প্রকাশকালঃ মে ২৫, ২০২৬
ঘুমিয়ে আছে রাকা। হঠাৎ অনুভব করলো সে যেখানে আছে সে জায়গাটা ঢুলছে। ঘুমের মধ্যেই শুনতে পেল পানির 'ছলাৎ ছলাৎ' শব্দ। যেন সে পানির মাঝে বসে আছে আর কেউ পানি নিয়ে খেলছে। অথচ এমনতো হওয়ার কথা নয়! সে তো ঘুমিয়ে ছিল লঞ্চের কেবিনে। সেখান থেকে তো আর পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা না!
বেশ কিছুক্ষণ এরকম অনুভব করার পর চোখ মেললো রাকা। তাকাতেই খুব আশ্চর্য্য হয়ে গেল! তার অবস্থান কেবিনে নয়! বরং বসে আছে নৌকায়, সাদাফ সাহেবের কোলে!
মুখ তুলে ওর দিকে চাইতেই মৃদু হাসলো সাদাফ। কৌতুক করে বললো,
--"মহারাণীর ঘুম ভেঙেছে তবে? তো ঘুম কেমন হলো?"
-- "হুম। ভালো।"
হাই তুলতে তুলতে জবাব দিলো সে। তারপর চারপাশে চোখ বুলায়। নৌকাটা একটা নাম না জানা নদী বেয়ে চলছে। একটু সামনেই ঘন বন। নৌকাটা সেদিকেই এগোচ্ছে। পরিবেশে এখনো ভালো করে আলো ফোটে নি। কেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন নিসর্গ চারিপাশে! ঘড়ি দেখা হয় নি, তাই নিশ্চিৎ ভাবে বলতে পারছে না কয়টা বাজে। তবে অনুমান করলো ভোর চারটা বা পাঁচটা তো বাজবেই! কিন্তু এতো ভোর ভোর সাদাফের এই নৌকা ভ্রমণ শুরু করার কারণ কি? অবাক হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
-- "এতো ভোরে বেড়িয়েছেন কেন? এখন কি দেখতে পারবেন বনের ভেতর? আলোই তো ফোটে নি এখনও!"
-- "সুন্দরবনের ভোর উপভোগ করতে কি দুপুর বেলায় আসতে চাও?"
ব্যঙ্গ করে প্রত্যুত্তর করলো। তারপর মুচকি হেসে ওর নাক টেনে দিয়ে বললো,
-- "সুন্দরবনের ভোর! সব ঋতুতেই মোহনীয় এক সময়ের নাম। আমরা তো সব ঋতুতেই এখানে আসতে পারবো না। এখন যখন এসেছি তখন বর্ষায় 'সুন্দরবনের ভোর' মিস করলে হবে? আজ না দেখলে সারাজীবন তো আফসোস করবে!.."
কথার বিনিময়ে মিষ্টি করে হাসলো রাকা। মুখে তার হাসি থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে যথেষ্ট বিরক্ত। এমনিতেই গত রাতে ঘুম হয় নি। সারাদিন জার্নি করে রাতের দিকে এখানে এসেছে ওরা। তারপর লঞ্চে চড়া, কতো কি! সুদূর রাজশাহী থেকে খুলনা, সেখান থেকে সুন্দরবন! এটা কী চাট্টিখানি কথা? তাই ভেবেছিল আজ একটু বেলা করে ঘুমিয়ে নেবে। কিন্তু সাদাফ সাহেব সেটা আর হতে দিলেন কই? ঠিকই তো ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে এনেছে ওকে!
বোটটা আস্তে আস্তে খাল বেয়ে বনের ভেতর ঢুকছে। রাকারা বসেছে বোটের সামনের দিকে। আর ওদের পেছনে বোটের আরেক কানিতে বসেছেন মাঝি। বেশ ভালোই জোয়ার উঠেছে এখন।
নৌকা এগোচ্ছে আর নানা জাতের গাছ-গাছালির পত্রপল্লব সরসর করে গা ঘেঁষে চলে যাচ্ছে। খালের পানিতে মাঝেমাঝে ছলকে উঠছে বিভিন্ন মাছ। মাছ গুলোর বেশিরভাগেরই নাম জানা নেই রাকার। তাই সাদাফের কাছে জানতে চাইলেই সে জানালো ওগুলো পারশে মাছ। আবার সেই পারশে মাছের ঝাঁকের মাঝে কখনো কখনো আড়িয়াল আর ভেটকি মাছও ঝাঁপিয়ে পড়ছে যেন!
হঠাৎ দূরে কোথাও 'কুক্ কুরুৎ কুক্' আওয়াজ তুলে ডেকে উঠলো এক বন মোরগ। আর ঠিক সঙ্গে সঙ্গেই ওদের পাশের জঙ্গল থেকে আরেকটা মোরগ সাড়া দিয়ে উঠলো সেই ডাকের। মোরগের ডাক শুনে আশপাশে তাকালো সাদাফ। আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই বললো,
-- "এখনই সূর্য উঠবে!"
কিন্তু দু' পাশে বনভূমি থাকায় ওদের আর সূর্য দেখা হলো না। ওরা না দেখতে পেলে কি হবে? বনের পাখিরা তো দেখছে, দিগন্তে সূর্য উঠছে! সূচনা হচ্ছে নতুন একটি দিনের!
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ 'ক্যাঁক ক্যাঁক' করে সারা বন কাঁপিয়ে দিলো কোনো এক পাখি।
-- "এটা কোন পাখি?" জানতে চাইলো রাকা।
বাইনোকুলারে চোখ রেখে দূরের কিছু একটা দেখছিল সাদাফ। সেখানে চোখ রেখেই উত্তর করলো,
-- "এক জাতের মাছরাঙা। দেখবে না কি তুমি?"
বলেই চোখ সরিয়ে ওর দিকে চাইলো। রাকা মাথা নেড়ে সায় জানাতেই ওকে একটানে কোলে বসিয়ে নিলো সাদাফ। চোখের সামনে বাইনোকুলার ধরিয়ে দিয়ে আঙুল দিয়ে ইশারা করলো দূরের জঙ্গলের দিকে।
নির্দেশনা অনুসরণ করে সেদিকে তাকিয়েই খয়েরী ডানার সেই মাছরাঙা পাখিটাকে দৃষ্টিগোচর করলো রাকা। বাইনোকুলারে চোখ রেখে তাকে দেখতে দেখতেই হঠাৎ চোখে পড়লো জলের ধারে নলঘোঙ্গা আরেক পাখিকে!
বন দেখতে দেখতে ভেতরের বিরক্তি ভাবটা নিমেষেই কেটে গেল ওর। এখন বেশ ইনজয় করছে সে সবকিছু!
আলো একটু বাড়তেই বনভূমি মুখর হলো নানা পাখির কলকাকলিতে। ডাক আর চেহারা দেখে তাদের নাম জেনে নিলো রাকা। দরজি টুনটুনি, ফিঙে, কাঠঠোকরা, বাবলার, সহেলী, ফটিকজল, শেতাক্ষী আরও কতো কি!
চলতে চলতেই মাথার উপর দিয়ে বিশাল ডানা ছড়িয়ে দিয়ে উড়ে গেল মদনটাক পাখি। কোথা থেকে যেন অবিরাম ডেকে যাচ্ছে ম্যানগ্রোভ পিটার।
সময়টা বর্ষাকাল। কাল সারারাত তুমুল বর্ষন হয়েছে। আপাদত বৃষ্টি নেই, তাই রক্ষে! সুন্দরবনের বেশিরভাগ পাখিই এইসময় বাচ্চা তোলে। তাই তাদের কর্মতৎপরতা, ডাকা-ডাকিটাও বেশিই দেখা যাচ্ছে!
কেউ একজন ফিসফিস করে রাকার কানের কাছে জানালো,
-- "হরিণ দেখবে? চিত্রা হরিণ?"
সাদাফের কথা অনুযায়ী ডান দিকে তাকাতেই নজরে এলো কেওড়া বনে তিনটি হরিণ দাড়িয়ে আছে। দুটো ঘাস খাচ্ছে আর একটা হরিণ অবাক চোখে ওদেরই দেখে যাচ্ছে।
চারপাশের মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে হঠাৎ পেটে টান পড়লো রাকার। অসহায় চোখে সাদাফের দিকে তাকিয়ে বললো,
-- "আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে। এখানে কোনো খাবার হবে?"
-- "বনের মধ্যে কি তোমার জন্য রেস্টুরেন্ট খুলে রেখেছে? আর... তুমি তো কালকে ম্যানেজারকেও ব্রেকফাস্টের কথা বলো নি.. অবশ্য বলবেই বা কি করে? ঘুমকুমারীকে তো কোলে করে আনতে হলো!.."
বিদ্রুপ করলো কি? নয় তো এমন দায়সারা জবাব দেবে কেন? রাকার মন খারাপ হলো। মুখটায় আরও অসহায়ত্ব প্রকাশ পেল। কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো,
-- "এখন কি হবে? আমার যে বড্ডো ক্ষুদা পেয়েছে!.. আপনি তো আমাকে বলেনও নি যে এই ভোরে বেরোবেন, আমি কি করে জানবো?"
ওর অসহায় চেহারা খানি দেখে মনে মনে বেশ মজা পেল সাদাফ। ওকে আরও একটু জ্বালাতে বললো,
-- "এখন এখান থেকে লঞ্চের কাছে যেতেও তো দেড়-দু' ঘন্টা লাগবেই। তারপর সেখানে গিয়ে খাওয়া। এতক্ষণ ওয়েট করতে পারবে না তুমি?.."
এবার যেন কেঁদেই ফেলবে রাকা! বলে কী? আরো দুই ঘণ্টা? ততক্ষণে পেটের ভেতর হাইড্রোক্লোরিক এসিডের বিক্রিয়ায় ও বেঁচে থাকবে তো? এখনই যে জ্বালা করছে!
হঠাৎ শব্দ করে হেসে দিলো সাদাফ। হাসির শব্দে ওর দিকে ফিরে তাকালো রাকা। কী চমৎকার হাসি ছেলেটার! ফর্সা মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ির ফাঁকে বেরিয়ে এসেছে তার ঝলমলে দাঁত। বেবি পিংক কালারের ঠোঁট দুটোও কী সুন্দর প্রসারিত হয়ে গেছে। মুহূর্তেই ক্ষিদের কথাটা মাথা থেকে উড়ে গেল রাকার। সব ভুলে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ওর দিকে। বনের মনোরম সেই পরিবেশে সাদাফের হাসিটা যেন বড্ডো মোহনীয় লাগছে ওর কাছে!
-- "কী দেখ মোর মুখ পানে চাহিয়া?
গিয়াছ নাকি মোর প্রেমে পড়িয়া?"
বলেই মুচকি হেসে ভ্রু নাচালো। কথাটা শুনেই ভাঙে রাকার। লজ্জা পেয়ে ততক্ষনাত মাথা নিচু করে ফেলে। সে দৃশ্য দেখে অট্টহাসিতে মেতে ওঠে সাদাফ।
তারপর হাসি থামিয়ে বোটে রাখা খাবারের বক্সগুলো দেখালো। উঠে গিয়ে ওর সামনে নিয়ে এলো। বক্সগুলো এক এক করে সামনে সাজিয়ে রাখতে রাখতেই বললো,
-- "আমি এতোটাও কেয়ারলেস না যে বউয়ের ক্ষিদের খোঁজ নিবো না!"
নাকে মুখে নাশতা গুঁজে দিয়ে কফির মগ হাতে নিয়ে আবারও নৌকা ভ্রমণ শুরু হলো। বড় নৌকাটা ছেড়ে উঠে পড়লো একটা ডিঙি নৌকায়।
নৌকা চলছে খালের ভেতর দিয়ে। যেতে যেতেই নজরে এলো একটা সুন্দরী গাছে লটকে আছে একটা সাপ। বৃষ্টির অত্যাচারে এই সময় সাপেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গাছে উঠে থাকে। তবে জায়গাটা সাপের আড়ৎ হলেও নাকি মানুষকে খুব কম কামড়ায়। হয় তো জানে, পর্যটকদের কামড়াতে নেই!
নৌকা ভ্রমণের দুই ঘণ্টায় অনেক পাখি, সাপ, ভোঁদড়, বানর, শূকর দেখা হয়ে গেল ওদের। সেগুলো দেখতে দেখতে ওরা খেয়ালই করে নি কখন আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেছে। যখন সেই মেঘ ভেঙে ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামলো তখন খেয়াল হলো তাদের। তাড়াতাড়ি বোটে ফিরতে ফিরতে একপ্রস্থ ভিজতে হলো! কী আর করা!