পাত্রীর বাড়িতে এসেছি কিছুক্ষণ হলো। ড্রইং রুমে আমরা সবাই বসা। বিয়ের জন্য উতলা মামা এখানে এসেই চুপ। লাজুক লাজুক মুখ করে বসে আছেন। একটা রুমাল দিয়ে মুখও ঢাকছেন মাঝে মাঝে। তার কান্ড দেখে আমার মজাই লাগছে।
একটুপর পাত্রীকে আনা হলো। লাল টুকটুকে শাড়ি পরে এক মহিলা এলেন সামনে। মুখটা হাসি-হাসি। তাকে মামার ঠিক সামনের সোফায় বসিয়ে দেয়া হলো। মেয়ের চেহারা মাশাআল্লাহ চমৎকার সুন্দর, আমার খুব ভালো লাগলো তাকে। মামাকে বললাম,
-- "মামী কিন্তু খুব সুন্দরী!"
মামা আড়চোখে দেখলেন, কিন্তু সরাসরি তাকালেন না। বোধ হয় লজ্জা-টজ্জা পাচ্ছেন। মেয়ের বাবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কল আসায় উঠতে হলো। এইসময় বড় ভাইয়া আমাকে ফিসফিস করে বললো,
-- "এই নূপুর, মেয়েটাকে দেখেছিস? কেমন ভাবে হাসছে না?"
-- "কেমন ভাবে?"
-- "কেমন অদ্ভুত ভাবে। অ্যাবনরমাল মনে হচ্ছে। ভালো করে খেয়াল করে দেখ!"
আমি তাকালাম। মেয়েটি আসলেই হাসছে। লাজুক হাসি নয়। একটু অন্যরকম হাসি। আমার বুক ধ্বক করে উঠলো। ভাইয়ার ইঙ্গিত বুঝতে বাকি নেই। এই মেয়েই আবার পাগল নয় তো? বাবার মুখটা গম্ভীর। তিনিও কি একই কথা ভাবছেন? বড় ভাইয়া ততোক্ষণে জায়গা বদল করে মামার পাশে গিয়ে বসেছে। মামাকে কিছু একটা বলতেই তিনি দিলেন এক ধমক!
মেয়ের বাবা ফিরে এলেন। আরও কয়েকজন মুরব্বীও হাজির হলেন। থরে থরে সাজানো নাস্তা নিয়ে হাজির হলেন একজন পৌঢ় নারী। বোধ হয় মেয়ের মা-খালা কেউ একজন। আমাদের সামনে ট্রে রেখে খেতে বললেন। বাবা মিষ্টি খাচ্ছেন। ভাইয়াও ফল নিলেন। মামা লজ্জায় কিছু মুখে নিতে পারছেন না। আর আমি ভয়ে! পৌঢ় মহিলার অনুরোধে শেষমেষ চানাচুর হাতে নিলাম। একজন মুরব্বী বললেন,
-- "মেয়ে কি আপনাদের পছন্দ হয়েছে?"
মামার দিকে প্রশ্নাত্মক চোখে চাইলেন বাবা। মামা লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। একটু হাসলোও। বুঝলাম, মেয়ে খুব পছন্দ হয়েছে। এবার মেয়েকে জিজ্ঞেস করার পালা। তাকে বলতেই সে উঁচু গলায় বললো,
-- "হ্যাঁ, চাচা। খুব পছন্দ হয়েছে। এই ছেলেকেই আমি বিয়ে করবো।"
বিয়ে বিষয়ে এমন চটপট জবাব যে কেউ দিতে পারে আমি জানতাম না। অবাক হলাম। মেয়ে হাসিহাসি মুখ করে মামার দিকে তাকিয়ে আছে। আরেকজন মুরব্বী তাকে বললেন,
-- "ঠিক আছে, মা। তুমি ঘরে যাও।"
-- "না। আমি যাবো না।"
একগুঁয়ে উত্তর। পৌঢ় নারী এগিয়ে গেলেন। একটু রাগী গলায় বললেন,
-- "ও-কি কথা লায়লা? চলো, ঘরে চলো।"
-- "আমি যাবো না। আমি বিয়ে করবো!"
আমাদের সন্দেহ ফলে যাচ্ছে। ভাব দেখেই বুঝতে পারছি মেয়ে স্বাভাবিক নয়। মামা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন। বাবা ইতস্তত করে বললেন,
-- "ওর কি কোনো সমস্যা আছে?"
-- "সমস্যা? আরে না, না। কীসের সমস্যা থাকবে? ও একটু এরকমই।"
-- "লায়লা মা, ঘরে চলো।"
শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা! স্পষ্টই বুঝলাম। মেয়ে ঘনঘন মাথা নাড়াচ্ছে সে এখান থেকে যাবে না। মহিলাও জেদ করছেন। বড় ভাইয়া আর পারলেন না। বললো,
-- "আমার মনে হয় উনি মানসিক ভারসাম্যহীন। অদ্ভুত আচরণ করছেন।"
মেয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো। ভাইয়ার দিকে আঙুল তাক করে বললো,
-- "এ্যাই! তুই কি বললি? আমি মানসিক ভারসাম্যহীন? মানে কি আমি পাগল?"
সরাসরি 'তুই' বলে ফেললেন। এখনও কি কিছু প্রমাণের প্রয়োজন আছে? মেয়েকে বাহু ধরে টানছেন মহিলাটি। ভাইয়া মামার দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললো,
-- "আমি বলেছিলাম, বলেছিলাম। এখানে একটা ঘাপলা আছে। শুনলে না তো!"
মুরব্বিরা কিছু বলতে চাইছেন। অন্তঃপুর থেকে আরও কয়েকজন এসে মেয়েকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মেয়ে তখনও তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে,
-- "তুই পাগল! তোর চৌদ্দ-গুষ্টি পাগল! আমি বিয়ে করতে চেয়েছি বলে পাগল হয়েছি না-কি? বেশ করেছি। শোন, আমি ওকেও বিয়ে করবো। তোকেও বিয়ে করবো। ওই বুড়ো হাবড়াটাকেও বিয়ে করবো।"
কি সাংঘাতিক কথা! ভয়ে আমার মুখ শুকিয়ে গেল। বুড়ো হাবড়া বলতে সে কাকে ইঙ্গিত করেছে বুঝতে পেরে বাবা কেশে উঠলো জোড়ে। মামা হতভম্ব। ভাইয়া সোফা থেকে উঠে দাড়িয়ে বললো,
-- "এরপরেও তোমরা বসে থাকবে? এই নূপুর ওঠ। চল তাড়াতাড়ি। ওরা বিয়ে করুক পাগলটাকে। আমরা যাই।"
আমি দাড়ালাম। ভাইয়া উলটো ঘুরে এগোবে তখনই একটা কান্ড ঘটলো। মেয়েটা ছুটে এসে ভাইয়াকে জাপটে ধরলো। ওর গলা চেপে ধরে চিৎকার শুরু করলো,
-- "তুই কই যাস? তোরে আমি বিয়া করবো। তুই আমারে পাগল বললি ক্যান? তোরে তো!"
হ-য-ব-র-ল অবস্থা। ভাইয়া নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছেন। বিস্মিত মামা মেয়েটিকে বলছেন,
-- "ওকে ছাড়ুন। ও তো আপনার অনেক ছোট। কি করছেন?"
-- "এ্যাই ছোড়া চুপ! তুই চেঁচাচ্ছিস ক্যান? বিয়ে করবি? ও হ্যাঁ, তুই তো বিয়ে করতেই আসছিস। শোন, চিন্তা করিস না। তোরেও বিয়ে করবো আমি। আগে এরে করে নেই। কতবড় সাহস আমারে পাগল বলে!"
মেয়েটিকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। কিন্তু ছাড়ানো যাচ্ছে না। কে যেন বলেছিল, পাগলের গায়ে অসুরের শক্তি? কথাটা বোধ হয় ভুল বলে নি। এরমধ্যে বাবা কিছু একটা বলায় তাকে ধমক দিলো মেয়েটি,
-- "বুইড়া ব্যাটা চিল্লাবি না। আমি আজকে সব্বাইকে বিয়া করবো।"
পুরো বাড়ি শুদ্ধ হৈ-চৈ পড়ে গেল। পাগল সামলাতে খুব হিমশিম খেতে হলো আমাদের। বহু কষ্টে ভাইয়ার থেকে মেয়েটাকে সরানো হলেও লাভ হলো না। সে জাপটে মামার ঘাড় চেপে ধরলো। ভাইয়ার দম আটকে এসেছিল। ও কাশতে কাশতে গলা ধরে বসে পড়লো সোফায়। তারপর ছুটে বেরিয়ে গেল। কিন্তু মামা ততক্ষণে আটকা পড়েছেন। মেয়ে কিছুতেই তাকে ছাড়ছে না। বিয়ে সে করবেই!
অবস্থা বেগতিক। শুধু বেগতিক না, মারাত্মক বেগতিক। আমি বোকার মতো দাড়িয়ে আছি। একফাঁকে সুযোগ পেয়ে বাবাকে বললাম
-- "আপনি বাঁচলে বাপের নাম। চলো বাবা, চলে যাই।"
-- " তোর মামাকে ফেলে চলে যাবো?"
-- "হ্যাঁ। চলো। পাগলটা যদি আবার তোমাকে ধরে?"
-- "আচ্ছা। আচ্ছা। চল।"
আমরা চুপ করে সটকে পড়লাম। বাড়ির সামনেই আমাদের গাড়ি রাখা ছিল। ওটাতে চেপে বসলাম। ভাইয়াও ওখানেই। বাড়িটার সামনের ল্যাম্প পোস্ট আছে। কিন্তু কোনো বাতি নেই। অন্ধকারেই গাড়ি থামিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। মামা আসলেই চলে যাবো।
মিনিট ত্রিশেক পর বাড়ির গেট দিয়ে দৌড়ে বেরোতে দেখা গেল মামাকে। উনি দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে ছুটছিলেন, আমাদের দেখেনও নি। গাড়ির কাঁচ নামিয়ে বাবা ডাকলেন তাকে। মামা ইউটার্ন নিয়ে ঘুরে এলেন গাড়ির কাছে। আমি পেছনের দরজা খুলে দিতেই হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকে ভাইয়ার উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়লেন,
-- "তাড়াতাড়ি গাড়ি স্টার্ট দে, নাহিদ। এই এলাকা থেকে তাড়াতাড়ি বের হ!"
ভাইয়া আদেশ পালন করলো। গাড়ি চলতে শুরু করলে ফ্রন্ট সিট থেকে বাবা পেছনে ফিরে মামার দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিলেন। মামা কিছু না বলে বোতলটা হাতে নিয়ে ঢকঢক করে পানি খেলেন। তার সারা শরীর ঘেমে একাকার! মুখের কয়েক জায়গায় নখের আঁচড় দেখা যাচ্ছে। বিধ্বস্থ চেহারা। গাড়ির ভেতরে থাকা ফাস্ট এইড বক্সটা নিয়ে মামার শুশ্রূষা করায় মন দিলাম। কাটার উপর স্যাভলন ক্রিম লাগাচ্ছি আর ছোট মামা আহাজারি করছেন,
-- "নূপুর রে, তোর মামা আর বাঁচবে না রে! ওই রাlক্ষুlসী মহিলা আমার জান নিয়ে নিছে। মনে হচ্ছে বিষ মেশানো নখ দিয়ে একেকটা আঁচড় লাগিয়েছে। আল্লাহ্ গো, রহমত করো!"
অনেকটা সময় নিয়ে ধীরে-সুস্থে ক্ষতে মলম লাগালাম। ওয়ান টাইম টেপ লাগিয়ে দিলাম তার উপর। কাজ শেষ হতেই সিটে হেলান দিয়ে মামা ক্লান্ত গলায় বললেন,
-- "এই আমি সৈয়দ লুৎফর রহমান শপথ করিতেছি যে ইহজনমে আর বিবাহ-মুখী হইবো না! কদাপি নহে!"
আচ্ছা, পাত্রী দেখতে গিয়ে এমন ভয়াবহ ঘটনার শিকার হয়েছিল কি কেউ?
____
অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। ভাইয়াদের বিয়ে হয়েছে, বৌ-বাচ্চা আছে। আমারও বিয়ে হয়ে গেছে। এখন শ্বশুড় বাড়িতে থাকি। মাঝে মাঝে বাড়ি যাই। বাবা-মায়ের চুলে পাক ধরেছে। বয়স হয়েছে সবার। মামারও বয়স হয়েছে। কিন্তু এখনো বিয়ে-থা করেন নি। করবেন সেই সম্ভবনাও ক্ষীণ!
সেই ঘটনার পর আজ অবধি মামার মুখে 'বিয়ে' শব্দটা উচ্চারিত হতে শুনে নি কেউ। বোধ করি পাত্রী দেখার সেই বিভৎস স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেন নি মামা!