মা আন্টিকে বসার ঘরে নিয়ে বসিয়েছেন। টুকটাক কথা বলছেন। আমি উঁকি দিতেই ডাকলেন,
“জিনিয়া, আন্টির সাথে পরিচয় হয়ে যাও।”
আমি ওনাকে সালাম দিলাম। ও-ঘর থেকে বাবার ডাক পড়ল হঠাৎ। ধমক দিয়ে আমার নাম উচ্চারণ করছেন। আমি ভয়েই ছুটতে শুরু করলাম। দেরি করলে, না জানি কি কুরুক্ষেত্র বাজান!
অবশ্য কুরুক্ষেত্র বাজলো না। বাসায় গেস্ট আছে শুনে উনি রাগটাকে চেপে রাখলেন। আমাকে গম্ভীর স্বরে বললেন,
“পাঞ্জাবিটা ইস্ত্রি করো চটপট। বাইরে যাবো!”
‘বাইরে কোথায়?’—-প্রশ্নটা ঠোঁটের আগালে এসেই গিয়েছিল। কিন্তু জিজ্ঞেস করা হলো না। পাছে ক্ষেপে ওঠেন!
আমি চুপচাপ পাঞ্জাবিটা রেডি করে দিলাম। বাইরে যাবো বললেও বাবা আসলে বাইরে গেলেন না। ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি পরে উনি ছাদে উঠলেন; পারশিয়াল ড্যামেজের কারণে সিঁড়ি ভাঙতে তার কষ্ট হয় ভীষণ। সবার আগে গল্প পেতে ফলো করুন ‘মৌরিন আহমেদ’ পেইজে। আমি পিছে পিছে যাচ্ছিলাম; আল্লাহ না করুক পা হড়কে গেলে কি হবে!
কিন্তু আমাকে দেখা মাত্রই হিসহিসিয়ে উঠলেন,
“তুমি আসছ কেন? কি সমস্যা?”
কি করে বলি, আমার মনে নানান শঙ্কারা উঁকি দিচ্ছে? স্বর নামিয়ে বললাম,
“এমনি। তুমি ছাদে কেন যাচ্ছ, বাবা?”
পরবর্তী ধমকটা খাবার জন্য প্রস্তুতই ছিলাম; কিন্তু দৈববলে বাবার মন গললো। শান্ত হয়ে বললেন,
“ভাড়াটিয়া উঠছে। দেখি নাহয় উপর থেকে।”
“আমি তাহলে তোমার সাথে যাই?”
বাবা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন আমার মুখের দিকে। আমি মুখ নিচু করে ঢোক গিললাম। ইদানিং বাবাকে খুব ভয় লাগে আমার। একটা কথা বলতে গেলে শ’ বার ভাবতে হয়। অথচ ছোটবেলায় বাপ-সোহাগী বলে খুব ক্ষেপাত আত্মীয়রা। যেকোনো কথা-আবদার নির্দ্বিধায় বলে ফেলা যেত।
“এসো। কিন্তু আমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করবে না!”
রাশভারী স্বর ফেলে বাবা আবার সিঁড়ি ভাঙতে শুরু করলেন। আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।
দুপুরবেলা মা রান্না করছিল। আমি রান্নাঘরে ঢুকেই কিছু বললাম না। এটা-ওটা নাড়লাম। চুলোর কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ালাম। কিছুক্ষণ ঘুটঘাট করতেই মা ধরে ফেললেন ব্যাপারটা। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“কি হয়েছে?”
“কাদেরকে ভাড়া দিয়েছ?”
“মানে?”
মার ভ্রু কোঁচকানো। আমি বললাম,
“ওদের ভাড়া দিয়েছ কেন? আন্টির ছেলেটা কত বড়! সে নাকি আবার সারাদিন বাসায় থাকবে। আমি তাহলে বাসায় থাকবো কীভাবে?”
“কেন, ওদেরকে কি তোমার ঘর ভাড়া দিয়েছি? তুমি তোমার ঘরে থাকবে। সমস্যা কোথায়!”
‘সমস্যা কোথায়?’—-কি করে বোঝাই সমস্যা কোথায়! আমি প্রায় সারাদিন বাসায় থাকি। কলেজে তেমন যেতে হয়না। তার ’পর যেই ঠান্ডা; রোদের ভরসায় প্রায় সারাদিনই উঠানে নাহলে ছাদে ঘুরে বেড়াই। বাবা ঝগড়া করলেও উঠোনের কোণে লুকিয়ে থাকি। কিন্তু ওই ছেলেটার রুম হলো ঠিক উঠানের সামনেরটা; উঁকি দিয়ে দেখেছি আমি। জানালা খুললেই দেখবে আমাকে! আর দেখলেই ডাকবে, ‘খুকি, খুকি!’ নিজের বাড়িতে কি স্বচ্ছন্দে ঘুরেও বেড়াতে পারবো না?
বললাম,
“ওই ছেলেটা আমাকে দেখলেই আমাকে ‘খুকি! খুকি!’ বলে। আর হাসে। আমার ভালো লাগেনা। বদমাশ ছেলে একটা।”
মা কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। কড়াই থেকে সবজি নামিয়ে রাখলেন বাটিতে। আমি সাহায্য করলাম তাতে। বললেন,
“সব কথা ধরতে নেই, জিনিয়া। ইকবাল মজা করে বলেছে। ও এবার মেডিকেলের জন্য সেকেন্ড টাইম প্রিপারেশন নিবে, কোচিংটা কাছাকাছি বলে তো এখানে ভাড়া নিয়েছে। সারাদিন পড়েই কূল পাবে না! বিরক্ত করা তো দূরের কথা…”
“ওর রুমটা উঠানের সামনে; জানালা খুললেই দেখা যায়।”
আমি ঠোঁট উল্টে বললাম। মার সহজ সমাধান,
“তুমি উঠানে যেও না তাহলে। তুমি ছাদে যাবে। তাছাড়া ওরা কি সবসময়ের জন্য থাকতে এসেছে? এডমিশন টেস্ট হয়ে গেলেই চলে যাবে।”
এডমিশন টেস্ট হওয়া কি আজকের কথা! কেবল জানুয়ারি মাস। ওদের পরীক্ষা হবে আমাদের এইচএসসির পর। এতোদিন আমার উঠোনে যাওয়া বন্ধ? মুখ লটকে এলো,
“যদি ছাদেও যায়?”
মা এবার রেগে গেলেন। চোখ গরম করে বললেন,
“বেশি বাড়াবাড়ি করবেনা, জিনিয়া। দুনিয়ার বাকি মানুষ কি ভাড়া দেয়না বাসা? ওদের এত নখরা করার সময় আছে? আর ওরা কতো টাকা ভাড়া দিচ্ছে আইডিয়া আছে? এ-গা-রো হাজার টাকা। এই টানাটানির সংসারে মাসে মাসে এগারো হাজার টাকার ফিক্সড একটা এমাউন্ট আসা কতটা উপকার বুঝতে পারছ?”
তাতে কি হয়েছে? ওইপাশের তিনতলা আন্টিরা পনেরো হাজার টাকা ভাড়ায় ফ্ল্যাট দিয়েছে। ভাড়াটিয়ার ছাদে যাওয়ার অনুমতি নেই; বাসার নিচে গ্যারেজেও জায়গা কম। সেখানে আমাদের ছাদও উন্মুক্ত আবার সামনে একফালি উঠানও আছে; আমাদের তো বরং আরেকটু বেশিই পাওয়া উচিৎ। তাইনা? কিন্তু বলা হলোনা। মার কথার উপরে কথা বললে ভাববে তর্ক করছি। অতএব, মার যুক্তিই অকাট্য!
_____________
পরদিন বিকেলের কথা। আছরের নামাজ থেকে এসে বাবার মেজাজ খারাপ। সাধারণত মা এসময় চা বানায়। চা-বিস্কিট খেতে খেতে সন্ধ্যে নামে। মাগরিবের আজান দিলে বাবা আবার মসজিদে ছোটেন।
চায়ের কাপ দেখেই বাবা রেগে গেলেন,
“রং চা? রং চা কীসের জন্য? ছাগলের মুত আমি খাইনা জানিস না?”
ধমকের চোটে আমার হাত কেঁপে উঠলো; চা চলকে পড়লো পিরিচে। বাবা আরও খাপ্পা হলো,
“একটা কাপও ধরতে পারো না? এতোবড় হয়ে শিখেছটা কি, হ্যাঁ?”
হম্বিতম্বি শুনে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন মা। হাতে মুড়ি-বিস্কিট; টেবিলে এনে রাখলেন। বাবার দিকে তাকাতেই উনি গম্ভীর মুখে বললেন,
“আমাকে রং-চা দেয়া হয়েছে কেন?”
“দুধ শেষ হয়ে গেছে।”
সহজ স্বীকারোক্তি দিয়ে মা নিজের কাপ এগিয়ে নিলেন। আমাকে বসতে ইশারা করলেন। আমি বসলাম না; বাবার চায়ের কাপটা তখনো হাতে! বাবা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন যেন,
“সেটা আগে বলা যেত না? আগে বলতে সমস্যাটা কোথায় ছিল?”
“ভুলে গিয়েছিলাম।”
মা ধীরে-সুস্থে চায়ে মুড়ি ভিজিয়ে উত্তর দিলেন। এত খামোশি হজম হচ্ছে না আমার। কখন যে আবার শুরু হয়ে যাবে! আমি মনে মনে দুয়া-দরুদ পড়তে লাগলাম।
“মন কোথায় থাকে তোমার? সারাদিন তো রান্নাঘরেই থাকো; তবুও ঘরে কি আছে, না আছে জানো না? এত বেখেয়ালি!”
বাবার গলার আওয়াজ ক্রমশ বাড়ছে। আমার আবার অস্থির লাগতে শুরু করেছে। দুয়া ভুল হচ্ছে। এখানে বেশিক্ষন থাকা ঠিক হবেনা বুঝে আমি কাপটা টেবিলে রাখলাম। মাকে পাশ কাটাবার সময় সন্তর্পণে বলে এলাম,
“আমি বিকেলে কিছু খাবো না, মা। ডেকো না।”
এখন আমি ছাদে বসে আছি। এখানে একটা পাঁচ বাই আট ইঞ্চির নিচু চৌকি আছে। আমরা যখন ভাড়া বাসায় থাকতাম তখন বারান্দায় থাকতো এটা। এখন নতুন ফার্নিচারের জন্য বাসায় এর জায়গা হয়না। ছাদেই থাকে সবসময়। আমি এখানে বসে থেকে পড়ি; ছবি আঁকি। মাঝে মাঝে শুয়েও থাকি।
নিচে বাবা একা একা চিৎকার করে যাচ্ছেন। তবে ক্ষীণ হয়ে শোনা যাচ্ছে। চেষ্টা করলেই উপেক্ষা করা যাবে। আমি চুপচাপ শুয়ে পড়লাম চৌকিতে। চিৎ হতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো বিস্তৃত নীল আকাশ। মেঘের আনাগোনা কম; কিন্তু যতটুকু আছে স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে আকাশটাকে!
তাকিয়ে থাকতে থাকতে আকাশের রং পাল্টালো; নীলচে আকাশ হলদে আভায় ভরে গেল। গোধূলী পড়লো। এরমধ্যে কখন যে আমার চোখ লেগে এলো টেরই পেলাম না।
“এই খুকি! এখানে এভাবে ঘুমাচ্ছো কেন? এই খুকি, এই!”
ঘুম ভাঙতেই দেখি মুখের সামনে একটা অপরিচিত মুখ; অনবরত ডেকে চলেছে। চোখ মেলতে দেখেই সরে গেল। আমি উঠে বসলাম। ভাড়াটিয়া আন্টির ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা ক্যাকটাসের টব। কি যেন নাম ওর? ইকবাল না ফয়সাল? ভ্রু কুঁচকে এলো আমার।
ছেলেটা আবার বললো,
“সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তুমি এইসময় এখানে ঘুমাচ্ছিলে কেন? বাসায় জায়গা নেই?”
ভ্রুর কুঞ্চন সোজা হলো না। বাসায় জায়গা নেই—-মানে? আমার বাসা এটা। আমি যেখানে - সেখানে ঘুমাবো। কাউকে কৈফিয়ত দিব কেন! মুখ-চোখ কুঁচকেই চৌকি থেকে নামলাম। চারপাশে অন্ধকার নেমে গেছে। ওড়নাটা মাথায় তুলে দিয়ে গম্ভীর হয়ে বললাম,
“আমাকে খুকি ডাকবেনা। খবরদার!”
আর দাঁড়ালাম না। নেমে এলাম সিঁড়ি বেয়ে। ছেলেটা কেমন করে যেন হাসলো; পেছন থেকে ডাকলো,
“খুকিকে খুকি বলবো না তো, কি বলব খুকি?