আমি ঘরে ফিরে কিছুক্ষণ কাঁদলাম। ইকবাল আমার গাছ সরিয়েছে এজন্য মোটেও কাঁদিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই, আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমার অনেক দুঃখ। এতো দুঃখের ভার বহন করার শক্তি আমার নেই!
“কি রে হাম্বা! কি করিস?”
ভাইয়া দরজায় দাঁড়িয়ে টুকটুক শব্দ করলো। আমি হাতের উল্টোপিঠে চোখের জল মুছে নিলাম দ্রুত। ভাইয়ার স্বভাব এমন। ঘরে ঢোকার আগে নক করে ঠিকই; কিন্তু উল্টাপাল্টা কথা বলে। অবশ্য আমার নাম ধরে খুব কম সময়ই ডাকে। একেক সময় একেক সম্বোধন করে; আর আমি রাগ করি।
ভাইয়া ঘরে ঢুকতেই আমি ঠোঁট উল্টে বললাম,
“বাজে কথা বলিস কেন সবসময়? নাম ধরে ডাকতে খুব কষ্ট?”
“সমস্যা কি? হাম্বা নামটা পছন্দ হয়নাই? গরু ডাকবো?”
বেশ রয়েসয়ে উত্তর করলো। আমার কান্নার রেশ এখনো কাটেনি; যেকোনো সময় পুনরায় কাঁদতে শুরু করতে পারি। এরমধ্যে এই ছেলের প্যানপ্যানানি বিরক্ত লাগছে। বললাম,
“কি জন্য এসেছিস ঘরে? দরকার না থাকলে বিরক্ত করবি না।”
“করলে কি করবি?”
বলেই ভ্রু নাচিয়ে আমার বেণী ধরে টান দিলো। আমার এত রাগ লাগলো! আজ কি সবাই আমাকে যন্ত্রণা দেয়ার পাঁয়তারা করছে! দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,
“কি বলতে এসেছিস, বলে বিদেয় হ কিন্তু!”
“কেন? এটা তোর বাপের ঘর?”
“বাপের না, আমার ঘর। বের হ!”
ভাইয়া আরোও কিছু বলতে যাচ্ছিল। এই ছেলের অভ্যাস খারাপ; আমাকে বিরক্ত করা এর অন্যতম প্রধান শখ। অনেকদিন অবশ্য উপদ্রব কম ছিল; কিন্তু মাঝে মাঝে বিরক্ত করেই! কিন্তু এবারে অত সুযোগ দিলাম না। ধাক্কাতে ধাক্কাতে বের করে দিলাম।
তারপর আবারো আমার কান্না পেলো। একা বারান্দায় বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে আমি কাঁদতে লাগলাম। শব্দ যদি বাইরে চলে যায়,খুব লজ্জা পাবো আমি!
কিন্তু লজ্জা আমাকে পেতেই হলো। একটুপর মাথায় কারো স্পর্শ পেয়ে চমকে তাকাতেই দেখি ভাইয়া দাঁড়িয়ে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অসম্ভব কোমল গলায় বললো,
“এই গরু! কাঁদিস কেন রে? চুপ কর বেয়াদব। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি না? আমরা সবাই আছি তো।”
আমি কিছু বলতে পারলাম না। কেবল বাঁ চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো একবিন্দু অশ্রু!
_____
মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবার খুব অদ্ভুত ধরনের হয়। এদের জীবন ভাবনা যেমন অদ্ভুত; তেমনি ভালোবাসার ধরনও। পশ্চিমা সংস্কৃতির মত এখানে কেউ কথায় কথায় ‘লাভ ইয়্যু, মিস ইয়্যু’ ইত্যাদি ইত্যাদি আলাপ করে ভালোবাসা দেখায় না। ‘ভালোবাসি’ মুখে প্রকাশ করাটা তাদের কাছে লজ্জার; কেউবা ভাবেন ন্যাকামি। সেজন্যে যে এরা ভালোবাসে না তা কিন্তু নয়!
বরং এদের ভালোবাসার মাত্রা অসম্ভব তীব্র! কারণ এরা যা করে সেগুলো অন্তর থেকে আসে; মৌখিক স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। অযথা রংচং মাখানোর চেষ্টা তো একেবারেই নেই!
গতকাল কান্নার পর ভাইয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছে আমায়। যারা আমার ভাইকে চেনে তারা জানে ও কেমন মারাত্মক ফাজিল; অসচেতন মানুষ। ক্ষেত্র বিশেষে আচরণও বিরক্তিকর। সেই ছেলে আচানক গম্ভীর স্বরে আমায় বললো,
“খবরদার জিনু, কাঁদবি না। বাবার পর এই ফ্যামিলির অভিভাবক কিন্তু আমি। সমস্যায় পড়লে আমাকে বলবি। আমি ম্যানেজ করবো। সংসারের যে হাল; দেখছিসই তো। বাবা পারুক না পারুক; দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে। তাই কিছু হলে আমাকে বলবি, একা একা অমন ভেউভেউ করে কাঁদতে বসবি না যেন!”
আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। ভীষণ অবাক লাগছিল। সবাই বলছিল, গত কয়েকমাসে ওর পরিবর্তন হয়েছে। ছেলে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে শিখেছে। অবশ্য বাবার অসুস্থতার সময় যতো দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে ওকে! আমার চাচারা তো একদিন এসে দেখে গিয়েই দায়িত্ব পালনের পাঠ চুকিয়ে ফেলেছিলেন; ভাইয়া-ই তখন সামলেছে সব। তারপরও ওকে কখনো হতাশ দেখিনি; সারাক্ষণ হাসে; আমার পেছনে লাগে। জীবনের লোয়েস্ট পয়েন্টে এসেও ওর জীবনীশক্তি অদ্ভুত তেজদীপ্ত!
সে সন্ধ্যায় ভাইয়া আমাদের সবার জন্য অনলাইন থেকে বার্গার অর্ডার করলো। বাবা খরচ হওয়া টাকার অংকটা শুনে একটু রাগ দেখাতে চাইলেই বললো,
“অনেক আগে এই টাকাটা একজনকে ধার দিয়েছিলাম, বাবা। এটা ফেরৎ পাওয়ার কথাই ছিলনা। তাই…”
“তাই পেয়ে গিয়ে বাজে খরচা করলে?”
বাবা গম্ভীর স্বরে বললেন। আমি ভাবলাম ভাইয়া রাগ করবে। কিন্তু ও হাসলো। খুব চমৎকার করে বললো,
“হ্যাঁ, করলাম। মাঝে মাঝে বাজে খরচা করলে মন ভালো থাকে। বুঝলে?”
বাবা বিপরীতে কথা বাড়ায়নি। সাথে সাথেই আমি লক্ষ্য করলাম, আমার ভেতর থেকে সেই বিকেলের মন খারাপ করা রেশটা হারিয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুতভাবে আমার ভালো লাগতে শুরু করেছে সব। মনে হচ্ছে, এই দুঃসময় একদিন কেটে যাবে। একটা নতুন ভোর আসবে খুব শীঘ্রই!
তাই আজ সকাল বেলাতে আমি ফুরফুরে মন নিয়ে কলেজে গেলাম। দু’টো সিটি ছিল। বেশ ভালোই হলো পরীক্ষা। আইসিটি স্যার অনেকদিন ধরে প্র্যাকটিকাল সাইন করা নিয়ে ঘুরাচ্ছিলেন আমাকে। আজ সেটাও সলভ হলো দ্রুতই।
বাসায় ফেরার পর ইকবালের সঙ্গে দেখা হলো। আমি না দেখার ভান করে চলে আসবো ও তখন বললো,
“আমার মা কোথায় গেছে এটা কি তোমাদের বলে গেছে? আসলে বাসায় নেই তো; দরজায় তালা।”
আমি দাঁড়ালাম। মুখে কিছু না বললেও মাথা নাড়ালাম; জানিনা। মাত্র বাইরে থেকে এসেছি আমি; ড্রেস দেখেনি চোখে? ওদের ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে রইলো। আমি ঘুরে ঢুকবো বাসায় হঠাৎ পেছন থেকে বললো,
“সরি, জিনিয়া। তোমার অনুমতি ছাড়াই জিনিস সরানোর জন্য! আমি সব আগের মত করেই দিয়েছি, বিশ্বাস কর! এরকম আর করবো না।”
আমি এবারও কিছু না বলে চলে এলাম। কেন যেন এই ছেলেটাকে আমার পছন্দ না। তাই কালকের দোষটা অনেকাংশেই আমার হওয়া সত্ত্বেও ওকে কিছু বললাম না। কারণ টব এলোমেলো করা এমন কোনো অপরাধ না যে ওর সঙ্গে আমি চিৎকার করে কথা বলবো। আই ওয়াজ ভেরি রুড!
বাসায় ভাড়াটিয়া আন্টি এসেছেন। বসার ঘরে বসে গল্প করছেন মার সঙ্গে। আমি ওনাকে ইকবালের আসার খবরটা দিয়ে আমার ঘরে এলাম।
পরের কয়েকদিন বাসার পরিবেশ রইলো বেশ ঠাণ্ডা। জমিজমা সংক্রান্ত একটা কাজে বাবা দাদুবাড়িতে চলে গেলেন কয়েকদিনের জন্য। সেখান থেকে গেলেন ময়মনসিংহে। দীর্ঘদিন ধরে রংপুরে আমাদের স্থায়ী নিবাস গড়ে উঠলেও আমার দাদুর বাবার বাড়ি ছিল ময়মনসিংহ। বাবার দাদু অর্থাৎ আমার পরদাদা বহু আগেই গত হয়েছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ব্রক্ষ্মপুত্র নদের কারণে তার অধিকাংশ জমিজমা তলিয়ে গিয়েছিল। বহুদিন পর ভেসে উঠেছে; খবর পাওয়া মাত্রই আমার চাচাদের মধ্যে উত্তেজনা ভর করেছে। তাদের দাদার বিশাল সম্পত্তি। যদিও এখনো ভাগ হয়নি; কিন্তু আমার দাদুও কম পাবেন না। আর দাদু পেলেই তো চাচাদেরও পাওয়ার পথ সহজ হয়ে যায়!
কিন্তু সমস্যা হলো, দাদুর বয়স হয়েছে; জমিজমার হ্যাপা পোহাতে তিনি যেতে পারবেন না। এদিকে ছেলেদের মধ্যে বাবা’ই বড় এবং এই মুহূর্তে বেকার মানুষও তিনি। অতএব, সবার জোরাজুরিতে বাবা গেলেন তার বাবার সম্পত্তি উদ্ধার করতে!
আমি মনে মনে হাসলাম। অসুস্থ হবার পর সবার ব্যবহারের কথা আমার মনে পড়লো। এতোদিন তো খোঁজটা অবধি করেনি। যেই দেখা গেল, মুফতে সম্পত্তি পাওয়া যাচ্ছে অমনি ‘ভাই তুমি যাও! তুমিই পারবে!’—-বলা শুরু হয়ে গেল!
এরমধ্যে ইকবালের সঙ্গে আমার দেখা হলো কয়েকবার। একই বাড়িতে থাকি; দেখা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে ওকে খুব সূক্ষ্মভাবে এভয়েড করতে লাগলাম আমি। ওর বেশিরভাগ কথাই যেহেতু অহেতুক ফাজলামো; সেহেতু কথার প্রত্যুত্তর করতাম না। মুখটা কুঁচকে চলে যেতাম।
আজ থেকে আমার টেস্ট পরীক্ষা শুরু। প্রথম পরীক্ষা বাংলা প্রথম পত্র। আড়াই ঘণ্টায় সাতটা সৃজনশীল লিখে হাতের অবস্থা কাহিল। আঙুলের ডগায় কলমের ছাপ বসে আছে। হাতটা জ্বলছেও খুব। আমি হাতে ফু দিতে দিতে ইকবালকে দেখলাম কলেজের মাঠে। দেখে একটু অবাকই হলাম। যতদূর জানি, ওদের বাসা গাইবান্ধায়। এডমিশনের জন্য রংপুরে এসেছে। আমাদের কলেজে ওর কাজ কি?
যাইহোক, অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার বিশেষ আগ্রহ নেই। আমি নিজের জীবন নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত। ঘন্টাখানেক পর রাধাবল্লভে পড়তে যেতে হবে; তাই গেটের পাশের গাছের নিচে বসলাম। এখানটায় শান বাঁধানো আছে। ফিজিক্স স্যার টেস্ট নেবেন; তাই চোখ বুলাতে লাগলাম।
কিন্তু আমার ইকবালকে নিয়ে আগ্রহ না থাকলেও; ওর আমাকে নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ। আমাকে দেখা মাত্রই এগিয়ে এলো,
“আরে খুকি!”
আমি রাগ রাগ করে তাকাতেই সংশোধন করে বললো,
“সরি। জিনিয়া।”
আমি চোখ নামিয়ে বই দেখতে লাগলাম। ইকবালের কৌতুহল দমানো গেলনা। এক নিঃশ্বাসে বলে চললো,
“কিন্তু তুমি এখানে কি করছ? তোমার তো এসময় স্কুলে থাকার কথা। তুমি কি ক্লাস বাংক করে এসেছ? কিন্তু কেন? ও মাই গড! তোমার কি কোনো ছেলের সঙ্গে চক্কর চলছে, তারজন্য. .”
আমার মাথা গরম হয়ে গেল। কি সব বাকোয়াস বকে চলেছে!
চোখ পাকিয়ে তাকাতেই চুপ হয়ে গেল ইকবাল। আমি আমার হাতের বইটা মুখের উপর তুলে ধরলাম; যেন গর্দভটা কভার দেখতে পারে। সে দেখলো এবং অশিক্ষিতের মত কেটে কেটে উচ্চারণ করলো,
“প-দা-র্থ-বি-জ্ঞা-ন দ্বিতীয় পত্র
একাদশ - দ্বাদশ শ্রেণি
ড. আমির হোসেন খান
প্রফেসর মোহাম্মদ ইসহাক…”
আমি চট করে বইটা নামিয়ে নিলাম।
ইকবাল আমার দিকে তাকালো। কেমন একটা হাসি দিয়ে বললো,
“তুমি কলেজে পড়ো, বলোনি তো! এই কলেজেই? কোন ইয়ার?”
“সেকেন্ড!”
আমি বেশ গম্ভীর গলায় বললাম। ইকবাল আরও অবাক হলো,
“সত্যি?”
“না মিথ্যে!”
আমার কণ্ঠে বিরক্তি ঝড়ে পড়ছে। আহাম্মক ছেলে!
“আমি ভেবেছিলাম তুমি স্কুলে পড়ো। এইট-নাইনে। সরি!”
আমি মহাবিরক্ত হলাম। যদিও আমার যাওয়ার সময় হয়নি; তবুও বই ব্যাগে রেখে উঠে দাঁড়ালাম। হাদারাম গাধা একটা! তুই জানতিস না আমি কলেজে পড়ি? আচ্ছা, না জানিস। কিন্তু একটা মিনিমাম আইডিয়া তো করতে পারিস! এতোবড় মেয়ে এইটে পড়ে!
গর্দভ ইকবাল আমার পিছু পিছু এলো। সাফাই গাইতে লাগলো,
“আসলে এখনকার ছেলেমেয়েগুলোর গ্রোথ হরমোন এতো বেশি, সিক্স-সেভেনেই এত লম্বা লম্বা হয়ে যায়; বুঝতে পারিনি। তাছাড়া তুমি এতটাও লম্বা না!”
বাহ, কি বিবেচনা! বাহ! এই বুদ্ধি নিয়ে তুই এমিবিবিএস পড়ার জন্য সেকেন্ড টাইম দিচ্ছিস? সব যদি তুই দেখেই ভেবে ফেলতে পারিস; তাহলে দেশের তো মহা উন্নতি রে! রোগীকে টেস্ট-ফেস্ট করতে হবেনা; মুখ দেখেই বলে ফেলবি, ‘আরে মশাই, আপনার এপেন্ডিক্স তো ব্লাস্ট হয়ে গেছে!’ যত্তসব!
দেঁতো হেসে বললাম,
“সমস্যা নেই। আমিও তো তোমাকে দেখে বুড়ো ভেবেছিলাম; মাস্টার্স করছ হয়তোবা। আসলে হয়েছে কি, ইন্টার পাশ ছেলের গালভর্তি এতো দাড়ি. .”
ইকবাল নিজের গালে হাত দিলো। খোঁচা খোঁচা দাড়িতে পূর্ণ মুখটা। নিরস কণ্ঠে বললো,
“দাড়ি রাখা সুন্নত। এটা নিয়ে ঠাট্টা করোনা!”
আপসেট হয়েছে। তাছাড়াও দাড়ির বিষয়ে বলা ঠিক না; ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে। সুর পাল্টে বললাম,
“ঠাট্টা করিনি। সরি।”
ব্যস! অমনি সুযোগ পেয়ে গেল। বলতে লাগলো,
“তুমি তাহলে এবছর এইচএসসি দেবে। আমার সাথে এডমিশান দেবে। আচ্ছা, তোমার এমবিশন কি বলত? মেডিকেলে পড়বে? তাহলে কিন্তু এখন থেকে ভালো করে পড়তে হবে। পরীক্ষার পরের কথা ভাবলে; আমার মত ধরা খাবে।”
ইকবাল আমার সাথে সাথে অনেকদূর এসে গেছে। আমার প্রাইভেট স্যার পড়ান সামনের গলিতে। আমি ফিরে তাকালাম,
“তুমি আমার সঙ্গে সঙ্গে কেন আসছ? কোনো দরকার?”
প্রশ্নটায় যেন চমক খেলো ইকবাল। সচকিত হয়ে আশেপাশে তাকিয়ে বললো,
“এমনি।”
“এমনি এমনি কারো পিছে আসতে হয়না। তোমার কাজে যাও।”
ইকবাল আমার দিকে তাকিয়ে রইলো; অপলক দৃষ্টিতে। আমি ওকে ফেলে রাস্তা পার হলাম। খুব দ্রুতই গলির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলাম!
________
দু’টো প্রাইভেট পড়ে বেরোতে বেরোতে পাঁচটা বাজলো। শীতকালের দিন; সাড়ে পাঁচটাতেই মাগরিবের আজান দিয়ে দেয়!
বাসায় ফিরে দেখলাম, মা আর ভাইয়া চা খেতে খেতে গল্প করছে। ভাইয়ার এখন সেমিস্টার শেষের ছুটি। তাই বাসাতেই থাকে সবসময়। আমি ছুটে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম,
“মা বলোতো, আমাকে দেখে কি কলেজে পড়ি বোঝা যায় না?”
মা কাপে চুমুক বসিয়ে বললেন,
“কেন? কেউ কলেজে পড়লে কি তার গায়ে লিখে রাখতে হয়; দেখে বোঝার জন্য?”
“না! তুমি বলোতো আগে। আমি দেখতে খারাপ? চেহারায় কিছু আছে যে ছোট ছোট দেখায়?”
“ক্যান? কি সমস্যা তোর?”
ভাইয়া পাশ থেকে বলে উঠলো। আমি ওরদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললাম,
“দেখ ভালো করে। বল, আমাকে দেখে কি মনে হয়? আমি খাটো?”
ভাইয়া ঠোঁট বাঁকালো; ভাবটা এমন—-গভীর চিন্তা করছে। আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বললো,
“সবই ঠিক আছে। কিন্তু সাইজটা একটু বেশিই কম। বাটু! আমাদের পরিবারে তোকে মানায় না। দেখছিস এজন্যই বলি, তোকে কুড়ায় পাইছে!”
“মোটেও না। বরং বল, তোকে কুড়ায় পাইছে। তুই তো বেশি লম্বা!”
চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করলাম। মুহূর্তেই দু’জনের কথা কাটাকাটি লেগে গেল। সেটা হাতাহাতিতে পৌঁছানোর আগেই মা দু’জনকেই ধমকে থামালেন।
আমি ঘরে ফিরলাম। উচ্চতায় আমার ভাইয়া লম্বা; এ-কথা সত্যিই। পাক্কা ছ’ ফুট ছেলে। ওই তুলনায় আমি একটু খাটো; পাঁচ ফুট চার। কিন্তু পরিবারের বাকি সদস্য অনুযায়ী মোটেও বেমানান নই। আর নাইবা আমাকে দেখলে মনে হয়, আমি বাচ্চা। সত্যিই ইকবাল একটা আহাম্মক!