কস্মিনকালে

পর্ব - ১

কস্মিনকালে বাংলা গল্প - লেখিকা সূচনা জাফরিন

ঐ সময়টা তে আমি বেশ গা ভাসানো দিন কাটাচ্ছিলাম। বাবার ইচ্ছে ছিল প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়াবে কিন্তু আমি নাছর বান্দি।স্কুল থেকে কলেজ অব্দি পড়ে আসা বান্ধুবীদের সাথে বিচ্ছিন্ন হতে আমি নারাজ। তাই নিজ জেলার সুনামধন্য সরকারি বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম । পরিবারে কারো বিশ্বাস ছিলনা আমিও যে ভর্তি পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হতে পারবো।

মনোবিজ্ঞান পছন্দের সাব্জেক্ট ছিল, তাই ওটায় বেঁছে নিয়েছি অপশন থেকে।

তবে আমি অনেকটা, ইংরেজী ডিপার্টমেন্টেই সময় কাটাতাম প্রিয় দুই বন্ধু শিলা আর তানহার সাথে।

একদিন গ্যালারি ভর্তি ক্লাসে, সামনের বেঞ্চে বসা এক ছেলেকে উদ্দেশ্য করে দেখিয়ে শিলা বলল

"মাহা শোন না, ঐ যে সামনে বসা ছেলেটা দেখছিস না? "

"হ্যাঁ! তো? "

"সে আমাদের ক্লাস টপার, কিন্তু ব্যবহার দেখলে অবাক হবি। "

"কেন!"

শিলা হাত নেড়ে বুঝালো "একেবারে থার্ডক্লাস"

"টপার দের তো একটু, ইগো,এটিটিউড থাকেই। " আমি বিশেষ পাত্তা না দিয়েই বললাম।

"আরেহ না এটা অহং না, কেমন যেন সবার সাথে যায় না। "

শিলা কে থামিয়ে বললাম "বাদ দে তো।আমাদের কী?জানিস গতকাল শপিং এ কী হয়েছে"

নিত্য দিনের মতো অন্য টপিকে চলে গেলাম।

ঠিক এক সপ্তাহ পর ক্যান্টিনে হাল্কা খাওয়া সেরে নিয়ে সবাই উঠে গেল কিন্তু আমার মুড ছিলনা বলে, কিছু খেলাম না বান্ধুবি দের বললাম আমি একটা ডিম চপ নিয়ে আসি।

ফিরে এসে দেখলাম বান্ধুবিরা অনেকটা দূরে চলে গেছে আমার ব্যাগ এর পাশে ছিল একটি জুসের বোতল আর স্যান্ডউইচ যা আজ তানহা সবাইকে ট্রিট দিয়েছিল।

ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বোতল আর স্যান্ডউইচ হাতে নিতেই পুরুষ কন্ঠে কেউ বলল"এসব আমার।"

চোখ তুলে তাকালাম।খুব সিরিয়াস চেহেরায় তাকিয়ে আছে ছেলেটি, আমি কিছু বুঝতে না পেরে এখনো ওভাবে তাকিয়ে রইলাম।

সে আবার বলল"নাস্তা গুলো আমার।"

আমি নিজের হাতের দিকে চেয়ে ভাবলাম অসম্ভব! একটু আগেই তানহা আমায় দিয়েছিল এসব।মুখে কিছু না বলে এমন নাস্তা খোঁজা ছ্যাঁচড়া ছেলেটার সামনেই বোতল খুলে ঢক ঢক শব্দে জুস পান করে নিলাম, সাথে স্যান্ডউইচে ও এক কামড় বসালাম।

আধখাওয়া বাকিটুকু টেবিলে রেখে দ্রুত পায়ে হাটা দিলাম বন্ধুদের কাছে।

"তোরা আমার জন্য দাঁড়াস নি কেন? "

জাকিয়া বলল" ঘর থেকে ফোন এসেছে আজ নাকি পাত্র পক্ষ আমায় দেখতে আসবে। তাই দ্রুত উঠে পড়লাম।আর তাছাড়া তোর তো বেশি সময় লাগেনি।

সমবয়সী কাউকে পাত্র দেখতে আসবে এই বিষয়টা যেন হাজারগুন এক্সাইটেড ঐ ছ্যাঁচড়া ছেলের টপিকের চাইতে, তাই আমিও বেমালুম ভুলে গেলাম ওদের বলতে।

চার জন মিলে ভার্সিটি থেকে সোজা পার্লার গেলাম। জাকিয়ার সাথে সাথে আমরা ও হাল্কা পাতলা ট্রিটমেন্ট নিয়ে বের হলাম।

রিক্সায় উঠছিলাম ঠিক তখনই তানহা তড়িঘড়ি করে বলল "দোস্ত শোন তোর নাস্তা গুলো আমার ব্যাগে রয়ে গেছে।"

ব্যাগ থেকে বের করে হাতে ধরিয়ে দিলো,সেই জুস আর স্যান্ডউইচ।

হতভম্ব হয়ে আমি সেদিকেই তাকিয়ে রইলাম আর রিকশা চলছে।

:

:

:

প্রায় দেড়মাস হয়ে গেছে ইংরেজী ডিপার্টমেন্টের সামনে যাই নি আর।বিভিন্ন বাহানা দিয়ে শিলা দের সাথে ক্যাম্পাসের অন্য জায়গায় দেখা করতাম।

একদিন ভার্সিটির বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, উদযাপন চলছে পহেলা বৈশাখের একহাতে নোটপ্যাড ধরে রেখেছি মাথার উপর আর অন্য হাতে কোল্ড ড্রিংকস। হঠাৎ কেউ ছোঁ মেরে কোল্ড ড্রিংকস টা নিয়ে নিলো, পাশে ফিরেই আমি বিহ্বল মুখে তাকালাম।

ততোদিনে আমি তার নাম জেনে গিয়েছিলাম কারণে অকারণে "পিয়াস আহমেদ"।

কেউ কিছু বললাম না,সে আমার দিকে বিশেষভাবে চেয়ে চেয়ে পুরো বোতল খালি করে সামনে ফেলে দিয়ে চলে গেল।

মনে মনে হাসলাম " এই ছেলে আমার চেহেরা কীভাবে মনে রেখেছে?"

:

:

:

জৈষ্ঠের গরম, বাসের সীটে জায়গা রেখে নিচে নেমেছিলাম পানি আনতে ,উঠে দেখি আমার জায়গায় ছেলেটি বসে আছে আর ব্যাগের কোনো হদিস পেলাম না।বন্ধুর সাথে কথায় মগ্ন পিয়াস কে উদ্দেশ্য করে বললাম "অসভ্য,বেয়াদব। "

সে আমার দিকে তাকালো কিন্তু কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই পেছনের দিকে চলে গেলাম। বাস ছেড়ে দেওয়ার সময় একবার আমার দিকে চেয়ে সে নেমে গেল।তখনো আমি ভীষণ রেগে ছিলাম, আমার ক্লাসমেট জুলাইফা বলল"একা বসতে বিরক্ত লাগে তাই তোর ব্যাগটা পেছনে নিয়ে এলাম,রাগ করেছিস নাকি?

আমার কটমটে চোখমুখ তখনই শান্ত হলো।সবে চলন্ত বাসের বাইরে পিয়াস কে দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম।

গ্রীষ্ম পেরিয়ে বর্ষার আগমন ভেজা সাদা শার্টে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে বাসে উঠলো পিয়াস।বাঁ দিকে আমি আর ডান পাশের আরো দু সীট আগে বসেছে সে।

অবাক হলাম কিছুটা, আগে কখনো দেখিনি বাসে যেতে।হয়তো বুঝতে পেরেছিল তাকে দেখছিলাম, সেও মুখ কিছুটা বাঁ পাশে ফিরিয়ে আড়চোখে দেখেছিল।তবে চোখাচোখি হয়নি।

অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের মাঝামাঝি সময়, পড়ালেখার পাশাপাশি আরেকটা কাজ শুরু করেছিলাম তা হলো ধর্মীয় ইল্ম অর্জন। মায়ের সাথে প্রায় খালার বাড়ি যেতাম, তাদের বিল্ডিং এর নীচ তলায় প্রতি শুক্রবার মহিলা মাহফিলের আয়োজন হতো।বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনী এবং ওলামায়ে কারাম দের বাণীতে বিভিন্ন সাহাবার কাহিনী শুনতাম,জিকির আসকার মিলিয়ে ঐ দেড় ঘন্টা যেন আস্তে আস্তে আমার জীবনে গাঢ় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল।ফরজের সাথে সুন্নাত ও পালন করা শুরু করলাম। পূর্বে কখনো পালন করিনি তা না তবে এখন আর হেলাফেলা নয়,গুরুত্বের সাথে শুরু করলাম।

কারণ ইল্মের চাইতে যে আমল বড়ো।

:

:

:

:

এরই মধ্যে বিয়ের দিন এসে পড়লো শিলার। সবাই বেশ তামঝাম করে গেলেও আমি গিয়েছিলাম গায়ে আবায়া চাপিয়ে।একেবারে সিম্পলভাবে তবে মাসব্যাপী বন্ধুদের সাথে জমজমাট প্ল্যানিং এ আমিও শামিল ছিলাম।

বিয়েতে আবার দেখা হয়ে গেল পিয়াস এর সাথে।আদৌ সে আমার নাম জানে কি না সন্দেহ ছিল।

কী জ্বালা সিঁড়িতে উপরে নিচে মুখোমুখি হয়ে গেছি।দুজনই একই দিক বদলাচ্ছি বারবার,যার ফলে কেউ ই এগিয়ে যেতে পারছিনা।

অবশেষে আমি থেমে গিয়ে রাস্তা দিলাম তাকে।সে উপরে উঠতে উঠতে মুচকি হাসলো।

:

:

:

থার্ড ইয়ারে উঠে গেছি দেখতে দেখতেই। ভার্সিটিতে চলছে বাৎসরিক অনুষ্ঠান আর সবাই গেলেও যাই নি আমি।গান- বাজনা এসব আর আমাকে টানে না,ছয়মাস আগেই মোবাইলের প্লে লিস্ট ডিলিট করেছি।

যে সুর গুলো একসময় প্রশান্তি দিতো তা এখন কেবল অস্থিরতা বাড়ায়।আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল আমার মধ্যে, সুন্নাত এবং নফল পালন করতেও বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম।

রোজ আকাশ দেখা, বৃষ্টি ছুঁয়ে দোয়া পড়া,আযানের উত্তর দেওয়া,ইকামত অব্দি দোয়া করা, সবার সাথে ভালো আচরণ করা ইত্যাদি ।ছোট বড়ো সবকিছুতেই আল্লাহর সাহায্য চাওয়া।ছোট বলতে একেবারে ছোট, এমনকি মোবাইল টা খুঁজে না পেলেও আল্লাহ কে বলতাম।ধীরে ধীরে প্রশান্তির ছায়ায় যেন ডুব দিচ্ছিলাম।

ভার্সিটিতে বিভিন্ন ভাবে পিয়াস কে নজরে পড়তো। সে বেশ সোশ্যাল এক্টিভিটি করতো।অনেক সময় ক্লাসে আসতো নোটিশ নিয়ে।তবে কখনো ব্যাক্তিগত ভাবে কথা হয়নি আমাদের।

:

:

:

বন্ধের দিন চলছিল। ফুফির বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম।চারতলায় থাকে তারা। নাস্তা করছিলাম হঠাৎ নিচের রাস্তায় হৈচৈ শুনতে পেয়ে বেলকনিতে দৌড়ে গেলাম।

রাইসা বলল "মাহা আপু, এদের ঝগড়া নিত্য দিনের, দেখার মতো কিছু নেই।লো ক্লাস লোকজন। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়াঝাটি করে রোজ।

আমি কিছুক্ষণ চেয়ে বুঝতে পারলাম সামনের গলিতে আরো দুটো বিল্ডিং এর পর কিছু সেমি পাকা ঘর মিলিয়ে একটি কোলোনি আছে, সেখানেরই বাসিন্দা এরা।

ঝগড়ায় লিপ্ত এক মহিলা আর যুবক কে থামাতে অনেকেই আসলেও তারা থামছিল না।আমি চিকেন রোল চিবোতে চিবোতে উপর থেকে এই দৃশ্য দেখছিলাম। নজরে এলো এক পরিচিত মুখ। অবিশ্বাস্য লাগলো বলে আরেকটু ঝুঁকে দেখলাম। কিন্তু সত্যিই আমার চোখ ভুল দেখেনি।পিয়াস ঝগড়ায় লিপ্ত যুবকটিকে পেছন থেকে জড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।ইতিমধ্যে অকথ্য ভাষার গালিগালাজে আমার কান পেকে গিয়েছে।

পাশে থাকা ফুফিদের কাজের মেয়ে মুনিরা কে দেখলাম বেশ মজা নিয়ে ঘটনা গুলো দেখছিল।একটু চিৎকার করে বলল

" ঐ মানিক্কা বাড়িত যা।"

সাথে সাথে প্রশ্ন করলাম তুমি চেনো ওদের?

"হ চিনি তো। ঐ কালা পোলাডা মানিক আর বেডির নাম সরুতি বানু।"

সে আরো অনেক কিছুই বলছিল কিন্তু আমি ওসবে মনোযোগ দিতে না পেরে হুট করেই জিজ্ঞেস করলাম "আর ঐ ছেলেটা কে? যে মানিক কে টানছে।"

"হের বড়ো ভাই রত্ন "

আমি দ্বিতীয় বার জিজ্ঞেস করলাম "রত্ন?"

"হুম আফা রত্ন।"

সে কোথায় থাকে? কী করে জানো?"

আমার প্রশ্নে মুনিরা একটু মুচকি হেসে তাকাল,তার হয়তো বুঝতে কষ্ট হয়নি আমি পিয়াসের প্রতি বেশি আগ্রহী।

"রত্ন ভাই দেখতে একটু ভালাই তাই না আফা? মনেই অয়না সে এই কলোনি তে তাহে।"

আমি ওসব কথায় বিরক্ত হয়ে আবার প্রশ্ন করলাম"এই ছেলে এখানে থাকে? গালিগালাজ ও করে?"

রাইসা ভেতর থেকে এসে বলল "মাহা আপু তুমি এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছো?মুনিরা কে দেখল " তোমাকে মা ডাকছে। "

মুনিরা তড়িঘড়ি করে চলে যেতেই আমি অবাক হয়ে নিচেই চেয়ে রইলাম।কেন জানিনা আমার মনটা হঠাৎ ই যেন বসে গেল।

চাপা একটা খারাপ লাগছে। কিছুতেই হাসতে, কথা বলতে মন চাইছে না। এসেছিলাম দুই দিনের জন্য কিন্তু বলে ফেললাম "ফুফি আমার কিছু কাজ বাকি আজ চলে যাই। অন্যসময় আসবো। "

কিন্তু মা-বাবার আদেশ দু তিন দিন পরই যেন ফিরি।

আর কি,ব্যাস থেকে গেলাম। এরপর থেকে সকাল সন্ধ্যা যখনই মনে পড়তো, আমি বারান্দায় গিয়ে উঁকি দিতাম কোলোনিতে।

সত্যিই দুই একবার পিয়াস কে দেখেছিলাম। এক অজানা খারাপ লাগায় ভরে যেত মন টা। আমার মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সব রং যেন কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে।

আমি এতোদিন পর বাবার স্পেশাল ভাবনাটা বুঝতে পেরেছি অর্থাৎ বাবা মুখ ফুঁটে কখনো বলেনি, কেন সে পাবলিক এ পড়াতে চাইনা। আমি আর আমার বড় বোন তাই ওটার নাম দিয়েছিলাম বাবার" স্পেশাল ভাবনা " কারণ সবাই তো আর এসব ভাবেনা।

দিন গিয়ে মাসে গড়াচ্ছে,আমার একটায় লক্ষ্য ছিল, আমি যে পথে আছি সেখানে এই সব আবেগ খাটেনা।তাছাড়া ও পিয়াসের কথা ভাবলেই বাবার চেহেরা মনে পড়ে।ঘর থেকে বিয়ের চাপ আসছিল প্রচুর, একে একে সব বান্ধুবীদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে কিন্তু একদিন হঠাৎ সে এমনভাবে সামনে এলো,,,

বিজ্ঞাপন