আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, ওটা সত্যিই বিড়াল ছিল। একটা স্বাভাবিক প্রাণীকে দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম? সিরিয়াসলি? দোলাচল নিয়ে পায়চারি করছিলাম ডাইনিং স্পেসে। ভাইয়া ওর ঘর থেকে বেরোলো; আমাকে দেখেই হুল্লোড় করে উঠলো,
“কিরে আহাম্মক! কি হইলো তোর?”
আমি মুখ ভেংচে তাকালাম। ফালতু ছেলে। ভাইয়া এগিয়ে এসে আমার বেণী ধরে টান দিলো একটা। আমি ব্যথায় ‘আহ’ করে উঠতেই দাঁত বের করে হাসলো। গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বললো,
“প্যাঁচির মত মুখ করে আছিস ক্যান?”
ভাইয়া চেয়ার টেনে বসলো। আয়েশ করে পানিভর্তি গ্লাসে চুমুক দিলো। আমি বিভ্রান্ত চেহারায় বললাম,
“সত্যিই ওটা জ্বিন ছিলনা?”
ভাইয়া গ্লাস ফাঁকা করে আমার দিকে তাকালো। ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি ঝুলছে। মিটমিট করে হেসে বললো,
“তুই কি পাগল, জিনিয়া? দুনিয়ায় কি মানুষের আকাল পড়ছে যে জ্বিন এসে তোকে ভয় দেখাবে?”
আমি চুপ করে রইলাম। ভাইয়া হেলেদুলে ঘরে চলে গেল।
যে বিড়াল নিয়ে এত কাহিনী, সেই বিড়ালের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো আরও তিনদিন পর। সেদিনও আমি ছাদে গিয়েছিলাম বিকেলে। গিয়ে দেখি, ইকবাল একটা সাদা বিড়াল নিয়ে চৌকিতে বসে আছে।
আমাকে দেখে হাসলো। বিড়ালের একটা হাতে নিয়ে নাড়াতে নাড়াতে বললো,
“হ্যালো জিনিয়া খুকি! তুমি নাকি আমাকে দেখে ভয় পেয়েছিলে? সরিইইইই। আমি খুকিদের খুবই পছন্দ করি। তারা আমাকে দেখে ভয় পাবে কেন?”
ওর নাটুকে স্বর আর ভঙ্গি দেখে আমি বিরক্ত হলাম। আমার ভয় পাওয়ার ঘটনা এই ব্যাটাকে বলেছে কে! বাড়ির ভেতরের খবর পাঁচকান করার অভ্যাস তো খুবই খারাপ। আজকেই মাকে ধরবো।
আমি কিছু না বলে সরে যেতে চাইলাম। ইকবালের তা ভালো লাগলো না। বিড়ালকে কোলে নিয়ে পিছু পিছু এলো। জবাবদিহির মতো বললো,
“আরে ও সরি বলল তো। এখনো রেগে থাকলে চলবে?”
আমি ফিরে তাকাতেই হেসে বিড়ালের গলায় আদর করে বললো, “বাবা সরি বলো!”
বিড়ালটা সাথে সাথেই ডেকে উঠলো, “ম্যাঁও!”
ইসস, কি ঢং! আমি ঠোঁট উল্টালাম।
ইকবাল আবারো আদর করে গলায় চাপ দিলো, “বাবা সরি একসেপ্ট হয়নি। আবার বলো?”
“ম্যাঁও!”
এবারও সাথে সাথেই উত্তর দিলো। আমি অবাক হলাম বটে, কিন্তু প্রকাশ করলাম না। কুঁচকানো চেহারা সোজা করে সামনের দিকে চেয়ে থাকলাম। ইকবাল বললো,
“ম্যাডামের রাগ পড়লো? সরি শুনেছেন?”
আমি গম্ভীর মুখে বললাম,
“কখন বললো? শুনতে পাইনি তো।”
ইকবাল এবার জোরেই হেসে উঠলো। আমি মুখ ফুলিয়ে তাকালাম।
“তুমি তো আচ্ছা মেয়ে! কোনো বিড়াল কি সত্যি সত্যি সরি বলতে পারে?”
“বিড়ালের মালিকও তো বলেনি।”
বলেই আমি উল্টো ঘুরে হাঁটা শুরু করলাম। “আরে আমি কেন সরি বলবো…”—-বলতে বলতেই পিছে আসছিল ইকবাল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই সরল কণ্ঠে বললো,
“সরি।”
দোষ নেই; তবুও ইকবালের এই অকপট স্বীকারোক্তি আমার ভালো লাগলো। আমি আগের মত আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে হেসে নিলাম; হাঁটতে শুরু করলাম।
ইকবাল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। বিড়ালটার সঙ্গে খেললো। একসময়ে আমার আগ্রহ জাগলো। দূর থেকেই স্বর উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“তোমরা বিড়াল পালো, বলোনি তো আগে?”
“কেন? বললে নিশ্চয়ই থাকতে দিতে না?”
ইকবালও গলা তুললো। আমি সাথে সাথেই উত্তর দিলাম না। ওরা বিড়াল পালে জানলে আসলেই ভাড়া দিতাম না। আমি বিড়াল খুব একটা পছন্দ করিনা। আর পোষা বিড়ালগুলো নাকি ন্যাওটা হয়। মালিকের গা ঘেঁষে থাকে। আবার সারা বাড়িময় ঘুরে-বেড়ায়।আশেপাশে এলে তো আমার কিছুতেই সহ্য হবেনা। সেদিন যেমন ভয় পেয়েছিলাম; ওরকম ভয় পাবো। কিন্তু এখন কি করা যাবে। ওরা দু’মাসের এডভান্স করেছে।
শ্বাস ফেলে বললাম,
“পারলে এখনো থাকতে দিতাম না। কিন্তু তোমাদের নসিবে বোধহয় অন্য কিছুই লেখা আছে।”
ইকবাল হাসলো। সহজ গলায় বললো,
“আমাদের বাসা থেকে বের করতে তোমার এত তাড়া কীসের, বলতে পারো?”
আমি জবাব দিলাম না। এমন ভাব করলাম যেন শুনতেই পাইনি!
আমার দিনগুলো খুব ব্যস্ততায় কাটছে। টেস্টের পর এখন পুরোদমে পড়ার সময় আমার। একটুও বাড়তি সময় নষ্ট করা যাবেনা। সকালে কলেজ থাকেনা; তাই একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। কিন্তু উঠেই পড়তে বসে যাই। আগে পাঁচটা প্রাইভেট ছিল। এখন দু’টো আছে। বাকিগুলো বাদ দিয়ে দিয়েছি। মা বলছিল, এতো টাকা দেয়া কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিছু জমাতে হবে। এইচএসসির পর কোচিংয়ে ভর্তি হতে হবে। তখন একবারেই বিশ-পঁচিশ হাজার টাকা বেরিয়ে যাবে। আমার বিশেষ আপত্তি নেই। টেস্ট পেপার সলভ করছি। ম্যাথ রিলেটেড সমস্যা হলে ভাইয়া আছে; হেল্প করতে পারে। প্র্যাকটিস এক্সামের জন্য উদ্ভাসে একটা কোর্সেও এনরোল করে ফেলেছি।
বাসার পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। বাবা সফলভাবে তার বাবার সম্পত্তি উদ্ধার করে ফেলেছে। এখন আবারো তার অফুরন্ত অবসর। সারাদিন বাড়ি বসে থাকেন।
সকালবেলা পড়তে বসেছি হঠাৎ কোত্থেকে যেন ইকবালের বিড়ালটা জানালা দিয়ে লাফিয়ে ঢুকলো আমার ঘরে। আমি চমকে উঠলাম। সাদা ধবধবে বিড়ালটার গায়ে ময়লা। সেই ময়লা নিয়ে ও লাফ দিয়ে উঠে পড়লো আমার পড়ার টেবিলের উপর, আমি ভয়ে উঠে দাঁড়ালাম চেয়ার থেকে। ও থামলো না। আবারও লাফ দিয়ে চলে গেল আমার নীল ফুলতোলা বিছানায়। হেঁটে বেড়াতে লাগল অস্থির ভাবে। সাথে গোঙাতে লাগলো। চাদরটায় পড়লো ওর নোংরা পায়ের ছাপ।
আমি আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলাম,
“মা! মা দেখো! ইকবালের বিড়াল আমার ঘরে, সব তছনছ করে দিলো…”
বাসায় তখন কেউ ছিলনা। মা সম্ভবত আন্টির ফ্ল্যাটে গিয়েছেন। ছুটে এলেন সেখান থেকে। আন্টিও এলো। আমি সবিস্তারে ঘটনা বলতে লাগলাম। আন্টি বিড়ালটাকে ডাকতে লাগলো,
“ভুট্টো সোনা! নেমে আয়, বাপ।”
আমি প্রথমে খেয়াল করিনি ডাকটা। কারণ আমিও চিৎকার করছিলাম। একটুপর আমার জানালায় এসে দাঁড়ালো ইকবাল। হন্তদন্ত হয়ে বললো,
“ভুট্টো! তুই এখানে? আমি সারা পাড়া খুঁজে এলাম।”
অবাক হয়ে গেলাম। ওরে ঢঙের গোষ্ঠী রে! ভুট্টো আবার কি! বিড়ালটা ইকবালকে দেখে আরো অস্থির হয়ে উঠল। আমি এবার চেঁচিয়ে উঠলাম,
“এই বিলাইয়ের বাচ্চা বিলাই, নাম আমার খাট থেকে!”
তৎক্ষণাৎ মা এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন! আমি চুপসে গেলাম। ইকবাল জানালা থেকে সরে গেল। ফ্ল্যাটে আমার রুমে চলে এলো। অনেক কাহিনী করে শেষমেষ শান্ত করলো বিড়ালটাকে। কোলে নিয়ে গায়ে হাত বুলাতে লাগলো। আন্টির একটা কল আসায় আগেই বেরিয়ে গিয়েছিলেন। আমার মাও চলে গেল। ইকবাল আমার দিকে তীক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে বললো,
“ওর নাম ভুট্টো। জুলফিকার আলী ভুট্টো। পাকিস্তানের ফর্মার প্রেসিডেন্টের নামে নাম। সুন্দর করে বলবে, নাহলে ও রাগ করবে! এখনো রেগে আছে; বাইরে থেকে মারামারি করে এসেছে বলে তোমাকে কিছু বললো না। নয়তো হাঁচড়ে দিত।”
মামার বাড়ির আবদার! নিজে আমার নামের উল্টোপাল্টা তন্দুরি করে, আবার বিড়ালের নাম নিয়ে নাটক! আমি ভুট্টোর দিকে তাকালাম। একদৃষ্টিতে দেখছে আমাকে। সেই দৃষ্টিতে আগ্রাসন। ইকবাল চলে যাচ্ছিল দেখে ভেংচি কেটে বললাম,
“আর তোমার প্রেসিডেন্ট ভুট্টো যে আমার পরিষ্কার বিছানার চাদর নোংরা করে ফেললো? তারবেলা কি আমি রাগ করব না?”
“ঠিক আছে, দাও। আমি ধুয়ে দিব।”
ইকবাল ফেরৎ এলো। আমি চাদরটা তুলতেই যাচ্ছিলাম; মা হুট করে দরজায় এসে দাঁড়ালো। বাধা দিয়ে বললো,
“না, না, বাবা। আমি ধুয়ে দেব। তোমাকে কিছু করতে হবেনা।”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাতেই; আমাকে চোখ দিয়েই ধমক দিলেন। আমার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। ফালতু লোকের ফালতু বিড়াল!
এভাবেই আমার দিনগুলোতে ইকবালের এই ভুট্টো মহাশয় বেশ আচানক হানা দিতে লাগলো। ওকে আমি পছন্দ করিনা, তাই চেষ্টা করি এড়ানোর। কিন্তু ব্যাটা মালিকের মতোই বদমাইশ!
আমি ভয় পাই; তাছাড়া ও বাইরের বিড়ালদের সাথে ঝামেলা করে—-এসব কারণে বেশিরভাগ সময় ওকে বাসার ভেতর রাখে আন্টি। কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন পালিয়েও যায়। আমাকে দেখলেই ভারি স্বরে “ম্যাঁও! ম্যাঁও!”—-করতে করতে ছুটে আসে। পায়ের কাছে ঘোরে, একদিন তো পা চেটে দিচ্ছিল। আমি ভেবেছি কামড়াবে হয়তো! ভয়ে কি চিৎকার দিয়েছিলাম। আল্লাহ্!
আগে ভুট্টোর মালিকের যন্ত্রণা—-এখন স্বয়ং ভুট্টো! জীবনটা এভাবেই যাচ্ছে কেটে। এদিকে, এইচএসসির আর তিনমাস বাকি মাত্র। আমার টেনশন আর ব্যস্ততা—-দুটোই বেড়েছে।
তবে ইকবাল বিরক্তিকর হলেও, ভুট্টো আসলে বিরক্তিকর নয়। মাঝে মাঝে ওকে দেখলে আমার ভালোও লাগে। যখন কাছে আসেনা, দূরে দাঁড়িয়ে নরম স্বরে “ম্যাঁও, ম্যাঁও!”—করে ভালো লাগে। মাঝে মাঝে একটু খাবার দেই ওকে। দূর থেকে দুধের বাটি রেখে খেতে বলি। ও এগিয়ে এলেই সরে যাই। একদিন আন্টির কাছে ধরা পড়ে গেলাম। উনি অবশ্য কিছু বলেনি; কিন্তু আমি লজ্জায় পালিয়ে এসেছিলাম।
যথারীতি এই খবরটাও পাচার হয়ে গেল ইকবালের কাছে। খুব পচানি দিলো আমাকে। আমি ধরা পড়া চোরের মতো মুখ আমটি-চামটি করলাম। কিছু বলার নেই; ফেঁসে গেছি!
পরদিন টিউশনে যাচ্ছি আচমকা ইকবাল আমার পেছন থেকে এসে ‘ভাউ’—-বলে চিৎকার করলো। রাস্তার মধ্যে এসব কি? আমি বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেলতেই হাসলো,
“কথায় কথায় ভ্রু কুঁচকিয়ে ফেল কেন, খুকি?”
“এগুলো কেমন ব্যবহার? রাস্তা না এটা?”
আমি রাগ করে বললাম। ইকবাল ফিচেল কণ্ঠে বললো,
“খুকি বললাম তার জন্য কিছু বলবে না?”
“সবসময়ই তো বলো। আর কত নিষেধ করবো?”
আমি বুকের উপর হাত ভাঁজ করে অন্য দিকে তাকিয়ে হাঁটতে লাগলাম। ইকবাল কথা প্যাঁচাতে লাগলো,
“তাহলে হার মেনে নিয়েছ? খুকি ডাকায় আর কোনো আপত্তি নেই?”
“আপত্তি শুনবে?”
আমি ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলতেই গালভরে হাসলো। বুকে হাত রেখে মরে যাওয়ার নাটক করে বললো,
“এভাবে রাগ রাগ করে তাকালে মরে যেতে ইচ্ছে করে, পিও!”
“শয়তান!”
আমি ওকে ফেলে গটগট করে এগিয়ে এলাম। ইকবাল পেছনে দাঁড়িয়ে হাসতে থাকলো। বেয়াদব ব্যাটা!