘেরাও করে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।এই রাজপ্রাসাদের দেওয়ালে দেওয়ালে যে কত শত গোপন পাপ আর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে,তা প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার ভয়েই সবাই ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠেছে।
তবে নায়েব খান কোমায় চলে গেলেও জমিদার বাড়ির সেই বিয়েটা কিন্তু থেমে থাকেনি। বাসর ঘরে শূন্য হাতে কনে ফিরে যায়নি।বাবার জায়গায় আজ নিজে গিয়ে ছাদনাতলায় বসেছিল জমিদারপুত্র নবাব!বাবার বিয়ের আসরে সে নিজেই মিহরিমাকে বিয়ে করে ঘরে তুলে এনেছে।
এতে অবশ্য কারও কিছু বলার সাহস ছিল না। কারণ নবাবের আপন মা অর্থাৎ নায়েব খানের প্রথমা স্ত্রী বহু বছর আগেই গত হয়েছেন।বড় কর্তার পর এই বিশাল জমিদারির রাশ এখন নবাবেরই হাতে।বাবার এই রহস্যময় পরিণতির পেছনে কার হাত আছে,তা খুঁজে বের করার আগেই কেন সে তড়িঘড়ি করে বাবার হবু কনেকেই নিজের স্ত্রী বানিয়ে ঘরে তুলল,তা নিয়ে জমিদার বাড়ির অন্দরে ফিসফাস শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।সবাই ধারণা করছে নায়েব খানকে বি ষ নবাবই খাইয়েছে।কিন্তু তা ওর সামনে বলার সাহস নেই কারোরই।পুরো জমিদার বাড়ি ছোট বড় সবাই নবাবকে ভয় পান কিনা! ভয় পাওয়ারও অবশ্য অনেক কারণ আছে। বাসর ঘরে তখন মিহরিমা বসে আছে। বাড়ির সব মহিলারা ওকে ঘিরে রেখেছেন। নায়েব খানেই ছোট স্ত্রী বলেই ফেললেন,
'কি কপাল গো তোমার।বাবা ছেলে দুজনকেই এমন দেওয়ানা বানালে কি করে?জাদু জানো বুঝি?'
মিহরিমার সাথে ওর ছোট বোন মেহনূর এসেছে।ওরা পিঠাপিঠি।বয়েসের পার্থক্য খুব বেশি নয়।তবে মেহনূরকে মেহরিমার থেকে বড়ই লাগে।গায়ের রংটা চাপা হলেও দেখতে খুব মিষ্টি সে।বোন সম্পর্কে ওসব কথাবার্তা মেহনূরের সহ্য হলো না।সে বলল,
'জি জাদু জানে।আপনি শিখবেন?'
নায়েব খানের ছোট স্ত্রী রেগে গেলেন।ধমকে বললেন,
'এই মেয়ে আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছি? না তো! তাহলে আগ বাড়িয়ে উত্তর দিচ্ছো কেন? শুনো... এসেছো, থাক, খাও দাও তারপর চলে যাও আমার সাথে লাগতে এসো না।'
কথাটা বলেই উনি চলে গেলেন।মিহরিমা চোখের ইশারায় মেহনূরকে শান্ত হতে বলল।মেহনূর আর কথা বলল না।সবাই মিহরিমার সাথে কথাবার্তা বললেন।অর্ধেক মেয়েরাই ওর সৌন্দর্য দেখে হিংসা করলো।মুখে না বললেও তাদের কথায় স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছিলো তা।মিহরিমাকে সুন্দর করে সাজানো হলো।বাগান থেকে তুলে আনা কাচা ফুলের গহনা পরানো হলো।মহিলারা আপাতত ওখান থেকে চলে গেলেন।কিছুসময় যেতেই কক্ষে প্রবেশ করলো জমিদার পুত্র নবাব।মিহরিমা ভয়ে বিছানার এক কোণে গিয়ে বসলো।নবাব আস্তে আস্তে হেঁটে বিছানায় গিয়ে বসলো।মিহরিমার দিকে তাকিয়ে বলল,
'ভয় নেই... মেয়ে।আমি রাক্ষস নই।তোমার কোনো ক্ষতি করব না।'