হঠাৎ করে ছোট-মামার মাথায় বিয়ের ভুত চাপলো। ছোট মামা বরাবরেই হুজুগে মাতাল মানুষ। কেউ একবার মাথায় কিছু ঢুকিয়ে দিলে সেটা নিয়েই মত্ত থাকেন। বাড়িতে তখন বড় ভাইয়ার বিয়ের কথা চলছে। এরমধ্যেই মামা হঠাৎ ঘোষণা দিলেন, ' তিনি বিয়ে করবেন। পাকা কথা না হওয়া অবধি জল-স্পর্শ করবেন না!' কি মারাত্মক কথা!
আমার ছোট মামা বড় অদ্ভুত জাতের। সাত বছর বয়সে তার বাবা মানে আমার নানাজান মারা যান। নানী তো আরও আগেই গত হয়েছেন। তাই বাবা-মার অবর্তমানে ছোট মামার দায়িত্ব পড়লো আমার বড় খালার উপর। কিন্তু খালার কড়া নিয়মকানুনের তোপে পড়ে ও-বাড়িতে মামা ছয় মাসও টিকলেন না। তল্পিতল্পা গুটিয়ে সুরসুর করে ট্রান্সফার হয়ে এলেন আমাদের বাড়িতে। সেই থেকে মামা আমাদের সঙ্গে থাকেন। আমাদের চার ভাইবোনের তিনি আদর্শ। আমরা যেমন তাকে ভীষণ ভালোবাসি, তেমনই তিনিও।
মামার সাথে বাড়ির সবার মধুর সম্পর্ক। শুধু একজন বাদে। এই ব্যক্তিটি আমার শ্রদ্ধেয় পিতা। দোষ অবশ্য বাবার নয়। দোষ মামারও নয়। মূল সমস্যা হলো মামার উদ্ভট কাজকর্ম আর চিন্তা। ছোট বেলা থেকেই মামা একটু পাগলাটে ধাঁচের। মুখ ফসকে যা বেরিয়েছে তাই হবে। কথার নড়চড় করবে না। কারমাইকেল কলেজে অনার্স পড়তেন। ফাইনাল পরীক্ষার আগের দিন এসে হঠাৎ তার মনে হলো, 'নাহ্, এই পরীক্ষা দিয়ে কোনো লাভ নেই তার। দেশে পাশ করা বেকারদের সংখ্যা বেশি। তারচে' না পাশ করে বেকার থাকা ভালো। অতএব মামা আর পরীক্ষা দিলেন না। লেখাপড়ার সাথে সম্পর্কের ইতি তার সেখানেই।
এরপর তাকে চাকরি-বাকরি করতে বলা হলো। তিনি করলেন না। গাদা গাদা বই এনে ঘর ভর্তি করলেন। ঘরে বসে শুরু হলো তার সাহিত্য চর্চা। বই পড়ে পড়ে মামার পাগলামি বাড়লো আরও একধাপ। নানা জাতের বই পড়েন, আর নানা রকমের কান্ড করেন। একদিন করলেন কি জানেন? ব্লাড ব্যাংক থেকে এক ব্যাগ রlক্ত কিনে এনে আমার গোলাপ গাছের গোড়ায় ঢালা শুরু করলেন। বলে কি-না এক্সপেরিমেন্ট করছি! বাড়ি শুদ্ধ সবাই আশ্চর্য হয়ে গেল।
আরেকদিন ঘটালেন আরও একটা ভয়াবহ কান্ড। কোত্থেকে একটা বিষধর সাপ নিয়ে এসে কাঠের বাক্সে করে বাগানে রেখেছিলেন। এটাও বোধ হয় এক্সপেরিমেন্টের জন্যই। আমার মা তা জানে না। উনি সকালে গাছে পানি ঢালতে বাগানে গিয়ে বাক্স দেখলেন। কৌতূহলী হয়ে খুললেন এবং সাপ দেখে চিৎকার করে লুটিয়ে পড়লেন!
বাড়ির কেউ এই ঘটনা জানলো না। অনেকক্ষণ পর মার খোঁজ করতে করতে কাজের খালা মাকে বাগান থেকে উদ্ধার করলেন। তিনি তখনো সাপের বিষয়ে জানেন না। আমরাও জানি না। মাকে অচেতন অবস্থায় তার ঘরে শোয়ানো হলো। তার প্রবল জ্বর এসেছে। জ্বরের ঘোরে হাবিজাবি বকছে।
ঠিক বিকেলের দিকে ছোট ভাইয়ার ঘর থেকে চিৎকার শোনা গেল। ছুটে গিয়ে দেখি, ওর পড়ার টেবিলের উপরে একটা সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে বসা। কালো কুচকুচে সেই সাপটা ফণা তুলে আছে। কি ভয়াবহ দৃশ্য!
সেই নিয়ে বাড়িতে খুব হাঙ্গামা হলো। হাউমাউ, চিৎকার-চেঁচামেচি। বাবা রেগে-মেগে ফায়ার! পারলে বাড়ি দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেন মামার। ভাইয়ারা ওঝা ডাকতে ব্যস্ত। সাপুড়ে খুঁজছেন। আমরা সাপের আতঙ্কে অস্থির! অথচ কাজটা করে মামা একেবারই নির্বিকার!
আমাদের হৈ-চৈ অবস্থা দেখে বড়ই বিরক্ত হয়েছেন এমন ভঙ্গিতে বললেন,
-- "ইস! একটা সাপ দেখে অতো লাফালাফির কি আছে? ওটাকে মারবার জন্যই বা অতো তাড়া কেন? তোমরা মানুষেরা পৃথিবীতে বাঁচতে পারো, আর ওরা পারে না?"
মামা একটু অদ্ভুত বলে যে তিনি লোক খারাপ তা কিন্তু নয়। মানুষ হিসেবে অসাধারন একজন। কোমল হৃদয়ের। তার বয়স খুব বেশি নয়। খুব বেশি হলে ত্রিশ-বত্রিশ হবে। বহু আগে থেকেই মা তাকে বলেছেন বিয়ে করতে। পাত্রী দেখবেন, সম্বন্ধ খুঁজবেন--কিন্তু মামা তখন কিছুতেই রাজি হননি। কেন, সেটা তিনিই জানেন। এখন আবার কেন বিয়ের জন্য এতো উতলা হয়ে পড়লেন সেটাও তিনিই জানেন।
ছোট ভাইয়ের সুমতি দেখে মা খুশি হলেন। একটু বিপাকেও পড়লেন। ঘটক সাহেবকে বলা আছে, তার বড় পুত্রের জন্য পাত্রী খুঁজতে। এখন আবার মতবদল হয়ে ছোট ভাইয়ের জন্য পাত্রী অনুসন্ধান করা- ব্যাপারটা মায়ের কাছে খুব অস্বস্তির মনে হচ্ছিল। অপরদিকে মামার কথা শুনে বাবা খুবই রেগে গেলেন। তার ধারণা, মামার আট-দশটা উদ্ভট কাজের মতো বিয়েও এরকম হবে। তিনি মোটেই সিরিয়াস নন। বিয়ে তার কাছে ছেলেখেলা। আর, মামা কোনো চাকরি-বাকরিও করেন না যে তার জন্য সহজেই পাত্রী পাওয়া যাবে। এই নিয়ে বাবার সাথে মামার ছোটখাটো একটা গৃহযুদ্ধও লেগে গেল! বাড়ির সবাই ভাগ হয়ে গেল দুই ভাগে। বড় দুই ভাইয়া, মা গেলেন মামার পক্ষে। ছোট ভাইয়া, বাবা আর বাড়ির পুরোনো চাকর-বাকরেরা রইলো আরেক পক্ষে। মাঝখান থেকে আমি পড়লাম মাইনকার চিপায়। না পারি এদিকে যেতে, না ওদিকে যেতে। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার কাঁটা তারের সীমান্ত হয়ে গেলাম যেন!
যাইহোক,অবশেষে মামার জয় হলো। বড় ভাইয়ার বিয়ে স্থগিত ঘোষিত হলো। আমরা কোমড় বেঁধে নামলাম মামার বিয়ের পাত্রী খুঁজতে। ঘটক সাহেব রোজই আসছেন-যাচ্ছেন। কিন্তু ভালো মেয়ের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
দস্তুরমত অনুসন্ধানের পর একটি পাত্রীর খোঁজ মিললো। বাড়িতে গিয়ে মেয়ে দেখার আগে আমরা আশপাশের খোঁজ-খবর নিলাম। মেয়ের আত্মীয়-স্বজনের ব্যাপারেও বিস্তর জানাশোনা হলো। তারপর একদিন শুভক্ষণ দেখে আমরা কনে দেখতে গেলাম। আমরা মানে- আমি, বড় ভাইয়া, বাবা, আর মামা।
মেয়েরা এলাকার বেশ প্রভাবশালী। এলাকায় এসে বাড়ি খুঁজে পাওয়া মোটেও সমস্যা হওয়ার কথা না। একজন লোকের কাছে ওদের বাড়ির সঠিক ঠিকানা শুনতে চাইলেন বাবা। লোকটি ঠিকানা বলে একটু গম্ভীর স্বরে বললেন,
-- "ওই বাড়িত যাইবেন ক্যান?"
বাবা কিছু বলবেন তার আগেই আমার পাশে বসে থাকা ছোট মামা জবাব দিলো,
-- "বিয়ের জন্য। ওদের মেয়ের সাথে আমার বিয়ে।"
কথার মাঝখানে বাঁ হাত ঢুকিয়ে দেয়ায় বেশ বিরক্ত হলেন বাবা। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন মামার দিকে। লোকটা হঠাৎ বললেন,
-- "ওই বাড়ির কোন মেয়ে? বড়টা, না ছোটটা?"
-- "বাড়িতে দুই মেয়ে আছে না-কি? আমরা তো জানি একজনই।"
এবার ভাইয়া কথা বললো। লোকটার গম্ভীর মুখভঙ্গির পরিবর্তন হলো না। বললেন,
-- "ওই বাড়ির দুই মেয়ে। কিন্তু ওরা সকলরে সেইটা কয় না। বড়টায় পাগল তো, তাই লুকায় রাখে আর-কি। যাউগ গা। যাইতেছেন যান।"
এই বলে লোকটি প্রস্থান করলো। আমরা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ একজন আরেকজনের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। মেয়ের কোনো বোন পাগল সে সম্বন্ধে আমরা সত্যিই জানতাম না। কিন্তু বিষয়টা মামাকে মোটেও বিচলিত করলো না। তিনি নির্বিকার বসে। বড় ভাইয়া বাবাকে বললেন,
-- "মেয়ের পাগল বোন আছে সেটা ওরা বলে নি তোমাকে?"
-- "ঘটক তো কিছু বলে নি।"
বাবা গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়লেন। আমি চুপ করে বসে আছি। এসব বড়দের আলাপে আমার কথা বলা শোভা পায় না। আমি নেহাৎই ছোট। স্কুলের গণ্ডিই পেরোই নি এখনো। ভাইয়া আবারও বললো,
-- "এখন কি করবো?"
-- "কি করবো মানে? মেয়ে দেখতে এতদূর এসে না দেখেই চলে যাবো না-কি? এতটাকার ফলমূল, মিষ্টি কিনে নষ্ট করবো?"
ছোট মামা ধমকালেন তাকে। ভাইয়া তাতে পাত্তা দিলো না। বললো,
-- "মিষ্টির চিন্তা বাদ দাও তুমি। আমার মন বলছে এখানে একটা ঘাপলা আছে। না হলে মেয়ের বোন আছে সেটা গোপন রাখবে কেন? সে বোন না-কি আবার পাগল!"
-- "আমারও তাই মনে হচ্ছে। এখন বাড়ি যাওয়াই বোধ হয় ভালো।"
বাবার উত্তর শুনে খুব রাগ করলেন ছোট মামা। রেগে গিয়ে বললেন,
-- "জানি তো। এখন তো বাড়িতেই চলে যেতে চাইবে তোমরা। বিয়েটা তো আমার, সেজন্যই। আমাকে কি তোমরা সহ্য করতে পারো? যে আমার ভালো-মন্দ দেখবে?"
-- "বাজে বকবে না, লুৎফর। তোমাকে সহ্য করতে পারি না মানে কি?"
-- "মানে কি বোঝেন না আপনি? এখন আমাকে ভেঙে ভেঙে বুঝাতে হবে?"
গাড়িতে বসেই বাবা আর ছোট মামার ঝগড়া বেঁধে গেল। তাদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের জোড়ে গাড়ির ভেতরে বদ্ধ পরিবেশ আরও উষ্ণ হয়ে উঠলো। একপর্যায়ে আমি হাঁসফাঁস করে বড় ভাইয়াকে বললাম,
-- "ওদের থামাও না, ভাইয়া?"
শেষ পর্যন্ত ভাইয়া আর আমার মধ্যস্থতায় তাদের ঝগড়ায় বাগড়া পড়লো। মিটমাট করে দেয়া হলো। কিন্তু ছোট মামার এক কথা__' মেয়ে না দেখে বাড়ি যাবো না!' মামাকে ঠাণ্ডা করতে আমরাও তার পক্ষে সায় দিলাম এবার। অগত্যা বাবাও রাজি হলেন।
আমরা মেয়ের বাড়ির দিকে এগোলাম।