গুঞ্জরনের নীড়ে

পর্ব - ৫

🟢

আজ পরীক্ষা ছিলনা। তাই একটু দেরি করেই খেতে বসেছি সকালবেলা। বাসায় এখন আমরা তিনজন; বাবা ফেরেনি। গতরাতে মাকে টেস্ট পেপারের কথা বলেছিলাম। বোর্ড পরীক্ষা ঘনিয়ে আসছে। ঠিকঠাক প্রস্তুতি নিতে না পারলে রেজাল্ট আর দেখতে হবেনা! মা খাবার টেবিলে বসেই ভাইয়াকে বললো,

“তোর টেস্ট পেপারগুলো কি করেছিস, নিশান? জিনিয়ার লাগবে, বের করে দিস তো।”

ভাইয়া খাওয়া থামিয়ে আমার দিকে তাকালো; তারপর চোখ সরিয়ে মাকে বললো,

“ওগুলো কোত্থেকে পাবে! বেচে দিয়েছি মনে নেই?”

“ওগুলো বেচে দিয়েছিস মানে!”

মা অবাক হলো। আমি বিশেষ অবাক হলাম না। কারণ ওগুলো যে বাসায় নেই; সেটা আমি আগেই জানতাম। ওর সমস্ত বইখাতা আমাকে দিয়েই তো গুছিয়ে নেয় ভাইয়া। বললো,

“তুমি তো বললে, বাসায় বইয়ের পরিমাণ বেশি হয়েছে। এক্সট্রাগুলো বেচে দিয়েছি।”

“ওগুলো এক্সট্রা? তুই জানিস না জিনিয়ার লাগবে ওগুলো?”

মা চোখ গরম করে করে তাকালেন। আমি তড়িঘড়ি করে বললাম,

“ওর বই পুরোনো, মা। ওগুলো দিয়ে এমনিতেও কাজ হবেনা। প্রাইভেটে সবাই নতুন কিনেছে; ওদের সাথে মিলিয়ে কিনতে হবে। স্যার না হলে সলভ করাবে কিভাবে?”

“হ্যাঁ, তাইতো।”

ভাইয়া সমর্থন জানাতেই মা খানিকটা দমে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন নতুন বই কিনতে কত লাগবে। আমি টাকার অংকটা বলতেই রীতিমত চমকে উঠলেন। আমি জানি এটা চমকে যাওয়ার মতই। কিন্তু কি করার আছে!

“বাবাকে বলো না এখনি। ফেব্রুয়ারিতে নিশানের ভর্তি। লাখখানেক টাকার মামলা। তোমাকেও তো কোচিংয়ে ভর্তি হতে হবে। এখনো তোমার টিউশনগুলো চলছেই। এরমধ্যে আরো টাকা…”

আমি মাথা নিচু করে শুনছিলাম। টাকার বিষয়ে চলে এলেই নিজেকে খুব অসহায় লাগে। খেতে ইচ্ছে করছিলো না আর। নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করলো ওরা। ঘরে যাবার আগে ভাইয়া হঠাৎ করে বললো,

“তোর বৃত্তির টাকাগুলো কি করেছিস?”

তাই তো! আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল। এসএসসিতে বোর্ড বৃত্তি পেয়েছিলাম আমি; টাকাগুলো তো আছেই। বললাম,

“একাউন্টে আছে। একটা টাকাও তো খরচ করিনি কখনো!”

“তাহলে তো হয়েই গেল। টাকা তুলে কি কি বই লাগে কিনে ফেল।”

ভাইয়ার কথা শুনে মার মুখের দিকে তাকাতেই মাও সায় দিলো,

“প্রয়োজনে যদি টাকা খরচ না করো; তবে টাকা জমিয়ে কি লাভ?”

দুদিন পর ব্যাংকে গিয়ে টাকা উঠিয়ে আনলো ভাইয়া। হাজার তিনেক টাকা দিয়ে টেস্ট পেপার কিনলাম। আরও তিনহাজার দিয়ে উদ্ভাসের ফাইনাল মডেল টেস্টে ভর্তি হলাম। এই প্রথম নিজের রেজাল্টের জন্য গর্ব লাগছে। বাবার অন্তত কিছুটা ভার কমাতে পেরেছি!

গুঞ্জরনের নীড়ে - মৌরিন আহমেদ

বিকেলবেলা টিউশন থেকে ফিরছি; গলির মুখে ইকবালের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ও আমাকে দেখেই ‘খুকি’ বলে হাত নাড়লো। আমি বিরক্তির চাউনি দেখিয়ে গটগট করে হাঁটতে শুরু করলাম। ইকবাল পিছু পিছু দৌড়ালো,

“আরে খুকি! রাগ করলে নাকি?”

আমি চট করে দাঁড়িয়ে গেলাম। একটা মানুষ কতটা ত্যাঁদড় হলে নিষেধ করার পরও একই কাজ করতে পারে? ইকবাল হাসতে হাসতে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,

“আমার নাম জিনিয়া সোবহানি। তুমি ভালো মানুষ হলে, অবশ্যই নাম ধরে ডাকবে।”

“আমি তো ভালো মানুষ না!”

আমি চোখ পাকিয়ে তাকাতেই; ইকবালের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বললো, “সরি।”

আমি উত্তর না দিয়ে পা বাড়ালাম সামনের দিকে। অসহ্য মার্কা ছেলে। ইকবাল পাশাপাশি ধীরে ধীরে হাঁটছে। নিচু স্বরে বললো,

“এখনো রাগ করে আছো? আচ্ছা, আর বলবো না। খুশি?”

আমি গম্ভীর গলায় বললাম, “মনে থাকে যেন।”

ইকবাল ঘাড় নাড়লো প্রত্যুত্তরে। অর্থাৎ মনে রাখবে। আমি আড়চোখে ওর দিকে তাকালাম। হাতে একটা পলিব্যাগ। ভেতরে বিড়ালের ছবি আঁকা একটা প্যাকেট। আমি প্যাকেটটা চিনি। আমার বান্ধবী স্মরণী ওর বিড়ালের জন্য কেনে; ক্যাটফুড। ইকবালদের বাসায় বিড়াল আছে? সর্বনাশ!

আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই ইকবাল বললো,

“একটা কথা বলি?”

আমি ভ্রু উঁচিয়ে তাকালাম; কি যে বলবে। এই ছেলের কথা মানেই তো উদ্ভট কিছু। আমার মুখভঙ্গিতে ইতস্তত করছে দেখে বললাম, “বলো।”

“তোমার রাগটা কিন্তু বেশি। খুকিদের এতো রাগ করতে নেই!”

বলেই একটা শয়তানি হাসি দিয়ে দৌড়ে চলে গেল ইকবাল। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বেয়াদব ছেলে! তোর কপালে ছাই পড়বে!

_____

ক’দিন ধরে আমার পড়ার চাপ যাচ্ছে খুব। প্রথম কারণ, টেস্ট চলছে কলেজে। যেহেতু সরকারি কলেজে পড়ি তাই এইচএসসির আগে আনুষ্ঠানিকভাবে এটাই শেষ পরীক্ষা। এর উপর নির্ভর করছে আমার বোর্ড পরীক্ষার এডমিট পাওয়া-না-পাওয়া। দ্বিতীয় কারণও ওটাই। শেষ সময়ে সিলেবাস শেষ করার তাড়া টিউশন স্যারদের; কেউ কেউ সিলেবাস শেষ করে আবার রিভিশনে চলে যাচ্ছেন! এতো এতো পড়ার মাঝে আমার অবস্থা রীতিমত খারাপ।

তবে এক দিক দিয়ে একটু শান্তিতে আছি; বাসার আবহাওয়া ভালো থাকছে। বাবা ময়মনসিংহ থেকে ফেরার পর বেশ ঠাণ্ডা মেজাজে আছেন। বাসার বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পেয়েছেন; মন তো ভালো হবেই। তাছাড়া জমিজমার কাজ কখনো তাড়াহুড়োয় হয়না। সময় লাগে অনেক! বাবাও তাই ব্যস্ত এসব নিয়ে। অসুস্থ শরীর নিয়েই যাতায়াত করছেন। মা প্রথমে একটু নারাজই ছিল; কিন্তু যখন দেখলো কাজ নিয়ে মগ্ন থাকলে বাবা কিছুটা শান্ত থাকছেন তখন আর বাধা দেননি।

ভাইয়ারও ভার্সিটিতে ছুটি। পরের সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হওয়ার আগে মোটামুটি দেড় মাসের মত সময় পাচ্ছে। অফুরন্ত অবসর পেয়ে কিসের একটা কোর্স-এ ভর্তি হয়ে গেছে। বলছে ফ্রিল্যান্সার হবে। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে কাজ করবে। আমরা কেউ কিছু বলিনি। একটা সময়ের পর, সবাইকেই সাবলম্বী হতে হয়। আগে থেকে চেষ্টা করলে লাভ বৈ ক্ষতি নেই!

_____

জানুয়ারি মাস; উত্তরবঙ্গে এমনই শীতের অবস্থা থাকে ভয়াবহ। তারপর এখন চলছে শৈত্যপ্রবাহ। টানা কদিনের কুয়াশায় ঢাকা থাকার পর আজ রোদ উঠবে বলেছে আবহাওয়া অফিস। আমি জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। রোদের ঝলক দেখা মাত্রই গোসলে যাবো।

তিনদিন হলো গোসল করিনা। এমনিতেই একদিন পর পর করি; গত দু’দিনে তাপমাত্রার অবস্থা দেখে সাহস পাইনি। তাছাড়াও কলেজে পরীক্ষা ছিল পরপর দু’দিন। বাসায় এসে আলসেমি কাটাতে পারিনি। অবশ্য তাপমাত্রা যত নিচে নেমেছে; আমি ইয়ার ফাইনালেও অত নিচে মার্ক তুলিনি। তাই ঠিক করেছিলাম, রোদ উঠলেই গোসল করব। এ-নিয়ে খানিকক্ষণ বেশ চেঁচামেচি করলো মা। রোদ যদি আরও পাঁচদিন না ওঠে, আমি কি তবে এভাবেই থাকব? আমার গায়ে পোকা হবে; চামড়ায় খোসপাঁচড়া হবে; আমি একটা গিদর —-ইত্যাদি ইত্যাদি শ’ খানেক বকাঝকা করে ঠাণ্ডা হয়েছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, আজ যদি কোনভাবে মিস যায় আমার গোসল; মা নির্ঘাৎ আমায় ঝাড়ুপেটা করবেন!

হুট করেই রোদের ঝলক পাওয়া গেল। মাও চিৎকার শুরু করলেন,

“কেটলিতে পানি ফুটে পড়ে যাচ্ছে, জেনি! গোসলে কি যাবে তুমি?”

আমি একপ্রকার ছুটেই গেলাম; পথে ভাইয়ার সাথে ধাক্কা খেলাম একটা। ও সবে বেরিয়েছে গোসল সেরে। মাথায় টালা মেরে বললো,

“এই গন্ধওয়ালা শাহবাগী, গোসল করিস না কেন?”

“তুই খুব করিস মনে হয়?”

“প্রতিদিন করি। তাও ঠান্ডা পানি দিয়ে। সবাই তোর মত পানিচোর নাকি!”

আমি দাঁত কটমট করতে করতে সরে এলাম। এরা এমনভাবে রিঅ্যাক্ট করছে যেন আমি কত বছর ধরে গোসল করিনা! আরে বাবা, আমার তো ঠাণ্ডার ধাঁত আছে। কিছু হতে না হতেই যে দম বন্ধ হয়ে মরে যেতে ধরি; সেসব এদের চোখে পড়ে না!

আর বদমাশটা এই ঠান্ডাতেও নিজের কাপড় ধোয় না। ভিজিয়ে রাখে মা ধুয়ে রাখবে বলে। পরে মা এগুলো দেখলেও কিচির-মিচির করে। আজও দেখলাম বালতিতে ভিজিয়ে রেখেছে; আমি তুলে ওভাবেই চটকা দিলাম বাইরে,

“এই আলসার ঘরের আলসা! তোর কাপড় কে ধুবে!”

কিন্তু কাপড়গুলো গিয়ে পড়লো মার গায়ে; মুহূর্তেই ভিজে গেল তার গা। আমি ভয়েই দরজা আটকে দিলাম। মা তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো,

“জানোয়ার!”

অবশেষে অনেক মান-অপমানের পর গোসল করে নিজেকে পুত-পবিত্র করে বেরোলাম ছাদে যাবার উদ্দেশ্যে। একহাতে কাপড়-চোপড়; অন্যহাতে ক্রিম আর লোশন। রোদটাও উঠে গেছে ভালো মতন। কাপড় নেড়ে দিয়ে ঘন্টাখানেক রোদ পোহানো যাবে।

“সাতদিন পর গোসল করলে নাকি, খুকি?”

ঘুরে তাকাতেই দেখি ইকবাল বসে আছে চৌকিটার উপর। হাতে বই। দাঁত কেলিয়ে চেয়ে আছে দেখে, ফট করেই আমার মেজাজটা আসমানে উঠে গেল! এই ছেলের সমস্যা কি! অন্যের ব্যাপারে এত নাক গলায় কেন?

Story Cover