ভুল ঠিকানায় পৌঁছানো খাম

লেখকঃ আবরারুল হক মনির

প্রকাশকালঃ আগস্ট ১৪, ২০২৬

আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প

ইবতেশামের জীবনের অকাট্য দর্শন একটাই—মানুষ নামক বিরক্তিকর প্রাণীটির কাছ থেকে অন্তত তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখাই মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মঙ্গলজনক।

পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্স সফটওয়্যার ডেভেলপার ইবতেশাম স্বভাবগতভাবেই একজন নিখুঁত মানববিদ্বেষী। মিরপুরের সাততলা ভবনের থ্রি-বি ফ্ল্যাটটি তার দুর্ভেদ্য দুর্গ। এখানে কারও প্রবেশাধিকার নেই। লিফটে সে কারও সঙ্গে সৌজন্যমূলক হাসিবিনিময় করে না, দারোয়ানকে বকশিশ দেয় না, এমনকি পাশের ফ্ল্যাটের কেউ বিপদে পড়লেও তার দরজার ছিটকিনি নড়ে না। গোটা ভবনের মানুষ জানে, থ্রি-বি-এর লোকটা একটা আস্ত যান্ত্রিক রোবট।

শীতের এক পড়ন্ত বিকেল। কফি হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজের মনেই বিরক্ত হচ্ছিল ইবতেশাম। হঠাৎ দরজার কলিংবেল বেজে উঠল।

আবরারুল হক মনির এর লেখা অনুগল্প ভুল ঠিকানায় পৌঁছানো খাম এর ইমেজ

অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলতেই সে দেখল, ভবনের দারোয়ান কাসেম মিয়া কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা উজ্জ্বল হলুদ রঙের খাম।

"কী চাই?" ইবতেশামের গলাটা যথারীতি কাঠখোট্টা।

"স্যার, এই খামটা আপনের নামে আইছে। পাঁচতলার ফাইয়াজ নামের পিচ্চিটা দিয়া গেল।"

ইবতেশাম ভ্রু কুঁচকে খামটা হাতে নিল। খামের ওপর গোটা গোটা কাঁচা হাতের লেখায় লেখা—*"পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষটার জন্য, ফ্ল্যাট থ্রি-বি।"*

কাসেম মিয়ার মুখের ওপর ধড়াস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল ইবতেশাম। সে নিশ্চিত, এটা কারও ফাজলামি। কেউ হয়তো তাকে ব্যঙ্গ করার জন্যই এমন সস্তা রসিকতা করেছে।

সোফায় বসে খামটা ছিঁড়ল সে। ভেতরে কোনো চিঠি নেই। সাধারণ আর্ট পেপার ভাঁজ করে বানানো একটা কার্ড। কার্ডের ওপর আঠা দিয়ে ম্যাকারনি আর গ্লিটার লাগিয়ে একটা অদ্ভুতদর্শন পাখির ছবি আঁকা। ভেতরে পেন্সিল দিয়ে লেখা গোটা কয়েক লাইন:

*"প্রিয় ভালো আঙ্কেল,

আমি ফাইয়াজ। আপনি হয়তো আমাকে চেনেন না। কিন্তু আমি জানি আপনি অনেক ভালো। গত সপ্তাহে আমার পোষা টিয়া পাখিটা খাঁচা থেকে উড়ে গিয়েছিল। আমি সারাদিন অনেক কেঁদেছি। কিন্তু গতকাল আমি দেখেছি, আমার পাখিটা আপনার বারান্দায় বসে আপনার দেওয়া বিস্কুটের গুঁড়ো খাচ্ছে। আপনি প্রতিদিন বারান্দায় পাখিদের জন্য বিস্কুট আর চাল ছিটিয়ে রাখেন। আপনার জন্যই আমার পাখিটা না খেয়ে মারা যায়নি। পরে আমি গিয়ে ওটাকে ধরে এনেছি। আমার আম্মু বলেছে, যারা পাখিদের ভালোবাসে, তারা নাকি সুপারহিরো। আপনি আমার সুপারহিরো। থ্যাংক ইউ।"*

চিঠিটা পড়া শেষ করে ইবতেশামের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে বারান্দায় গিয়ে মেঝের দিকে তাকাল।

পুরো বারান্দার মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে টোস্ট বিস্কুটের গুঁড়ো আর চিপসের টুকরো। ইবতেশাম প্রতিদিন বিকেলে এখানে দাঁড়িয়ে চা আর বিস্কুট খায়। সে এতটাই চরম অলস যে, নিচে পড়ে থাকা বিস্কুটের গুঁড়ো সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পরিষ্কার করে না।

সাত বছরের একটা বাচ্চা তার এই চূড়ান্ত নোংরা স্বভাবটাকেই 'মহানুভবতা' ভেবে বসেছে! ফাইয়াজ ভেবেছে, ইবতেশাম ইচ্ছে করেই পাখিদের জন্য খাবার ছিটিয়ে রাখে।

ইবতেশামের ঠোঁটে একটা বাঁকা, প্রায় নিস্তেজ হাসি ফুটে উঠল।

"বোকা বাচ্চা! আমি নাকি সুপারহিরো!" ইবতেশাম বিড়বিড় করল।

বিজ্ঞাপন

সে কার্ডটা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার জন্য উদ্যত হলো। কিন্তু ঠিক ডাস্টবিনের ওপর হাতটা নিতেই সে থমকে গেল। তার চোখ আটকে গেল ওই আঁকাবাঁকা 'সুপারহিরো' শব্দটার ওপর।

গত পঁয়ত্রিশ বছরে কেউ তাকে ভালো মানুষ বলেনি। তার প্রাক্তন প্রেমিকা তাকে 'পাষাণ' বলে ছেড়ে গিয়েছিল। তার মা ফোনে কথা বলার সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, "তোর বুকের ভেতর কোনো মায়া-দয়া নেই রে ইবু।" ভবনের মানুষেরা তাকে আড়ালে 'কঞ্জুস' আর 'অহংকারী' বলে ডাকে।

অথচ এই হলুদ খামটার ভেতরে থাকা বাচ্চাটার চিঠিতে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো ঘৃণা নেই; আছে কেবল একরাশ খাঁটি মুগ্ধতা। ইবতেশাম জানে, এই মুগ্ধতা তার প্রাপ্য নয়। এই খামটা ভুল ঠিকানায় আসেনি, এটা আসলে ভুল মানুষের কাছে এসেছে।

তবু কার্ডটা ডাস্টবিনে ফেলতে গিয়েও ফেলতে পারল না সে। জীবনে প্রথমবার একটা অদ্ভুত লোভ তাকে পেয়ে বসল। এই মিথ্যে প্রশংসাটা, এই 'সুপারহিরো' ডাকটা তার বুকের ভেতরকার জমাটবাঁধা বরফের পাহাড়ে হঠাৎ এক টুকরো উষ্ণ রোদের মতো এসে পড়ল।

পরদিন সকাল সাতটা।

গেটের সামনে বসে ঝিমোচ্ছে দারোয়ান কাসেম মিয়া। হঠাৎ সে দেখল, থ্রি-বি-এর সেই 'রোবট' সাহেব নিচে নামছেন। তবে সাহেবের মেজাজ আজ রুক্ষ নয়। তার হাতে একটা ছোট পলিথিনের ব্যাগ।

ইবতেশাম গেটের বাইরে গিয়ে ভবনের সামনের রাস্তায় বসে থাকা নেড়ি কুকুরটার সামনে পলিথিন থেকে কয়েক টুকরো পাউরুটি বের করে দিল। কুকুরটা লেজ নেড়ে খেতে শুরু করল।

কাসেম মিয়া চোখ রগড়ে দৃশ্যটা দেখল। সে কি স্বপ্ন দেখছে?

ইবতেশাম ভেতরে ঢুকে কাসেম মিয়ার দিকে তাকাল। তারপর পকেট থেকে একটা একশো টাকার নোট বের করে কাসেমের হাতে দিয়ে একটু ইতস্তত করে বলল, "কাসেম ভাই, চা খেয়ে নিয়েন। আর শুনুন... আমার জন্য বাজার থেকে ভালো জাতের কিছু পাখির খাবার আর একটা মাটির পাত্র এনে দেবেন তো। বারান্দায় রাখব।"

কাসেম মিয়া হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, আজ নির্ঘাত পশ্চিম দিকে সূর্য উঠেছে।

লিফটে উঠে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে রওনা হলো ইবতেশাম। তার ঠোঁটের কোণে একটা প্রশান্তির হাসি। সে জানে, ফাইয়াজের চিঠিটা নিছকই একটা ভুল বোঝাবুঝি। কিন্তু ইবতেশাম সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে ওই বাচ্চাটার ভুলটা ভাঙতে দেবে না। বাচ্চাটা তাকে যে মহানুভবতার পোশাকটা পরিয়ে দিয়েছে, ইবতেশাম এবার সেই মাপেই নিজের শরীরটা তৈরি করবে। সে আর অলসভাবে বিস্কুটের গুঁড়ো ফেলে রাখবে না; এবার সে সত্যিই পাখিদের জন্য খাবার কিনবে।

মাঝে মাঝে মানুষের জীবনে বদল আসার জন্য বড় কোনো ট্র্যাজেডি বা কান্নার দরকার হয় না। একটা সামান্য ভুল বোঝাবুঝি, ভুল ঠিকানায় পৌঁছানো একটা খাম আর এক চিমটি অপ্রত্যাশিত ভালোবাসাই একটা মানুষকে খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করে।

মানুষ হওয়ার আগে, এভাবেই হয়তো কখনো কখনো অন্যের চোখে নিজের একটা মিথ্যে, সুন্দর প্রতিবিম্ব দেখতে হয়। আর সেই মিথ্যেটাকে সত্যি করার প্রবল জেদ থেকেই জন্ম নেয় সত্যিকারের একজন মানুষ।

(সমাপ্ত)
আগের গল্প ইনডেক্স পাতা পরের গল্প