গুঞ্জরনের নীড়ে

পর্ব - ৯

🟢

এইচএসসির রেজিস্ট্রেশন কার্ড নিতে কলেজ এসেছিলাম সকালবেলা। দেয়ার কথা এগারোটায়। কিন্তু স্যার আসতে আসতেই বাজালেন সাড়ে বারোটা। সরকারি কলেজ বলে কথা! তারা সময় অনুযায়ী নয়, সময় তাদের অনুযায়ী চলে।

যাইহোক, কলেজে বিজ্ঞানের মোট শিক্ষার্থী সাতশো পঞ্চাশ। এতজনের জন্য স্যার এলেন দু’জন। একজন শুরু থেকে ডাকতে শুরু করলেন; অন্যজন শেষ থেকে। এদিকে আমার সিরিয়াল ছিল মাঝের দিকে। শেষের আর শুরুর দিকের রোলেরা কার্ড বাগিয়ে চলে যাচ্ছে; আমি তখনো চাতক পাখির মতো বসে আছি কখন ডাকবে আমায়। দেবের গানের মতো অনেকটা—-“কবে আইবো আমার পালা রে!”

আরও ঘন্টাখানেক পর, দেড়টার দিকে অবশেষে ‘আমার পালা’ এলো। কাগজ দেখে আমার মাথায় হাত। হায় আল্লাহ্, কি ছবি দিয়েছে আমার! এ-তো সাক্ষাৎ মুরগিচোর! অথচ ছবি আমি ঠিকই দিয়েছিলাম। কলেজ থেকে এডিট করে জঘন্য বানিয়ে দিয়েছে। আমি স্যারকে কাগজটা দেখালাম। উনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইলেন না, দায় কলেজ কর্তৃপক্ষের। উপরন্তু বলে দিলেন আমি ছবি পাল্টাতে চাইলে আজকের মধ্যেই নতুন তোলা ছবি আর তিনশো টাকা নিয়ে অফিসে যোগাযোগ করতে। আজ না হলে জরিমানা সমেত খরচা পড়বে পাঁচশ!

আমাকে নিশ্চয় পাগলে পায়নি! এই সময় মাতব্বরি করে তিনশো টাকা দিলে আবার কবে কাগজ দেবে; দেয়ার আগে আরও কোনো ক্যারফা বাজাবে কিনা—-স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা। এক ক্লাসমেটের কাছ থেকে ফোন নিয়ে মার কাছে ফোন দিলাম। মা সবশুনে খুবই বিরক্ত হলেন,

“এত আহ্লাদীপনা করোনা তো জিনিয়া। আমার কাছে তিনশো টাকা নেই এখন। তোমার বাবা বাড়ি যাওয়ার সময় একশো টাকা দিয়ে গেছে। বিকেলে এলে দেখা যাবে…”

“বিকেল পর্যন্ত কলেজ খোলা থাকবে না, মা!”

আমি বেজার মুখে বলতেই মা তার সহজ সমাধান বাতলে দিলেন,

“তাহলে কাল করো।”

“কাল এলে তো পাঁচশো টাকা লাগবে।”

এই উত্তরে মা ক্ষেপে গেলেন,

“মগের মুল্লুক নাকি! একদিন সময় দিয়ে আবার জরিমানা! পাঁচশো টাকা কি বানের জলে ভেসে আসবে?”

মা রাগ ঝাড়তে লাগলেন আমার উপর। এত যন্ত্রণা আমার ভালো লাগছিলো না। আজকের সারাদিনের পড়া নষ্ট হয়ে গেছে। দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম প্রথমে, তারপর অবশ্য বসে ছিলাম—-এখন বিরক্ত লাগছে। ছবি মুরগিচোর হোক আর যাইহোক আমি বাপু আর ঝাড়ি খেতে পারবো না। অগত্য!

কলেজ থেকে যখন বেরোলাম তখন ঘড়িতে দু’টো বেজে গেছে। টিউশন দু’টো আজকের ডেটেই পড়েছে। তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত। একঘণ্টায় বাড়ি যাওয়ার কি দরকার ভেবে আমি আবারও কলেজে ঢুকে পড়লাম। কমনরুমে গিয়ে যোহরের নামাজটা পড়ে নিলাম। দশটাকা দিয়ে অলটাইমের একটা বান কিনে খেতে খেতে গেলাম টিউশনে। বানটার সাইজ ছোট; তবে ঘণ্টা তিনেকের মতো ‘ক্ষিদে’ নামক রাক্ষসকে দমিয়ে রাখা যাবে। বাড়ি গিয়ে, ফিরে আসতে খরচা পড়তো ত্রিশ টাকা; আবার তাড়াহুড়ো করে আসার হ্যাপা ছিল—-এখন সিস্টেম লস হিসেবে ‘দশটাকা’ মেনে নেয়াই যায়।

হঠাৎই আমার মনে প্রশ্ন এলো, নিজেকে মিতব্যয়ী করতে গিয়ে কি আমি কিপটে হয়ে যাচ্ছি? কিন্তু আমার পারিবারিক অবস্থা অনুযায়ী এই আচরণটাই কি গ্রহণযোগ্য নয়?

তারপর হামেশার মত ওই স্বপ্নটা—-“একদিন অনেক টাকা হলে জীবনটা সুখের হয়ে যাবে। অপ্রাপ্তির খাতা পূর্ণ হবে!”—-র কথা ভাবতে ভাবতেই চলে গেলাম পড়তে!

গুঞ্জরনের নীড়ে - মৌরিন আহমেদ

বাসায় এসে রেজিস্ট্রেশন কার্ড দেখে একদফা হাসলো বাবা আর ভাইয়া। ওদের হাসি দেখে পিত্তি জ্বলে গেল আমার। বিরক্ত হয়ে বললাম, “ঝটপট পাঁচশো টাকা দাও দেখি।” অমনি ঠিক হয়ে গেল সব। বাবা বললেন, এতটাও খারাপ হয়নি। বাদ দাও! রেজিস্ট্রেশন কার্ড সুন্দর করে কি হবে; রেজাল্ট যদি খারাপ হয়? তারচেয়ে রেজাল্টটা ভালো করায় মন দাও। আমি হতাশ হয়ে ফিরলাম পড়ার টেবিলে।

দিনকাল এভাবেই কাটছে। সারাদিন মোটামুটি নিজের ঘরেই থাকি। খাওয়া-ঘুম-নামাজ-গোসল এই ব্যাসিক কাজগুলো ছাড়া পড়ার টেবিলেই বেশি সময় যায়। আগে সকালবেলা অনেকটা সময় ছাদে থাকতাম। কিন্তু এখন আর যাওয়া হয়না। শীত ফুরিয়ে গেছে। উত্তপ্ত মার্চের সকালবেলা ছাদে গিয়ে তন্দুরি হওয়ার কি দরকার!

বিকেলের দিকে অবশ্য ছাদে যাই। একা একা ছাদের গাছগুলোর সাথে সময় কাটাতে ভালোই লাগে। আমার অবশ্য একটা বদভ্যাস আছে। গাছের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে আমার। এটা শুনে অনেকে আমাকে পাগল ঠাওড়াতে পারেন; কিন্তু আমি মোটেও পাগলামি ধরনের কিছু করিনা। গাছে পানি দেয়ার সময় নিচুস্বরে কথা বলি। গাছ সেসব বুঝবে-প্রত্যুত্তর করবে—-এই ভাবনা আমার মোটেও নেই। আসলে আমার কথা বলতে ভালো লাগে। একা একা থাকি তো, অনেক কথা জমে যায়!

তবে একদিন বিকেলে ধরা পড়ে গেলাম ইকবালের কাছে। সেদিন দেখলাম, আমার সবচেয়ে পুরোনো গোলাপ গাছটা শুধুই বড় হয়ে যাচ্ছে। ফুল-টুল হওয়ার নাম-গন্ধ নেই। একটু বকাঝকাই করছিলাম, রোজ রোজ এত যত্নআত্তি করি, ফুল হবেনা কেন? কলি যাও বা আসে ফোটার আগেই মরে যায়! আগে তো এমন ছিলনা!

হঠাৎ কে যেন নাকি সুরে বলে উঠলো,

“সরি খুকি ভুল হয়ে গেছে। কথা দিচ্ছি পরেরবার থেকে ঠিক ফুল ফুটবে।”

হঠাৎ কারো কণ্ঠ শুনে আমি চমকে গেছি! পেছনে ফিরে যখন দেখলাম, ওটা ইকবাল ছাড়া আর কেউ নয় তখন তো আমার লজ্জার মাথা কাটা গেল।

ইকবাল আমার লজ্জার ধার ধারলো না। আগের মতোই নাকি সুর তুলে বললো,

“কি খুকি ভয় পেয়ে গেলে নাকি? আমি বরং ভয় পেয়েছি তোমার গাছের সাথে কথা বলা দেখে! তুমি তো জগদীশচন্দ্র বসু লাইট ভার্সন গো!”

আমার এবার মেজাজ গরম হলো। একে লজ্জায় পড়েছি; জেনেবুঝে আরও লজ্জা দেয়া? দাঁত কিড়মিড় করে বললাম,

“আমার বাড়ি, আমার ছাদ, আমার গাছ—-আমি কথা বলব; তোমার তাতে কি?”

“কথায় কথায় এত আমার আমার করো কেন? সাধে কি আর খুকি বলি? বাচ্চাদের মত কাণ্ডকীর্তি তোমার।”

ইকবালের ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি। আমার গা জ্বলে গেল। আমাকে নিয়ে তোর গবেষণা করার দরকার আছে? তুই নিজের কাজটা করনা, বাপু! ঝাঁঝ নিয়ে জবাব দিলাম,

“বাচ্চাদের সাথে ঝগড়া করা বোধ হয় খুব বড় মানুষের কাজ? বাচ্চাদের নিয়ে এত আগ্রহ কীসের?”

“কি যে বলো, আগ্রহ থাকবেনা? চোখের সামনে এত সুন্দর করে ঘুরে বেড়ালে…”

“ফালতু কোথাকার!”

আমি গাছে পানি দেয়া শেষ করে চলে এলাম নিচে। ফাজিল ব্যাটা!

গাছের সাথে কথা বলা নিয়ে আরও কয়েকদিন পচালো ইকবাল। পরদিন ছাদে গিয়ে দেখি ওই গোলাপের টবগুলোর কাছে হাঁটুমুড়ে বসে গাছে পানি দিচ্ছে ইকবাল। আমার উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই শুনিয়ে শুনিয়ে বললো,

“খুকি আজ ব্যস্ত ছিল রে। তাই ওর হয়ে আমিই পানি দিয়ে দিচ্ছি। তোরা কিছু মনে করিস না যেন; ফুল দিস ঠিকমত!”

রাগে আমার শরীর চিড়বিড় করে উঠলো। দৌঁড়ে গিয়ে পানির মগ কেড়ে নিতেই ইকবাল ঠোঁট উল্টে বললো,

“বাব্বাহ! খুকি তো ভালোই রেগে গেছে!”

আমি চোখ পাকিয়ে তাকাতেই আবার হাসলো। যেন ফার্স্ট ক্লাস কৌতুক শুনিয়ে ফেলেছে!

তারপরের দিন তো ফাজলামির মাত্রা আরেক কাঠি উপরে উঠে গেল!

নতুন আরও চার-পাঁচটা টব এনে রেখে দিলো আমার টবের কাছাকাছি। সবগুলো আবার জিনিয়া ফুলের গাছ! সবগুলো টব একসাথে লাল রিবন দিয়ে বেঁধে রাখা; উপরে প্ল্যাকার্ডের মত একটা কার্ডে লেখা,

“Zinnia fool ke liye Zinnia phool!”

আমি সারা বিকেল বসে থাকলাম ছাদে; বদমাইশটার আসার অপেক্ষায়। এলোনা।

অবশ্য আমার রাগটাও বেশিক্ষণ স্থায়ী হলোনা। গাছগুলো বেশ সতেজ ছিল। যত্ন করলে জুন-জুলাইয়ের দিকে ফুল ফুটবে। আমার কাছে এর আগে জিনিয়ার গাছ ছিলনা; তাই আগ্রহ নিয়েই আমি ফুল আসার অপেক্ষা করতে লাগলাম!

_______

মার্চের মাঝামাঝি সময়ে এসে আমার বাকি টিউশন দু’টোও বন্ধ হয়ে গেল। একটায় স্টুডেন্ট কম ছিল বলে স্যার রাগ হয়ে বন্ধ করে দিলেন; অন্যটা আমি নিজেই বাদ দিলাম। অনেক হয়েছে টিউশন স্যারের বাড়ি বাড়ি পড়তে যাওয়া; এবার না হয় নিজেই একটু চেষ্টা করি!

তবে শেষ যেদিন টিউশন গেলাম, সেদিন একটা বাজে ঘটনা ঘটে গেল। গলির মোড়ে একটা টং দোকান আছে। চা-সিগারেট বিক্রি হয়। স্বাভাবিকভাবেই ওখানে অনেক ধরনের মানুষের আনাগোনা চলে। অনেক বাউন্ডুলে-বখাটেরাও বসে। তবে এলাকার স্থানীয় হওয়ায় কখনো কেউ টিজ করার সাহস পায়নি। দোকানদার মামাও জানেন, এলাকার কাউকে কিছু বললে ওনার খবর হয়ে যাবে। এলাকাবাসী একসঙ্গে এলে পার পাবে নাকি!

কিন্তু সেদিন কোত্থেকে একদল বখাটে এসেছিল। বয়স আমার চেয়ে কমই হবে, চামশিপড়া চেহারা একেকটার। রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে ওরা সিগারেট ফুঁকছিল। আমি একটু সরে দাঁড়াতে বলতেই আচানক বাজখাঁই কণ্ঠে বললো,

“তোর বাপের রাস্তা এটা? সরতে বলিস কোন আক্কেল?”

আমার একই সঙ্গে রাগ এবং বিস্ময় হচ্ছিল। কোথাকার কোন ছ্যাচড়া পোলাপাইন এসে দাপট দেখায়? আমি দোকানি আঙ্কেলের দিকে তাকাতেই উনি অসহায় চাউনি দিলেন। তখনি ওদের একজন বলে উঠলো,

“আবার তাকায় কেমন করে দেখ! চোখ পাকায় **!”

“ওদিকে কি দেখিস, এদিকে তাকা **!”

বলেই লিডার গোছের ছেলেটা আমার ডান বাহু ধরে টানলো। চোখ লাল। নিশ্চয়ই গাঞ্জা-ফাঞ্জা টেনে আসছে; নেশার ঘোরে আছে।

এ-জাতীয় অবস্থায় আমি আগে কখনো পড়িনি। তাই ভয়ও লাগছিলো একটু। কিন্তু যদি বুঝতে পারে আমি ভয় পাচ্ছি তাহলে ব্যাপারটা আরও খারাপ হয়ে দাঁড়াবে। আমি ঘুরে তাকিয়ে বললাম,

“তাকালাম, কি করবি রে? আর গায়ে হাত দিলি কোন সাহসে রে মাদার**? একটা চিৎকার দেব না, পুরা মহল্লা এসে জড়ো হয়ে যাবে।”

“তাই নাকি? দে দেখি চিৎকার!”

পাশ থেকে এখন বললো। আমি সত্যি সত্যিই চিৎকার শুরু করলাম। তবে তার আগে কাঁধের ব্যাগ খুলে ঘুরিয়ে ওদের ধাক্কা দিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে চিৎকার করলাম। আমি জানি, হয় ওরা আমার পেছন পেছন আসবে নয়তো চলে যাবে। যাই করুক, আমার ক্ষতি নেই। বরং পিছু ধাওয়া করলেই আমার বাড়ির কাছাকাছি আসবে। তখন মাইর একটাও মাটিতে পড়বেনা!

যদিও কাজটা করার সময় আমি শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম না। কারণ বলেছি; এ-জাতীয় সিচুয়েশন আমার জন্য নতুন। কিন্তু আমি শতভাগই সফল হলাম। অলরেডি সন্ধ্যা নামার সময় হয়ে এসেছে; মাগরিবের নামাজ পড়তে মুসল্লিরা বেরিয়েছে মসজিদের উদ্দেশ্যে। একজন দু’জন করে এসে ঘিরে ধরলো ওদের। আমার বাপ-ভাই আর ইকবালকেও দেখা গেল ভিড়ে।

গুঞ্জরনের নীড়ে মৌরিন আহমেদ

বখাটেগুলো একচোট মার খেল মহল্লাবাসীর হাতে।

আমি দূরে দাঁড়িয়ে থেকে সব দেখলাম। একসময়ে ভাইয়া ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এলো। আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো,

“সাব্বাশ, জিনু! চল। তোকে বাসায় দিয়ে আসি।”

Story Cover