গুঞ্জরনের নীড়ে

পর্ব - ৭

🟢

আমার মনে হচ্ছে, শরীরটা অবশ হয়ে গেছে। বিড়ালরুপী জান্তবের সম্মোহনী ওই জ্বলজ্বলে দৃষ্টিকে আমি কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারছি না! এক মুহূর্তের মধ্যে আমার দেহের সমস্ত রক্ত জমিয়ে দিয়েছে। নিঃশ্বাস আটকে আটকে আসছে আমার। মুখ থেকে দুয়া বেরোচ্ছে উল্টাপাল্টা,

“লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা… না, না। বিপদের দুয়া পড়তে হবে। আল্লাহুম্মা ইন্নি আসালুকা… আরে কি পড়তেছি এইসব! আল্লাহ্! আল্লাহ্ দুয়াটা মনে করায় দেও গো।”

“ম্যাও!”

আমার দিকে বিড়ালটা হুংকার ছাড়লো যেন। আমার কলিজা শুকিয়ে গেল তৃষ্ণায়। এই কণ্ঠ? এই স্বর তো কোনো স্বাভাবিক বিড়ালের হতে পারে না; নির্ঘাৎ কোনো শয়তান! ইয়া আল্লাহ্! আমি কি আজকে মারা যাবো?

“লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানা কা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন!”

কিছুক্ষণ উল্টাপাল্টা দুয়া পড়ার পর অবশেষে আসল দুয়াটা মনে পড়লো আমার। আর কি আশ্চর্য! ঠিক দুয়াটা পড়ার পর বিড়ালটা আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো; দ্বিতীয়বার “ম্যাও!” বলে ধমক দিয়ে এই ছাদের প্রাচীর থেকে ঝাঁপ দিয়ে পাশের বাড়ির উঁচু দেয়ালের ওপর চড়লো। নিমিষেই মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম!

কোনমতে উঠে পড়িমড়ি করে সিঁড়ির দিকে ছুটলাম; জান হাতে নিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকতে পারলে বাঁচি। কিন্তু কথায় আছে অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায়! সেখানে আমার মত সার্টিফায়েড অভাগী এমনি এমনি পার পেয়ে যাবে—-তাই কি হয়?

দিগ্বিদিক শূণ্য হয়ে সিঁড়ি ভাঙছি; হঠাৎ কীসের সাথে যেন ধাক্কা খেলাম। হুড়মুড় করে গড়িয়ে পড়লাম দুই সিঁড়ির মাঝের ফাঁকা জায়গাটায়। মাত্রই একটা বিপদ থেকে রেহাই পেয়ে আরেকটা বিপদের মুখে পড়ে আমি প্রাণপণে চিৎকার শুরু করতে যাবো, “আল্লাহ্! বাঁচাও প্লিজ!”

সঙ্গে সঙ্গেই আমার নাক-মুখ চেপে ধরলো কেউ। অবয়ব মানুষের; ঘন অন্ধকারে আমি বুঝতে পারলাম না বান্দাটা কে। কোনো চোর-ছ্যাচড়ার পাল্লায় পড়লাম নাকি ভেবে আমি দু’হাতে ওর হাত সরাতে চেষ্টা করতে করতে ইচ্ছেমত লাথি হাঁকিয়ে গেলাম।

এদিকে নাক চেপে ধরায় দম আটকে যাচ্ছে; অন্যদিকে আমি হাতপা ছোঁড়াছুঁড়ি করছি। আচমকা পা’টা বেকায়দা জায়গায় লাগতেই আগন্তুক “আহ্!”—-করে ছিটকে সরে গেল।

সুযোগ পেয়ে পিছিয়ে যেতেই আমিও সিঁড়ির সোপানের সঙ্গে বাড়ি খেলাম। কিন্তু থেমে থাকলে চলবে না। জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে আমি উঠে দাঁড়ালাম, সামনের জনকে কাবু করতে হবে। চোর হলে রক্ষে নেই। অন্ধকারে হাতড়ে কয়েকটা সিঁড়ি ভাঙতেই পায়ের কাছে তার শরীরের উপস্থিতি টের পেলাম। কাতরাচ্ছে,

“মা গো, মরে গেলাম গো!”

আমার গায়ে বিদ্যুত খেলে গেল। ইকবাল!

আমি ধপ করে বসে পড়লাম সোপানের উপর। অন্ধকারে আর একপাও এগোনোর সাহস হলোনা। এমনই অঘটন কম ঘটাই নি। স্তিমিত কণ্ঠে বললাম,

“তুমি কি খুব ব্যথা পেয়েছ, ইকবাল? আমি বুঝতে পারিনি আসলে…”

“বুঝতে পারনি বলে এতো জোরে মারবে? জানো, কোথায় লাথি দিয়েছ? আমার বংশের প্রদীপ নিভে যায় নাকি কে জানে!”

শেষের কথাটা বিড়বিড় করে বলে কাতরাতে লাগলো। আমি জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলাম। গা’টা শিরশির করে উঠলো আমার। ইকবালের মত একটা তরুণ ছেলের সাথে একটু আগে আমি ধাক্কা খেয়েছি; সে আমার উপর পড়ে লেপ্টে ছিল; তার স্পর্শকাতর জায়গায় লাথি দিয়ে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি—-এরচেয়ে জঘন্য ঘটনা আর কি হতে পারে? ঘৃণায় - লজ্জায় আমার কান গরম হয়ে গেল।

তথাপি নিজের ইমেজ ধরে রাখতে; মেজাজ দেখিয়ে বললাম,

“তুমি আমার নাক-মুখ চেপে ধরেছিলে কেন? সাহস তো কম নয় তোমার!”

“তুমি চিৎকার করছিলে কেন? সবাই এসে যদি দেখত, অন্ধকারে আমি তোমার গায়ের উপর পড়ে আছি; খুব ভালো হতো? কি ভাবতো সবাই আমাকে?”

ইকবাল হিসহিস করে বললো। বাইরে আবছা আলো ছিল; কিন্তু সিঁড়িঘরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমরা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। তবুও মনে হলো, ইকবাল উঠে বসলো। আমি বললাম,

“আমি কি জানি, তুমি এটা!”

পরক্ষণেই বিড়বিড় করলাম,

“তুই ব্যাটা ভাড়াটিয়া; নিজের ফ্ল্যাটে থাকবি। রাতের বেলা তুই ছাদে আসবি কেন?”

ইকবাল বোধ হয় শুনে ফেললো সেটা। রাগ করে বললো,

“ও হ্যালো! আমরা টাকা দিয়ে ভাড়া থাকি। মাগনা থাকি না।”

আমার মেজাজও খারাপ হয়ে গেল। বিড়বিড় করে বলা কথা শুনে আবার গলাবাজি! ঠাস করে বলে ফেললাম,

“আমি বলেছি, তোমরা মাগনা থাকো? ভাড়াটিয়া ভাড়াটিয়ার মতো থাকো। ছাদে আসবে কেন? এই এলাকায় কোনো বাড়িতে ভাড়াটিয়া ছাদে যাওয়া এলাউ করে?”

“সেটা তো তোমরা আগে বলোনি। আগে বললে ভাড়াই উঠতাম না।”

“সে তো আমি প্রথমদিনেই বলেছিলাম, তোমাকে ভাড়া দেব না। তাও এসেছ কেন?”

প্রত্যুত্তরে ইকবাল আর কিছু বললো না। চুপ হয়ে গেল। মোক্ষম জবাবটা দিতে পেরে আমারও বেশ আনন্দ হলো। পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে আমি অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে নিচে নেমে এলাম।

গুঞ্জরনের নীড়ে - মৌরিন আহমেদ

সকালবেলা বেরিয়েছি কলেজের উদ্দেশ্যে। টেস্ট পরীক্ষা শেষ হলে কি হবে, আজকে থেকে টেস্টের প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা শুরু। আমি বুঝিনা, টেস্টের পর ঘাড় ধরেই যখন বের করবেন কলেজ থেকে; এইচএসসির আগে যখন আর লেনাদেনা রাখবেন না; তখন এত তাড়াহুড়ো করে পরীক্ষা নেয়ার কি দরকার? দু’টো দিন দম তো নিতে দেবে!

ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে একটু উঁকি-ঝুঁকি মারলাম; মিস্টার ইকবাল মহোদয়ের সঙ্গে যদি ভুলক্রমেও দেখা হয়ে যায়! ও গাণ্ডু শালার সাথে দেখা করার ইচ্ছে আমার মোটেও নেই।

কিন্তু যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যে নামা তো অনিবার্য! আমি দরজার বাইরে মাথাটা বের করতেই দেখলাম ইকবাল বেরোলো ফ্ল্যাট থেকে; চটজলদি ভেতরে ঢুকলাম আমি। পিপহোলে চোখ দিয়ে দেখতে লাগলাম গাণ্ডুটা গেল নাকি। মা এসে বাগড়া দিলেন। আচানক বাজখাঁই কণ্ঠে বলে উঠলেন,

“এই জানোয়ার! এতক্ষণ ‘দেরি হবে, দেরি হবে’ বলে উৎপাত করে এখন আবার দরজায় দাঁড়িয়ে কি তামাশা করছিস? তোর জন্য আধা ফোটা ভাত রাইস কুকার থেকে নামালাম…”

মা এতো জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন যে আমি চমকে উঠতে বাধ্য হলাম। পেছনে ঘুরে কৈফিয়ত দেব; মা সেই সুযোগ দিলেন না। ঠেলেঠুলে বির করে দিলেন। অগত্য!

গলিতে বেরোনোর পর আমি ইকবালকে দেখতে পেলাম। অনেকটা দূরে চলে গেছে। আমি ওর পিছু পিছু কচ্ছপের গতিতে এগোলাম। গতকাল সন্ধ্যার ব্যাপারটা খুব বিশ্রী হয়েছে। প্রথমত, ওকে এভাবে কথা শোনানো উচিৎ হয়নি। এজন্য একটু অপরাধবোধ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ওর সাথে ধাক্কা খেয়ে যে কেলেঙ্কারি কাণ্ড করেছি তাতে নিজেকে খুব শরমিন্দা লাগছে। তাই আমি কোনোভাবেই চাচ্ছি না ওর মুখোমুখি হতে!

সেদিন দুপুরটা আমার খুব ভালো কাটলো। বাবার মেজাজ ফুরফুরে থাকায়, অনেকদিন পর খাবার টেবিলে আমরা চারজন একসাথে বসে গল্প করলাম। খাওয়া শেষ হয়েও অনেকক্ষণ বসে হৈচৈ করলাম। প্রাণখুলে হাসলাম। এগুলো অবশ্য আগেও হতো। যখন বাবা সুস্থ ছিল, সবকিছু স্বাভাবিক ছিল, তখন আমরা খাবার টেবিলে বসে খুব কথা বলতাম। সারাদিন কে কি করলাম, কোন ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটলো—-খুব আগ্রহ নিয়ে শেয়ার করতাম।

কথায় কথায় জ্বীন প্রসঙ্গ এসে গিয়েছিল। বাবা ময়মনসিংহ যাওয়ার পর দাদুকে নাকি একজন প্রায়ই কল করতো। ফোন রিসিভ করলে প্রথমে কথা বলতো না। এরপর একদিন দাদু বিরক্ত হয়ে উচ্চবাচ্য করতেই নাকি অপরপাশ থেকে গম্ভীর গলায় কেউ একজন বলেছেন,

‘আমি জ্বিনের বাদশা। তুই আমার সাথে বেয়াদবি করিস?’

দাদু প্রথমে বিশ্বাস করেনি। খুব স্বাভাবিক। কিন্তু কথায় কথায় সে দাদুর সম্পর্কে এমন এমন তথ্য দিয়ে ফেলেছে; যেগুলো খুবই সংবেদনশীল আর গোপন। খুব কম মানুষই এসব জানে। একটা কথা তো বলে ফেলেছে যেটা দাদু ছাড়া আর কেউ জানেই না! আমি অবাক হয়ে বললাম,

“সত্যি সত্যি তাহলে ওটা জ্বিনের বাদশাই ছিল?”

“আরে না!”

বাবার কথাতে সায় দিয়ে ভাইয়া বলে উঠলো,

“জ্বিনের কোন ঠ্যাকা পড়েছে দাদুর হিস্ট্রি মুখস্ত করবার? নিশ্চয়ই এমন কোনো লোক যে দাদুর ক্ষতি করতে চায়; ফায়দা লুটাতে চায়। সেজন্যই হয়তো বা ব্ল্যাকমেল করছে!”

“আমারও তাই মনে হয়।”—-বাবা বললো।

ওরা খাওয়ায় মন দিলো। আমার মনটা খচখচ করতে লাগলো। খাওয়াতে কিছুতেই মন বসলো না। কিছুসময় পর আমি বলেই ফেললাম,

“আচ্ছা বাবা, তুমি কি কখনো জ্বিন দেখেছো?”

“জ্বিন কি তাই দেখা যায় নাকি! জ্বিন আসে মানুষ, বিভিন্ন রকম পশু-পাখির রূপ ধরে। ওদের সত্যিকারের রূপ তোমাকে দেখাবে নাকি?”

মা প্রত্যুত্তর করলো। আমি বললাম,

“তোমরা তাহলে দেখো নি?”

“না।”

“আমি দেখেছি।”—-আমার কথা শুনে ওরা সবাই চমকে উঠলো। ভাইয়া তো হেসেই ফেললো,

“তুই? জ্বিন কি তোকে এসে বলেছে, ‘হ্যালো জিনিয়া। আমি জ্বিন।’ বোগাস সব!”

“তাইতো। তুমি কীভাবে দেখলে?”

মাও হেসে জিজ্ঞেস করলো। বাবার ঠোঁটেও উৎসুক হাসি। আমি দেখলাম, ওদের চোখ মুখে তীব্র অবিশ্বাসের ছাপ। হাহ, একটা কথা যদি বিশ্বাস করত আমার! যাই হোক। আমি ওদের পরশুদিনের ঘটনা খুলে বললাম। বর্ণনা করলাম, সেই আধভৌতিক কাহিনী—বিড়াল রূপী অশরীরীর কান্ডকীর্তি!

সবশুনে ওরা স্তব্ধ হয়ে গেল। পিনপতন নীরবতা নেমে এলো খাবার টেবিলে। এবার ওদের চেহারা দেখে আমার বেশ ভালো লাগলো। ভেতরে ভেতরে একটা গর্বের স্ফুলিঙ্গ নাড়া দিয়ে গেল। হাসি চলে এলো ঠোঁটের কোণে।

মা হঠাৎ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,

“তুই সত্যি বিড়াল দেখেছিলে। সাদা রঙের?”

আমি সগর্বে ঘাড় নাড়লাম। বাবার ভাবুক কণ্ঠ শোনা গেল; বললেন,

“কাল বিকেলে নামাজ থেকে ফেরার সময় আমিও একটা সাদা বিড়াল দেখেছিলাম। গ্যারেজে বসে ছিল।”

“ওটা তো মেবি ভাড়াটিয়াদের। ইকবালের কাছে…”

ভাইয়া বলতে বলতেই আচানক থেমে গেল।

পরক্ষণেই তিনজোড়া চোখ আমার দিকে নিবদ্ধ হলো। ওদের দৃষ্টিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। আমি কিছু বলতে যাবো; চিৎকার করে বলবো, ‘তোমরা যা ভাবছো তা নয়।’—-সুযোগটুকুও হলোনা। তার আগেই তিনজনের হো হো করা অট্টহাসিতে কেঁপে উঠলো সারা ঘর। আমি একেবারে বেকুব বনে গেলাম!

Story Cover