আমার উত্তর দেয়ার ইচ্ছে ছিলনা; কিন্তু কিছু না বলেও পারলাম না। এই ছেলেকে একটু শিক্ষা দেয়া দরকার। তারে কাপড় মেলে দিতে দিতে দাঁত কটমট করে বললাম,
“মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলাটা কোনো ভদ্রলোকের কাজ নয়!”
ইকবাল নিঃশব্দে হাসলো; ওর দিকে না তাকিয়েও আমি বিষয়টা বুঝতে পারলাম। বললো,
“গোসল কোনো ব্যক্তিগত ব্যাপার নাকি?”
“অবশ্যই। অন্তত শীতকালে।”
শীতকালে গোসল নিয়ে কেউ কথা বললে আমার মেজাজ ঠিক থাকেনা। আর কেউ প্রতিদিন গোসল করে এই ফ্লেক্স নিলে তো ইচ্ছে করে বরফ গলা পানিতে চুবিয়ে ধরি। যেন কোল্ড স্ট্রোক করে টপটে যায়। তার’পর প্রশ্নটা যদি আসে ইকবালের মত বিরক্তিকর মানুষের কাছ থেকে!
আমার চেহারা গম্ভীর হয়ে গেল। ইকবালের ঠোঁটে কৌতুকের হাসি,
“কিন্তু তোমার মা তো আর সেটা মনে করছেন না। তিনি জানালেন বলেই তো আগ্রহ পেলাম জিজ্ঞাস করতে…”
“আচ্ছা, ছুঁচো লোক তো তুমি। আমার বাসায় আড়িপেতে আবার সেটা বলতে এসেছ?”
আমি দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ওর সামনে দাঁড়ালাম। ইকবাল চৌকিতে দুহাত ভর দিয়ে মাথাটা একটু পেছনে নিলো; ভারি আমোদ পেয়েছে এমন কণ্ঠে বললো,
“আড়িপাতলাম কই? আন্টি তো ঢেড়া পিটিয়ে শুনিয়ে দিলেন!”
“তুমি একটা ইতর!”
আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। কাপড়গুলো নিয়ে ছাদের অন্যপাশে এসে তাড়াতাড়ি মেলতে শুরু করলাম। ভেবেছিলাম; রোদ পোহাবো। কিন্তু এই মূর্তমান যন্ত্রণাটাকে নিয়ে কি তাই সম্ভব? যতক্ষণ ছাদে থাকবো, বিরক্ত করবে!
______
আজ কলেজে বোটানি পরীক্ষা ছিল। এমন কঠিন করেছে যে; প্রশ্নপত্র দেখে আমার হাতপা ছুঁড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিলো। হায় আল্লাহ্! কোথা থেকে কি ভেবে কি প্রশ্ন করেছে, আমিই যে কি উত্তর করেছি—-দিশকুল পাচ্ছিলাম না। চুড়ান্ত দুঃখী মুখ করে বেরিয়েছিলাম কলেজ থেকে। কাচারি অবধি হেঁটে এসে ভাবলাম কিছু একটা খাই। বহুদিন হলো বাইরের কিচ্ছু খাইনা। সুরভীর পাশে, কলেজ রোডের শুরুতে সারবাঁধা ফুচকার স্টলগুলো রীতিমত আমাকে দেখলে হাতছানি দিয়ে ডাকে।
আজও কলেজ রোডের ফুচকার স্টল; কাচারির সারি সারি বেকারির দোকানের প্রদর্শিত লাড্ডু আর মিষ্টি দেখে আমার জিভে জল এসে যেতে লাগলো। বিশেষ করে মৌবনের বুন্দিয়ার লাড্ডুগুলো! যেন হাত বাড়িয়ে ডাকছে আমায়,
“আয়, জিনিয়া! একটু অন্তত চেখে যা। ধন্য কর আমাদের!”
বাধ্য হয়েই আমি দাম শুনলাম। ত্রিশ টাকা পিস্! তাও এতটুকু টুকু দেখতে। আগে তো বড় সাইজগুলোর দাম বিশ টাকা ছিল; ছোটগুলি পাঁচ টাকা। এখন!
নেব কিনা দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। অতটুকু জিনিস খেয়ে আমার মন ভরার প্রশ্নই আসেনা। আবার দুটো নিতে গেলে ষাট টাকা লাগবে! অ্যাপ্রনের পকেট হাতড়ানোর পর আমার বিবেক আমার আবেগকে কড়া ধমক দেয়,
“দিল সে নেহি, দিমাগ সে ফায়সালা কার!”
মনের কঠিন অগ্নিপরীক্ষা শেষে আমি বেরিয়ে এলাম। এমন নয়, এখন আমার কাছে টাকা একেবারেই নেই। আসলে আছে; বেশ ভালো পরিমাণেই আছে। বৃত্তির টাকাগুলো তুলেছি সেদিন; হাজার তিনেকের মত বেচে গেছে। কিন্তু ওগুলো যদি এই সামান্য লাড্ডু-ফুচকার পেছনে ঢেলে দেই তাহলে প্রয়োজনের সময় কি করবো!
বিকেলবেলা অবশ্য একটা মজার ব্যাপার ঘটলো। ভাড়াটিয়া আন্টি চারটে ইয়ে বড় বড় লাড্ডু দিয়ে গেলেন। ইকবালের জেদের কারণে বানিয়েছেন নাকি। আমি এত্তো অবাক হলাম! প্রতিবেশীকে খাবার দেয়া খুবই নরমাল; আমরাও দেই; কিন্তু সেটা এতো চমৎকার করে আমার মনের মতো হয়ে গেল—-আমি না চমকে পারলাম না। মীরাক্কেল হলো নাকি!
বাবা এমনিতে মিষ্টি পাগল লোক; কিন্তু স্ট্রোকের পর খান না। মার ডায়েবেটিস আছে; উনি ভুলেও মুখে তুলবেন না। বাকি রইলো ভাইয়া। সে আবার মিষ্টি খুব একটা পছন্দ করে না। খেলে হয়তো একটা খাবে। অতএব, আমি আয়েশ করে তিনটে লাড্ডু সাঁটিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললাম।
পরদিন মা পাটিসাপটা বানালেন। আন্টির পিরিচ ফেরৎ দেয়ার জন্য দু’টো পাটিসাপটা নিয়ে আমি গেলাম ইকবালদের ফ্ল্যাটে। তখন ইকবাল বাসায় ছিলনা। আন্টি একপ্রকার জবরদস্তি করেই আমাকে ভেতরে নিয়ে বসালেন। প্রথমবারের মতো ওদের ফ্ল্যাটটা দেখলাম আমি।
সত্যি বলতে, এটা আমার ফ্ল্যাট। বাবা যখন নিজের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে এই বাড়িটা করবার সিদ্ধান্ত নিলেন তখন আমার আর ভাইয়ার মধ্যে একদিন খুব কথাকাটাকাটি হলো। ভাইয়া বললো, আমার বিয়ে হয়ে গেলে আমাকে আর বাড়িতে আসতে দেবেনা। বাবা-মা না থাকলে তো ঘাড় ধাক্কা দেবে। কথাটা খুনসুটি করেই বলা; কিন্তু বাবা বেশ গুরুত্বের সাথে নিয়েছিলেন।
আইন অনুযায়ী ভবিষ্যতে এই জমিতে আমার হক থাকলেও; জীবদ্দশাতেই আমার কিছুটা হক আদায় করে রেখে যেতে চেয়েছে বাবা। বাসা করার সময় আমাদের ফ্ল্যাটটা করিয়েছে ভাইয়ার প্ল্যান অনুযায়ী; আর এই ফ্ল্যাটটা করিয়েছে আমার ইচ্ছেতে!
যদিও আমি জানিই সবকিছু, তবুও আন্টি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন আমায়—-ওনারা কিভাবে সাজিয়েছেন সব। অবাক করা বিষয় আমি আমার পছন্দ অনুযায়ী নিজের রুমটা করতে বলেছিলাম বাবাকে, ওই রুমটায় ইকবালের থাকার ঘর। বড় বারান্দা ওয়ালা ঘরটা; ঘর আর বারান্দার মাঝে চার পাল্লার কাঠের দরজা দেয়া। যেন ইচ্ছে হলেই পুরোটা খুলে ফেলা যায়। ঘরটা বেশ ছোট। একটা বিছানা আর পড়ার টেবিল ছাড়া কিচ্ছুটি রাখা যাবেনা। ইকবাল রাখেওনি। একদম আমি যেভাবে ভেবেছিলাম, ওমন করে সাজানো!
ইকবালের সাথে আমার পছন্দের কাকতালীয় মিল লক্ষ্য করে আমার বুকের ভেতরটায় হঠাৎ কেমন করে উঠলো।
আন্টি আমাকে বসার ঘরে বসিয়ে রেখে রান্নাঘরে ঢুকলেন। চা আনবেন। এতো করে বললাম মাত্র বিকেলের চা খেয়ে এসেছি; উনি শুনলেনই না। আমি বসে থাকতেই ইকবাল এলো। পরনে নীল শার্ট।
আমাকে দেখে ভ্রু নাচাতেই আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। ও নিজের ঘরে চলে গেল। একটুপর ফিরে এসে বসলো পাশের সিঙ্গেল সোফায়।
“তারপর কি মনে করে আমাদের বাসায় আসা হলো, খুকি?”
আমি সরু চোখে তাকালাম। ইকবাল হাতমুখ ধুয়ে শার্ট পাল্টে একটা পোলো পরে এসেছে। আমার চাহনি দেখে বললো,
“রাগ করো কেন? তোমার চেহারার ‘খুকি খুকি’ ভাবটার জন্যই তো খুকি ডাকি। বুঝলে?”
আমি কোনো প্রত্যুত্তর না করে মাথা নিচু করে বসে রইলাম। অজ্ঞাত কারণে সেই শুরুর দিন থেকে এই ছেলেটাকে আমি ভালো লাগে না।আশেপাশে এর উপস্থিতিও আমার জন্য খুব একটা সুখকর নয়। তবে আমার ধারণা, আমি যে ওকে পছন্দ করিনা—-এটা ইকবাল ভালো করেই জানে। জানে বলেই, আমাকে বিরক্ত করার পাঁয়তারা খোঁজে!
______
আজ আমার টেস্ট পরীক্ষা শেষ হলো। প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা অবশ্য বাকি। পরশু থেকে শুরু হবে। আজকে পড়ার চাপটা একটু কম; ইচ্ছে যদিও একেবারেই নেই। তবুও সামনে বোর্ড পরীক্ষা। হেলাফেলা করে অঘটন ঘটাতে চাইনা।
সন্ধ্যায় পড়তে বসেছি; কতক্ষণ হয়েছে খেয়াল নেই। বিদ্যুৎ চলে গেল হঠাৎ। আমি পড়ালেখায় ক্ষান্ত দিয়ে ঘর থেকে বেরোলাম। বাবার ঘরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো আলাপ চলছে। মা আর ভাইয়া ওখানেই। আমি একবার উঁকি দিয়ে শুনলাম, জমিজমা সংক্রান্ত আলোচনা। আগ্রহ পেলাম না। নিঃশব্দে চলে এলাম ছাদে!
জানুয়ারি পেরিয়ে আজ ফেব্রুয়ারির সাত তারিখ। উত্তরবঙ্গের জাঁকিয়ে বসা শীত একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে। আগে অনেক ঠাণ্ডা ছিল; সন্ধ্যায় বেরোলেই গা জমে যাওয়ার মত হতো। এখন অতটা নয়। অবশ্য কুয়াশা কমেনি। ছাদের চারপাশটায় যেন কুয়াশার একটা আস্তর দিয়ে ঢাকা।
আমি একা একা পায়চারি করতে লাগলাম। নরম-পশমি জন্তু; এক মুহূর্তের জন্য আমি বুঝতে পারলাম না ওটা কি! অসম্ভব ভয় পেয়ে ওড়না হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে লাফিয়ে উঠলাম,
“ও আল্লাহ্ এইটা কি!”
লাফটা বুঝে-শুনে দেইনি; কেবল প্রতিবর্ত ক্রিয়ার দরুন নেয়া একটা আকস্মিক পদক্ষেপ। কিন্তু ফলাফল ভালো হলোনা। বেতাল হয়ে আমি হুড়মুড় করে পড়ে গেলাম নিচে। সঙ্গে সঙ্গেই পায়ের কাছে আসা জন্তুটাও লাফ দিয়ে সরে গিয়ে উঠলো ছাদের রেলিংয়ের ওপরে। আমি দেখলাম ওটা ধবধবে সাদা রংয়ের একটা বিড়াল!
ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে আতঙ্কে আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। মেঝেতে শুয়ে আমি তাকালাম ওটার দিকে। আধো অন্ধকারে কুয়াশায় ঢাকা ওর গায়ের রং আর জ্বলজ্বলে চোখ দুটো এমনভাবে চেয়ে আছে আমার দিকে; গায়ে কাটা দিলো আমার। যেন ওটা সত্যিকারের বিড়াল নয়; বিড়ালরূপী অশরীরী কোনো জান্তব! এক্ষুনি ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার উপর!