গুঞ্জরনের নীড়ে

পর্ব - ৩

🟢

বাসায় ঢোকার মুখেই ভাইয়ার সাথে ধাক্কা খেলাম। ভাইয়া বিরক্ত হয়ে বললো,

“এই সন্ধ্যা বেলা কোত্থেকে আসলি?”

“ছাদ থেকে। সর।”

ছোট করে উত্তর দিয়েই ফ্ল্যাটের দরজা আটকে দিলাম। আমার ঘরে যাবো; ভাইয়া পিছু পিছু এসে চাপা স্বরে ধমকাতে লাগলো,

“ছাদে! নামাজ নেই - কালাম নেই; এই সময় ছাদে গিয়েছিলি কি জন্য বেয়াদব? সন্ধ্যা বেলা ছাদে যেতে মানা করেনি মা!”

ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালাম। দাঁত কিড়মিড় করে বললাম,

“আমি গিয়েছি তাতে তোর কি? তুই নামাজ পড়িস কয় ওয়াক্ত!”

“আমার হিসেব চাস। আমি বড় না তোর? এক চড় খাবি!”

বলেই মাথায় টালা দিলো একটা। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম,

“মা দেখো আমাকে মারছে তোমার ছেলে!”

“এই, এই! তোকে মারলাম কখন আমি!”

বলতে বলতেই আরেকবার চাটা মারলো; এবার আগের চেয়ে জোরে। আমিও গলার স্বর উঁচু করলাম,

“মা!”

তখনি ফ্ল্যাটের দরজা খোলার শব্দ হলো। বাবা এলেন মসজিদ থেকে। আমাদের দিকে তাকালেন একপলক; আমরা দু’জন মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলাম!

________

পরদিন সকালে কলেজে ব্যবহারিক ক্লাস ছিল। সেজন্যে চটজলদি বেরিয়ে গেছি। গলির মোড়ে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পরও অটো পেলাম না। রিকশা অবশ্য ছিল। কিন্তু আমার একা একা রিকশা চড়তে ভয় লাগে; পাছে রিকশাওয়ালা অন্য জায়গায় নিয়ে চলে যায়! আমি একলা তখন কি করে বাঁচাবো নিজেকে! আরেকটা সমস্যাও আছে। সেটা হলো ভাড়া। বাসা থেকে কলেজ যাওয়ার অটো ভাড়া দশটাকা। কলেজটা একটু ভেতরে; রাধাবল্লভে। অটো থেকে নেমে হাঁটতে হয় খানিকটা। কিন্তু রিকশা নিলে ভাড়া চেয়ে বসে পঞ্চাশ টাকা। দর কষাকষি করে চল্লিশ অবধি আসবে; এর নিচে না।

ঠাণ্ডার দিনে দাঁড়িয়ে থাকতেও ভালো লাগছে না। ক্লাসটা গুরুত্বপূর্ণ না হলে এতক্ষণে বাড়ি চলে যেতাম। টেস্টের পড়াই কতটা বাকি এখনো!

হঠাৎ ইকবাল এলো বাসার দিক থেকে। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

“খুকি, স্কুলে যাচ্ছ?”

আমি ওকে আপাদমস্তক দেখলাম; দেখেই মুখ ফিরিয়ে নিলাম। আজব ছেলে একটা! বলেছি খুকি ডাকবে না। তবুও!

“অটোর অপেক্ষা করছো? মনে হয় পাবে না। আজকে একটা ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা আছে। সব অটো ভর্তি হয়ে যাবে। বেটার হয় রিকশা নিলে!”

তোকে এত কথা কইতে কে বলেছে, বাপু? আমি জানতে চেয়েছি কিছু! আমার বড্ড বিরক্ত লাগলো। মুখ কুঁচকে গেল আপনাআপনি।

ইকবাল কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো আমার পাশে। অপেক্ষা করলো হয়তো আমার উত্তরের। তাতে কি! অপরিচিত মানুষের সাথে খাতির জমানোর আমার কোনো ইচ্ছে নেই। যথেষ্ট মানুষ চেনা হয়ে গেছে আমার।

কিন্তু এই ছেলের মতিগতি আলাদা। কথা সে বলবেই! আমি বিরক্ত হয়ে তাকাতেই উসখুস করে বললো,

“একটা কথা বলি?”

আমি ভ্রু কুঁচকে ইশারা করতেই বললো,

“তোমার বাবা কি আর্মিতে ছিলেন?”

ভ্রুর কুঞ্চন আরেকটু বাড়াতেই হড়বড় করে বলতে লাগলো,

“না, আসলে, উনি অনেক রাগী মনে হয়! সারাক্ষণ হুমকি-ধামকি করেন। অনেক স্ট্রিক্ট, তাই না? তোমাদের সাথে রাগারাগিও করেন বোধ হয়…”

আমি বিরক্তির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সরে গেলাম ওর থেকে। কি গায়ে পড়া ছেলে! অন্যের জীবন নিয়ে এত আগ্রহ! পড়তে এসেছ, পড়ে বিদেয় হলেই তো হয়।

একটুপর অটো পাওয়া গেল। ইকবালের কথা সত্যি; জায়গা নেই-ই বলতে গেলে। পেছনে দু’জন মোটা মহিলা বসেছে; ওখানে বসাই যাবে না। আমি তবুও ঠেলেঠুলে উঠে পড়লাম। আসার সময় ইকবালের দিকে তাকালামও না। দেখ ব্যাটা, তোর ফ্রি এডভাইস আমার লাগে না!

gunjoroner nire golpo

ইদানিং মনে হয়, আমি যতক্ষণ বাসার বাইরে থাকি ততক্ষনই আমার শান্তি। বাসায় ফেরা মানেই সেই একঘেঁয়ে যন্ত্রণা। কলেজের ক্লাস করে বাড়ি ফিরিনি আর। ক্লাস শেষ হতে দেরি হয়েছিল; বেরিয়ে দেখি ঘন্টাখানেক পরে রাধাবল্লভে কেমিস্ট্রি প্রাইভেট। এটুকু সময়ের জন্য ফেরার মানেও হয়না। ডাবল খরচা।

অবশেষে তিনটের দিকে যখন বাসায় এসে পৌঁছেছি, তখন পেটে রীতিমত ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। ক্ষিদেয় প্রাণ যায় যায়! কিন্তু চৌকাঠে পা রাখতেই মুখটা তেঁতো হয়ে এলো। এই সময় বাবা চিৎকার করছে!

কারণ কি? কারণ তার হিসেব করা টাকার এদিক-ওদিক হয়েছে। এখন তিনি সংসার চালাবেন কি করে? মা আর ভাইয়া দু’জনেই ও-ঘরে। আমি হাতমুখ ধুয়ে রান্নাঘর থেকে খাবার বের করলাম। এই চেঁচামেচি তো রোজকার রুটিন! এরজন্য তো খাওয়া বন্ধ রাখতে পারিনা।

টেবিলে একা একা বসে যতোটা সম্ভব দ্রুত গিলছিলাম। যাকে বলে গপগপ করে খাওয়া? অথবা গোগ্রাসে গেলা। আমি সাহিত্যিক নই; শখও নেই। আপাতত খেয়ে নিজের অস্তিত্ব গুম করে দিতে পারলে বাঁচি। ঘরে গিয়ে কানে তুলো দিয়ে পড়তে বসে যাব। নাহলে ছাদ তো খোলাই আছে!

কিন্তু তবুও কিছু কথা কানে আসেই,

“আশ্চর্য! তোমার টাকা নিয়ে আমি কি ফূর্তি করে নষ্ট করেছি?”

মায়ের বিপরীতে বাবার চিৎকার,

“তুমি টাকা নাও নি তো কি করেছ?”

“টাকা নেইনি সেটা কখন বললাম? বলেছি না, সয়াবিন তেল শেষ হয়েছিল? তেল ছাড়া আমি রান্না করবো কি দিয়ে? তোমার ছেলে দাঁড়িয়ে আছে জিজ্ঞেস করো না কেন?”

“বাবা তুমি বাজার করো, তুমি জানো না তেলের কি দাম? এরকম করার কি আছে?”

ভাইয়াও কথা বলছে ওখানে। মায়ের আক্ষেপের সুর শোনা গেল,

“হায় আল্লাহ্! এমন কঞ্জুসের ঘরেই কেন আমাকে পাঠিয়েছ?”

আমি তৎক্ষণাৎ উঠে এলাম। খাওয়া শেষ হয়েছে আমার।

ঘরে এসে আগে কানে তুলো গুঁজলাম। প্রাইভেটের পড়া কমপ্লিট করতে গিয়ে মনে পড়লো, টেস্ট পেপার কিনতে হবে। এইচএসসি সামনে। বাসায় যা হলো, দু’-একদিনের মধ্যে টাকা চাওয়া অসম্ভব। এমনিতে আমার বাবা কিপ্টে নয়। একটু হিসেব করে চলতেন। কিন্তু চাকরিটা যাওয়ার পর এখন সত্যি সত্যিই কিপ্টে হয়ে গেছেন! টাকার কথা শুনলেই রেগে যান।

টাকা! টাকা! টাকা!

আমার কাছে যদি অনেক টাকা থাকতো, আমি সব সমস্যা এক চুটকিতেই মিটিয়ে ফেলতাম। কিন্তু হায়! আল্লাহ্ আমার তাকদীরে কি এসব লিখেছেন?

_________

বিকেলবেলা ছাদে গিয়েছি। আজ বিকেলে চা বানানো হয়নি বাসায়, মা’র মন খারাপ। বাবাও চুপচাপ আছে। এখন আমি চা নিয়ে গেলে কি যে বলবে! অবশ্য আমার চায়ের নেশা নেই। দিলে খেতে পারি; না দিলে জোর নেই।

ছাদে এসেই আমার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। আমার ছাদভর্তি নানান ধরনের ছোট ছোট ফুলগাছে। ইকবাল আমার অধিকাংশ টব তার জায়গা থেকে সরিয়ে ফেলছে! আমি প্রায় উড়ে এলাম ওর সামনে,

“এই ছেলে! আমার টব সরাচ্ছ কেন?”

ইকবালের সাথে আরোও কিছু টব। সেগুলো দেখিয়ে একটা হাসি দিয়ে বললো,

“তোমার টবগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা তো; ভাবলাম একটু সরিয়ে আমারগুলো…”

“তোমারগুলো কি? আমার টব সরিয়ে তুমি তোমারগুলো রাখবে?”

জানি না কেন, আমার কণ্ঠ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক জোরে শোনালো। হুট করে আমি হাইপার হয়ে গেলাম। ইকবাল আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললো,

“তুমি রেগে যাচ্ছ কেন? আচ্ছা, আচ্ছা। সরি। ভুল হয়েছে আমার…”

“এই ছাদ আমার। তুমি সরালে কি জন্য এগুলো? জানো এগুলো একটা প্যাটার্ন মেইনটেইন করে সাজিয়েছিলাম? তোমার সাহস কি করে হলো!”

“সরি! আ’ম রিয়েলি সরি! খুকি…”

“আরেকবার খুকি বললে ঘুষি মারবো একটা। আমার নাম জিনিয়া। শুনেছ তুমি?”

অনেক জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম। ইকবাল রীতিমত হতভম্ব। আমি নিজেও বিস্মিত। হুট করে রেগে যাওয়া আমার রীতিবিরুদ্ধ। যেখানে অপরিচিত কারো সাথে কথা বলার ন্যূনতম ইচ্ছে করে না; সেখানে রাগ দেখাবো—-অসম্ভব! কিন্তু এই মুহূর্তে নিজেকে সামলাতেও পারছি না।

আবারও চিৎকার করলাম,

“দাঁড়িয়ে আছ কেন? আমার জিনিস যেমন ছিল তেমন করবে তুমি; এক্ষুণি! নাহলে তোমার খবর আছে!”

বলেই গটগট করে নেমে এলাম ছাদ থেকে। আমার হঠাৎ কান্না পাচ্ছে। প্রবল কান্নায় ভেঙে যাচ্ছে আমার ভেতরটা!

Story Cover