গতরাতে তাহাজ্জুদ সালাতে বলেছিলাম, এমন কাউকে দিও, যে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সম্মান করবে আমাকে।যেখানে শ্রদ্ধা সেখানেই ভালোবাসা।
ঘন মেঘে ঢাকা আকাশ, গাছের ডালে ডালে জলের ফোঁটা ঝুলে আছে। বাতাসে এক ধরণের শীতলতা, যে শীতলতা মনটাকেও ছুঁয়ে যায়। চারদিকে যেন একটুকরো নীরবতা, মাঝেমধ্যে দূর থেকে ভেসে আসে কাকের ডাক কিংবা দূরের মসজিদের মাইকের হালকা আওয়াজ। এমন আবহাওয়ায় আমার জীবনে এলো এক অপ্রত্যাশিত মোড়।
শীত শীত দিনটায় বাবা বলল "যাও দেখা করে এসো রাহি কে নিয়ে। "
আমি কত করে বললাম " তারা ঘরে আসলেই তো হয় বাবা। পরিবারের বড়দের ছাড়া প্রথম দেখা কি ঠিক হবে?"
বাবা বলল"কেন নয়? তোমরা এখন যথেষ্ট ম্যাচিউর, ঘরে বসে যতটুকু বুঝবে তার চাইতে বাইরে নিঃসংকোচে কথা বলে আরো অনেকটা জানতে পারবে একে অপরকে। "
আমার পরিবারে ছেলে-মেয়ের সমান বন্ধুত্ব কিংবা আড্ডার সম্মতি কখনোই ছিল না, বেপর্দা না চললেও, বেশি রক্ষণশীল ও না তাই ওদের বোঝাতে পারলাম না।
অবশেষে বড় আপা তৈরি করে দিলো আমায়। বেশি কিছু না চোখে গাঢ় কাজল টেনে দিয়েছে। নাকে আগে থেকেই স্টোনের নথ ছিল।
আপা বলল"একটু সাজগোজ না করলে মেয়ে লাগে নাকি? "
গতানুগতিক হিজাব, আবায়া পড়েই চলে গেলাম
রেস্টুরেন্টে দেখা—
রাহি আপার হাসিমাখা চোখের মাঝে আমি কিছুটা চুপচাপ বসেছিলাম। আমার প্রথম অভিজ্ঞতা, তাই মনের ভেতর অজানা কাঁপুনি।
সামনে বসা পাত্র ইফাস আলম
ভদ্র, মার্জিত, সুপাঠ্য মানুষ। কথায় কথায় বোঝা যায় সে প্রতিষ্ঠিত, নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখে।
ঠিক তখনই প্রথম খেয়াল করলাম পাশের চেয়ারে এসে বসা ছেলেটিকে। পরিচয় করিয়ে দিলো সে ইফাসের একজন খাস জুনিয়র ভাই । পরিচিত মুখ,পরনে সাদাসিধে পোশাক, কিন্তু এক ধরণের স্থিরতা আছে তার চাহনিতে। আমাদের চোখাচোখি হয় একবার। পিয়াস চোখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তার সংযত ভঙ্গিমা আমাকে অবাক করে তোলে।
রাহি আপা কানে কানে বলে ওঠে, “তোর বর যেই হোক, কিন্তু পাশের ভাইটারে আমার ভালো লাগছে।”
আমি কড়া চোখে তাকালাম।
ইফাস বলল"আপনারা দুজন সম্ভবত একই ইউনিভার্সিটিতে পড়েন। দেখা হয়েছে কখনো? "
দুজনেই হ্যাঁ সূচক মাথা নারালাম।
সে আবার জিজ্ঞেস করল "পরিচয় আছে?"
আমরা একত্রে না সূচক মাথা নাড়ালাম।
"যাই হোক তাল মিল ভালো আছে।" ইফাস মজা করে হাসলো ।
সত্যি বলতে সেইদিনই আমাদের ফর্মাল পরিচয় হয়েছিল।
বাসায় ফেরার পর—
রাতে আপাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপু, তুমি কি কখনও বাবাকে জিজ্ঞেস করেছো, কেন তোমাকে পাবলিকে পড়তে দেয়নি?”
আপা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “পাবলিকে মেধাবী ছেলে মেয়ের বসবাস কিন্তু মনে কর, সবাই তো একই জেলা কিংবা একই পরিবেশ থেকে উঠে আসেনা ।আর্থিক অবস্থা ও এক হয়না।তাছাড়া আমার মতো বমি করা মেয়ে অন্য জেলায় কী করে যাতায়াত করবে বল? তাই হয়তো।
আপার শেষের কথায় হাসলাম খুব।
:
:
:
ভার্সিটিতে শীত শীত আমেজ, চলছে নবীন বরণের প্রস্তুতি। কয়েকদিন ধরে বেশ আয়োজন। হাটার পথেই দেখতে পেতাম পিয়াস কে। সেও বিভিন্ন কাজ দেখিয়ে দিচ্ছে জুনিয়রদের।
আমার মনে হতো পড়ালেখায় একটু কম আগ্রহী ছেলে মেয়েরাই এসব আনুষ্ঠানিক কাজে বেশি ব্যস্ত থাকে কিন্তু পিয়াস কে দেখে বুঝলাম , আমার ধারণা ভুল ছিল, সে সব কাজেই মনোযোগী অর্থাৎ যা ই করে গুরুত্ব দিয়ে করে তাই ভালো নাম ও আছে।
আমি তাকে যথেষ্ট এড়িয়ে চলতাম, জানিনা সে কী ভাবতো! তবে তাকে কখনো কথা বলার সুযোগ দিতাম না।
ব্যাপারটা এমন না যে তার আর্থিক কিংবা পারিবারিক কারণে এড়িয়ে চলছিলাম,আসল কথা হলো,
আমি রবের জন্য তাকে ছেড়ে দিয়েছি।কখন, কীভাবে, কেন? আমার তাকে ভালো লাগতে শুরু করেছিল জানিনা।
কিন্তু আমি চাই রব আমার জন্য যাকে রেখেছে কেবল তাকে ঘিরেই আমার সমস্ত আবেগ হোক।আমার বিশ্বাস, যা কিছু আমার জন্য বরাদ্দ তা ছিনিয়ে নেওয়ার সাধ্য কারো নেই।
“জেনে রাখো! যদি সমগ্র জাতি তোমার উপকার করতে চায়, তারা তোমার উপকার করতে পারবে না, তবে যা আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করেছেন। আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করতে চায়, ক্ষতি করতে পারবে না, তবে যা আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করেছেন। কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে এবং পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে।
(তিরমিজি: হাদীস নং ২৫১৬)
:
:
:
প্রায় তিন সপ্তাহ পর আপা এলো শশুর বাড়ি থেকে।
দিনের সেই মুহূর্তে বেজে উঠলো ল্যান্ডলাইনের রিং। আমি উঠে গিয়ে ধরি। অন্যপ্রান্তে কেউ নেই। কদিন ধরেই এই অদ্ভুত ব্ল্যাংক কল আসছে।
পরেরদিন আরো একবার ফোন বাজলে আপা রিসিভ করে বলে"শোনো কী বলবে বলে ফেলো, বিয়ে করে ফেলছি কিন্তু শীঘ্রই। "
এতদিন যাবৎ চুপ থাকা গলায়, কেউ স্বর যুক্ত করে বলল "সে কোথায়?"
আপা আগে থেকেই দুষ্ট ছিল,উত্তেজিত হয়ে হাতের ইশারায় আমাকেও পাশে দাঁড় করিয়ে বলল "সে? সে টা আবার কে শুনি?"
অপর পাশ থেকে রিসিভার রাখার শব্দ হলো।
পরবর্তী কদিন আমার মনে একটা অদ্ভুত ভাব। জানি ইফাস পাত্র হিসেবে ভালো, তার পরিবার ভালো—কিন্তু মনটা যেন ঠিক সায় দিচ্ছে না।ভার্সিটির কোরিডরে আকষ্মিকভাবে দেখা হয়ে গেল পিয়াসের সাথে, তা আদৌ কাকতালীয় ছিল নাকি ইচ্ছাকৃত জানা নেই আমার। চোখেমুখে কেমন যেন অস্থিরতা দেখলাম, আমাকে কিছু বলতে চাইছে হয়তো কিন্তু আমি মোড় ঘুরিয়ে অন্যদিকে চলে গেলাম।
:
:
:
হঠাৎ বাবার মুখে একদিন পিয়াসের কথা শুনে থমকে যাই আমি।আশ্চর্য হলেও সত্য যতবার রাত জেগে সালাতের সেজদায় বলেছি "আমি ক্ষণিকের মোহ চাইনা।যার জীবনের শেষ অব্দি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকব কেবল তাকেই দিও।রবের কাছে কিছু চাইতে আমি কখনো কৃপণতা করিনি। হোক আমার জন্য অসাধ্য, কাল্পনিক, অবাস্তব কিংবা আকাশ কুসুম কিন্তু আমার রব যখন বলে " হয়ে যাও। তা হয়ে যায়।
“তাঁর আদেশ তো এই—যখন তিনি কিছু ইচ্ছা করেন, তখন তিনি শুধু বলেন: ‘হও’, আর তা হয়ে যায়।”(সূরা ইয়াসীন ৩৬:৮২)"
আর প্রতিবার এরপরের দিনই কোনো না কোনো ভাবে আমার সাক্ষাৎ হয় পিয়াসের সাথে। কি আশ্চর্য আজ ও বাবা তার কথা বলতেই ডেকেছে।
বাবা খুব গম্ভীর হয়ে বসে আছে, কামরায় আমার উপস্থিতি বুঝে সবার সামনে বলল"আজকাল ছেলে মেয়েরা বেশ সাহসী হয়ে উঠেছে, যা চায় তার জন্য পিছপা হয়না।
আমি বাবার কথা বুঝলাম না, কি বলতে চেয়েছেন।
বাবা আবার বলল "সামনের সপ্তাহে তোমার বিয়ে পড়ানো হবে।যেমন মেয়ে তেমন ছেলে দুজনই নাছোড়বান্দা।
আমি খুব অবাক হলাম, দুলাভাই, আপা আম্মা সবাই একই ঘরে বসে আছে।
বাবার কাছে গিয়ে কম্পিত স্বরে জানতে চাইলাম"আমি কি কোন ভুল করেছি? তুমি কি রেগে আছো বাবা?"
"পিয়াসের সাথেই তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমি জানি তুমি কিছুতে জড়িত নও।সে বলেছে আমাকে।"
তারপরও সন্দিহান ভাবে বললাম "তুমি যা চাইবে তাই হবে, যেখানে বলবে সেখানেই করব বিয়ে।"
বাবা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে দুলাভাইকে সাথে করে নিয়ে কী কাজে যেন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আমি অবিশ্বাস্য চোখে ধপ করে বসে পড়লাম বেডে।
আপা কাছে এসে দুষ্টু চোখে বললো "
সে তার "সে" কে নিয়েই যাবে আমাদের কাছ থেকে।
আমি বললাম "মানে?"
আপা বলল বিয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে, অনেক কাজ বুঝলি?
রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, যতটুকু জানি বাবার হাতে আরো দশটি ভালো পাত্র ছিল তাও আবার দশগুণ ভালো চারিদিক থেকে। পিয়াস কি করে বাবাকে রাজি করালো? এখনো তো তার পড়াও শেষ হয়নি। একটু দ্বিধা নিয়ে ভাবলাম "তাছাড়া তার ফ্যামিলি ও তো,,,
:
:
এক শুক্রবার সত্যিই আমার বিয়ে পড়ানো শেষ।মসজিদ থেকে সবাই ফিরে এলো।
বাবা হেসে বললেন,
“কখনো ভাবিনি, এই ব্রিলিয়ান্ট ছেলেটা একদিন আমার মেয়ের জীবনসঙ্গী হবে।”
পিয়াস এবার মাথা নিচু করে হাসল।
তার চোখে-মুখে সম্মান, আরেকটু বেশি নীরবতা।
আমি এবার ধীরে বললাম"কী জাদু করছেন আপনি বাবাকে?"
পিয়াস বলল বেশি কিছু না চারদিন, রোদে পুরে বৃষ্টিতে ভিজে উনার অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একদিন সুযোগ পেয়ে বললাম "আংকেল আমার জীবনের সব কাজকেই আমি শতভাগ গুরুত্ব দিয়ে করেছি এবং সফল ও হয়েছি।আমার জন্ম, পরিবার, বংশ পরিচয় সেগুলো আমার হাতে ছিলনা। তবে আমার যোগ্যতা কে একটিবার সুযোগ দিন!
আমি চাইনা ভবিষ্যতে এমন একটা দিন আসুক যেদিন আমার বলতে হবে"
আজ আমার সব আছে শুধু মাহা নেই।শতভাগ নয় হাজারভাগ এর উপরে চেয়েও, সে কেন আমার হলো না?"
তারপর আমি আদ্র চোখে পিয়াস কে বললাম "কবে হলো এসব?"
"যেদিন ইফাস ভাইয়ের পাত্রী হিসেবে তোমাকে দেখেছি। সেই হতে ভীষণ মিস করছিলাম। তখন আমার মনে হলো ভালোবাসি বলার চাইতেও প্রতিক্ষণে কারো অভাববোধ করার অনূভুতি টা দারুণ জ্বালার।
মাহা আমি তোমাকে ভালোবাসি কিনা জানিনা। তবে তোমার অভাবে পুড়ি ক্ষণে ক্ষণে।"
আমি মাহা হোসাইন “আমি বিশ্বাস করতাম না, ‘কস্মিনকালে’ কখনো এমন কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু আজ বুঝলাম—সময় সব ঠিক করে দেয়।বাবার সুযোগ দেওয়া না-কি পুরোটাই মহান রবের কারিশমা ছিল সেটা , জানিনা। শুধু জানি বাস্তবতা কখনো কখনো গল্পকেও হার মানায়। ”
প্রকৃতির ভারী আকাশ হঠাৎ হালকা হাওয়ায় নড়ে উঠল।
দূরে কোথাও পাতা ঝড়ে গেল—
অতীতের কোনো এক দিন থেকে এসে
আজকের দিনে মিলল দুটি মানুষ।